বুধবার, ২৬ আগস্ট, ২০১৫

ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র চলছে


সময়ের সাফ কথা....
ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র চলছে
সংলাপ ॥ বাংলার ইতিহাস, বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস-এর বিশদ বিবরণ আর লেখার প্রয়োজন নেই। আসল ইতিহাসের সত্যতা এখন এখন সবাই জানে। সুপরিকল্পিতভাবে এবং সুসংগঠিত হয়ে এক শ্রেণীর জাতীয় শত্রু এই ইতিহাসকে বিকৃত করে দেয়ার  ষড়যন্ত্রে আজও লিপ্ত। মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদেরকে সমাজে কলঙ্কিত করতেও আজও তারা বদ্ধ পরিকর। এক পৈশাচিক ও বর্বরতায় তারা উন্মাদ হয়ে উঠছে। এরা মানুষ নয়, এরা মানুষরূপী দু-পেয়ে জন্তু। এদেরকে দেশবাসী ধীরে ধীরে চিনতে পারছে। বাঙালিরা এদেরকে ঘৃণা করে মনেপ্রাণে। এদের নাম ঘৃণিত নাম। বিবেকবানদের  কলম দিয়ে, মুখ দিয়ে তাদের নাম উচ্চারণ করাও উচিত নয়। এমনকি বাংলা ভাষার অক্ষর দিয়ে এসব বিশ্বাসঘাতকদের নাম লিখে সমালোচনা করাও উচিত নয়। প্রবাদ আছে ‘যাকে ঘৃণা করো, তাকে মনে প্রাণে ঘৃণা করো’। কাগজে ফলাও করে ছবি ছাপিয়ে (হোক সে ছবি বিকৃত আকারের) বারবার পবিত্র কলমের কালি দিয়ে এদের নাম লিখে সমালোচনা করাও সঠিক কিনা তা বিবেকবানদের ভাববার বিষয়। তাই মনেপ্রাণে ঘৃণার সাথে সাথে বিবেকবানরা তাদেরকে কাগজে কলমে শুধু ঘৃণা করা নয় সব মুদ্রন ও বৈদ্যুতিন মাধ্যমে সার্বিক অঙ্গনে তাদের বয়কট করা উচিত বলে চিন্তাবিদরা দিক নির্দেশনা দিয়ে যাচ্ছে।
সম্প্রতি তারা বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটা জোটের একটা অংশ হিসেবে কাজ করছে। স্বাধীনতা উত্তর বিভিন্নভাবে কারো রাজনৈতিক অদূরদর্শিতার কারণে, কারো অবৈধভাবে জোগাড় করা ক্ষমতাকে সংগঠিত করার কারণে, কারো বা ক্ষমতারোহনের সহায়ক শক্তি হিসাবে সমর্থন আদায়ের কারণে আজ তারা সমাজ ও রাজনৈতিক অঙ্গনে চলা-ফেরা করার অধিকার পেয়েছে। ধর্মের লেবাস পরে ধর্মভীরু মানুষের মাঝে আজ তারা বিস্তৃত। তারা আজও এ দেশকে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ ও গণতন্ত্রকে মেনে নিতে পারেনি, পারেনি স্বাধীনতাকে মেনে নিতে। মুক্তিযোদ্ধাদের উপর নাখোশ ভাব আজও তারা তাদের চিনৱা থেকে অপসারণ করতে পারেনি। স্বাধীনতাকে নিয়ে, মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে আজও কটুক্তি করার দুঃসাহস দেখায় তারা।
অপরদিকে নির্লজ্জ দেশপ্রেমিক নামধারী রাজনীতিকরা কেউ মুক্তিযুদ্ধের কথা বলে, কেউ জাতির জনকের নাম ভাঙ্গিয়ে,  মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষ সেজে গলাবাজি করে সর্বদা দুর্নীতি-লুন্ঠনের কাজে নিজেদেরকে ব্যস্ত রেখে দিন কাটাচ্ছে ক্ষমতার জন্য। তারা কিভাবে দেশপ্রেমের মর্যাদা দেবে এবং কিভাবে জবান বন্ধ করবে ঘৃণিত সেই ধর্মের নামে রাজনৈতিক তথাকথিত ইসলামী দলের। ’৭১-এ এদের চরিত্র আর কার্যক্রম আজ কার কাছে অজানা নয়। ওইসব নরপশুদের বিচার করা হয়নি। বরং ওইসব নরপশুদের নাগরিকত্বসহ রাজনীতি করার অধিকারও ফিরিয়ে দেয়া হয়েছে। আজ তারা নিজেদেরকে নিরাপরাধ হিসেবে ঘোষণা দিচ্ছে। তাদের কথা, অপরাধই যদি আমরা করে থাকি তাহলে আমরা পুনঃরাজনীতির সুযোগ পাই কি করে এবং নাগরিকত্বই বা ফিরে পাই কি করে? এসব শুনে নতুন প্রজন্মরা হতবাক। সচেতন দেশপ্রেমিকগণ দিশেহারা। মুক্তিযোদ্ধারা লজ্জায় মুখ তুলে তাকাতে পারছে না। প্রশ্ন হলো আইনের ফাঁক গলিয়ে নাগরিকত্ব পেলেই কি এরা নিরাপরাধ এটা প্রমাণিত হয়ে যাবে? মানবিক আইন বা প্রত্যক্ষদর্শিতার কোনো মূল্য নেই!
