মঙ্গলবার, ৩০ জুলাই, ২০১৩

জাতি চায় -আবেগে বেগবান হোক রাজনীতিকরা



জাতি চায় -
আবেগে বেগবান হোক রাজনীতিকরা

* মানুষ বড়ই অকৃতজ্ঞ, যোগ্যতার মূল্য দিতে জানে না।
* মানুষ বড়ই দুর্ভাগা; যারা নিজেদের কল্যাণ অকল্যাণ বুঝে না।
* যে জাতি যেমন তাদের গণতন্ত্র তেমন।

শাহ্‌ নাসরিন ॥ মিথ্যাচারের শক্তি দেখে সচেতন দেশবাসী স্তম্ভিত, দিধান্বিত। ধ্বংস কত সহজ, বিনির্মাণ কত কঠিন, ধ্বংস মুহুর্তের ব্যাপার, বিনির্মাণ  সময় সাপেক্ষ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে কয়েক মুহুর্তের মধ্যে ধ্বংস হয়েছিলো নাগাসাকি - হিরোসীমা নগরী। আজও জাপান তার ফলাফল বয়ে বেড়াচ্ছে। সেদেশে আজও জন্ম নিচ্ছে ব্লাড ক্যান্সারের শিশু। ব্লাড ক্যান্সারের উপর এত গবেষণা বোধ হয় আর কোন দেশে হয় না। একটা আশা ছিলো এ সরকার হয়তো তলে তলে কঠিন প্রস্তুতি নিচ্ছে। কিন্তু জাতি হতাশ হচ্ছে। এদেশের মানুষ কি বুঝতে পারছে না যে রাষ্ট্র গত ৪২ বছরের জীবনে এরকম সঙ্কটময় অবস্থায় আর পৌঁছায়নি। এ সঙ্কট মোকাবেলা করতে না পারলে কি ভয়ানক মাসুল দিতে হবে জাতিকে। ধর্মের নামে সন্ত্রাসীদের ষড়যন্ত্রের জাল কতটা বিস্তৃত কতটা শক্ত তা কি এখনও উপলব্ধি করতে পারছে না এদেশের মানুষ।
সবচেয়ে অবাক লাগে মানুষ এত সহজে কি করে ভুলে গেলো বিএনপি সরকারের সীমাহীন দুঃশাসনের স্মৃতি। মানুষ অতীতের কঠিন অসুখের কষ্টের কথা ভুলে যায়। বর্তমানে সর্দিও তার কাছে অনেক বড় বলে মনে হয়। কিন্তু ২০০১-২০০৬ এর বিএনপি সরকারের দুঃশাসনের কষ্ট কাহিনীতো ভুলে যাওয়ার কথা নয়। এ সময়ের পত্রিকাগুলো বের করলে দেখা যাবে ৪২ বছরের বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন দুঃশাসন, গণতন্ত্রের নামে স্বৈরশাসন আর আসেনি। ওই সময়ে একজন নিরপেক্ষ ডাক্তার মহিলার একটা মন্তব্য মনে পড়ছে, তিনি বলেছিলেন বাংলাদেশে আল্লাহর এক গজব নাজিল হয়েছে। আর তা হলো তারেক জিয়া। তারেক জিয়ার ঘনিষ্ঠ মহল থেকে একটা কথা শুনেছিলাম যে তারেক জিয়া নাকি তখন বলেছিলো, আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থীই দিতে পারবে না। তার প্রমাণ আমরা তখন পেয়েছিলাম র‌্যাব এর ক্রস ফায়ারের মাধ্যমে। সংখ্যালঘুদের উপর তখনকার সীমাহীন অত্যাচার ’৭১ এর নির্যাতনের কাহিনী মনে করিয়ে দিচ্ছিলো। বিশেষ করে ভোলা অঞ্চলের ঘটনাগুলো ভালো মনে আছে। প্রতিদিন টিভির টক শো গুলোতে তাদের অতীত কীর্তি কলাপের কাহিনীগুলো মনে করিয়ে দেয়। তাদের দুঃশাসনের ফিরিস্তি এ স্বল্প পরিসরে দেয়া যাবে না। অশিক্ষিত শ্রেণী না হয় বুঝেনা, শিক্ষিত শ্রেণী কি করে ধর্মের নামে আফিম খেয়ে বুদ হয়ে আছে। সত্য উপলব্ধির অবকাশটুকুও কি তাদের নেই।
ক্ষমতাসীন সরকার সবসময়ই ১০-২০% বা তার চেয়ে বেশি জনপ্রিয়তা হারায়। কারণ বর্তমানটাই মানুষ অনুভব করে। অতীতের বহুকিছু মানুষ ভুলে যায়। বর্তমান সরকারকে তো আমি মন্দের ভালো হিসেবে নিয়েই বলছি এ সরকারে ব্যর্থতার যে ঢাকঢোল বিরোধীরা পেটাচ্ছে সাফল্যের প্রচারতো তেমন নেই, প্রচারণায় তারা সফলতা পেয়েছে। বিশ্ব ব্যাংকের কর্মকর্তারা গত এক বছর ধরে লেফট-রাইট করে এদেশে আসা-যাওয়া করে এদশের প্রতিটি কর্ণারে প্রতিটি মানুষের কাছে পৌছে দিলো পদ্মাসেতুর দুর্নীতির কাহিনী। যে দুর্নীতি হয়ইনি, হতে পারতো।
তবে আমি বলব এ সরকারের ব্যর্থতার চেয়ে সাফল্য অনেক বেশি। ’৭১এর পরাজিত শক্তির ষড়যন্ত্র, বিরোধী জোটের ষড়যন্ত্র, বিদেশীদের ষড়যন্ত্র যেভাবে সামাল দিয়েছে এবং এত প্রতিকূল অবস্থার মধ্যে যেভাবে উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে, যেভাবে জনগণের মৌলিক চাহিদার যোগান দিয়েছে তা প্রশংসার যোগ্য। ১৮ দলীয় জোটের যত ভাগ ভোট আছে, যত ভাগ সমর্থন আছে, ততো ভাগ এদের অবস্থান আছে এদেশের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে। এদেশের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে আছে ’৭১ এর পরাজিত শক্তি ও তাদের ষড়যন্ত্রের জাল। যা এদেশের মানুষের ধারণারও অতীত আত্মরক্ষার জন্য এমন কোন পথ নেই তারা বেছে নেয়নি। তাদের হিংস্র থাবা কতটা বিস্তৃত তা অনুমান করতে পারার কথা সচেতন মানুষ মাত্রই। এ ষড়যন্ত্রের মধ্যে কাজ করা কত কঠিন ছিলো এবং আছে, তাও সামাল দিয়েছে এ সরকার। ’৭১ এর পরাজিত শক্তি নিজের অর্থনীতিকে যেমনি মজবুত করেছে, তেমনি এদেশের অর্থনীতি ধ্বংসের মহড়ায় নেমেছে। গাজীপুরের নির্বাচনের ঘটনায় হঠাৎ করেই আশা সঞ্চার হলো চিন্তার জগতে। দুর্ভাগ্যের মধ্যে সৌভাগ্যের আভাস দেখতে পেলাম। আজমত উল্লাহ হারেনি, আজমত উল্লাহরা কখনও হারে না, আজমত উল্লাহ হেরেও জিতে গিয়েছেন। এদেশের প্রতিটি কোণে আজমত উল্লাহর খবর পৌছে গেছে, তিনি নতুন করে পরিচিত হয়েছেন জাতির কাছে। এতদিন আজমত উল্লাহ ছিলেন শুধু গাজীপুরের। এখন তিনি হলেন সারা দেশের, তিনি যেনো হিরো হয়ে উঠলেন। হয়তো এই পরাজয় তার দলের জন্য আরও বড় দরজা খুলে দিবে।

