মঙ্গলবার, ১৮ জুন, ২০১৩

দলবাজদের দাপট ভেঙে দিচ্ছে জাতির মেরুদন্ড


দলবাজদের দাপট ভেঙে দিচ্ছে জাতির মেরুদন্ড

দিগন্ত ॥ দল শব্দের দু’টি অর্থ। দলপতি যখন শক্তিদাতা, সৌন্দর্যদাতা, প্রাণদাতা হন তখন দল অর্থ হচ্ছে সংগঠিত জনতা যারা লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রচেষ্টা করে। দলপতি যখন পীড়নদাতা, দোলনদাতা তখন দল অর্থ হচ্ছে  দলন, পেষণ, নিপীড়ন, নির্যাতন। দলের মধ্যে কে দলপতি হবেন এ নিয়েই শুরু হয় দলাদলি ও দলবাজি। দলবাজির মূল কারণ ব্যক্তিস্বার্থ। ব্যক্তিস্বার্থে দলের ভালো বা মন্দ, যে কোন সিদ্ধান্তকে অযৌক্তিকভাবে সমর্থন করাই হল দলবাজি। দলবাজরাই দল এবং দেশের ক্ষতি করে। কারণ তারা দলনিরপেক্ষ অবস্থানে দাঁড়িয়ে দলের কোন ভুল সিদ্ধান্তকেও সঠিক বলে প্রচার করতে এমনভাবে ব্যস্ত থাকে যে, তাদের কারণে ক্ষমতাসীন দলের নেতৃত্বের পক্ষে অনেক সময়ই উপলব্ধি করা সম্ভব হয় না যে,  তাদের সিদ্ধান্তটি আসলে সঠিক নয়। ফলে সরকার সেই ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েই এগিয়ে যায়, এক সময় যা সরকারের বড় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সাধারণত, বড় বা লোভনীয় কোন সরকারি পদ, ব্যবসা, ব্যাংক, বীমা, টিভি চ্যানেল ইত্যাদির অনুমোদনসহ বিভিন্ন সুবিধা বাগিয়ে নেয়ার জন্যই দলবাজরা অন্ধভাবে দলকে সমর্থন দিয়ে থাকে। এমন নজির আছে ভূরি ভূরি। বঙ্গবন্ধু এ ধরনের দলবাজদের নাম দিয়েছিলেন ‘চাটার দল’।
বর্তমান শাসনামলেও প্রশাসন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যমসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দলবাজদের প্রবল উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। এদেশের মানুষ যথেষ্ট রাজনীতিসচেতন। ফলে কে কী উদ্দেশ্যে সরকারের তোষামোদি করছে, তা বুঝতে কারও অসুবিধা হয় না। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক যে, সব সরকারই দলবাজদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়ে আসছে। ফলে জনপ্রশাসন থেকে শুরু করে সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান- প্রতিটি ক্ষেত্রেই শীর্ষ পদেও দেখা যায় দলবাজদের দাপট। প্রশাসনে সরকারি কর্মকর্তাদের দলবাজি করার উদ্দেশ্যও মূলত ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করা অর্থাৎ পদোন্নতি, পছন্দের স্থানে পদায়ন, ঘুষ-দুর্নীতির সুযোগ ইত্যাদি বাগিয়ে নেয়া। এক্ষেত্রে সরকারি চাকরির সুবিধা হল, সরকার পরিবর্তনে দলবাজদের চাকরিচ্যুত হওয়ার আশংকা কম। বড়জোর তাদের ওএসডি করে রাখা হয়। তাতে বেতন-ভাতা হারানোর ভয় নেই। বরং আবার সরকার পরিবর্তন হলে নতুন করে দলবাজির মাধ্যমে ক্ষতিটুকু উসুল করে নেয়া যায় কড়ায়-গন্ডায়। ক্ষমতায় আসা দলের নেতৃত্বও ভাবে, দলকে সমর্থন করার জন্য বেচারাকে আগের সরকার ওএসডি করেছিল, কাজেই এবার তাকে পুরস্কৃত করা দরকার! প্রশাসনে এভাবে দলবাজদের উৎসাহিত করার ফলে নিরুৎসাহিত ও বঞ্চিত হন দক্ষ, যোগ্য ও মেধাবী কর্মকর্তারা। ফলে সরকারি কর্মকান্ড হয়ে পড়ে স্থবির ও দুর্নীতিগ্রস্থ।
সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দলবাজির চিত্রটি আরও ব্যাপক। বিশ্ববিদ্যালয়ে দলবাজি না করলে পাওয়া যায় না উপাচার্যের পদ। ফলে যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে, তখন সে দলের অনুগত ব্যক্তির উপাচার্য হওয়া প্রায় প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেছে। অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষক নিয়োগেও প্রাধান্য পেয়ে থাকে দলীয় বিবেচনা। তাই আজকাল শিক্ষকদের মধ্যেও দলবাজির প্রবণতা প্রবল হয়ে উঠেছে। শিক্ষকরাই যদি দলবাজি করেন, তাহলে শিক্ষার্থীদের আর দোষ কী! তাই শিক্ষাঙ্গনে বন্ধ হয় না লেজুড়বৃত্তির ছাত্র রাজনীতি। দলবাজদের দাপট ভেঙে দিচ্ছে জাতির মেরুদন্ড। এ থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে কখনও রক্ষা করা যাবে না মেধাবী ও যোগ্যদের মর্যাদা। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে বাড়বে অন্যায়, বৈষম্য ও দুর্নীতি। দল বিশেষ করে ক্ষমতাসীনদের বুঝতে হবে, দলবাজরা কখনও দলের জন্য মঙ্গল বয়ে আনে না। বরং ক্ষমতাসীনদের জনপ্রিয়তা কমাতেই ভূমিকা রাখে তারা। যারা দলবাজি করে বেড়ায় তাদেরও বুঝতে হবে, মানুষ কখনও দলবাজদের পছন্দ করে না। বরং ঘৃণা ও করুণাই করে থাকে।