সচেতন পাঠক ও নতুন প্রজন্ম ১৯৭১ সনের তৎকালীন পত্রিকার পাতাগুলোতে একটু চোখ বুলালেই দেখতে পাবেন আজকের নাগরিকত্ব ও রাজনৈতিক অধিকার ফেরত পাওয়া ওইসব দু-পেয়ে জন্তুর আসল চেহারা। সংরক্ষণশালাগুলোতে সংরক্ষিত এসব প্রামাণিক দলিল আজকে মুক্তিকামী নতুন প্রজন্মের জন্যই মারণাস্ত্র হাতিয়ার।
নাগরিকত্ব, রাজনৈতিক অধিকার আইনের মাধ্যমে ফিরে পেলেও এরা ভীরু কাপুরুষ। পিছন থেকে ছুরি চালিয়ে অন্ধকারে খুন করে। সামনাসামনি আসতে সাহস পায় না। সচেতনরা কোনোভাবেই এদের দল বা এদের সহযোগিতা করতে পারেন না। ’৭১ এর স্বাধীনতা বিরোধী তথাকথিত ধর্মীয় দলগুলোর নেতারা দেশ স্বাধীন হবার পর একবার জাতির উদ্দেশ্যে বক্তৃতা দিতো বা বলতো আমরা ভুল করেছি, আমরা জাতির নিকট ক্ষমাপ্রার্থী এবং আল্লাহ্‌র নিকট ক্ষমাপ্রার্থী অথবা আজও যখন তারা বিভিন্ন দলের সঙ্গে মিশে সমাবেশে বক্তব্য রাখছে এবং সেই সব সমাবেশে ’৭১ এর ভূমিকার জন্য লজ্জিত হয়ে হাতজোড় করে জাতির নিকট নিজেদের ভুলের জন্য ক্ষমা চাইতো তাহলে হয়তো জাতি আজ তাদের নিয়ে অন্যরকম চিন্তা-ভাবনা করার সুযোগ পেতো। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক যে আজও পর্যন্ত এদের নিকট থেকে জাতির কাছে এমন কোনো আহ্বান আসেনি। নির্লজ্জের মতো এই দেশের পতাকা উড়িয়ে গাড়ি চড়েছে। এরা যে ইসলাম পালন করে তার স্বরূপই এটা যা মুহম্মদী ইসলামের সঙ্গে কোন সম্পর্ক নেই।
আজও ’৭১ এর ন্যায় তারা ষড়যন্ত্রীর ভূমিকাই পালন করছে। প্রশ্নঃ কেন এদেরকে সমাজের প্রতিটি স্তর থেকে উৎখাত করা হচ্ছে না? কেন প্রয়োজনে আর একটি একাত্তরের পুনরুত্থান হচ্ছে না? কতটুকু স্পর্ধা থাকলে আজ তারা মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুর উপর কটাক্ষ করে বক্তব্য রাখতে পারে। এই স্পর্ধার ভিত্তি কোথায়? চিন্তাবিদ মহলের একটাই ধারণা তা হলো রাজনৈতিক দলগুলোর ‘ক্ষমতার লোভ’ তাদেরকে জিইয়ে রাখছে। একমাত্র ক্ষমতা লোভের কারণেই স্বাধীনতার শত্রু ও প্রথম শ্রেণীর রাজাকাররা ক্ষমতাকে সংহত করেছে। পরবর্তীতে এসব রাজাকারদের সমর্থন নিয়ে সরকার গঠন এবং বর্তমান চলমান অবস্থায় এদেরকে নিয়ে আসন ভাগাভাগি করে নির্বাচন করার পরিকল্পনা জাতিকে রাজনীতিকদের উপর বিতশ্রদ্ধ করে তুলছে। তাই রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পাশাপাশি সহাবস্থান করছে রাজাকার আর মুক্তিযোদ্ধা।
রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখলের জন্য, বাংলাদেশকে তথাকথিত রাজনৈতিক ইসলামের আওতায় আনার জন্য এবং তাদের কসাই চরিত্র প্রতিষ্ঠিত করার জন্য বাংলার মাটিতে, তারা ছলে-বলে-কৌশলে সার্বিক ষড়যন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছে। দিনে দিনে মুক্তিযুদ্ধের শত্রুরা সুদীর্ঘ পরিকল্পনার নীল নক্সা যে বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে তা ক্ষমতালোভী অন্য রাজনীতিকরা ক্ষমতার মোহে অন্ধ হয়ে থাকার কারণে দেখার সুযোগ পাচ্ছে না। নতুন প্রজন্মের কাছে  নিরীহ ধর্মভীরু জাতি একটাই আবেদন করছে সাময়িক ভোগ, ব্যক্তি স্বার্থ ও সম্পদ বৃদ্ধি করার জন্য