অত্যাচারীর রেহাই নাই



অত্যাচারীর রেহাই নাই

সংলাপ ॥ অতি+আচার=অত্যাচার। যেসব চালচলন ও ব্যবহারে ‘অতি’ যুক্ত হয়ে নিজের কিংবা অন্যের ক্ষতির কারণ হয় তা-ই অত্যাচার।  যেমন, অপরিমিত বা অত্যধিক আহার বিহার পরিশ্রম ইত্যাদি শরীরের উপর অত্যাচার। যে কোন কর্ম নিজের বা অন্যের ক্ষতির কারণ হলে তা অত্যাচার হয়। কে কখন কী কতটুকু গ্রহণ-বর্জন করতে পারবে তার একটা সীমা আছে। এ সীমা নির্ধারিত।  নির্ধারিত সীমাই অসীমের প্রমাণ ও পরিচয়। সীমালঙ্ঘন মাত্রই অত্যাচার। নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করলে, আচার ‘অতি’ দোষে দুষ্ট হয়ে অত্যাচারে পতিত হয়। অত্যাচার একটা ‘পতিত’ অবস্থা যদিও কিছুকাল এর দম্ভ ও উত্থান বিভ্রান্তির সৃষ্টি করে। তাই কুরআন বলছে - ‘কেবল তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে যারা মানুষের উপর অত্যাচার করে আর পৃথিবীতে অহেতুক বিদ্রোহ করে বেড়ায়। তাদের জন্য রয়েছে মর্মন্তুদ শাস্তি।’ (৪২ সুরা শুরা:৪২)। আর, আমি কোন জনপদকে কখনও ধবংস করি না যতক্ষণ পর্যন্ত না তার অধিবাসীরা অত্যাচার (সীমালঙ্ঘন) না করে। (২৮ সুরা কাসাস:৫৯)।
আমরা বাস করছি অত্যাচারের সমুদ্রে। ঘরে-বাইরে অত্যাচার। ভেতর-বাহির, পূর্ব-পশ্চিম-উত্তর-দক্ষিণে অত্যাচার চলছে তো চলছেই। প্রত্যেকেই সুযোগ পেলে কম-বেশি অত্যাচার  করছি - নিজের উপর, পরিবারের উপর, দেশের উপর, মানুষের উপর, প্রকৃতির উপর।
চিকিৎসক সেবার নামে রোগীর উপর অত্যাচার করছেন অহেতুক রোগ নির্ণয়ের জন্য পরীক্ষা চাপিয়ে।  শিক্ষিক ছাত্রদের উপর অত্যাচার করছেন কোচিং বাণিজ্য করে। ব্যবসায়ীরা খাদ্যে বিষ মিশিয়ে অত্যাচার করছেন ভোক্তাদের। ফুটপাত দখল করে বিক্রেতারা অত্যাচার করছে পথচারীদের। সরকারী দল অত্যাচার করছে বিরোধী দল ও জনগণের ওপর। বিরোধী দল অত্যাচার করছে সরকারী দল আর জনগণের ওপর। স্বামী অত্যাচার করছে স্ত্রী-কে, স্ত্রী অত্যাচার করছে স্বামীকে। পিতা-মাতা সন্তানের ওপর অত্যাচার করছে। সন্তান বড় হয়ে অত্যাচার করছে পিতা-মাতাকে। ধনীরা ধন-সম্পদ কুক্ষীগত করে অত্যাচার করছে গরিবদের। মোদ্দা কথা - যে যে স্তরে অবস্থান করছে সে স্তর থেকেই তার পক্ষে যতটুকু সম্ভব ততটুকু অত্যাচার সে চালিয়ে যাচ্ছে অন্যের ওপর। নিজের ওপর তো বটেই। প্রাবল্যই অত্যাচারের মূল কারণ। যে যেখানে প্রবল সে সেখানে দুর্বলের উপর অত্যাচার করে। অত্যাচারে প্রণোদনা দেয় - অর্থের লোভ, ক্ষমতার লোভ, হিংসা, ধর্মীয় বিদ্বেষ, ক্রোধ।
যে কোন প্রকারে অন্যের ধন-সম্পদ আত্মসাৎ করা, শ্রমিককে শ্রমের প্রকৃত মূল্য না দেয়া, মানুষকে কষ্ট দেয়া, মিথ্যা বলা, ওজনে কম দেয়া, ভেজাল দেয়া, প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করা ইত্যাদি সবকিছুই অত্যাচারের অর্ন্তভূক্ত। অত্যাচারের প্রশস্ত রূপ রাষ্ট্র শাসনে। যে শাসক মানুষের জান-মাল-ইজ্জতের নিরাপত্তা দিতে পারে না কিন্তু নিজের নিরাপত্তার জন্য বিশেষ বাহিনী পোষে সে শাসক অত্যাচারী। যে শাসক জনগণের শিক্ষার ব্যবস্থা করতে পারে না কিন্তু নিজের সন্তানকে বিদেশে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করে, যে শাসক জনগণের হক আদায় করে না, জনগণের জান-মালের নিরাপত্তা দেয় না, সবল ও দুর্বলের মধ্যে সমতা রক্ষা করে না, স্বার্থপ্রণোদিত আচরণ করে -  সে অত্যাচারী শাসক। কষ্টকর বিষয় হলো - আমরা এমন একটা সমাজে বাস করছি যে সমাজে যে যত বেশি অত্যাচারী সে ততবেশি ক্ষমতা ও ধন-যশের মালিক হয়। দুর্বলরা অত্যাচার সইতে সইতে এতোই অভ্যস্ত হয়েছে যে অত্যাচার করে না এমন কোন ব্যক্তিকে তারা নেতা বা শাসক মনোনীত করে না। অত্যাচার এখন কোন অপরাধ হিসেবে তো গণ্য হয়ই না, বরঞ্চ যে অত্যাচার করে না তাকে দুর্বল, বোকা, ভীতু, বেচারা,  হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়।
কুরআন নিজের উপর এবং অন্যের উপর যে কোন রকম অত্যাচারকে হারাম করেছে। যে কোন মানুষ, এমনকি জীব, জন্তু, পশু, পাখি ও প্রকৃতির উপর অত্যাচার করাও হারাম। শুধু অত্যাচার করা নয়, অত্যাচারীকে সহযোগিতা করা, অত্যাচারীর সাথে সম্পর্ক রাখা এমনকি অত্যাচার নীরবে সহ্য করাও হারাম। কুরআন বলছে - ‘আর তোমরা অত্যাচারীদের প্রতি ঝুঁকে পড়বে না, অত্যাচারীদের সহযোগি হবে না, তাহলে আগুন (জাহান্নামের) তোমাদেরও স্পর্শ করবে’ (১১ সুরা হুদ:১১৩)। কুরআনের মোট একশ’ চৌদ্দটি সুরার মধ্যে দুই তৃতীয়াংশ সুরায় অত্যাচার থেকে বিরত থাকার নির্দেশ আছে। বাংলাদেশ মুসলমান অধ্যুষিত দেশ। এদেশে মুসলমানদের সংখ্যা বাহুল্যের জন্য আমরা গর্ব করি। এটাও একটা অত্যাচার বটে। যারা যে ধর্ম মানে না, তা মানে বলে দাবি করা সে ধর্মের ওপর অত্যাচার।
যতক্ষণ অত্যাচার করার প্রবণতা থাকে ততক্ষণ কেউ আল্লাহকে স্মরণ করার যোগ্য হয় না। অত্যাচারীর জন্য আল্লাহ্‌কে স্মরণ না করাই উত্তম। আল্লাহ তায়ালা রসুল (সা.)-কে বলেন - ‘অত্যাচারীকে বলে দাও, সে যেন আমাকে স্মরণ না করে। কারণ যে ব্যক্তি আমাকে স্মরণ করে, আমিও তাকে স্মরণ করি। আর অত্যাচারীকে স্মরণ করার অর্থ হলো তার উপর আমার অভিশাপ বর্ষণ করা।’ অত্যাচারিত ব্যক্তি ক্ষমা না করা পর্যন্ত অত্যাচারী আল্লাহর কাছে ক্ষমাপ্রার্থী হতে পারে না। যে অত্যাচার করে সে অত্যাচার পাবে, যে দয়া করে সে দয়া পাবে - এটাই বিধাতার বিধি।
আল্লাহ তায়ালা অত্যাচারীকে কিছু সময় পর্যন্ত অবকাশ দিয়ে থাকেন। অবশেষে যখন পাকড়াও করেন তখন তাকে আর রেহাই দেন না।  সুরা ইব্রাহিমে বলা হয়েছে - ‘অত্যাচারীদের কর্মকান্ড সম্পর্কে আল্লাহকে কখনও উদাসীন মনে করো না। তবে তিনি তাদের শুধু একটি নির্দিষ্ট দিন পর্যন্ত অবকাশ দেন, যেদিন চক্ষুসমূহ বিস্ফারিত হবে, তারা মাথা ঊর্ধ্বমুখী করে উঠিপড়ি করে দৌড়াতে থাকবে, তাদের চোখ তাদের নিজেদের দিকে ফিরবে না এবং তাদের হূদয়সমূহ দিশাহারা হয়ে যাবে। মানুষকে আজাব সমাগত হওয়ার দিন সম্পর্কে সাবধান করে দাও, যেদিন তাদের কাছে আজাব আসবে। সেদিন অত্যাচারীরা বলবে, হে আমাদের প্রভু! অল্প সময়ের জন্য আমাদের অবকাশ দিন, তাহলে আমরা আপনার ডাকে সাড়া দেব (অন্যের ওপর অত্যাচার করব না) এবং রাসুলদের অনুসরণ করব। তোমরা কি ইতিপূর্বে কসম খেয়ে বলতে না যে তোমাদের পতন নেই! যারা নিজেদের ওপর অত্যাচার করেছে, তোমরা তো তাদের বাসস্থানেই বাস করছ এবং সেসব অত্যাচারীর সঙ্গে আমি কেমন আচরণ করেছি, তা তোমাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে গেছে। উপরন্তু আমি তোমাদের জন্য বহু উদাহরণ দিয়েছি’ (১৪ সুরা ইব্রাহিম:৪২-৪৫)। সুরা শোআরার শেষ আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘যারা অত্যাচার করে তারা শীঘ্রই জানতে পারবে তাদের যাবার জায়গা কোথায়।’ তাই কেউ যদি তার কারো ওপর অত্যাচার করে থাকে, তবে এখনই তার কাছ থেকে ক্ষমা নেয়া উচিত, ক্ষতিপূরণ দেয়া উচিত এবং সেই ভয়াবহ দিন আসার আগেই এটা করা উচিত, যেদিন টাকা-কড়ি দিয়ে কোন প্রতিকার করা যাবে না, বরং অত্যাচারীর কাছে কোন পুণ্য থাকলে তার অত্যাচারের পরিমাণ হিসাবে অত্যাচারিতকে উক্ত পুণ্য দিয়ে দেয়া হবে এবং অত্যাচারীর আর কোন অসৎ কাজ না থাকলেও অত্যাচারিতের অসৎ কাজ তার ওপর বর্তানো হবে।
মানবপ্রবৃত্তির অসংযত কাম-ক্রোধ, লোভ, মদ-মাৎসর্য থেকেই অত্যাচারের জন্ম। তাই শিষ্টাচার, সহিষ্ণুতা, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান, সহাযেগিতা ও সহমর্মিতার চর্চাই পারে অত্যাচারকে প্রতিরোধ করতে। কুরআন অত্যাচারকে প্রতিরোধ করার যে ব্যবস্থাপত্র দিয়েছে তা সিয়াম বা সংযম। নির্ধারিত সীমানাতে সন্তুষ্ট থাকার চর্চা করাই সিয়াম।
অত্যাচারই অশান্তি ও দুঃখের মূল কারণ। ব্যক্তিক, সামাজিক, আর্থিক ও রাষ্ট্রিক জীবন অত্যাচারমুক্ত হলে মানবজাতির কোন দুঃখ-কষ্ট থাকতো না। মানুষের মধ্যে অত্যাচার প্রতিরোধচেতনা জাগ্রত হলে মানবিক সমস্যাবলীর সমাধান হতো। অত্যাচারীকে প্রতিহত না করলে তার উদ্ধত্ত্য বেড়ে যায়। তাই বাধাহীন ভাবে অত্যাচারীকে অত্যাচার চালিয়ে যেতে দেয়া যায় না। অত্যাচারীর বিরুদ্ধে ‘সীসা ঢালা প্রাচীরের মতো অবিচল’ থেকে যে প্রচেষ্টা করে সে-ই মোমেন।