বাঙালির দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধ চলছে-চলবে


বাঙালির দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধ চলছে-চলবে

সংলাপ ডেস্ক ॥ বাংলাদেশে সার্বিক অঙ্গনে সন্ত্রাসী ঘটনাগুলোকে বিশ্লেষণ করে সমাজবিজ্ঞানীদের মধ্যে কেউ কেউ মনে করছেন এবং বলেও থাকেন, বাঙালি জাতি জাতিসত্তার লক্ষ্য থেকে সম্পূর্ণ বিচ্যূত, তথাকথিত ধর্মীয় ও পরনির্ভর হয়ে উঠছে। এটা কি বিশ্বাসযোগ্য? দৃঢ়তার সঙ্গে বলা যায় এই ভূখন্ড পুরোপুরি স্বাধীন, সার্বভৌম ও গণপ্রজাতন্ত্রী এবং বাঙালি জাতিসত্তায় উন্নত শির নিয়ে এগিয়ে চলছে বাংলাদেশ এবং চলবেও।
রাষ্ট্রধর্ম ‘ইসলাম’ হলেও বাংলাদেশ তথাকথিত ধর্মরাষ্ট্রের পথে এখনও পা বাড়ায়নি। বিচার ব্যবস্থা, প্রশাসনিক কাঠামোর দূরাবস্থা ও রাজনৈতিক আশা-আকাঙ্খার ভিতর-বাইরের নানা চাপের মধ্যে থেকেও দেশবাসী শান্তি (ইসলাম)-কে আঁকড়ে ধরে আছে এবং সুন্দরকে ছেড়ে দেয়নি। যতদিন বাংলা ভাষা বেঁচে থাকবে, অটুট থাকবে একুশের ভাবাদর্শ, যতদিন উৎসাহ যোগাবে মুক্তিযুদ্ধের প্রেরণা, ততদিনই দেশবাসী ধর্মীয় উগ্রতা ও ধর্মান্ধতার কুৎসিতের বিরুদ্ধে লড়তে থাকবে। লড়াই ক্রমশ বাড়ছে এবং প্রবলও হচ্ছে। বাঙালিরা লড়ছে বলেই নিজেদের তৈরি করা স্বার্থের ইসলাম কায়েম করার দাবিদারদের বর্বরোচিত হামলায় বাংলাদেশ বারবার আক্রান্ত হচ্ছে। বাংলাদেশের ধর্মভীরু মানুষই যারা সত্যিকার শান্তি (ইসলাম) প্রিয় তারাই এর বিরুদ্ধে লড়ছে। এ লড়াই সংশয়হীন। লক্ষ্য হচ্ছে জাতিসত্তার পূর্ণাঙ্গ বিকাশ এবং স্বনির্ভরতার চূড়ান্ত প্রচেষ্টা। এই মহৎ ও মানবিক উদ্দেশ্য নস্যাৎ করবে বলেই একুশে ফেব্রুয়ারীর, ষাটের দশকের গণআন্দোলনের এবং স্বাধীনতা যুদ্ধের পরাজিত অমানবিক তথাকথিত রাজনৈতিক ইসলামের নামে মিথ্যাচারের শক্তি জোট একই দিনে ২০ মিনিটের মধ্যে এ দেশের ৬৪টি জেলার ৬৩টিতে প্রায় ৫১০টি ষড়যন্ত্রমূলক বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে পেশী প্রদর্শন করেছে। তারা বলতে চেয়েছে তারা জাগ্রত, সম্মিলিত, শক্তিময় এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার একচ্ছত্র বিরুদ্ধশক্তি। তাদের এ হামলা ও আত্মপ্রকাশের চেষ্টা কেবল বাংলাদেশের মানুষের বিরুদ্ধে নয়, বাঙালি জাতিসত্তা এবং উপমহাদেশের লোকায়ত ভাবাদর্শেরও বিরুদ্ধে।
উগ্র, ধর্মান্ধ ও কুৎসিত সন্ত্রাসীরা ‘ধর্মযোদ্ধার দল’ বলে নিজেদের দাবি করেছে এবং বারবার প্রকাশ করতে চাচ্ছে নিজেদের শক্তিকে। এ গোষ্ঠী এখন বাঙালি জাতির মুখোমুখি অর্থাৎ সামনে, কিন্তু আড়ালে আছে আরো অনেক বড় বড় মাথা আর দেশী-বিদেশী সংগঠন। যেমন, আমেরিকার পোষ্যপুত্ররা এবং তালেবানদের মতো আরো সুগঠিত শক্তি, এদেরকে সরাসরি সাহস ও সশস্ত্র কৌশল যোগাচ্ছে বলে ইসলামি চিন্তাবিদগণ চিন্তিত।
ওই গোষ্ঠী সুপরিকল্পিত এবং তাত্ত্বিক দিক থেকে অত্যন্ত সুগঠিত এবং আল-কায়দার ভাবাদর্শে চালিত। স্মরণ করা যেতে পারে মিশরের এক সময় হাসান আল বান্নার ভাবশিষ্য সৈয়দ কুতুবের ইখওয়ানুল মুসলিমিন (মুসলিম ভ্রাতৃসংঘ) এই আদর্শই প্রচার করতো। তিরিশ ও চল্লিশের দশকে ওরাই ভারতবর্ষের স্বাধীনতা যুদ্ধ ও গণতন্ত্রের আকাঙ্খাকে ওই আদর্শের ভিত্তিতেই কুফরি ও আল্লাহ্‌ বিরোধী বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন। তারও লক্ষ্য ছিল হুকুমত-ই-এলাহীর (আল্লাহ্‌র শাসন ব্যবস্থা) পূর্ণাঙ্গ প্রতিষ্ঠা।
সশস্ত্র বিপ্লবের ডাক দিয়েছিলো তারা। জামাল আব্দুল নাসেরের মিশর কিংবা এই উপমহাদেশ সৈয়দ কুতুবের ইখওয়ানুল মুসলিমিন অথবা মৌদুদির জামাতকে আমল দেয়নি। কিন্তু তাদের ভাবাদর্শের মৃত্যুও ঘটেনি। আমেরিকার মদদে আফগানিস্তান সহ উপমহাদেশে তালেবানদের বিভিন্ন নামে সংহত করে ওহাবী ভাব ও আদর্শকে বিশ্বময় প্রতিষ্ঠিত করে তুলতে এখনও সক্রিয়। বৃহৎ শক্তির মদদে তাদের সশস্ত্র কৌশল আজ বিশ্বের সর্বত্র বিভিন্ন দেশের সংস্কৃতির অন্যতম সংকট। তথাকথিত হুকুমত-ই-ইলাহী প্রতিষ্ঠার অছিলায় বাংলাদেশে তারা বহু বাংলা-আরবী-ফার্সি নামে সংগঠন গড়ে নিজেদের মধ্যে সংযোগ রক্ষা করে চলছে। এটা সন্দেহ নয়, এটা বাংলার আকাশে-বাতাসে-মাটিতে যে ঘ্রাণ পাওয়া যাচ্ছে তার পরিপ্রেক্ষিতে ধর্মভীরু শান্তিপ্রিয়
বাঙালিদের সংশয়। এই সংশয়ের কারণ সশস্ত্র বিপ্লবের হুমকি ও সন্ত্রাস এবং আফগানিস্তান হতে তাদের ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের বাংলাদেশে প্রবেশ ও অস্ত্রশিক্ষা এবং প্রকাশ্য স্লোগান।  সংশয়ের প্রধান ভিত্তি হচ্ছে,  ধর্মভীরু মানুষকে সহজেই বেহেস্ত ও দোযখের কথা বলে বলে এক ভাবাবেগ তৈরি করে নিজেদের ভাবাবেগকে, আল-কায়দার কৌশল থেকে দারিদ্র্যের সুযোগ
নিয়ে নিজেদের কৌশলকে, তালেবানদের সন্ত্রাস থেকে নিজেদের আগ্রাসী সন্ত্রাসকে সমস্ত  তথাকথিত ইসলাম ধর্মের নামে সংগঠনগুলো কখনো আলাদা করেনি এবং আলাদা করে দেখতে শেখেনি ধর্মান্ধতার কারণে। এসব কারণেই ইসলামি চিন্তাবিদরা শংকিত। এরা উপমহাদেশে যে কোনো জাতিসত্তার, সংস্কৃতি ও মানবতার শত্রু, যে রকম এসবের জন্য দুশমন আমেরিকা ও সৌদি আরব ঠিক তেমনি বর্বরতার ওজনে বাঙালির শান্তিপ্রিয় স্বচ্ছ জীবন, স্বপ্ন, ঐক্য ও ঐতিহ্যের জঘন্যতম শত্রুর নাম স্বাধীনতা যুদ্ধাপরাধী গোষ্ঠী। বাংলাদেশে তাদের ক্ষমতাসীন হওয়ার জন্য যে কোনো কার্যক্রম চিহ্নিত হয়েছে বাঙালি জাতিসত্তার উপর হামলা বলে। তাদের যে কোনো হুমকি সমগ্র দেশের বিরুদ্ধে হুমকি, তাদের যে কোনো বর্বরতা ঘায়েল করতে পারে বাঙালির চোখকে, কানকে, স্বপ্ন ও আকাঙ্খাকে কিন্তু গোটা জাতিসত্তাকে নয়। বাংলাদেশ যেমন অসৎ রাজনৈতিক জরাগ্রস্ত তেমনি পৃথিবীর সব দেশে যেখানে বাঙালি আছে সবাই মর্মাহত। বাংলাদেশে আতঙ্ক বাড়ছে আর বিশ্বজুড়ে বাঙালির রক্ষক্ষরণ হচ্ছে হৃদয়ে, ভাবাবেগে এবং গভীর উদ্বেগে। তাই বিশ্বব্যাপী বাঙালি আজ চুপ থাকতে পারে না, চুপ থাকা উচিতও নয়। উদ্বেগ ও ভাবাবেগকে ভাষায়, প্রতিবাদে, মিছিলে, সম্মিলিত প্রতিজ্ঞায় প্রতিরোধ গড়ে তোলা দরকার। দরকার প্রস্তুতি ও এর বিরুদ্ধে লড়াই করার মানসিকতা। শান্তি ও স্থিতিশীল বাংলাদেশ বাঙালিদের একমাত্র স্বপ্ন ও আকাঙ্খা। এটা অনস্বীকার্য বাংলাদেশে মানুষের মধ্যে ৯৫% মুসলমান। তাদের মধ্যে ৯০%-ই ধর্মভীরু ও শান্তিপ্রিয়। দুর্ভাগ্য ৫% উগ্রধর্মান্ধরা মধ্যপ্রাচ্যের এক হাজার বছরের সংস্কৃতিকে বাঙালির চার হাজার বছরের সভ্যতার মধ্যে প্রতিষ্ঠিত করতে মত্ত কিন্তু ইসলামি মূল্যবোধগুলো যে বাঙালির মন ও মননে, কথা ও কথকতায়, চিরায়ত ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারে চার হাজার বছরের বাঙালির জীবনপ্রবাহে অবিচ্ছেদ্য ও অভিন্ন রয়েছে তা জেনেও তারা না জানার ভান করছে।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের মাটির তলার সম্পদের লোভে আধিপত্যবাদী শক্তিরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে ৫% ধর্মান্ধদের মধ্যে একটি বিরাট অংশকে মদদ দিয়ে ক্ষমতালিপ্সূ পদলেহী সেবাদাস করে ধর্মের নামে বিভিন্ন প্রকারে সার্বিক অঙ্গনে সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে বিশেষ করে প্রশাসনের অভ্যন্তরে, যা সমগ্র জাতিসত্তার জমিন ও দেহের উপর হামলা। একে রুখতে হবে গণজাগরণকে আরো বেগবান  করে।  প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে বাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে। বজ্রকন্ঠে একই সুরে বলতে হবে - জয় বাংলা বাঙালির বাংলাদেশ, চার হাজার বছরের বাঙালি শান্তির প্রতীক, শান্তিই ইসলাম। ধর্মান্ধরা সাবধান!