বর্তমানে সময় ও পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে সংস্কারহীন সমাজ ব্যবস্থায় ও রাষ্ট্র পরিচালনা কাঠামোর মধ্য দিয়ে রাজনীতিকরা দেশটাকে যে জায়গায় নিয়ে যাচ্ছে সেখানে প্রতিবাদের ঝড় তুলতে হবে যাতে অগ্রসরমান নতুন প্রজন্ম একশ’ বছর পিছিয়ে পড়তে না পারে। দেশবাসীর কাছে আহ্বান, স্বাধীন সার্বভৌমত্বের জন্য যে দেশপ্রেমিকরা খুনীদের হাতে বুকের তাজা রক্ত এ মাটিতে ঢেলে দিয়েছে সেই খুনী গোষ্ঠীর সাথে সামিল হবেন না।

বাংলা এবং বাঙালির স্বপ্ন


বাংলা এবং বাঙালির স্বপ্ন
সংলাপ ॥ পৃথিবীর অন্যান্য জাতির মতো বাঙালি একটি জাতি। রয়েছে পাঁচ হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী ইতিহাস। সে ইতিহাস নিখুঁতভাবে আমরা আজও গবেষণা করে বের করতে পারিনি। তা সত্ত্বেও যে ইতিহাস আমরা পেয়েছি তাতে করে এই জাতির ভাষা, নৃতাত্ত্বিক পরিচয় এবং ভৌগলিক অবস্থান অনেক গৌরবময়। বহু জাতির সংমিশ্রণের ফলে বাঙালি জাতি একটি শংকর জাতিতে পরিণত হয়েছে যুগ এবং শতাব্দির ধাপে ধাপে। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় এই যে, অনেক জাতির সংমিশ্রণ হলেও এই জাতি নিজেদের বাঙালি অস্তিত্বকে বিলুপ্ত হতে দেয়নি। স্বাধীনতা ও পরাধীনতার অনেক উত্থান পতনের মধ্যে কোনো অর্থনৈতিক মুক্তিও আসেনি।
বাংলাদেশ, ত্রিপুরা, আসামের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল তথা মেঘালয়, উত্তরবঙ্গ এবং পশ্চিমবঙ্গ সহ বাঙালির ভৌগলিক পরিচয় নিয়ে এই জাতির আদিকাল থেকেই বসবাস। যে সমস্ত বাঙালি বিজ্ঞ রাজনীতিকরা বৃটিশ আমলে একটি স্বাধীন বৃহৎ বাংলা গঠনের স্বপ্ন দেখেছিলেন তারা বৃটিশ এবং তৎকালীন দিল্লী কেন্দ্রিক রাজনীতিকদের কাছ থেকে বিশেষ সুবিধা আদায় করতে পারেননি। এটা বাঙালির সবচেয়ে বড়  দৈনতা। তা না হলে এতদিনে হয়তো বাঙালিরা বিশ্বের বুকে তাদের শিক্ষা দীক্ষা ঐতিহ্য ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে অনেক দূর এগিয়ে যেত। ভারতস্থ আজকের পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, উত্তরবঙ্গ, মেঘালয় রাজ্যসমূহ নানা সমস্যায় জর্জরিত। মাথাপিছু আয় কিংবা বাংলা ভাষাভাষী এলাকার জাতীয় গড় আয়ের হিসাব কষলে যে সত্যটি বেরিয়ে আসে তা মোটেই সুখকর নয়। দারিদ্র্যের চরম কষাঘাত শতকরা ৭০টি পরিবারে। তৃতীয় বিশ্বের প্রায় সকল সরকার যেভাবে মাথাপিছু আয়, জাতীয় উৎপাদন কিংবা অন্যান্য অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির হিসাব কিংবা পরিসংখ্যানাদি নথিভূক্ত করে তা লোক ভুলানো ব্যাপার। এ হিসাব রাষ্ট্রীয় আত্মরক্ষার হিসাব। যে কোনো রাজ্যের কিংবা দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার, মুদ্রার অবমূল্যায়ন, বাজেট ঘাটতি, কর্পোরেশন ও বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠান সমূহ যখন প্রতিনিয়ত লোকসানের দায়ে মুখ থুবড়ে পড়ে তখন একজন সাধারণ মানুষও বুঝতে সক্ষম হয় দেশের অর্থনীতি কোন পর্যায়ে আছে।