বুধবার, ২৪ জুলাই, ২০১৩

রাজনৈতিক অঙ্গনে সত্যের অন্তর্দ্ধানে - অর্ধ সত্য ও মিথ্যার কাইজায় জাতি বিভ্রান্ত


রাজনৈতিক অঙ্গনে সত্যের অন্তর্দ্ধানে

অর্ধ সত্য ও মিথ্যার কাইজায় জাতি বিভ্রান্ত


Ø তিনি সত্যকে প্রতিষ্ঠা করেন এবং মিথ্যাকে ব্যর্থ করেন-যদিও অপরাধীরা ইহা অপছন্দ করুক না কেন। ৮ঃ৮।

Ø আমরা তাহাদিগকে কর্ণ, চক্ষু এবং হৃদয় দান করিয়াছিলাম। কিন্তু তাহাদের কর্ণ, চক্ষু ও হৃদয় কোন কিছুই তাহাদের উপকারে আসিল না, কারণ তাহারা অস্বীকার করিত এবং যে আজাব লইয়া তাহারা ঠাট্টা-বিদ্রুপ করিত উহাই তাহাদিগকে পরিবেষ্টন করিয়া ফেলিল। ৪৬ঃ২৭।

 
·        দারিদ্র্য - মুক্তিযুদ্ধ - ধর্ম - নারীঃ রাজনীতির পণ্য বৃত্ত থেকে বের করে আনতে হবে।

·        বাঙালি জাতিসত্তার মর্মমূলে পৌঁছাতে হবে আত্মপরিচিতির বিনির্মাণে।

·        ধর্মকে আধুনিক চিন্তার সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে হবে জাতির উপলব্ধি বেগবান করতে। 

 
শেখ উল্লাস ॥ অত্যন্ত দুঃখজনক ও দুর্ভাগ্যজনক হলেও এ কথা আজ সত্য যে, এদেশে বর্তমানে যে রাজনীতি চলছে তার মূল উপজীব্যই হচ্ছে ধর্ম, দারিদ্র্য, মুক্তিযুদ্ধ অথবা নারী। কথাটা এভাবে বললে হয়তো আরও স্পষ্ট হয় যে, রাজনীতিজীবী বা রাজনীতিকরা এই ধর্ম, দারিদ্র্য, মুক্তিযুদ্ধ এবং নারীকে রাজনীতির পণ্য বানিয়েছে এবং এই পণ্য বাজারজাতকরণের কাজটা যে যতটুকু মিথ্যা ও অর্ধসত্যের মধ্য দিয়ে সূক্ষ্মভাবে করতে পারছে সে ততটুকু সফল হচ্ছে রাজনীতিতে।  এই অবস্থার মধ্যে রাজনীতি এবং  রাজনৈতিক দলগুলোর পরিচালিত কর্মকান্ডে রাজনীতিকদের মধ্যে কেউ কেউ শতভাগ মিথ্যাচার করছে, কারো কারো মধ্যে সত্য-মিথ্যার-রসায়নে অর্ধসত্য রয়েছে। অর্ধসত্য আর মিথ্যার কাইজায় দেশের রাজনীতি এবং রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে জনগণের দূরত্ব দিন দিন বেড়েই চলেছে। জনগণ সত্যটা জানে তাই রাজনীতি ও রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি বিরক্ত হয়ে উঠছে এবং এই সুযোগে অনেক ক্ষেত্রেই অযোগ্য, অদক্ষ, লুটেরা, ব্যবসায়ী ও গণবিচ্ছিন্ন ও অরাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক অবস্থানগুলো দখল করে নিচ্ছে।

রাজনীতিতে সত্যের অন্তর্দ্ধানে দারিদ্র্য, মুক্তিযুদ্ধ, ধর্ম, ও নারী  রাজনীতিতে পণ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের অধিকাংশ মানুষ অশিক্ষিত ও দরিদ্র এবং এই দারিদ্র্যের দুষ্টচক্রে পড়ে তারা অসহায় বলে তাদেরকে অতি সহজেই কাবু করতে পারছে গণতন্ত্রের নামে লুটেরা গোষ্ঠী। পরিণতিতে একজন যথার্থ স্বাধীন ও  সত্যের পূজারী সচেতন মানুষ হিসেবে সমাজে বাস করতে পারছে না।

এই সুযোগটি ব্যবহার করেই রাজনীতিজীবী এবং রাজনৈতিক ইসলামপন্থীরা গণতন্ত্রের ফাঁদে ফেলে মিথ্যার আশ্রয়ে ধর্মকে রাজনীতির পণ্যে পরিণত করার দুঃসাহস দেখাচ্ছে এই দেশে। এদেশের অধিকাংশ মানুষ ধর্মভীরু, কিন্তু ধার্মিক নয়। ধর্মের মর্মকথা তাদেরকে জানানো হয়নি। বেশিরভাগ ধর্মবেত্তা ও ধর্মজীবীরাও ধর্মের মর্মকথা জানে না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে জানলেও তাদের কায়েমী স্বার্থেই ধর্মের আসল কথাটা ধর্মভীরু জনগণকে জানাতে চায় না। এই সুযোগটিও ব্যবহার করছে রাজনীতিজীবীরা। ধর্মও এখন এদেশে একটি পণ্য হয়ে উঠছে সমাজে। যার ফলশ্রুতিতে দেখা যাচ্ছে, ধর্মের নামে বিশেষ করে পবিত্র ‘ইসলাম’ শব্দটি ব্যবহার করে তৈরি হয়েছে হাজারো প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক, বীমা, স্কুল, কলেজ ইত্যাদি। এতে করে সমাজের কিছু কিছু লোকের আর্থিক প্রভাব প্রতিপত্তির বিকাশ ঘটলেও অধিকাংশ লোকের জন্য তা এক বিরাট বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। শ্রমজীবী মানুষের কষ্ট ও দুর্ভোগ বেড়েই চলেছে এবং এইভাবে সৃষ্ট অর্থনৈতিক বৈষম্যপূর্ণ সমাজে রাজনীতিজীবীদের পণ্য হচ্ছে ধর্ম এবং তা বাজারজাত করণে মাঠে নেমেছে মিথ্যার ঝুড়ি নিয়ে রাজনীতিক, ধর্মজীবী ধর্মান্ধ রাজনৈতিক ইসলামপন্থীরা।  ১৯৭১ সালে দেশপ্রেম ও সমাজ সচেতন চিন্তাচেতনায় সমৃদ্ধ যে অংশটি মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছিল স্বাধীন দেশে তাদেরকেও যথাযথ মূল্যায়ন ও পুনর্বাসন না হওয়ায় তাদের অধিকাংশই এখন সমাজের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীতে পরিণত হয়েছে। স্বাধীনতার ৪২ বছর ধরেই দরিদ্র ধর্মভীরু মানুষ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সরকারের রাজনীতিতে শুধু ভোটের জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে। মুক্তিযোদ্ধাদের কাংঙ্খিত বাংলাদেশ এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। দেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেক যে নারী সমাজ তারা বর্তমানে অর্থনীতির বিরাট চালিকাশক্তিতে পরিণত হলেও তাদেরকে পশ্চাতে নিয়ে যাওয়ার গভীর চক্রান্তে লিপ্ত রয়েছে ধর্মজীবী, ধর্মান্ধ ও ধর্মব্যবসায়ীরা এবং এই অপতৎপরতা থেকে তাদেরকে মুক্ত করার কোনো দৃঢ় ও যথাযথ ব্যবস্থাও নেয়া হচ্ছে না। ফলে নারী জাতির যথাযথ সম্মানও প্রতিষ্ঠা হচ্ছে না এবং তারা অনেক ক্ষেত্রেই ধর্মের অপব্যাখ্যার শিকার হয়ে ও রাজনীতির পণ্য হিসেবেই ব্যবহৃত হচ্ছে। দেশ ও জাতির সার্বিক অগ্রগতির যাত্রাও মন্থর হয়ে পড়ছে এবং এই অবস্থা থেকে উত্তরণ ঘটাতে না পারলে দেশ ও সমাজ আরও পিছিয়ে যাবে। বিকৃত চিন্তাচেতনার অধিকারী অশিক্ষিত ধর্মজীবী ও ধর্মান্ধদের রাজনীতিক হওয়ার স্বপ্ন বাস্তবায়িত হওয়ার পথই শুধু সুগম হবে।

উত্তরণের জন্য আজ প্রয়োজন ধর্ম, দারিদ্র্য, মুক্তিযুদ্ধ ও নারীকে পণ্য বানানোর যে ন্যাক্কারজনক প্রতিযোগিতা চলছে এক শ্রেণীর রাজনীতিক ও সমাজপতিতের মধ্যে তাদেরকে রুখে দাঁড়ানো। বাংলাদেশের বর্তমান রাজনীতিতে কারা এই ন্যাক্কারজনক প্রতিযোগিতায় লিপ্ত তা সাধারণ মানুষ বিশেষ করে সচেতন ও দেশপ্রেমিক কারোরই অজানা নয়। এদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় যারা এদেশের লাখো নিরীহ মানুষকে হত্যা করেছে, নারী নির্যাতন করেছে, লুটপাট করেছে তা কারোরই এখন অজানা নয়। আর যারা এই অপরাধীদেরকে বাঁচাতে আজ বিভিন্ন ফন্দি-ফিকির করছে তারাও অপরাধের জালে জড়িয়ে পড়ছে। মুখে গণতন্ত্রের কথা বললেও তারা প্রকৃতপক্ষে একাত্তরের ঘাতক-দালাল-রাজাকারদের সহযোগী ছাড়া কিছু নয়। তারাই মূলত ধর্ম, দারিদ্র্য, মুক্তিযুদ্ধ ও নারীকে পণ্য বানিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করে বাংলাদেশকে ধর্মীয় সন্ত্রাসের চারণভূমি করে রাখতে চায়। তাদের মুখোশ জনগণের সামনে আবারো যথাযথভাবে উন্মোচনে নতুন প্রজন্ম মাঠে নেমেছে। তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য সরকারকে সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত হওয়া আজ সময়ের দাবি। আর তা না করা হলে দেশ ও জাতির জীবনে  অন্ধকার নেমে আসতে বাধ্য।