গণতন্ত্রের পূর্বশর্ত গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল


গণতন্ত্রের পূর্বশর্ত
গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল

আরিফিন হক ॥ গণতন্ত্রের পূর্বশর্ত হচ্ছে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল। আমাদের দেশের রাজনৈতিক দলগুলো এখনও গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল হিসেবে বিকশিত হতে পারেনি। প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোতে দলীয় সিদ্ধান্ত ছাড়াই, কয়েকজনের সিদ্ধান্ত ও ইচ্ছা অন্ধভাবে সমর্থিত হয়। অন্ধ সমর্থন এবং সমর্থন বিষয়ক অন্ধতা দেশে গণতন্ত্রের বিকাশের পথকে রুদ্ধ করছে। রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরে গণতন্ত্রের অনুশীলন নেই। দলের মধ্যে যারা আছেন তাদের ভিন্নমতই যেখানে গ্রহণযোগ্য নয় সেখানে দলের বাহির থেকে যেসব উপদেশ ও সমালোচনা করা হয় তা গ্রহণযোগ্য হবে কি করে? কিভাবে রাষ্ট্র পরিচালনায় জনগণের অংশগ্রহণ ও জনমতের প্রতিফলন ঘটবে?
দেশে সাংবিধানিক গণতন্ত্র আছে বটে কিন্তু কার্যত দেশ চলছে কয়েকজন মানুষের ইচ্ছা-অনিচ্ছায়। গণতান্ত্রিক আলোচনা, পর্যালোচনা ও পর্যবেক্ষণ ছাড়া যে রাজনীতি চলছে তাতে ব্যক্তিস্বার্থ সিদ্ধি হতে পারে কিন্তু দেশের স্বার্থসিদ্ধি হবার কোন সুযোগ নেই। রাজনীতি আটকে আছে অদ্ভুত একনায়কতন্ত্রের জালে। এ জাল যারা ছিড়তে যায় তারাও আটকে যায় জালে। এটাই প্রতিক্রিয়াশীলতা। বাংলাদেশেও যথেষ্ট সমর্থ, মেধাবী, কল্যাণশীল ও দক্ষ লোক আছেন। কিন্তু এদের কোন মূল্যায়ন নেই। কে দেবে মূল্য? যাদের চিন্তাজগত ক্ষমতাকেন্দ্রীক, ক্ষমতার বাইরে যারা আর কিছু ভাবতেই পারে না তারা কিভাবে অন্যকে মূল্যায়ন করবে? ভেতর-বাহির থেকে ক্ষমতা তাড়া করলে কোন মূল্যবোধইতো বেঁচে থাকে না! তাই ধীরে ধীরে সব কিছু স্বার্থান্বেষীদের দখলে ও নিয়ন্ত্রণে চলে যাচ্ছে।
জনগণ রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে কী প্রত্যাশা করে? জনগণ প্রত্যাশা করে প্রগতি, জনগণ চায়, মোটা ভাত ও জীবনের নিরাপত্তা। কিন্তু তারা কি দিয়েছে জনগণকে? দিয়েছে - অস্বস্তি ও উৎকণ্ঠা। পথে পথে মরছে মানুষ। আন্দোলন করতে গিয়ে মরছে, না করতে গিয়েও মরছে। মৃত্যু যেন অবধারিত হয়ে উঠেছে সর্বত্র। ঘরে-বাইরে কোথাও স্বাভাবিক মৃত্যুর নিশ্চিয়তা নেই। বাংলাদেশ এখন দু’মুখো মরণ ফাঁদের মাঝখানে দাঁড়ানো। পা বাড়ালেও মরণ, পেছালেও মরণ।
তাই দেশের সচেতন নাগরিক মাত্র  রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন। দেশ যেন একটি অমীমাংসিত রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের দিকে যাচ্ছে। এমন কোন সমস্যা নেই যার সমাধান অসম্ভব। কিন্তু সমস্যা সমাধানের দিকে অগ্রসর না হয়ে ক্রমাগত সাংঘর্ষিক অবস্থার দিকে যাচ্ছে। এই সংকট উত্তরণের কোনো সদিচ্ছাও যেন নেই রাজনৈতিক দলগুলোর। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকবেই, মতপার্থক্য না থাকলে প্রগতি থেমে যেতো, উত্তরণ থেমে যেতো। এসব মতপার্থক্য থেকে একমতে পৌঁছার পথ অবশ্যই হতে হবে গণতান্ত্রিক।
বর্তমান সরকারের মেয়াদ প্রায় শেষের দিকে। এর পর নির্বাচন করতেই হবে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নির্বাচন ছাড়া সরকার পরিবর্তনের আর কোন পথ নেই। প্রশ্ন হচ্ছে, কোন ব্যবস্থায় পরবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে? বিরোধীদল বলছে তারা তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া নির্বাচনে যাবে না, নির্বাচন হতেও দেবে না। বিরোধীদল চায়, দলনিরপেক্ষ কোনো সরকারের অধীনে নির্বাচন। তাদের  এ দাবির পক্ষে যুক্তি আছে অবশ্যই। প্রকৃত সত্য হচ্ছে বর্তমান সরকারী দল বিরোধী দলে থাকলে তারাও এটাই চাইতো।
যে কোন রাজনৈতিক সংকট সমাধানের সদিচ্ছা থাকলে খুব সহজেই তা সম্ভব। কিন্তু এজন্য চাই বর্তমান রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন। দেশের প্রধান দুটি রাজনৈতিক দল তাদের দৃষ্টিভঙ্গি না বদলালে সমাধান আসবে না। এজন্য সবার আগে নিজ নিজ দলে ব্যক্তির স্বেচ্ছাচারিতা বন্ধ হওয়া চাই।  দলের মধ্যে গণতন্ত্রের চর্চা চাই।
রাজনীতিকরা যদি মনে করে থাকেন যে দেশের মানুষ তাদের বোলচালে আত্মহারা হয়ে তাদের প্রতি আজীবন আনুগত্য দেখিয়ে যাবে তা হলে ভুল করবেন। দেশের মানুষ অনিচ্ছা সত্ত্বেও অনেক কিছু মেনে নিতে চাইছে, মন না চাইলেও অনেক কিছুর সঙ্গেই মানিয়ে চলতে চাচ্ছে। কিন্তু এই মেনে নেয়া ও মানিয়ে চলার একটা সীমা আছে। এ সীমা যখন অতিক্রম করবে তখন জনগণ ঠিকই রুখে দাঁড়াবে। দেশকে সেই সুনামির দিকে ধাবিত না করাই শ্রেয়।