মানুষের ক্রয়ক্ষমতা, চাকুরির সংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং যে কোনো শ্রমের মূল্যায়ণ থেকে অতি সহজেই অনুমান করা যায় একটি জাতির দারিদ্র্যতার মাপ কতটুকু। বর্তমান বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে উপরে উল্লিখিত বাংলা ভাষাভাষী অঞ্চল সমূহের যে বাস্তব চিত্র পাওয়া যায় তা থেকে নিঃসন্দেহে বলা যায় বাঙালি জাতি যে অন্ধকারে নিমজ্জিত ছিলো সেই অন্ধকারে আজও নিমজ্জিত। সব অঞ্চল সমূহের বাঙালিরা স্বদেশী বেনিয়াদের শোষণে জর্জরিত এবং পণ্যের ক্রেতা হিসেবে তারা লুটেরা ও কালোবাজারীদের পুঁজির যোগানদাতা। শুধু তাই নয়, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য চরমভাবে বিকৃত ইংলিশ ও বিদেশী সংস্কৃতির উগ্র থাবায়। কিছু সংখ্যক ধনী লোক কিংবা উন্নত পেশাজীবীদের উন্নয়ন, একটি জাতির উন্নয়নের কোনো মাপকাঠি নয়। ঝলমলে বিপনী বিতান, পাশ্চাত্যের অনুকরণে লেফাফা দুরস্ত টেলিভিশন প্রোগ্রাম আর  নাটকে ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানাদিতে অভিজাতদের ঘর-দুয়ার এবং বিলাসবহুল আসবাবপত্র সমূহ বারবার দেখানো উন্নয়নের কোনো পরিচয় নয়।
আজ বিশ্বের বাজারে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার মতো কাঁচামাল থেকে তৈরি পণ্যদ্রব্য, বৈদ্যুতিক, ইলেক্ট্রনিক, ডিজিটাল কিংবা কুটির শিল্পের উন্নত পণ্য সামগ্রী, হাল্কা কিংবা ভারী যন্ত্র ও যান্ত্রিক শিল্পদ্রব্য কিছুই বাঙালি জাতির আয়ত্বাধীন নয়। কৃষি, সরকারী চাকুরী ও দৈহিক পরিশ্রম ব্যতীত বাঙালির কোনো জাতীয় পুঁজি নেই। একটি মজবুত অর্থনৈতিক ভিত্তির উপর দাঁড় করাবার কোনো উপকরণ কিংবা পুঁজি কিছুই বাঙালির আয়ত্বে নেই। খাদ্য এবং শিক্ষাক্ষেত্রে যে জাতি স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারে না সে জাতি যতই বিত্ত-বৈভবের বড়াই করুক না কেন তার সে বড়াই ঠুনকো এবং বালির বাঁধের মতো তুচ্ছ। আমরা অতি নিকটবর্তী ইতিহাস আওড়ালে স্পষ্টই দেখতে পাবো ভারত রাষ্ট্র ভারতস্থ বাঙালি অঞ্চলসমূহকে বাজার কলোনী হিসেবেই দেখছে।
সুজলা সুফলা নদ-নদী প্রবাহিত বাংলা ভাষাভাষী অঞ্চল সমূহের উজানে কৃত্রিম বাঁধ নির্মাণের কারণে বাঙালি জাতির অস্তিত্বের সাথে জড়িত যে কৃষি ব্যবস্থা, সেই ব্যবস্থা এখন দাঁড়িয়ে আছে ধ্বংসের শেষ পর্যায়ে ভগ্নস্তুপের মতো। অদূর ভবিষ্যতে রাজনৈতিক গোলযোগ ও দারিদ্র্যতার মধ্য দিয়ে যাতে বাঙালির অস্তিত্বের বিলুপ্তি হয়ে যায় এটা তার একটা সুদূরপ্রসারী নীল নক্সা বলে চিন্তাবিদরা মনে করছেন। প্রতিটি নদী থেকে উৎপত্তি হয়েছে বহু উপনদী সমূহের। সেই উপনদী থেকে উৎপত্তি হয়েছে ছোট বড় অনেক ধরনের খাল এবং নালার। এভাবেই জালের মতো দেশের আনাচে কানাচে বিস্তৃতি লাভ করেছে বাঙালির কৃষি ও সেচ ব্যবস্থার এক প্রাকৃতিক পদ্ধতি। সেই পদ্ধতিকে তছনছ করে দিচ্ছে রাজনীতির জঘন্য কারসাজি। বিদ্যুৎ উৎপাদন আর সেচ ব্যবস্থার অজুহাতে আধিপত্যবাদীরা যেভাবে একের পর এক আগ্রাসনী ভূমিকা নিচ্ছে তাতে সহজেই অনুমেয় দেশের ভবিষ্যত কোন পথে।