কোনো কোনো রাজনৈতিক দল বিশেষ করে বর্তমানে ক্ষমতাসীন সরকারি দল এই ধর্ম, দারিদ্র্য, মুক্তিযুদ্ধ ও নারীকে পণ্য বানানোর প্রতিযোগিতায় লিপ্ত নয়-কথাটি পূর্ণ সত্য নয়, বলা যেতে পারে অর্ধসত্য। এই দল ও সরকারের ভেতরেও এখন ঢুকে পড়েছে অনেক নব্য রাজাকার যাদের সাথে এদেশের স্বাধীনতাবিরোধী চক্রের যোগসাজশ রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্নের একটি শোষণমুক্ত অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পথে বাধা-বিঘ্ন তৈরি করাই এদের কাজ। এদের পূর্বসূরীরা স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধুকে ঘিরে রেখে শেষ পর্যন্ত একটি ১৫ই আগষ্ট সৃষ্টির যাবতীয় আয়োজন করতে সফল হয়েছিলো। এরাই কথিত হেফাজতীদেরকে ঢাকায় আসার সাহস ও শক্তি যুগিয়ে একটি অনাকাঙ্খিত ও বিব্রতকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে এই সরকারের জন্য, যে সরকারের বিপুল ভোটে বিজয়ী হওয়ার মূল নিয়ামক শক্তিই ছিল মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশ গড়ার স্বপ্নে বিভোর নতুন প্রজন্ম।  

এদেশের সাধারণ মানুষ ধর্মভীরু, কিন্তু ধর্মান্ধ নয়। জনগণের এই ধর্মভীরুতাকে পুঁজি করেই সংবিধানে আজ রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম সন্নিবেশিত রয়েছে। ইসলাম অর্থই শান্তি। এটি মানবজাতির একটি সর্বজনীন ধর্ম এবং সাম্যের ধর্ম। এই ধর্মে নারী-পুরুষের সমান অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করেছে। এই ধর্ম যেখানে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে সংবিধানে স্বীকৃত সেখানে কোনো বৈষম্য, বঞ্চনা, শোষণ, নিপীড়ন থাকতে পারে না। যদি তা থাকে এবং তা দূর করার কোনো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা না হয় তবে তা হবে ইসলাম অবমাননা, ধর্মভীরু বাঙালি জাতির ধর্মীয়?অনুভূতিতে আঘাত। বাঙালি জাতির দারিদ্র্য, ধর্ম, মুক্তিযুদ্ধ ও নারীকে নিয়ে রাজনীতির পণ্য করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত তাদের বিরুদ্ধে?  সরকারের বলিষ্ঠ পদক্ষেপ জাতি দেখতে চায়।?সমাজের সকল বৈষম্য দূর করে একটি ন্যায়ভিত্তিক, সাম্যবাদী ও বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণই হোক সরকারের সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার। তবেই সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম ইসলামের সন্নিবেশ করাটা সরকারের সত্য  পদক্ষেপ   বলে পরিগণিত হবে। আর তা না হলে ধর্মকে পণ্য করার অভিযোগে বর্তমান সরকারের কর্তাব্যক্তিরাও অভিযুক্ত হবেন  এবং দেশ ও জাতির কাছে তাদেরকেও একদিন জবাবদিহি করতে হবে।

বঙ্গতাজ তাজউদ্দীন বাঙালি জাতির প্রেরণা


বঙ্গতাজ তাজউদ্দীন

বাঙালি জাতির প্রেরণা

 
[১৯৭১ সালে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোতে বাঙালি জাতিকে স্বাধীনতার পথে যোগ্য ও সফল নেতৃত্ব যিনি দিতে পেরেছিলেন তাঁর নাম বঙ্গতাজ তাজউদ্দীন আহমদ। দুর্ভাগ্য জাতির, স্বাধীন দেশে ফিরে এসে আওয়ামী লীগ এই মহানায়কের সাথে যথার্থ সম্পর্ক রাখতে ব্যর্থ হয়। কিছুদিনের মধ্যেই তাঁকে মন্ত্রিসভা থেকেই অপসারিত হতে হয়। আওয়ামী লীগের মধ্যে ঘাপটি মেরে পড়ে থাকা যুদ্ধাপরাধীদের ষড়যন্ত্রের জন্য তৎকালীন সরকার সত্য জানতে চায়নি। ক্ষমতার মোহ, স্বজনপ্রীতি এবং সামপ্রদায়িকতা নেতৃত্বকে কুরে কুরে খাওয়া আরম্ভ করেছিলো। মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্নের বাংলাদেশ পথ হারিয়ে চলতে থাকে মূলত তখন থেকেই। স্বাধীনতার পর আজ পরিবর্তীত পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে তাই আবারও ভেবে দেখার সময় এসেছে দেশ গঠনে বঙ্গতাজ তাজউদ্দীনের চিন্তাচেতনাকে ধারণ করার। মুক্তিযুদ্ধের সফল পরিসমাপ্তি ঘটাতে তাজউদ্দীনের অবদানকে স্মরণ করার পাশাপাশি যে আরো একটি নাম বাঙালির ইতিহাসে জ্বলজ্বল করে ভেসে ওঠে তাঁর নাম এম এ জি ওসমানী - মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি। পাঠ্যপুস্তকে, ইতিহাসের বইয়ে শুধু কোনো ব্যক্তি বিশেষকে যোগ্য স্থান দিলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যাবে না। নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধ ও জয়ের জন্য তাজউদ্দীন এবং ওসমানীকেও যথাযথ মর্যাদায় আগামী ও বর্তমান প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে হবে। তাজউদ্দীন ও ওসমানী ’৭১-এ সে দিন ছিলেন পথিকৃৎ। তাদের অনন্য ভূমিকা ও নেতৃত্ব ব্যতিরেকে দেশকে পাকিস্তানী হানাদার মুক্ত করতে কোনোভাবেই সম্ভব হতো না, এমনকি ভারতের সমর্থন নিয়েও নয়। বাঙালি জাতি যতদিন বিশ্বের বুকে টিকে থাকবে তার স্বাধীনতার ইতিহাসে তাজউদ্দীন-ওসমানী চিরস্মরণীয় থাকবেন।]

সংলাপ ॥ ১৯২৫ সালের ২৩ জুলাই গাজীপুর জেলার কাপাসিয়ার দরদরিয়া গ্রামে এক মধ্যবিত্ত কৃষক ও সাধক পরিবারে তাঁর জন্ম। তিনি একাধারে রাজনীতিবিদ ও আইনজীবী ছিলেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৪৬ সালে অর্থনীতিতে প্রথম শ্রেণীতে বি.এ.অনার্স এবং ১৯৬৪ সালে জেল থেকে পরীক্ষা দিয়ে ল’ পাস করেন। ছাত্রজীবন থেকেই প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করেন। তিনি চল্লিশের দশকে নিখিল বঙ্গ মুসলিম ছাত্রলীগ ও বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের নেতৃস্থানীয় সদস্য ছিলেন।

তিনি পাকিস্তান আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার (১৪ আগষ্ট ১৯৪৭) পর মুসলিম লীগ সরকারের গণবিরোধী নীতির প্রতিবাদে মুসলিম লীগের সঙ্গে সম্পর্ক ত্যাগ করেন। তিনি রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ - ১৯৪৮ ও রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ - ১৯৫২ উভয় কমিটির সদস্য ছিলেন। ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারির ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণের দায়ে গ্রেফতার হন ও কারা নির্যাতন ভোগ করেন। পূর্ব পাকিস্তান যুবলীগ (এপ্রিল ১৯৫১)-এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এবং ১৯৫১-১৯৫৩ পর্যন্ত এ সংগঠনের কার্যকরী পরিষদের সদস্য ছিলেন। ১৯৫৩ সালে তিনি আওয়ামী লীগে যোগদান করেন ও ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।