বুধবার, ৫ জুন, ২০১৩

শান্তির লক্ষ্যে বিরোধিতার বুদ্ধিবৃত্তিকরণ চাই


শান্তির লক্ষ্যে বিরোধিতার  বুদ্ধিবৃত্তিকরণ চাই

 
আরেফিন হক ॥ রাজনৈতিক পরিস্থিতি আপাতত শান্ত মনে হলেও সামগ্রিক পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। মহাজোটের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিগুলোও পূরণ হয়নি। দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় সরকার অনেকটাই ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার পক্ষ থেকে সরকারকে অভিযুক্ত করা হচ্ছে। বিচারবহির্ভূত হত্যাকা-, গুম, হত্যা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বাড়াবাড়িকে অভিযুক্ত করে নানা প্রতিবেদন প্রকাশ করা হচ্ছে।

অন্য দিকে অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়েছে, বিনিয়োগ পরিস্থিতিও ভালো নয়। উন্নয়নের চাকা ঘুরছে না। গ্যাস-বিদ্যুৎ তথা জ্বালানির অভাবে বিকাশমান শিল্পগুলো আক্রান্ত। নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণহীন, সেবা খাত দুর্নীতিগ্রস্ত। এসব সমস্যা সরকার অকপটে স্বীকার করতেও চায় না। সাধারণ মানুষের সমস্যাগুলো নিয়ে ভাববার যেন কেউ নেই।

আস্থাহীনতার অভাবে ঘনীভূত হচ্ছে রাজনৈতিক সঙ্কট। আকাশে জমছে কালো মেঘ। এই মেঘ কাটানোর সহজ পথও খোলা নেই। তত্ত্বাবধায়কব্যবস্থা বিলুপ্ত করে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন বিরোধীদল মেনে নেবে না। একতরফা নির্বাচনের পথে হাঁটলে প্রতিরোধ অবশ্যম্ভাবী। বিরোধী দলগুলো জোটগতভাবে সামনের দিনগুলোতে আরো শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলবে; আগের মতোই তারা লাভ করবে জনসমর্থন। ফলে যে সাংঘর্ষিক পরিস্থিতির জন্ম দেবে, সেটা হবে জাতির জন্য দুর্ভাগ্যজনক। একই সাথে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বিপর্যয়ে পড়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেয়া সম্ভব হবে না। সরকার বা বিরোধী দলের- হার্ডলাইন যে গণতন্ত্রের জন্য কতটা বিপজ্জনক, তা নিকট ইতিহাসের দিকে তাকালেই বোঝা যায়।

রাজনীতি হচ্ছে সংঘাতের বুদ্ধিবৃত্তিকরণ। সংঘাত এড়িয়ে বা ছাড়িয়ে আরো উপরের স্তরে গিয়ে সংঘাতের কার্যকারণ নির্মূল করার প্রক্রিয়াই রাজনীতি। সমাজকে আরণ্যকতা থেকে উদ্ধারের জন্যেই রাজনীতি। সমাজ জীবনে বিবাদ-কলহকে আলোচনা-পর্যালোচনা বিবেচনার অধীন করে সমাধান বের করবার জন্যেই রাজনীতি। রাজনীতিতে আলোচনার কোন বিকল্প নেই। অথচ আমাদের দেশে রাজনীতিতে আলোচনা- পর্যালোচনার জন্য কোন ধৈর্য ও প্রজ্ঞার প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে না। বাংলাদেশের রাজনীতিতে বর্তমানে কেবল প্রলাপ আর বিলাপ চলছে। সংলাপ চলছে না, আলাপ চলছে না।

রাজনৈতিক ক্ষেত্রে যে অচলাবস্থার সৃষ্টি হচ্ছে, আলোচনার মাধ্যমে তা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। এজন্য প্রথমে সরকারকে দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা উপলব্ধি করতে হবে। জাতীয় সমস্যাগুলোর সমাধানকে অগ্রাধিকার দিয়ে, বিরোধী দলকে আস্থায় নিয়ে, একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য পথ প্রশস্ত করতে পারলেই সরকারের দক্ষতা প্রমাণিত হবে এবং সরকারের পক্ষে জনমত তৈরি হবে। দেশের ঘণীভূত রাজনৈতিক সঙ্কট সমাধান করতে হলে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের প্রেক্ষিত গড়ে তোলাই হবে রাজনৈতিক দূরদর্শিতা প্রদর্শনের পরিচায়ক। 

মুবাহালা


মুবাহালা

 
মুবাহালা-প্রতিযোগিতার আহবান। মিথ্যা অবলম্বনকারীর উপর আল্লাহ্‌র অভিশাপ চাহিয়া পক্ষ-প্রতিপক্ষ উভয়েই প্রার্থনা করিয়া উহার ফলাফল দ্বারা সত্য নির্ণয় করা। ইয়েমেন প্রদেশের নজরান নামক স্থানে একদল খ্রীষ্টান ধর্মযাজক পন্ডিত, তাহাদের দলীয় লোকজনসহ, পাদরি সূরাহবীলের নেতৃত্বে মদিনায় আসিয়াছিলেন খ্রীষ্ট ধর্মকে সর্বশ্রেষ্ঠ ধর্ম বলিয়া প্রমাণ করিবার জন্য এবং কর দান করা হইতে মুক্ত হওয়ার জন্য। অনেক কথাবার্তার পরও যখন তাহাদের পান্ডিত্য রসুল পাকের নবুয়তকে সত্য বলিয়া স্বীকার করিতে পারিল না তখন এই বিষয়ের মীমাংসার ব্যবস্থা স্বরূপ মুবাহালা বাক্য নাজেল হইল ঃ

‘সুতরাং আপনার নিকট এই বিষয়ে জ্ঞানের কথা (অহিরূপে) আসিবার পরেও যাহারা আপনার সঙ্গে বিতর্ক করে তাহদিগকে বলিয়া দিনঃ আস, আমরা ডাকিয়া লই আমাদের সন্তানগণকে এবং তোমাদের সন্তানগণকে এবং আমাদের নারীগণকে এবং তোমাদের নারীগণকে এবং আমাদের নফসসমূহকে এবং তোমাদের নফসসমূহকে। অতপর বিবেচনার জন্য আল্লাহর নিকট আমরা প্রার্থনা জানাই মিথ্যাবাদীগণের উপর আল্লাহর লানত হওয়ার জন্য।’ (৩:৬১)। ‘নিশ্চয় ইহা সত্য বৃত্তান্ত, ইলাহ হইতে নাই কিছু আল্লাহ ব্যতীত (অর্থাৎ আল্লাহ্‌ ব্যতীত কোন ইলাহ নাই) এবং নিশ্চয় আল্লাহ্‌ হইলেন তিনি যিনি সর্বশক্তিমান এবং বিজ্ঞানময় বিচারক।’ (৩:৬২)।