গণতন্ত্রের দাবিদার ভারতের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের পর্যালোচনা টেনে আনলে দেখা যাবে ভারতে গণতন্ত্রের ভিতরে ওত পেতে বসে আছে একদল শক্তিশালী পুঁজিপতি, বুদ্ধিদাতা আমলা এবং ধর্মীয় উগ্রবাদী গোষ্ঠী। তাদের বাহ্যিক বেশভূষা অতি সাধারণ। তারাই ভারত সরকারের গণতন্ত্রের হর্তাকর্তা। তারা কোটি কোটি ভারতীয় নাগরিকের শিক্ষা, চিকিৎসা ও চরম দারিদ্র্যতাকে উপেক্ষা করে সুপার পাওয়ার হওয়ার কামনায় দিনরাত রঙিন স্বপ্ন দেখছে। ভারতে দু’এক জাতির বসবাস নয়। ডজন ডজন জাতির বসবাস। নদীতে বাঁধ মানেই বাঙালি জাতির মুন্ডুপাত, একটি নীরব সর্বনাশী আগ্রাসন। বাঙালির জীবনে নদী নেই, পানি নেই এটা বিশ্বাস করতে চরম কষ্ট হয়। হাজার হাজার বৎসরের ইতিহাসকে ভেঙ্গে চূর্ণ বিচূর্ণ করে দিলেও বাঙালি জীবনের সাথে নদীর সম্পর্ককে বিচ্ছিন্ন করে দেখা যায় না। এটা একটা প্রাকৃতিক বন্ধন। পলিবাহিত খরস্রোতা নদী দু’কূল ভেঙ্গে নিয়ে মানুষের জীবনকে বার বার নতুন সাজে সাজালেও বাঙালিরা এই নদীকে ভালোবাসে সবচেয়ে বেশি। এক অবিশ্বাস্য মায়ার বন্ধনে এই নদনদী সকলের নাড়ির সাথে মিশে আছে। সুতরাং নদীকে সচল ও উজ্জ্বীবিত রাখার দায়-দায়িত্ব সমস্ত বাঙালি জাতির। নদী-বিহীন বাঙালি জীবন মানেই হচ্ছে বাঙালির অস্তিত্বের সংকট। ফারাক্কা বাঁধের নির্মমতায় বাংলাদেশের যে ক্ষতি হয়েছে তা সকলের জানা। আগামীতে টিপাইমুখ সহ বিভিন্ন নদীর পানি ও বাঁধ নিয়ে ভারতের যে আগ্রাসনী মনোভাব রয়েছে তাতে করে বাঙালি জাতি চিরতরে খাদ্য এবং অর্থনৈতিক ভাবে পঙ্গু হয়ে যাবে এতে কোনো সন্দেহ নেই। আজ বাংলা ভাষাভাষী অঞ্চলের প্রায় তিন শতাধিক  উল্লেখযোগ্য নদী ও উপনদীর অস্তিত্ব শেষ হতে চলেছে। বর্ষা মৌসুমে নদীগুলো শুধু তাদের চিহ্ন বুকে ধারণ করে বেঁচে আছে।
প্রায় চার যুগ ধরে নদীর তীরে তীরে ভারত বিভিন্ন কর্পোরেশনকে লাইসেন্স দিয়েছে কেমিক্যাল জাতীয় কারখানা তৈরির। সেই কারখানাসমূহ থেকে বিষাক্ত বর্জ্য ও তরল পদার্থ নদীর পানিতে মিশে গিয়ে এক চরম দুর্গতির সৃষ্টি হয়েছে বাঙালির জীবনে। নদীর পানি এখন আর সুপেয় নয়। নদীর মাছে আজ স্বাদ নেই, নেই মাছের বংশবিস্তারের কোনো সুযোগ। সেই নদীর পানি যেসকল তৃণ শস্যাদি শুষে নেয় তাতেও রয়েছে কেমিক্যালের প্রভাব। এভাবে এক নীরব নিঃশব্দ এবং লক্ষণহীন ক্ষয়রোগের শিকারে পরিণত হয়েছে বাঙালির জীবন এবং তার কৃষি। অপরদিকে বিদেশ থেকে আমদানীকৃত কীটনাশক ঔষধ এবং সারসমূহ অপরিকল্পিতভাবে ব্যবহারের ফলে তা মাটিতে মিশে গিয়ে বৃষ্টি জলের সাথে ভূগর্ভের নিচে চলে যাওয়াতে ভূগর্ভের পানি দূষিত হচ্ছে। ভূগর্ভের নিচে, মাটির স্তরে স্তরে ভেজা ভেজা নমুনায় আটকে থাকে যে পানি সেই পানির যোগানদার হচ্ছে নদীর প্রবাহ, আদ্র জলবায়ু এব বৃষ্টি। একটি এলাকায় যখন নদী, উপনদী, খাল, নালা ইত্যাদিতে জলের ধারণ ক্ষমতা কিংবা জলের প্রবাহ কমে যায় তখন ভূগর্ভের পানিও কমে যেতে বাধ্য। এমতাবস্থায় সহজেই পানির স্তরে ঘাটতি শুরু হয়। যার ফলশ্রুতিতে পানি আরো অধিক নিচে নেমে যায়।