১৯৫৪ সালের মার্চ মাসে যুক্তফ্রন্টের মনোনয়নে কাপাসিয়া অঞ্চল থেকে পূর্ববঙ্গ পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন এবং এবং একই বছর জুন মাসে ৯২-ক ধারায় গ্রেফতার হন। তিনি ১৯৫৫-র ২৭ অক্টোবর কাউন্সিলর সভায় আওয়ামী লীগের সাংস্কৃতিক ও সমাজসেবা সম্পাদক নির্বচিত হন। ১৯৫৮-র ৭ অক্টোবর দেশে সামরিক শাসন জারির পর আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ ঘোষিত হলে তিনি গ্রেফতার হন এবং ১৯৫৯ সালে মুক্তিলাভ করেন। ১৯৬২ সালে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে পরিচালিত এনডিএফ (ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট)-এর গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৬৪ সালের ২৫ জানুয়ারি আওয়ামী লীগের পুনরুজ্জীবনে তিনি বিশিষ্ট ভূমিকা পালন করেন। একই বছর ৮ মার্চ কাউন্সিল সভায় দলের সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হন। তিনি এপ্রিল (১৯৬৪) মাসে গ্রেফতার হন। জেল থেকে মুক্তি পেয়ে তিনি দেশের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে (২ জানুয়ারি ১৯৬৫) সম্মিলিত বিরোধী দলের প্রার্থী ফাতেমা জিন্নাহর নির্বাচনী প্রচারাভিযানে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৬৬ সালের ৫ ও ৬ ফেব্রুয়ারি  লাহোরে বিরোধী দলের সম্মেলনে আওয়ামী লীগের প্রতিনিধি দলের সদস্য হিসেবে যোগদান করেন। এ সম্মেলনের বিষয় নির্বাচনী কমিটিতে শেখ মুজিবর রহমান কর্তৃক ঐতিহাসিক ৬-দফা কর্মসূচী উপস্থাপন করেন। ১৯৬৬-র ১৯ মার্চ কাউন্সিল সভায় তিনি আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন এবং প্রায় ছয় বছর এ পদে দায়িত্ব পালন করেন। শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে তিনি ৬-দফার প্রচারাভিযানে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। ৮ মে (১৯৬৬) দেশরক্ষা আইনে পুনরায় গ্রেফতার হন। গণ-আন্দোলনের চাপে ১৯৬৯ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি সরকার কর্তৃক তাঁকে মুক্তি দেয়া হয়। অতঃপর গণ আন্দোলনে (জানুয়ারি-মার্চ ১৯৬৯) নেতৃত্বের ভূমিকা পালন করেন। বিরোধী দল ও সরকারের মধ্যে রাজনৈতিক বিরোধ মীমাংসার জন্য রাওয়ালপিন্ডিতে প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান কর্তৃক আহুত গোলটেবিল বৈঠকে (২৫ ফেব্রুয়ারি, ১০, ১১ ও ১২ মার্চ ১৯৬৯) তিনি আওয়ামী লীগের প্রতিনিধি দলের সদস্য হিসেবে যোগদান করেন। তিনি ১৯৭০-এর ৭ ডিসেম্বর আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে ঢাকা-৫ আসন থেকে জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭১-এর মার্চের অসহযোগ আন্দোলনের তিনি অন্যতম পরিচালক ছিলেন। ২৫ মার্চ (১৯৭১) রাতে পাকিস্তানী সামরিক বাহিনী নিরস্ত্র বাঙালিদের উপর সশস্ত্রভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ে গণহত্যা শুরু করলে তিনি ঢাকা ত্যাগ করে ভারত গমন করেন। ১২ এপ্রিল (১৯৭১) স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার গঠিত হলে সরকারের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৭ এপ্রিল (১৯৭১) মুজিবনগরে এ সরকারের আনুষ্ঠানিকভাবে শপথ গ্রহণ করেন। বাংলাদেশ থেকে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীকে বিতাড়িত করার জন্য তাঁর সরকার কর্তৃক সর্বাত্মক মুক্তিযুদ্ধের ডাক দেয়া হয়। সে আহ্বানে সাড়া দিয়ে দলে দলে ছাত্র-জনতা, ইপিআর, পুলিশ ও বাঙালি সৈনিকেরা মুক্তিযুদ্ধে যোগদান করে। এদের সমন্বয়ে মুক্তিবাহিনী গঠন করা হয়। মুক্তিবাহিনীর জন্য অস্ত্র সংগ্রহ ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ের ব্যাপারে তিনি কৃতিত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ভারত, রাশিয়া, পূর্ব জার্মান ও পূর্ব ইউরোপের সমাজতান্ত্রিক দেশসমূহ তাঁর সরকারের প্রতি সমর্থন জ্ঞাপন করে মুক্তিযুদ্ধে সাহায্য ও সহযোগিতা প্রদান করেন। বাংলাদেশের সর্বত্র মুক্তিবাহিনী গেরিলা যুদ্ধের কৌশল চালিয়ে পাক-হানাদার বাহিনীকে পর্যদুস্ত করে তোলে। ৩ ডিসেম্বর (১৯৭১) পাকিস্তান ভারত আক্রমণ করলে মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় মিত্র বাহিনীর যৌথ কমান্ড কর্তৃক তিনি বাংলাদেশে যুদ্ধাভিযান পরিচালনা করেন। ১৬ ডিসেম্বর (১৯৭১) ঢাকায় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে উক্ত যৌথ কমান্ডের কাছে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী আত্মসমর্পণ করলে বাংলাদেশ চূড়ান্তভাবে স্বাধীনতা লাভ করে। ২৩ ডিসেম্বর (১৯৭১) তাজউদ্দীনের সরকারের মুজিবনগর থেকে বিমান যোগে ঢাকায় আগমন এবং তেজগাঁ বিমান বন্দরে বিপুল সংবর্ধনা লাভ করেন। পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঢাকায় প্রত্যাবর্তন করেন। ১২ জানুয়ারি তাঁর নেতৃত্বে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের নতুন মন্ত্রিপরিষদ গঠিত হলে তাজউদ্দীন আহমদের অর্থমন্ত্রীর পদ লাভ হয়। তিনি ১৯৭২-এর ১১ এপ্রিল শাসনতন্ত্র প্রণয়ন কমিটির সদস্য নিযুক্ত ও গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান (১৯৭২) রচনায় বিশিষ্ট ভূমিকা পালন করেন। ১৯৭৩-এর ৭ মার্চ ঢাকা-২২ আসন থেকে জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭৪-এর ২৬ অক্টোবর মন্ত্রিত্ব থেকে পদত্যাগ করেন। ১৯৭৫-এর ১৫ আগষ্ট সামরিক বাহিনীর কিছু সংখ্যক সদস্যের হাতে রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিহত হলে খন্দকার মোশতাক আহমদ ক্ষমতা দখল করে দেশে সামরিক আইন জারি করলে ২৩ আগষ্ট তিনি গ্রেফতার হন। তিনি অসামপ্রদায়িক প্রগতিশীল রাজনীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন। তিনি আওয়ামী লীগকে বাঙালির আশা-আকাঙ্খার প্রতীক-প্রতিষ্ঠানে গড়ে তোলার জন্য দীর্ঘকাল সংগ্রাম পরিচালনা করেন। ষাটের দশকে পূর্ব বাংলায় বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলন উজ্জীবনে বিশিষ্ট ভূমিকা পালন করেন। তাজউদ্দীন আহমদ সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি দৃঢ় আস্থাশীল রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে খ্যাত। তিনি বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী থাকাকালে ব্যাংক, বীমা ও বৃহৎ শিল্প প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ করার ক্ষেত্রে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেন। স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তিনি উল্লেখযোগ্য অবদান রাখেন। ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারের প্রচলিত নিয়ম অগ্রাহ্য করে প্রবেশকারী সশস্ত্র বাহিনীর কতিপয় ব্যক্তির হাতে গুলিবিদ্ধ হয়ে তিনি ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর মৃত্যুবরণ করেন।

কার্যত সকল অর্থেই যারা স্বাধীন বাংলাদেশ এবং আওয়ামী লীগের  মধ্যে  যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ ও লালন করে না তারা তাঁর জন্মদিন যথাযোগ্য মর্যাদায় পালন করবে না এটাই স্বাভাবিক। মানুষ কি কালক্রমে বিবেক বর্জিত হয়ে যাচ্ছে। তাজউদ্দীন  কালক্রমে মুছে যাবে ইতিহাস থেকে?  তাজউদ্দীন শুধু নয় তার পরিবারসহ গোটা পঞ্চাশ এবং ষাটের দশকে রাজনীতিকরা যে কষ্ট এবং ত্যাগ স্বীকার করেছেন, যে নির্যাতন সহ্য করেছেন তা এ জাতি কোনদিন ভুলে যাবে না। অথচ স্বাধীনতার পর এক বছর যেতে না যেতেই তাজউদ্দীনই প্রথম মন্ত্রিসভা থেকে অপসারিত হন। আবার তাজউদ্দীনের ভাই-ও ছেলে হাসিনা মন্ত্রিসভা থেকেও অপসারিত হন। হায়রে নিষ্ঠুর নিয়তি। যে মানুষ বলতে গেলে আওয়ামী লীগের একমাত্র নেতা, যিনি দেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম চলাকালে পরিবারের সাথে এক রাত্রিও যাপন করেননি, সে স্বাধীনতার এক বছর পরই তিনি মন্ত্রিসভা থেকে অপসারিত হলেন। রাজনৈতিক অদূরদর্শিতার জন্য শেখ মুজিব চিনতে পারলেন না কে তার বন্ধু কে তার শত্রু? আজও ঠিক তাই। শেখ হাসিনা সত্যিকারভাবে শত্রু-মিত্র চিনতে পেরেছেন বলে মনে হয়ে না। তা যদি পেরে থাকেন তবে বলবো তিনি যখন শৈশবে এবং তার বাবা যখন জেলে তখন এমনকি তাজউদ্দীনও যখন জেলে তখন আওয়ামী লীগ অফিসে যার চেষ্টায় মোমের প্রদীপ জ্বলতো সেই জোহরা তাজউদ্দীন আওয়ামী রাজনীতিতে উপেক্ষিত কেন।

শেখ মুজিবকে বিচ্ছিন্নভাবে তুলে ধরা যাবে না। কেননা তাতে শেখ মুজিবই ছিন্নমূল হয়ে যাবেন যতই কথায় কথায় বঙ্গবন্ধু বলা হোক। নিশ্চয়ই শেখ মুজিবের অতীত-বর্তমান ছিল। তাই শুধু শেখ মুজিবের নাম নিলে কাজ হবে না। আমাদের দেশের জাতীয়তাবাদী সংগ্রামে শেখ মুজিব নিশ্চয়ই মাষ্টার দা সূর্যসেন, ক্ষুদিরাম থেকে প্রেরণা পেয়েছেন। তাদের কথাও দু’একবার বলা দরকার। মাওলানা ভাসানী আমাদের দেশের জাতীয়তাবাদী রাজনীতির অন্যতম পুরোধা ছিলেন তাঁর কথাও বলা দরকার। তাজউদ্দীন, মনসুর আলী, সৈয়দ নজরুল কামরুজ্জামানের কথাও বলা দরকার। আওয়ামী লীগকে বলতে বাধ্য করা হয়নি বলেই কালক্রমে বাঙালি জাতীয়তাবাদী সংগ্রাম পরিণত হয়েছে রাজনীতির দাবাখেলার গুটি।