এই বাক্যের নির্দেশ অনুসারে বলা হইলঃ আমরা আমাদের পুত্রগণকে  লইয়া আসি আর তোমরা তোমাদের পুত্রগণকে লইয়া আস; আমরা আমাদের নারীগণকে আর তোমরা তোমাদের নারীগণকে লইয়া আস, আমরা আমাদের নফসগণকে আর তোমরা তোমাদের নফসগণকে লইয়া আস। উন্মুক্ত মাঠে উভয় দল প্রার্থনা জানাই - যেন এই বিষয়ে অসত্য আরোপকারীর উপর আল্লাহর লানত নাজেল হয়। প্রার্থনা পেশ করিবার সময় নির্ধারিত হইয়াছিল পরবর্তী দিবসের প্রভাতকাল। উহা ছিল দশ হিজরির ২৪ জিলহজ্ব, শুক্রবার।

ইহা ছিল উভয় পক্ষের প্রতিনিধিত্বমূলক একটি ফয়সালার ব্যবস্থা। সেইজন্য পুরুষ জাতির প্রতিনিধি, নারী জাতির প্রতিনিধি এবং শিশু ও কিশোর দলের প্রতিনিধি এবং পন্ডিত দলের প্রতিনিধি একত্র করা হইল। অর্থাৎ সবরকম লোকদের পক্ষ হইতে প্রতিনিধি লইয়া আল্লাহর কাছে আবেদন করা, যাহাতে মিথ্যাবাদীগণের উপর আল্লাহর অভিশাপ বর্ষিত হয়। অর্থাৎ নবূয়তের দাবি মিথ্যা অথবা তাহাদের দ্বারা তাঁহার নবুয়তের অস্বীকৃতি মিথ্যা।

রাসুলুল্লাহ্‌ (সাঃ) সালমান ফারসীকে নির্ধারিত মাঠে শামিয়ানা টানাইয়া; নিজেদের আশ্রয়ের জন্য ব্যবস্থা করিতে বলিলেন। তাহাই করা হইল। (প্রকাশ থাকে যে নবী এবং ইমামগণের কাজের এন্তেজাম দেয়ার জন্য আহলে বাইতগণই যোগ্যতম ব্যক্তি)।

খ্রীষ্টান প্রতিনিধি দলের উপস্থিতির আগেই রসুল পাক তাঁহার দল হিসাবে (আবনায়ে রসুল)’ অর্থাৎ রসুল সন্তান ইমাম হাসান ও ইমাম হোসাইন (আঃ), নেছায়ে রসুল ফাতেমা তুজ জোহরা এবং নফসে রসুল আলী (আঃ) কে সঙ্গে লইয়া যথাস্থানে আসন উপস্থিত হইয়া আসন গ্রহণ করিলেন।

অপরপক্ষে খ্রীষ্টান প্রতিনিধিবৃন্দ কিছুদূর হইতে তাহাদিগকে দেখিয়া দাড়াইয়া রহিলেন এবং দলপতি সুরাহবীল এইমর্মে দলীয় নেতৃবৃন্দের প্রতি সতর্কবাণী উচ্চারণ করিয়া বলিয়া উঠিলেন, ‘ভাতৃবৃন্দ’ আমার দৃষ্টিতে আমি তাঁহার এবং তাঁহার দলীয় ব্যক্তিগণের মধ্যে ঐশী জ্যোতির চরমরূপ দেখিতে পাইতেছি। তাঁহারা যদি এই পাহাড়কে সরিয়া যাইতে বলে তাহা হইলে পাহাড় নিজ স্থান হইতে সরিয়া যাইবে। এমতাবস্থায় যদি আমরা মুবাহালার কথা অনুযায়ী স্রষ্টার নিকট সম্মিলিত প্রার্থনা জানাই তাহা হইলে নিশ্চিত জানিয়ে রাখ অভিসম্পাত আমাদের উপরেই পতিত হইবে। শুধু আমরাই নয় বরং গোটা খ্রীষ্টান জাতি আমাদের কারণে অভিসম্পাতে নিপতিত হইবে।’ এই বলিয়া খ্রীষ্টান দলপতি পাদরী সাহেব রাসুলপাকের নিকট অগ্রসর হইয়া সবিনয়ে বলেলেন ‘আমি সাক্ষ্য দির্তেছি যে, নিশ্চয় আপনি আল্লাহর সত্য নবী’। এইরূপে খ্রীষ্টান মোমিনগণ সত্যকে অস্বীকার করিলেন কিন্তু তাহারা নিজ ধর্ম ত্যাগ করিতে রাজি হইলেন না। যেহেতু তাহারা নজরানের সমগ্র খ্রীষ্টানগণের প্রতিনিধি হিসাবে আসিয়াছেন সেইহেতু তাহাদের তাৎক্ষণিক ধর্মান্তর সারাদেশের ধর্মান্তরের শামিল হইয়া পড়ে। অবশ্য পরবর্তীকালে তাহাদের অধিকাংশই মোহাম্মদী ধর্মে দাখিল হইয়াছিলেন। তাহারা নবীর রাষ্ট্রের আনুগত্য গ্রহণের প্রতীক স্বরূপ কর দানে সম্মত হইলে রাসুল্লাহ (সাঃ) তাহাদিগকে আলী (আঃ) এর সাথে চুক্তিপত্র সম্পাদনের নির্দেশ দিলেন। চুক্তি বিষয়ে খ্রিষ্টানগণের সহিত  সদয় আচরণ করা হইল এবং বিরোধিতা না করিয়া যতকাল তাহারা শান্তিপূর্ণ আচরণ করিবে ততকাল তাহাদিগকে তাহাদের আপন ধর্ম পালনে স্বাধীনতা দেয়া হইল। এইরূপে তাহারা কর প্রদান করার প্রতিশ্রুতি দিয়া বিদায় গ্রহণ করিলেন।

মুবাহালার এই ঘটনা হইতে একটা কথা বিশেষভাবে প্রমাতি হইল যে, বৈষয়িক বুদ্ধিমত্তা রুহানী শক্তির নিকট সব সময়ই পরাজিত হইয়া থাকে। ইহা সর্বকালীন সত্য। এইজন্য পার্থিব বুদ্ধিমত্তা আপন অধিকার প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে সত্যের বিরুদ্ধে তাহার পাশবিক শক্তি চিরকালই ব্যবহার করিতে অভ্যস্ত, কারণ ইহা ছাড়া তাহার অস্তিত্ব রক্ষা করার অন্য উপায় থাকে না।

এই প্রসিদ্ধ ঘটনাটি বিশেষ একটি প্রমাণ বহন করে যে, দ্বীনে মোহাম্মদী খ্রীষ্ট ধর্ম হইতে উচ্চমানের ধর্ম। ঘটনাটির গুরুত্ব হইল এই যে, ইহা ভিন্ন ধর্মাবলম্বী মোমিনগণের দ্বারা রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এঁর নবুয়তের সাক্ষ্য দানের ব্যাপার। এক নবীর উম্মতগণ অন্য নবীকে নবীরূপে একযোগে প্রত্যক্ষভাবে সাক্ষ্য দানের একটি মহান ঘটনা।