ঢাকার ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ৪৬ মিটার নিচে নেমে গেছে। এটা অতি স্বাভাবিক ব্যাপার যে পানি নিচে নেমে যাবার প্রাক্কালে মাটির  স্তরের বিভিন্ন কেমিক্যাল জাতীয় পদার্থ দ্রবীভূত হয়ে তা পানির সাথে থিতিয়ে পড়ে। সেই ভূগর্ভের পানি চাপকলের সাহায্যে উপরে উঠিয়ে পান করা হচ্ছে এবং দৈনন্দিন জীবনে এর বহুল ব্যবহারও হচ্ছে। যার ফলশ্রুতিতে বাঙালি জাতি আজ আর্সেনিক নামে এক ভয়াবহ রোগে আক্রান্ত। ভারতের নদীতে বাঁধ দিয়ে জলের প্রাকৃতিক গতিকে রোধ করার কারণে বাংলাদেশকে বহু অদৃশ্য দুর্যোগ মোকাবেলা করতে হচ্ছে। বিভিন্ন নদীর উৎসমুখে ভারত সরকার বিবেকহীন ভাবে যে সমস্ত বাঁধ দিয়ে চলেছে তা বাঙালি জাতিকে গলাটিপে হত্যা করার মতোই এক ভয়ঙ্কর অপরাধ। নদীর স্রোতের প্রবাহ ঠিক না থাকার কারণে নদীর তলদেশে পলিমাটি জমে তা ভরাট হয়ে গেছে। এজন্য বর্ষা মৌসুমে এই পানি দ্রুত সাগরে পতিত হতে পারে না। যার ফলে প্রতি বৎসর বাংলাদেশ সহ বাংলা ভাষাভাষী অঞ্চলে ভয়াবহ বন্যা হচ্ছে। নদীর পানিতে লবণ নেই, তাই সাগরের নোনা জল নদীর জলের স্থান দখল করে নিচ্ছে যার ফলশ্রুতিতে সুন্দরবন সহ উপকূলীয় এলাকায় গাছপালা, মাছ এবং পশুপাখীদের জীবন আজ অকাল-মৃত্যুর দাপটে বিলীন। এভাবে চারিদিকে বাঙালি জাতির জন্য সৃষ্টি হয়েছে এক চরম বিপর্যয়। সময়ের ধাপে ধাপে মানবসৃষ্ট প্রাকৃতিক দুর্যোগে, অভাব অনটনে বাঙালিরা বিপর্যস্ত। অদূর ভবিষ্যতে যারা বেঁচে থাকবে তারা হবে মেধাহীন, শিক্ষাহীন, পঙ্গু, অলস, দুর্বল, জ্বরাজীর্ণ, শীর্ণ কায়া এবং বিশ্বের কাছে অবহেলিত ও চির লাঞ্ছিত। বাঙালি জাতির ইতিহাসে অনেক জ্ঞানী গুণী খ্যাতিমান দার্শনিক ও বিজ্ঞানীদের জন্ম হয়েছে। সমাজ এবং বিশ্ব তাদের দ্বারা অনেক উপকৃত হয়েছে সন্দেহ নেই। জ্ঞান, শিক্ষা ও অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতায় এই জাতিকে এগিয়ে নিয়ে যাবার মতো আজও কেউ কোনো বাস্তবসম্মত ফর্মূলা আবিষ্কার করতে পারেনি। প্রচুর প্রাকৃতিক সম্পদ এবং জনশক্তি থাকা সত্ত্বেও বাঙালিরা আজ শুধুই অবহেলিত শ্রমিক। রাজনৈতিক ভাবে বাঙালিরা সরকারের দিকে অসহায়ের মতো তাকিয়ে আছে মুক্তির জন্য। অভাবের তাড়নায় কে কত সহ্য করতে পারে এই যেন তাদের প্রতিযোগিতা। বাংলাদেশের বাঙালিরা কিছু সংখ্যক ধর্ম ব্যবসায়ী, অস্ত্র ব্যবসায়ী, চোরা কারবারী, খুনী লুটেরা ও তাদেরকে সহায়তা দানকারী সৈন্য ও পুলিশ বাহিনীর কাছে জিম্মি এবং চরমভাবে পর্যুদস্ত। অভাবের তাড়নায় কে কত বড় মিথ্যুক, ছিনতাইকারী ও সন্ত্রাসী হতে পারে এরই চলছে প্রতিযোগিতা। ঠান্ডা এবং স্থির মস্তিষ্কে চলছে মেধার নিধন।  চলছে অবাধ সম্পদ পাচার এবং নিজ সন্তানদের নিরাপদ স্থান হিসেবে বিদেশে পাঠিয়ে দেয়ার হিড়িক। আজকে সারা বিশ্বে বাঙালি জাতির পরিচয় খরা এবং দুর্ভিক্ষ পীড়িত একটি জাতি হিসাবে। খুনী, লুটেরা এবং দুর্নীতিতে বারবার অভিশপ্ত বাংলাদেশ প্রবল জনসংখ্যার চাপ, ভবিষ্যতে পানিবিহীন শহর হওয়ার আশঙ্কা এবং বস্তি, আর্সেনিকের দাপট, খরা ও বন্যার ছোবল, বনজ সম্পদ উজাড় এবং অগণিত মানুষের সৃষ্ট আবর্জনায় জর্জরিত। ন্যায়বিচার বঞ্চিত সমাজ, দুর্নীতি এবং অনিয়মের বেড়ি পরা বাঙালি জাতিকে কে বাঁচাবে? কে রক্ষা করবে বাঙালি জাতির অস্তিত্ব?