ইতিহাস নিশ্চয়ই একদিন কথা বলবে। ইতিহাস নিশ্চয়ই বলবে আওয়ামী লীগ রাজনীতি গড়ে তোলার প্রশ্নে তাজউদ্দীনের নিরলস নিভৃত, সুদক্ষ নেতৃত্বের কথা, স্বাধীনতা যুদ্ধে তাজউদ্দীনের মুজিবনগর সরকার গঠন করতে ক্ষিপ্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারার কথা; তাজউদ্দীনের উপর আওয়ামী লীগের ষড়যন্ত্রকারী নেতা মোস্তাক গংদের সীমাহীন অসহযোগিতাকে মোকাবেলার কথা। নিশ্চয়ই আগামী প্রজন্ম উপলব্ধি করবে তাজউদ্দীন বাংলার জন্য কতটুকু করেছেন। তারা আজকাল যেসব নেতা মন্ত্রী আছেন তাদের সাথে তাজউদ্দীনের পার্থক্য তৈরি করতে পারবেন। বর্তমান মন্ত্রী নেতা হন দেশের আর কাজ করেন ব্যক্তিস্বার্থ ও এলাকার জন্য। কার্যত তারা আঞ্চলিক নেতাই থেকে যান। তাজউদ্দীন জাতির নেতা ছিলেন বলেই আঞ্চলিক সমস্যাকে তিনি কখনো প্রাধান্য দেননি। দেশের প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে তিনি কাপাসিয়ার কোন কাজই করেননি আলাদাভাবে। অথচ সে নেতার সঠিক মূল্যায়ন করা হয়নি। তাজউদ্দীন আজ আর কোন স্বার্থ হাসিলের কেন্দ্রবিন্দু নন। বঙ্গবন্ধুর নাম বললে রাজনৈতিক কেরিয়ার হয়, মন্ত্রীত্ব নিশ্চিত হয়। তাজউদ্দীনের নাম বললে এসব কিছুই হয় না সুতরাং তার নাম দিয়ে কি লাভ। ওটা মুক্তিযোদ্ধা আর গবেষকদের চিন্তা-চেতনায় শুধু থাক। দেশ স্বাধীন হবার পর ওই মানুষটিই চেয়েছিলেন দেশকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করতে। কখনো তিনি বিদেশী সাহায্য নির্ভর অর্থনীতি গড়ে তুলতে চাননি। সে জন্যই তিনি জাতির আত্মনির্ভরশীল অর্থনীতির রূপরেখা তৈরি করেছিলেন। দেশ শাসনের সময়গুলোতে তার সততা প্রশ্নাতীত। মুজিবনগর সরকারে প্রধানমন্ত্রী হবার পরও নিজ হাতে নিজের কাপড় কেঁচেছেন তাজউদ্দীন। আর পরবর্তীতে যারা সেদিনের আওয়ামী লীগকে ভাঙ্গিয়ে নেতা-মন্ত্রী হয়েছেন তাদের বা হচ্ছেন তাদের পেট্রোল-পাজেরো ছাড়া রাজনীতি চলে না। ত্যাগের মানসিকতা নেতৃত্ব থেকে এদেশে বলতে গেলে উঠে গেছে। দলের যারা ত্যাগী কর্মী তারা সুবিধাবাদীদের ভীড়ে আস্তে আস্তে হারিয়ে যাচ্ছে। দল আস্তে আস্তে নীতিহীন ক্লাবে পরিণত হয়ে যাচ্ছে। যে মন্ত্রী হয় সে তার ব্যক্তি স্বার্থকেই অগ্রাধিকার দেয়। জাতীয় সংকীর্ণতা নেতাদের পেয়ে বসেছে। এ অবস্থার অবসান নিশ্চয়ই একদিন হবে। নিশ্চয়ই একদিন বাংলার মাটিতে তাজউদ্দীনরা প্রতিষ্ঠা পাবে। এ বিশ্বাস পোষণ করেই স্মরণ করুক দেশবাসী তাঁর জন্মবার্ষিকী। দেশের আপামর জনগোষ্ঠীর জন্য বাংলার মাটিতে তাজদের রক্ত বৃথা যায়নি এবং যাবেও না।

কুরআনের আলোকে সময়ের সাফ কথা....নারী পুরুষ সম্পর্কিত কটুক্তি


কুরআনের আলোকে সময়ের সাফ কথা....

নারী পুরুষ সম্পর্কিত কটুক্তি

 
আল্লামা মোহাম্মদ সাদেক নূরী ॥ টিভি ফুটেজ থেকে যা পাওয়া যায় তাতে শফীর কটুক্তিগুলো জঘন্য ব্যাভিচারী চরিত্র ও মানসিকতার নগ্ন বহিঃপ্রকাশ। এ মানসিকতায় শফী একা নন; এরা একটি গোষ্ঠী; এরা তথাকথিত কওমি মূলত খারেজি তথা দেশের সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থা ও নীতি বহির্ভুত তথাকথিত শিক্ষার নামে অশিক্ষার উৎপাদন। এদের কথিত শিক্ষা এবং জীবন যাপন সাধারণত হুর-গেলমানের নেশা দ্বারা তাড়িত। আলোচ্য উক্তিগুলোর মাধ্যমে তাদের নেতা শফীর বার্ধক্যজনিত সারল্যের সুযোগে তাদের ভেতরটাই বের হয়ে এসেছে।

উক্তিগুলোতে নারী-পুরুষের জন্মগত সম্পর্ক সম্বন্ধের প্রভেদ বোধহীনভাবে তাদের পারস্পারিক আকর্ষণকে তেতুল ও তেতুলসৃষ্ট প্রতিক্রিয়ার সাথে মিশিয়ে নিজেদের প্রবণতার আলোকে যৌনতাসর্বস্ব রূপে উপস্থাপন করা হয়েছে। এটা নারী-পুরুষ উভয়কূলের জন্যই অমর্যাদা, অসম্মান, অপমানজনক ও চরম অধার্মিকতা এবং দেশের ‘টর্ট’ বিধিতে দন্ডনীয় অপরাধ।

এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, মেয়েদের বেশি পড়ানো এবং বাইরে যাওয়ার বিরোধিতাসহ উক্তিগুলো কুরআনের নারী-পুরুষ সম্পর্ক, মর্যাদা ও শিক্ষা-দীক্ষা বিষয়ক নির্দেশনাদি  ও দিকদর্শনের অনুকূল তো নয়ই বরং সরাসরি পরিপন্থী। (২৪ঃ৩১, ৩৩ঃ৫৯)।

স্মরণীয় যে, যারা কুরআনকে সঠিকভাবে হৃদয়ঙ্গম করে না এবং কোন বিষয়ে কুরআন অনুযায়ী মীমাংসা প্রদান করে না, কুরআনের ভাষায় তারা পশুরও অধম এবং ক্ষেত্রবিশেষে কাফের, ফাসেক ও জালেম এবং জাহান্নামী। (আল-কুরআন-৭ঃ১৭৯; ৫ঃ৪৪, ৪৫, ৪৭)।

ঈমানের তাগিদে বলতেই হয় যে, এদের সহযোগে বা মাধ্যমে সম্পাদিত কোন ‘ইবাদত’ আল্লাহর নিকট গ্রহণীয় কি না, তা তিনিই ভাল জানেন; তবে কুরআনের দৃষ্টিতে নিঃসন্দেহ যে, তাদের এবং তাদের উক্তরূপ কাজে অর্থ, মেধা, অথবা শ্রম দ্বারা সমর্থন সহযোগিতা করা কুরআনের শিক্ষা-দীক্ষার প্রতি অবজ্ঞা ও বিরোধিতার শামিল এবং ঈমানের জন্য দুধে চনা তুল্য। স্মরণীয় যে এদের সহায়ক-সমর্থকরা সুস্থ্য সমাজ গঠনে তদধিক বড় বাধা এবং কুরআনের শত্রু তো বটেই।

স্মর্তব্য যে, এহেন ব্যাভিচারী মানসিকতা থেকে সমাজকে মুক্ত করতে চাইলে এদেরকে ব্যক্তিগত ও সামাজিকভাবে পূর্ণ মাত্রায় বয়কট করাসহ এদের উৎপাদন ব্যবস্থাটির বিলোপ সাধনের কোন বিকল্প নেই; তা না করে এদের সমালোচনা করা, অর্থ, সময় ও মেধার অপচয় বই নয়। আল্লাহ্‌ সকলকে এ বোধে সমৃদ্ধ করুন। (আমীন)

বিঃ দ্রঃ - এদেরকে কুরআনের দোহাইতেও কোন ফল হবে, মনে হয় না; কারণ বিগত ৫ মে বাইতুল মোকার্‌রমের সামনে কুরআন পোড়ানোর কোন নিন্দা এবং এর সাথে জড়িতদের শাস্তির কোন দাবি তাদের তরফ থেকে শোনা যায়নি।

ইমামতি পেশা হতে পারে না


ইমামতি পেশা হতে পারে না

 
সাদিকুল হক ॥ ইমাম ও খতিবের দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অতি সম্মানের পদ। ইসলামের প্রাথমিক যুগে যারা সমাজের পথপ্রদর্শক হতেন তারাই মসজিদে ইমামতি করতেন। ইমামের দায়িত্ব কেবল নামাজ পড়ানো ছিল না। সমাজনীতি, অর্থনীতি, আল্লাহভক্তদের পারস্পরিক দায়িত্ব-কর্তব্য, শান্তি-শৃঙ্খলা, সভ্যতা-সংস্কৃতিসহ মানবজীবনের নানা বিষয়ে পথপ্রদর্শকগণ প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও নির্দেশনা দিতেন। তখন মসজিদও ছিল শিক্ষা-দীক্ষা ও মানবসেবার কেন্দ্রবিন্দু।

দিনে দিনে অবস্থার অনেক পরিবর্তন হয়েছে। এখন ধর্মকর্ম থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছে সেবা, পারস্পরিক সহযোগীতা ও সহমর্মিতার মনোভাব। ইমামদের কর্মতৎপরতা এখন সীমিত হয়েছে মসজিদের চার দেয়ালের মাঝে। ইমাম অর্থ যে নেতা, তিনি যে নেতৃত্ব দেবেন কল্যাণমূলক কাজে, তিনি যে ভাবের সৃষ্টি করে অভাব দূর করবেন তা আমরা একেবারেই ভুলে গেছি। মসজিদের বাইরে ইমামরা এখন ব্যস্ত থাকেন মিলাদ, ঝাড়ফুঁক, বিয়ে, জানাজা নিয়ে। এসব প্রতিটি আনুষ্ঠানিকতায় তারা পুরোহিতদের মতো পারিশ্রমিক গ্রহণ করেন। তাই ইমামতি এখন নিছকই একটা পেশা। ইমামতির নামে একশ্রেণীর মানুষ এখন ধর্মজীবী হয়েছে। বর্তমান কালের অধপতিত মুসলিম সমাজও  মেনে নিয়েছে এই ধর্মজীবী শ্রেণীকে। অনেকেরই ধারণা ইমামরা বেতন না নিলে তাদের সংসার চলবে কী করে? অধিকাংশ মুসলমানরা ধরেই নিয়েছে যে, ইমাম সাহেব যৎসামান্য বেতনে মসজিদে নিয়মিত নামাজ পড়াবেন আর দাওয়াত খেয়ে, টিউশনি করে, মিলাদ পড়িয়ে সংসারের ব্যয় নির্বাহ করবেন। এ ধারণা চরম অমূলক ও ইসলামের বিরুদ্ধে বড় পাপ। কুরআনে কঠোরভাবে ধর্মকর্মের বিনিময় করতে নিষেধ করা হয়েছে। সকল মুসল্লিরা যেমন নামাজ পড়ে এবং সংসার চালায় ইমামদেরকেও তেমনি করতে হবে। তাই ইমামতি হওয়া উচিত ঐচ্ছিক, জীবিকা উপার্জনের উপায় হিসেবে এটাকে গ্রহণ করা কুরআন বিরুদ্ধ। যে সমাজে যিনি যোগ্যতম তিনি হবেন মসজিদের ইমাম।