আর একটি গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য এই ঘটনার উপর করা যাইতে পারে খ্রীষ্টান প্রতিনিধিদল প্রথম সাক্ষাতেই নবুয়তের সাক্ষ্য দিতে পারিতেন, কিন্তু আল্লাহপাকের এইরূপ ব্যবস্থার একটি গভীর রহস্য রহিয়াছে। এই ঘটনা দ্বারা শুধু অন্য ধর্মাবলম্বীর নিকট নবীর নবুয়ত প্রকাশ করার উদ্দেশ্য ছিল না,  তাহা হইলে উহা প্রথম পর্যায়েই ঐরূপ করিয়া দেখাইতে পারিতেন, বরং তাহাদের অনুসারী আহলে বাইতের শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশ করার জন্য এলমে এলাহীর এহা একটি রহস্যপূর্ণ ব্যবস্থা বিশেয়। ইহা এইরূপ ব্যাপক আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে ঘটান হইয়াছিল, ইহা হইতে উম্মতে মোহাম্মদীর বিশেষ প্রয়োজনীয় শিক্ষা গ্রহণের জন্য, যাহাতে তাহারা রসুল বংশের গুরুত্ব ভুলিয়া না যায়। এই উদ্দেশ্য না থাকিলে প্রথম দিনেই নবী তাঁর নবুয়তকে তাহাদের নিকট প্রকাশ করিতে পারিতেন যেহেতু তাহারা ছিল বিশ্বাসী।

বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে রাষ্ট্রীয় পরিচালনার ক্ষেত্রে মুবাহালার ঘটনা কোন দিকনির্দেশনা দিতে পারবে কিনা বিশেষজ্ঞরা বলতে পারবেন। তবে দার্শনিকের দৃষ্টি ভঙ্গিতে বিশ্লেষণ করলে বলা যায় মুসলমান অধ্যুষিত বাংলাদেশের সমাজের প্রতি স্তরে এর প্রয়োগ একেবারে অসম্ভব নয়। হানাহানির পথ পরিত্যাগকরে ধৈর্যের সাথে মুখোমুখি বসে সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত হওয়ার এবং সর্বস্তরে সত্য প্রতিষ্ঠার পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে।

গণতন্ত্র কেবল নির্বাচন নয়


গণতন্ত্র কেবল নির্বাচন নয়

 
দিগন্ত ॥ শাসনপদ্ধতি হিসেবে গণতন্ত্রের চেয়ে গ্রহণযোগ্য কোনো তন্ত্র এখনো পাওয়া যায়নি। চলমান পৃথিবীর শাসনব্যবস্থা হিসেবে গণতন্ত্রই সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য আচরিত শাসনব্যবস্থা। গণতন্ত্র কেবল নির্বাচনী খেলা নয়। গণতন্ত্র হচ্ছে - সংখ্যাগরিষ্ঠের ইচ্ছা-অনিচ্ছার মূল্য দেওয়া, পারস্পরিক সহযোগিতা ও সমঝোতার বাতাবরণ সৃষ্টি করা, নাগরিকদের অধিকার ও সুযোগের সাম্য প্রতিষ্ঠিত করা। কিন্তু স্বাধীনতার পর গত ৪২ বছরে আমাদের অভিজ্ঞতা কি বলে যে, বাংলাদেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে? নাকি উল্টো ঘটনা ঘটেছে? বাংলাদেশে যে গণতন্ত্র নেই তার বহু প্রমাণ চারদিকে জ্বল জ্বল করছে। এদেশে নাগরিকদের অধিকার ও সুযোগের সাম্য তো আসেইনি, বরং বৈষম্য আগের যে কোনো সময়ের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে। আমাদের দেশে গণতান্ত্রিক নির্বাচনী খেলার অন্তরালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে পরিবারতন্ত্র। বাংলাদেশের শাসক শ্রেণী সুকৌশলে গণতন্ত্রকে নির্বাচনের সমার্থক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছেন। এদেশের মানুষ মনে করে নির্বাচনে ভোট দিতে পারলেই গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেলো। বাংলাদেশের গণতন্ত্র আসলে ছদ্মবেশী একনায়কতন্ত্র। এই বিকৃত গণতন্ত্রে শাসকগোষ্ঠী চড়া গলায় মানবাধিকার, স্বাধীনতা ও সাম্যের প্রতি তাদের আনুগত্য  প্রকাশ করে।

প্রকৃতপক্ষে এ ধরনের ব্যবস্থায় মানবাধিকার ও সাম্যের ভিত্তি ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। এই বিকৃত ব্যবস্থা জাতীয়তাবাদ ও পররাষ্ট্রনীতির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ঐকমত্য গড়ে উঠতে দেয় না এবং গড়ে উঠতে থাকলেও তাকে বাধাগ্রস্থ ও ধ্বংস করে। এই দূষিত ব্যবস্থা বহুত্ববাদ বিলুপ্ত করে, এমনকি রাজনৈতিক দলের মধ্যেও গণতান্ত্রিক মতপার্থক্যের অবকাশ রাখে না। এ ব্যবস্থার আওতায় গণতন্ত্রের অন্যতম প্রধান উপাদান, সংবিধানসম্মত বিরোধী দলকেও সুবিন্যস্তভাবে দুর্বল করা হয়। এ ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন দল কূটকৌশল ও বল প্রয়োগ করে রাষ্ট্রক্ষমতার বাইরে থাকা বিরোধী পক্ষকে দমন, পীড়ন ও নিয়ন্ত্রণ করে। এ ছাড়া ক্ষমতাসীন দল আইনসভা, বিচার ও নির্বাহী বিভাগের স্বাধীনতা ও শক্তি খর্ব করে। তাদের দলীয় নয়, দলবাজি সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন করে বলহীন ও নির্জীব করে তোলে। এ ধরনের বিকৃত গণতন্ত্রে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার খোসা ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না।

গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির মূলে রয়েছে মানুষের সাম্য, আইনের শাসন, ন্যায়বিচার, ভিন্নমতের প্রতি সহিষ্ণুতা ও শ্রদ্ধাসহ অন্যান্য চিরন্তন মূল্যবোধ। মৌলিক সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিষয়ে সাধারণ ঐকমত্যের ওপর ভিত্তি করেই গণতন্ত্রের ভুবন তৈরি হয়। এই ঐকমত্যেরও অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক মাত্রা রয়েছে। এ দুই ক্ষেত্রেই দেশের প্রধান রাজনৈতিক শক্তিগুলো ঐকমত্যের ভিত্তিতে কাজ করলে গণতন্ত্র সুপ্রতিষ্ঠিত হয়।

সামপ্রতিক কালে রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির মধ্যে যে প্রতিদ্বনিদ্ধতা চলছে তাতে আদর্শের প্রতিযোগিতার চাইতে ক্ষমতার দ্বনদ্ধ, যাওয়া ও থাকার প্রবণতাই মুখ্য। এই প্রতিদ্বনিদ্ধতা আমাদের গণতন্ত্রকে সুরক্ষা করবে না, বরং ১৯৭৫ পরবর্তী, কিংবা ২০০১ থেকে ২০০৮ সময়ের ধারায় ঠেলে দিতে পারে। বিএনপি রক্ষণশীল গণতন্ত্রের ভাবাদর্শে হাঁটতে পারে, তবে তা যদি উগ্র ডান, হঠকারী ডানদের জঙ্গীবাদী ধারায় টেনে নিয়ে যায় তা হলে বাংলাদেশের দুর্বল গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানসমূহ আরো বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বিষয়টি আওয়ামী লীগ এবং মহাজোটভুক্ত দলগুলোকে আরো গভীরভাবে বিবেচনায় নিয়ে দেশের গণতন্ত্রকে নিরাপত্তা বিধানে ভূমিকা রাখবে সেটিই এ মুহূর্তের ঐতিহাসিক দায়িত্ব হতে পারে। সেই রাজনৈতিক দায়িত্ব পালনে এখন কারোরই ব্যর্থ হওয়ার সুযোগ নেই।

বিচিন্তক মানস নজরুল


বিচিন্তক মানস নজরুল

 