জাতিকে ভাবতে হবে সে কোন জাতি? তার ভাষা ও অতীত ইতিহাস কি? তার ভৌগলিক সীমারেখা কতটুকু? আজ বাঙালি জাতিকে একটি শক্তিশালী জাতি হিসেবে গড়ে তোলার ইস্পাত কঠিন শপথ নিতে হবে বর্তমান সরকারকে। ষড়যন্ত্র চলছে বাংলা ভাষাভাষী বাঙালির মধ্যে সবসময় একটা হানাহানি ও শত্রুতা যাতে লেগে থাকে। বাংলাদেশের বাজারে মাঝে মধ্যে ছাড়া হয় নকল টাকার নোট।
আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় আমরা ভারতের কাছে যতটুকু ঋণী তারচেয়ে শতগুণে বেশি ঋণী আমাদের প্রতিবেশী বাঙালিদের কাছে। বাঙালি হিসেবে আমরা বাঙালির কাছে আশ্রয় পেয়েছি। সেদিন প্রশ্ন ছিলো না আমরা মুসলমান না হিন্দু। আমরা সে সময় অনুভব করেছি বৃটিশপূর্ব বাঙালি। আমরা ছিলাম এক মাতৃভূমির সনৱান, এক ভাষার সন্তান। বৃটিশ আমাদের বিভক্ত করে দিয়ে গেছে বাঙালি জাতিকে চিরকাল দুর্বল ও পঙ্গু করে রাখার উদ্দেশ্যে। মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রায় সত্তর লক্ষ শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছে প্রতিবেশী বাঙালি। অস্ত্র, খাদ্য, ট্রেনিং তাদেরই বদৌলতে হয়েছে। যদিও পরবর্তীতে প্রচুর বৈদেশিক সাহায্য ভারতের হাত দিয়ে এসেছে। বাঙালির জন্য বাঙালির দরদ ছিলো, স্নেহ এবং সহানুভূতি ছিলো, যার ফলে বাংলাদেশ স্বাধীন হবার সুযোগ হয়েছিলো তাড়াতাড়ি। কিন্তু আজ বাঙালির সেই জাতীয়তাবোধ ও মমত্ববোধ কোথায় গেলো? আজ এই সত্য হারিয়ে গেছে কুচক্রী বাংলাদেশ ও ভারতের একটি বিশেষ গোষ্ঠীর হাতে। তারা ধর্মের নামে রাজনীতির মুখোশ পরে বাঙালি জাতিকে চিরতরে পঙ্গু ও নিঃস্ব করার পায়তারা করছে। বাঙালিদের মধ্যে হিন্দু এবং মুসলমান এই দুই জাতির ধর্মীয় পার্থক্য দেখিয়ে সবসময় নানাবিধ অপপ্রচার চালাচ্ছে। তারা চায় না বাঙালিরা একতাবদ্ধ হোক। অপপ্রচারকারীরা তলে তলে ভারতের সাথে অবাধ গুপ্ত বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে। বড় বড় ব্যবসা ছাড়াও চাল ডাল থেকে শুরু করে যন্ত্রপাতি কাপড় চিনি ইত্যাদির ব্যবসা গোপনে করে যাচ্ছে আর বাংলাদেশের তৈরি পণ্যদ্রব্য অবিক্রিত অবস্থায় নষ্ট হচ্ছে। বাঙালি বিরোধী ধর্মীয় মুখোশ পরা দ্বিচারীরা ভারতের গরু দিয়ে ঈদের উৎসব পালন করে আর হোটেল রেষ্টুরেন্টে গোমাংশের চালান দেয়। এভাবেই জনগণকে ধোঁকা দিয়ে রাজনীতি করে তথাকথিত ইসলামপন্থীরা।
দেশবাসী চায় নতুন যুবশক্তি আর দীর্ঘদিন থেকে যারা সততা, ন্যায়বিচার ও গণতন্ত্রের অভিজ্ঞতা দেখেছে তাদের প্রত্যক্ষ সহযোগিতা। আজ বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও জনগণের সম্পদ আত্মসাৎ করে যারা স্বঘোষিত বুদ্ধিজীবী শ্রেণীতে উন্নীত হয়েছে তারা তাদের এলাকায় কোটি কোটি টাকা খরচ করে কিছুটা উন্নয়ন ঘটায় তবে সেই এলাকার জনগণ সেই লোকটিকে অবশ্যই বারবার ভোট দেবে। কিন্তু তা হচ্ছে না। সে টাকার বিনিময়ে সন্ত্রাসী লালন করছে এবং প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য