অথচ এখন ইমামতি হয়েছে স্বল্প বেতনের একটা অনিশ্চিত চাকরি। অন্যান্য ক্ষেত্রে চাকরি পাওয়া যেমন কঠিন, চাকরি যাওয়াটাও তেমনি কঠিন। ইমামদের বেলায় ব্যাপারটা আলাদা। মসজিদ কমিটি কেবল মুখ খুলে ‘না’ বললেই ইমামের চাকরি চলে যায়। জীবন নির্বাহের জন্য অন্য কোন দক্ষতা না থাকায় মসজিদ কমিটি কর্তৃক নির্ধারিত যৎসামান্য বেতন-ভাতার ওপর ইমাম সাহেব নির্ভরশীল হওয়ার দরুন তিনি ইচ্ছা করলেও পারছেন না তার আত্মসম্মান রক্ষা করতে। পারছেননা স্বাধীনভাবে বুক ফুলিয়ে সত্য কথাগুলো বলতে। ইমামের মর্যাদা যে সবার ঊর্ধ্বে, ইমাম যে সবার নেতা, এসব বেমালুম ভুলে গিয়ে তিনি হয়ে পড়ছেন মসজিদ কমিটির আজ্ঞাবহ। মান-মর্যাদা বিলিয়ে দিয়ে তিনি মসজিদ কমিটি ও মুসল্লিদের মনোরঞ্জনে ব্যস্ত। এটা যে একজন ইমামের জন্য এবং দ্বীন ইসলামের জন্য কত লজ্জাকর তা বলার অপেক্ষা রাখে না। শুধু তাই নয়, এ ধরনের ইমামের পেছনে নামাজ কতটুকু শুদ্ধ হবে, তাও ভেবে দেখা প্রয়োজন।

ইমামতি এক মহান দায়িত্ব। যে দায়িত্ব পালন করেছেন স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সা.) নিজে, পালন করেছেন সাহাবা, খলিফা, আমির-ওমরারা, সে দায়িত্ব এখন পালন করছেন স্বল্প বেতনে নিয়োজিত ধর্মজীবীরা! 

আমাদের দেশে বিশেষ করে ঈদের দিন ইমামকে হেয় প্রতিপন্ন করা হয়, ইমামতি পদের মর্যাদাকে ছুড়ে ফেলা হয় মাটিতে। ঈদগাহে সব মানুষকে বসিয়ে রেখে ইমাম সাহেবের সামনেই তার নজরানার জন্য মুসল্লিদের কাছে হাত পেতে সাহায্য নেয়া হয়। এটা বড়ই দৃষ্টিকটু ও অবমাননাকর। বিষয়টি ভিক্ষাসদৃশ। ইমামের উচিত এ খয়রাতি নজরানার প্রতি ভ্রূক্ষেপ না করে ব্যবসা-বাণিজ্য বা অন্য কর্মের মাধ্যমে ঈদের খরচ নির্বাহ করা। তাহলে ইমামের সম্মান কিছুটা হলেও প্রতিষ্ঠিত হতো। ইমামের পদের মর্যাদা এবং ইসলামের মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় ইমাম এবং মুসল্লিদের উদ্যোগী ও সচেষ্ট হতে হবে। এক্ষেত্রে ইমামের দায়িত্বই বেশি।

নিজেকে মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করতে হলে একজন ইমামকে অবশ্যই বেতন-ভাতার ওপর নির্ভরশীল না হয়ে জীবন নির্বাহের জন্য হালাল ব্যবসা-বাণিজ্য বা অন্য কোন পেশা গ্রহণ করতে হবে। দাওয়াত খাওয়া, টিউশনি, মিলাদ পড়া ও ঝাড়ফুঁক দিয়ে টাকা-পয়সা গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকতে হবে। ইমামের অবশ্যই মাতৃভাষায় গুছিয়ে প্রাঞ্জলভাবে কথা বলার দক্ষতা থাকতে হবে। জুম্মার দিন সমসাময়িক বিষয়ে দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য উপস্থাপন করতে হবে। টাকা-পয়সা গ্রহণের ব্যাপারে তাকে থাকতে হবে খুবই সতর্ক। বিশেষ করে দান-খয়রাত গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকতে হবে। ইমাম সাহেবের পোশাক হবে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, ব্যবহারে হবেন তিনি মার্জিত, ভদ্র ও শালীন। ইমামের কথা ও কাজ এক হতে হবে। সত্য বলায় থাকতে হবে সৎসাহস। ইমামকে নিজের কাজ নিজে করতে হবে। যথাসম্ভব পরনির্ভরতা পরিহার করতে হবে। আল্লাহর সন্তুষ্টির লক্ষ্যে আদর্শ রাষ্ট্র ও সমাজ গঠনের জন্য, আদর্শ ও নীতিবান মানুষ তৈরির জন্য ইমামকে সচেষ্ট হতে হবে। আলোকিত সমাজ ও মানুষ গঠনের জন্য মসজিদকেন্দ্রিক শিক্ষা, চিকিৎসাসহ গণমুখী কর্মসূচি গ্রহণ করে মসজিদকে কর্মচঞ্চল করে তুলতে হবে। তাহলে ইমামতি যেমন সম্মানজনক হবে তেমনি ইসলাম তার মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত হবে।

গণ জাগরণের পথ ধরে - আওয়ামী লীগকে হাঁটতে হবে


গণ জাগরণের পথ ধরে

আওয়ামী লীগকে হাঁটতে হবে

 
সংলাপ ॥  মুসলিম লীগ নামক দলটির নেতৃত্বে ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান নামক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল-এ কথা অনস্বীকার্য। কিন্তু এর মাত্র ৭ বছর পর ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনের মধ্য দিয়ে এ অঞ্চলের মানুষের সাথে মুসলিম লীগের সম্পর্ক ছিন্ন হওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছিল। ওই নির্বাচনে ভরাডুবি হয়েছিল মুসলিম লীগের। এর পরের ইতিহাস সবার জানা।

এদেশের স্বাধীনতার সংগ্রাম থেকে শুরু করে অসংখ্য গণআন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী দল যে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ- সেকথাটি অস্বীকার করারও কোনো উপায় নেই। অথচ ২০০৮ সালের ডিসেম্বরের সাধারণ নির্বাচনে জনগণের অকুন্ঠ সমর্থনে ভূমিধ্বস বিজয় অর্জনকারী এই দলটির নেতাদের সাথে সাধারণ জনগণের বিচ্ছিন্নতা এখন যে পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে তা উদ্ধার করতে না পারলে আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগ কি ক্ষমতায় আবার আসতে পারবে? নাকি আগামী দিনগুলোতে আওয়ামী লীগের অবস্থা মুসলিম লীগের মতো হবে? এমন প্রশ্ন ও শংকা এখন অত্যন্ত জোরেশোরে শোনা যাচ্ছে সচেতন মহলে, বাংলার আকাশে-বাতাসে সর্বত্র।

এমন অবস্থা কেন হলো? এর থেকে উত্তরণের উপায় কি? এই অবস্থা থেকে উত্তরণের কোনো প্রয়োজনই বা আছে কি? বাংলাদেশে স্বাধীন ও মুক্ত চিন্তা-চেতনাসম্পন্ন বুদ্ধিজীবী আহমদ ছফার একটি বিখ্যাত উক্তি এ প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য যার মূল কথা হচ্ছে এই যে, আওয়ামী লীগ যখন ক্ষমতায় যায় তখন সমাজের নগণ্য সংখ্যক লোক আঙ্গুল ফুলে কলা গাছ হয়, আর আওয়ামী লীগ যখন ক্ষমতাচ্যুত হয় তখন দুর্যোগ নেমে আসে সাধারণ মানুষের জীবনে। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘পাকিস্তানীরা সব নিয়ে গেছে, রেখে গেছে চোরগুলোকে’। ‘যে দিকে তাকাই, দেখি শুধু চোর’। ‘আমি ভিক্ষা করে নিয়ে আসি, আর চাটার দলেরা সব খেয়ে ফেলে’। এই চোর আর চাটার দলের কারণেই  আজকে দেশের অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, ওই চোর আর চাটার দলেরা দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক জীবনে তৈরি করেছে ভয়াবহ রকমের নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি। তারা ধর্মান্ধদের সাথে?হাত মিলিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে অবস্থান তৈরি করে বর্তমানে আওয়ামী লীগ-নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারকেও বেকায়দার মধ্যে ফেলে দিয়েছে। যা থেকে উত্তরণ ঘটাতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিরোধী দলের অপপ্রচারে নিরুৎসাহিত না হয়ে এবং ভেদাভেদ ও অন্তঃকলহ ভুলে জনগণের আস্থা অর্জনে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে দলের নেতা-কর্মীদের প্রতি আহবান জানিয়েছেন। ২০০৮ সালের সাধারণ নির্বাচনে বিপুল ভোটে বিজয়ী করে মহাজোট সরকারের কাছ থেকে যেমন একটি দেশ প্রত্যাশা করেছিল জনগণ তা পুরাপুরি বাস্তবায়িত হতে না দেখে তারা এখন চিন্তিত। সরকারের নীতি-নির্ধারকরাও এখন জনগণের চিন্তার কথা বুঝতে পারছেন কিনা তা সময়?বলে দেবে। অনেক ক্ষেত্রে উন্নয়ন কর্মকা- থাকলেও এই মহাজোট সরকারের  প্রতি সাধারণ মানুষের চিন্তার কারণ বের করার চেষ্টা চলছেও বলে শোনা যাচ্ছে। কিন্তু এত জনপ্রিয় ও বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়ে দেশ পরিচালনার দায়িত্বে এসে সরকারের অবস্থাটি আজ এমন কেন হলো তা খতিয়ে দেখে উত্তরণের পথ খোঁজার কাজটি করতে হবে অত্যন্ত সতর্কতা ও আন্তরিকতার সাথে। বঙ্গবন্ধু এক বিদেশী সাংবাদিককে বলেছিলেন, ‘আমার যোগ্যতা হচ্ছে এই যে, আমি এদেশের মানুষকে ভালোবাসি।’ এ কথা ভুলে যাওয়া সমীচীন নয় যে, বঙ্গবন্ধু সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারী খন্দকার মোশতাক, তাহের উদ্দিন ঠাকুররা ৭৫-এর ১৫ আগষ্টের আগ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর অতি কাছেই অবস্থান করতো। বর্তমানেও  আওয়ামী লীগ-নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারকে চুড়ান্তভাবে ব্যর্থ করার জন্য এই ধরনের ষড়যন্ত্রকারীর অভাব নেই এবং তারা বেশ সফলভাবেই সক্রিয় রয়েছে। দলটি বর্তমানে যেভাবে চলছে তা থেকে ঘুরে না দাঁড়ালে আগামী নির্বাচনে এই দল কয়টি আসন পাবে তা নিয়ে অনেক মুখরোচক কথাই এখন বিভিন্ন মহলে উচ্চারিত হচ্ছে।  জাতির বিবেকবান ও সচেতন মহল চাইছে, আওয়ামী লীগের বর্তমান অবস্থা থেকে উত্তরণ ঘটাতে এর নীতি-নির্ধারকদেরকে এখন জরুরি ভিত্তিতে নিম্নলিখিত কর্মপন্থাগুলো বাস্তবায়ন করা দরকার-