সালাহউদ্দিন আহমদ ॥ কবিতার বাইরেও নজরুলের বিরাট বিচিত্রতাও নিশ্চয় অবিস্মরণ দ্যুতিময়। তাঁর গল্প, নাটক, উপন্যাস, প্রবন্ধ চর্চা, পত্রিকা সম্পাদনা ও পরিচালনা; অভিনয় চলচ্চিত্র পরিচালনা, গীতিকার, সুরকার, আবৃত্তিকার, গায়ক ও বক্তা হিসেবে দক্ষতা -সমস্ত মিলেই নজরুল। বিশেষ করে তাঁর গানের কথা বলবো যে - গানের অনেকগুলো কবিতা হিসেবেই বিবেচ্য এবং যে গানের বিষয় ও সুরের বিচিত্রতা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ গীতিকারদের তুল্য। না মেনে উপায় নেই, রবীন্দ্রনাথের পরে আর কোনো লেখকের মধ্যে এতো বিচিত্র বিষয়ে এতো বিপুল সাফল্য অর্জিত হতে দেখা যায় নি।

নজরুল চিন্তাশীল, ভাবুক। দর্শনের ওপর কোনো রচনা না করলেও কবিতা, গল্প, উপন্যাস ও প্রবন্ধে তার দার্শনিক চিন্তা প্রতিফলিত হয়েছে। আর সার্থক দর্শন মানেই জীবন দর্শন। নজরুলের চিন্তা-চেতনা, জগত ও জীব ভাবনার সমষ্টিই তাঁর দর্শন। দর্শনের জীবন অর্থ ও ব্যঞ্জনার নিরিখেই নজরুলকে বিচার করতে হবে। নজরুলের মানস-চিন্তা, দারিদ্রের কঠোরতা, যুদ্ধের হিংস্রতা, অন্যায়, অত্যাচার, অবিচার, সংকীর্ণতা, ও কু-সংকার প্রভৃতি প্রতিকুল পরিবেশ ও পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। উৎপীড়িত মানুষের জন্য লিখেছেন ও লড়াই করেছেন। সময় ও পরিস্থিতি প্রয়োজনে, তাঁর মোহ নিদ্রা থেকে জাগাবার লক্ষ্যেই তিনি জয়গান করলেন দ্রোহ, আত্মবিশ্বাস ও আত্মশক্তির। এভাবে দ্রোহী, চেতনা ও অহমের সাধনার মাধমে যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন, তাই বাংলা মানসলোকে তাঁকে করে তুললো অনন্য, অপ্রতিদ্বন্দ্বী। রবীন্দ্রনাথ প্রমুখ রোমান্টিক কবি প্রবরের আনন্দময় কাব্য ধারার সঙ্গে এখানেই পার্থক্য বিচিত্র নজরুল চেতনার।

প্রতিবাদ ও নেতিবাচক মনোভাব নজরুল-দর্শনের শেষ কথা নয়। এটাকে আমরা নজরুল দর্শনের প্রারম্ভিক পর্ব বলে অভিহিত করতে পারি। নজরুল ধ্বংসস্তুপের ওপর গড়ে তুলতে চান নতুন সৃষ্টির সৌধ। আর এ জন্যে তিনি জোর দেন অহংবোধ ও আত্মনিষ্ঠার। এভাবে নিজের উপর নিজের বিশ্বাস প্রতিষ্ঠিত হলে মানুষ আত্মশক্তিতে বলীয়ান হয়। সে অনুধাবন করতে পারে পরম স্রষ্টার শ্রেষ্ঠতম জীব হিসেবে সে মহান। মানুষের অন্তরে স্রষ্টার অধিষ্ঠান হয়। মানুষকে স্রষ্টার কাছাকাছি যেতে কোনো অনুমতির প্রয়োজন পড়ে না। এ প্রসঙ্গে মহাকবি ইকবাল তার ‘আসরারই খুদী’ গ্রন্থে ‘আমি’র বর্ণনায় বলেন, যার অর্থ, নিজেকে এমনভাবে শক্তিশালী কর যেন প্রতিটি ভাগ্য নির্ধারণের সময় স্বয়ং আল্লাহ তাঁর বান্দাকে জিজ্ঞেস করেন : বল; তোমার কি চাই? একই বক্তব্যের ক্রমধারায়, অর্থাৎ স্রষ্টা ও সৃষ্টির এই নিবিড় সম্বন্ধের পরিপ্রেক্ষিতে নজরুল ‘আমি’কে বর্ণনা করেন অসীম বলে।

দর্শনের দার্শনিকরা যেভাবে স্রষ্টা ও সৃষ্টি, খোদা ও বান্দার সম্বন্ধ নিয়ে আলোচনার সূত্রপাত করেন, আমরা দেখি নজরুল ঠিক একইভাবে অগ্রসর হন। একই প্রসঙ্গে কবি বলেন -

‘আমার আপনার চেয়ে আপন যে জন

খুঁজি তারে আমি আপনায়

আমি শুনি যেন তার চরণের ধ্বনি

আমার তিয়াসী বাসনায়-’

নজরুল এই একই তত্ত্ব ব্যক্ত করেছেন তাঁর আরেকটি কবিতায়। তিনি    বলেন ঃ

আমি ভাই ক্ষ্যাপা বাউল আমার দেউল

আমার আপন দেহ

আমার এই প্রাণের ঠাকুর নহে সুন্দর

অন্তরে মন্দির সেই।

‘ধূমকেতু’ কবিতাটির মধ্যে নজরুল এর কবিসত্ত্বার স্বরূপ প্রতিবিম্বিত। সূক্ষ্মভাবে বিচার করলে দেখা যায় যে, এই আপাত দ্বন্দ্ব ও বৈপরীত্য নজরুল কবি মানসের মধ্যে একটি স্থির বিশ্বাসের আলোকের সমন্বয় লাভ করেছে। যে তত্ত্বের মধ্যে সমস্ত বৈলক্ষন্য সংগতি ও ঐক্য পায় তা বাংলায় লীলাবাদ নামে পরিচিত। নজরুল এই তত্ত্বের তাত্ত্বিক ছিলেন বলে তাঁর পক্ষে একই সঙ্গে শাক্ত সংগীত, বৈষ্ণব গান, ইসলামী সংগীত প্রভৃতি বিভিন্ন ধর্ম বিষয়ক রচনার জনক হওয়া সম্ভব হয়েছে।

নজরুল কবি মানসে শুধু দ্রোহ নয়, আমরা দেখি প্রেমও কবির অন্তরে ফল্গুধারার ন্যায় বহিত হয়েছে। কবির অনেক কাব্যে, গল্পে, উপন্যাসে, প্রেমের প্রকাশ ঘটেছে। ‘দোলন চাঁপা’ কাব্যে কবির প্রেম সম্পর্কিত অস্থির, মানসিকতা ধরা পড়ে। প্রেমিকের বিচিত্র প্রণয়লীলা ও তাঁর মান-অভিমান, অনুরাগ-বিরাগ, দ্বন্দ্ব-সংশয় প্রভৃতি সবরকম ভাবই ‘দোলন-চাঁপা’ কাব্য গ্রন্থের বিধৃত হয়েছে। এরকম শোনা যায় প্রমীলার ডাকনাম ছিল ‘দুলি’ বা ‘দোলন’। এই দোলন থেকেই কাব্যগ্রন্থের নামকরণ করা হয়েছে। কবিতাগুলো ভিতরকার কথা প্রিয়ের জন্য বেদনা-উচ্ছাস। সামরিক কবির প্রেমের উল্লাস তাঁর সামরিক উচ্ছ্বাসের মতোই ঝড়ের হাওয়ায় বহমান। ‘পূজারিনী’ কবিতাটি তাঁর শ্রেষ্ঠ নিদর্শন। যাতে নজরুল দেহগত প্রেমের অদ্ভূত রহস্য উদ্ঘাটনে উন্মুখ হয়েছে। ‘পূজারিনী’ কবির জীবন্ত মানস-প্রতীমা।

নজরুল শুধু আত্মসত্তার মহিমাই বর্ণনা করেন নি, তিনি গুরুত্বের সঙ্গে মানব সত্ত্বা নিয়ে আলোচনা করেছেন। তাঁর দর্শনে প্রেম হলো মানব প্রেম আর ধর্ম হলো মানব ধর্ম। তাঁর কবিতা, গল্প, উপন্যাস ও গানে মানুষের কথাই বলা হয়েছে। সমাজের সংকীর্ণতা, ধর্মীয় সংকীর্ণতা, মানুষে মানুষে বিভেদ, সাম্প্রদায়িকতা কবি মনকে দারুণভাবে ব্যথিত করেছেন। তিনি সব সময়ই মানুষের জয়গান গেয়েছেন। সবার উপরে স্থান দিয়েছেন মানুষকে। কবি তাই ‘মানুষ’ কবিতায় লিখেছেন ঃ

‘গাহি সাম্যের গান-

মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান।’

নজরুল সাম্প্রদায়িকতা কখনো প্রশ্রয় দেননি। তিনি সব সময় অসাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করতেন। তিনি হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের অমানবিক দিকগুলোর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। নজরুল জীবন দর্শনের লক্ষ্য ছিলো হিন্দু মুসলমানের মিলন ঘটানো।

নজরুল ছিলেন দেশ প্রেমিক। নজরুলের দেশপ্রেম তাঁর নিজেরই মতো দুর্দম, তাঁর কোন দলের জ্ঞান নেই, প্রাধান্যের আকাঙ্খা নেই; সকলকে সমান অধিকারে তিনি দেখতে চেয়েছেন এবং তাদের সঙ্গে গলাগলি হয়েই সে স্বাধীনতা পেতে চেয়েছেন। নজরুলই সম্ভবতঃ একমাত্র কবি, যিনি এ দেশের হিন্দু-মুসলমান দুই বৃহৎ জাতিকে বলিষ্ঠ স্বীকৃতি দিয়েছেন। তার কবিতায়, তাঁর গান, তাঁর সামাজিক মেলামেশা প্রভৃতির ভেতর দিয়ে তা ফুটে উঠেছে। তিনি বিশ্বাস করতেন, এই দুই বৃহৎ জাতির পরস্পর প্রীতির অন্তরালেই সমগ্র দেশের কল্যাণ নিহিত আছে। তাই তিনি সকল সাম্প্রদায়িকতার উর্ধ্বে দাঁড়িয়ে কথা বলতে পেরেছেন। এ ব্যাপারে তিনিই বোধ হয় একক। বঙ্কিমচন্দ্র, শরৎচন্দ্র এমন কি রবীন্দ্রনাথও সাহিত্যক্ষেত্রে সব সময় সাম্প্রদায়িকতার উর্ধ্বে উঠতে পারেননি।

নজরুলের মানবতাবাদের প্রকাশ ঘটেছে তাঁর বিভিন্ন কাব্য, সাহিত্য, গান ও অভিভাষণে। তিনি সমস্ত মানুষকে এক করে দেখতে চেয়েছিলেন। সমগ্র পৃথিবীকে তিনি এক দেশ হিসেবে ভাবতেন। এদিক থেকে নজরুল ছিলেন আন্তর্জাতিকতাবাদী। তিনি ছিলেন বিশ্বের নাগরিক। তাঁর বিভিন্ন কাব্যে মানবতার সুরটি স্পষ্ট হয়ে উঠে। কবিতাগুলোতে শোষণ, বঞ্চনার, অসাম্যের বিরুদ্ধে কবি কণ্ঠ ধ্বনিত হয়েছে। নির্যাতিত অবহেলিত মানবতার বিরুদ্ধে তিনি প্রচন্ড বিদ্রোহ করেন। তিনি এই শোষণ, বঞ্চনা যে পর্যন্ত  শেষ না হবে সে পর্যন্ত থামবেনা না। বিদ্রোহী কবিতায় তিনি বজ্র কণ্ঠে ঘোষণা করেন ঃ

মহা বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত

আমি সেই দিন হব শান্ত

যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন রোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না

অত্যাচারীর খড়গ কৃপান ভীম বণ-ভূমে রণিবে না।

গভীর ও ঘনিষ্ঠ মানবতাবোধই নজরুলের সাম্যবাদের ভিত্তি। মানুষের ভেদাভেদ তিনি স্বীকার করেন নি। নর-নারীর মধ্যে অধিকার বৈষম্যের তিনি বিরোধী। সর্বধর্মের উপরে মানবধর্মকেই তিনি উচ্চতম স্থান দিয়েছেন। মানুষের মধ্য্যেই তিনি সৃষ্টিকর্তাকে প্রত্যক্ষ করেছেন। তাঁর সাম্যবাদ ঈশ্বরকে অস্বীকার করে না। এক ঈশ্বরের অস্তিত্ব সম্পর্কে দৃঢ় আস্থা নজরুলের সাম্যবাদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। ‘সাম্য’ কবিতায় তিনি  বলেন ঃ

হেথা স্রষ্টার ভজনালয় এই দেহ এই মন

হেথা মানুষের বেদনায় তাঁর দুঃখের সিংহাসন

সাড়া দেন তিনি এখানে তাঁহারে যে নামে যে কেহ যাকে

যেমন ডাকিয়া সাড়া পায় শিশু যে নামে ডাকে সে মা’কে।

নজরুলের সাম্যবাদ সবধর্মের মহামিলন। এ সম্পর্কে তিনি বলেন ঃ

যেখানে আসিয়া এক হ’য়ে গেছে সব বাধা-ব্যবধান

যেখানে মিশেছে হিন্দু-বৌদ্ধ মুসলিম-খৃষ্টান।

নজরুল কোনো রাজনীতিবিদ ছিলেন না। তবু তাঁর বিভিন্ন রচনায় রাজনৈতিক চিন্তাধারার প্রতিফলন ঘটেছে। কবি জীবনের প্রারম্ভকাল থেকে অবসান কাল পর্যন্ত নজরুল ইসলাম মনে প্রাণে বিপ্লব ও বিদ্রোহকে সমর্থন করেছেন। বিদ্রোহ ও বিপ্লব ব্যতীত স্বাধীনতা ও মুক্তি লাভ সম্ভব নয়, এ রকম ধারণা নজরুলের জীবন দর্শনের অর্ন্তগত।

আধুনিক বাংলা কবিতার দু’শো বছরের (উনিশ ও বিশ শতাব্দী) ইতিহাসে নজরুল ইসলাম অন্যতম প্রধান কবি। অবিসংবাদী রবিকাব্যচ্ছায়া থেকে তিনি প্রথম বাংলা কবিতাকে মুক্ত করেন - অন্য কয়েকটি ধারা প্রবাহিত করেন। নজরুল ইসলাম হয়ে ওঠেন ‘জাতীয়তাবাদী কাব্য নায়ক’ বাংলা কবিতার প্রথম সার্থক সাম্যতন্ত্রের উদগাতা, নিপীড়িত ও শোষিত শ্রেণীর মানুষের বন্ধু, হিন্দু-মুসলমানের সৌভ্রাত্বের প্রতীক, আন্তর্জাতিক মিলনের পরিপোষক। এই পরিচয়েও নজরুলের সমস্ত পরিচয় প্রকাশিত হয় না; কেননা তিনি ওসবের পরও প্রেমের কবি, নিসর্গের কবি, বাঙালি জাতির কবি। আসলে নজরুলের ছিলো বিচিন্তক মানুষের ভিন্ন-ভিন্ন কক্ষ। তাঁর প্রতিভার তাবৎ বিচ্ছুরণ কবিতার কেন্দ্র থেকেই - কবিতার রশ্মি ও জল তাঁর সমস্ত শিল্পকাজে সঞ্চালিত ও প্রবাহিত। এতো বিচিত্র ক্ষেত্রে এতো সাবলীল স্বচ্ছলতা, আর তাও মাত্র সৃষ্টিশীল তেইশ বছরের (১৯১৯-১৯৪২) মধ্যে আজ একটি প্রাকৃতিক ঘটনা বলেই মনে হয়।