বর্তমানে সরকার ও আওয়ামী লীগের বিভিন্ন স্তরে যে নব্য রাজাকাররা জায়গা করে নিয়েছে তাদেরকে চিহ্নিত করে সরকার ও দল থেকে বের করে দিতে হবে।

সরকার ও দলে সততা ও দক্ষতার মূল্যায়ন করে নতুন প্রজন্মের নেতৃত্বের স্থান করে দিতে হবে যাতে তারা দেশ ও সমাজের কল্যাণকে অগ্রাধিকার দিয়ে কর্মপন্থা তৈরি করতে পারেন।

দেশপ্রেম ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় তরুণ সমাজকে উদ্বুদ্ধ করার জন্য সারা দেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে সর্বোচ্চ শাস্তির জন্য আন্দোলন ছড়িয়ে দিতে হবে। শাহবাগের গণজারণ মঞ্চ-এর আন্দোলনকারীদেরকে শত্রু না ভেবে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে তাদের চলমান আন্দোলনে সর্বাত্মক সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে হবে। এরশাদ কোনোদিন গণজাগরণ মঞ্চকে সমর্থন দিতে পারে না। কারণ, মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি পুরোটাই হানাদার পাকিস্তানী বাহিনীর পক্ষে ছিলেন। ১৯৭১-এর ৯ মাসে তিনবার তিনি পাকিস্তান থেকে ঢাকা এবং রংপুর গিয়েছেন। কিন্তু বাঙালির মুক্তিযুদ্ধ তার মধ্যে কোনো আবেদন সৃষ্টি করতে পারেনি। আরও ভুলে গেলে চলবে না যে, এদেশের ছাত্র-শ্রমিকসহ সব কয়টি রাজনৈতিক দলের দীর্ঘদিনের গণআন্দোলন তথা এরশাদ-বিরোধী গণজাগরণের মুখে ১৯৯০-এর ডিসেম্বরে একজন স্বৈরাচার হিসেবে ক্ষমতা থেকে তার পতন হয়েছিল। ফলে যেকোন গণজাগরণকে এরশাদ ভয় পাবেন-এটাই স্বাভাবিক।

স্মরণ রাখা দরকার যে, ১৯৯২ সালে শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটির আন্দোলন ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে জয়লাভের পেছনে একটি বড় ধরনের নিয়ামক শক্তি হিসেবে কাজ করেছিল। তখন ষড়যন্ত্রকারীরা গুজব ছড়িয়েছিল এইভাবে যে, জাহানারা ইমাম আন্দোলনে সফল হলে এদেশে শেখ হাসিনার নেতৃত্ব চলে যাবে, ঠিক তেমনি এখনকার নব্য রাজাকাররা গুঞ্জন ছড়াচ্ছে যে, গণজাগরণ মঞ্চের কর্মীরা আন্দোলনে সফল হলে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের নেতৃত্বও চলে যাবে।  যুদ্ধাপরাধীদের চলমান বিচার বাধাগ্রস্ত করার জন্য হেফাজত ইসলামের নামে যে সংগঠনটিকে এখন নামানো হয়েছে সেটি নতুন কিছু নয়, জামাতেরই একটি সহোদর সংগঠন মাত্র। বহুদিন আগে থেকেই এই নামের সংগঠন চট্টগ্রামে কার্যক্রম চালিয়ে আসছিল। বর্তমানে শুধুমাত্র যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচাতে আগের চাইতে আরও অনেক বেশি অর্থ-সম্পদে পুষ্ট হয়ে ধর্মের নামে মাঠে নেমেছে। এদেশের ধর্মভীরু মানুষকে বিভ্রান্ত করে যুদ্ধাপরাধ ইস্যু থেকে তাদের দৃষ্টি সরানোর জন্যই হেফাজত এখন ব্লগার-নাস্তিক প্রসঙ্গ তুলেছে। একাত্তরের রাজাকারসহ পাকিস্তানী বাহিনীর সকল দোসররা মুক্তিযোদ্ধাদেরকে যে ‘দুস্কৃতিকারী, ‘দুর্বৃত্ত,‘ভারতের অনুচর, ‘অনুপ্রবেশকারী’ বলতো সে কথাটিও আজ স্মরণ রাখা দরকার। একটা কথা আজ স্বতঃসিদ্ধই যে, আওয়ামী লীগই আওয়ামী লীগের শত্রু। আর সে আওয়ামী লীগে আজ নব্য রাজাকাররা যেভাবে ঘাপটি মেরে বসেছে তা থেকে দলটিকে সাফ করতে না পারলে দেশে আবারও বিপর্যয় নেমে আসবে। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর দীর্ঘ ২১ বছর পরে হলেও মানুষ আওয়ামী লীগের প্রতি তাকিয়েছিল। বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতি এদেশের জনগণের নাড়ীর টান। এ চেতনায় উদ্বুদ্ধ হওয়ার কারণেই তারা আজ একটি স্বাধীন দেশের নাগরিক। অথচ এবার নির্বাচনের মাধ্যমে দলটি জনগণ থেকে পুরোপুরি ছিন্ন হওয়ার অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে আওয়ামী লীগের ভেতরকার সমস্যাদির জন্য।

শাহবাগে এ বছর ৫ই ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া গণজাগরণ মঞ্চ এদেশের গণমানুষ ও বিশেষ করে নতুন প্রজন্মকে জাতীয়তাবাদী দেশপ্রেমে নতুন করে আকৃষ্ট করেছিল। যারা ১৯৫২, ৬২, ৬৬, ৬৯, ৭১, ৯০ দেখেননি তারা এবার তা শাহবাগে দেখেছে ২০১৩-এ এসে। এই গণজাগরণকে এরশাদ ভয় পাবে, জামাত-হেফাজতিরা একে নাস্তিক-মুরতাদ ঘোষণা করাকে ধর্মের কাজ হিসেবে জাহির করতে চাইবে-এটাই স্বাভাবিক। ‘দুষ্ট লোকের মিষ্ট কথায় কখনো ভুলিতে নাই’-এ উপদেশমূলক বাক্যটি বাংলার প্রবাদেই আছে।

একাত্তরের মানবতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে যে মামলা চলছে তার শুধু রায় নয়, অনতিবিলম্বে সেই রায়ের বাস্তবায়ন দেখতে চায় জাতি, বিশেষ করে নতুন প্রজন্ম যারা ২০০৮ সালের নির্বাচনে মহাজোটকে বিপুল ভোটে বিজয়ী করার পেছনে নিয়ামক শক্তি হিসেবে কাজ করেছিল। এই মামলা ও এর রায় কার্যকর করা নিয়ে যেকোনো টালবাহানা এদেশ ও বর্তমান সরকারের জন্য ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনবে।  

সকল দ্বিধাদ্বন্দ্ব ভুলে শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চ এবং এর চেতনা  সারা দেশে ছড়িয়ে দেয়া এখন সময়ের দাবি। বর্তমানে ছাত্রলীগ-যুবলীগ নামের যে সংগঠন আছে সেগুলো দিয়ে যুদ্ধাপরাধবিরোধী গণজাগরণ তৈরি করা কোনো মতেই সম্ভব নয়-এ কথা এরা নিজেরাও জানে। তারা ছাত্রদল-যুবদলের সাথে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত রয়েছে।  এদের একমাত্র লক্ষ্যই হচ্ছে ক্ষমতায় থাকা এবং ক্ষমতায় যাওয়া। অপরদিকে গণজাগরণ মঞ্চের কর্মীরা ক্ষমতা চায়না। এরা ১৯৬৯, ৭১-এর সেই মুক্তিযোদ্ধাদের উত্তরাধিকার যারা দেশ ও মানুষের জন্য নিজেকে অকাতরে বিলীন করে দেয়ার জন্য প্রস্তুতি নিয়েছে। যাদের ডাকে ২০১৩-এ এসেও এদেশের মুক্তিকামী সকল মানুষ শাহবাগে সমবেত হয়েছিল এ বছর ফেব্রুয়ারি-মার্চ মাসে। যুদ্ধাপরাধীদের সাথে কোনো আপোষ না করে এবং গণজাগরণের পথ ধরে আওয়ামী লীগকে আবারো সঠিক পথে ফিরে আসতে হবে দেশ ও জাতির জন্য। যুদ্ধাপরাধী ও ধর্মান্ধ শক্তির সাথে আপোষের রাজনীতির জন্য আওয়ামী লীগের জন্ম নয়। ওই রাজনীতির ধারক-বাহক বিএনপি, জাতীয় পার্টি বা জামাতই এর জন্য যথেষ্ট।