বোমাবাজ ও সন্ত্রাসী লেলিয়ে দিচ্ছে। এখন সম্পদ এবং ক্ষমতা - দুটোই সকল অপরাধের জন্য দায়ী। জনগণ শুধু চেয়ে চেয়ে এসব দেখছে। এসবের বিরুদ্ধে প্রতিকার ও প্রতিবাদ করার কোনো বিশ্বস্ত রাজনৈতিক দল নেই। নেই আত্মরক্ষার কোনো হাতিয়ার। পুলিশ এসবের বিরুদ্ধে কিছুই করতে পারছে না। তাদের মধ্যে এক শ্রেণী পর্দার অন্তরালে  লুটপাট সম্পদের ভাগীদার হচ্ছে। বখরা এবং চাঁদা আদায়ের জন্য প্রকাশ্য এবং নেপথ্য উভয় রাসৱাই তারা অনুসরণ করছে বলে জনগণের মধ্যে অবিশ্বাসের দানা বেঁধে উঠছে। আজকের বাঙালি জাতিকে বাঁচতে হলে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে একটি সত্য সুন্দর সমৃদ্ধশালী দেশ উপহার দিতে হলে জাতির ঐক্য এবং নতুন প্রজন্মের এগিয়ে আসা ছাড়া কোনো বিকল্প রাজনীতি নেই। বাঙালি জাতির অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখতে হলে এবং বহুমুখী শোষণের নাগপাশ থেকে বাঁচতে হলে বাঙালিকে অবশ্যই বিভিন্ন অঙ্গনে সংস্কার এবং কৌশলগত সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে।
বাঙালি জাতিকে সঠিকভাবে কিছু করতে হলে ধর্মীয় দ্বিজাতি তত্ত্বকে ভুলতে হবে। ভুলতে হবে সাম্প্রদায়িক রাজনীতিকে। অগ্রসর হতে হবে বাঙালি জাতীয়তাবাদের উপর ভিত্তি করে। কোন দলকে রাজনীতির নেতৃত্বে যাবার আগে ভবিষ্যৎ লক্ষ্য ও পরিকল্পনাকে একটি দায়বদ্ধতার কাঠামোতে আনতে হবে। থাকতে হবে একটি দিক নির্দেশনা ও লক্ষ্য পূরণের পূর্ণাঙ্গ ও প্রকাশ্য দলিল এবং দৃঢ় প্রত্যয় সত্যের পথে পথচলার জন্য। অতএব দেশকে  উত্তরণের জন্য দ্রুত পথ চলতে (১) বাঙালি জাতীয়তা (২) মানবতা (৩) নিজ নিজ ধর্মীয় স্বাধীনতা (৪) গডফাদারহীন গণতন্ত্র এবং (৫) প্রশাসন বিকেন্দ্রীকরণকে রাষ্ট্রের আদর্শ হিসেবে মূল্যায়ন করতে হবে সর্বাগ্রে।

বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট, ২০১৫

সত্য দিয়ে মিথ্যা প্রতিহত করার সময় এসেছে

সত্য দিয়ে মিথ্যা প্রতিহত করার সময় এসেছে

ড. আলাউদ্দিন আলন ॥ সময় এসেছে রাষ্ট্রধর্মের সংজ্ঞা, ধর্মীয় অনুভূতির সংজ্ঞা, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের সংজ্ঞা সর্বোপরি ইসলাম (শান্তি) এর সংজ্ঞা নির্ধারণ করার। আজকাল সমাজের সর্বস্তরে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় ধর্মীয় অনুভূতি। চারিদিকে তুমুল বাক-বিতণ্ডা চলছে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত বিষয়ক ঘটনা নিয়ে। সমাজে শান্তির জায়গায় অশান্তি এবং সত্যের জায়গায় মিথ্যা ছড়িয়ে পড়ছে রাজনীতিকদের দ্বিচারিতার জন্য। 
বাংলাদেশ নিয়ে কোন ভাবনা যেন নেই বাঙালির! রাজনীতিকদের দ্বিচারিতা ও বিকৃতি প্রকাশে ধর্মভীরু বাঙালি আজ ব্যস্ত ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত নিয়ে। পাকিস্তানি কায়দায়, আফগানিস্তানি কায়দায় বাঙালি আজ ধর্মীয় অনুভূতির জ্বরে পাগল প্রায়। ধর্মীয় অনুভূতির জ্বরে পাগল হবার আগে একটি বারের জন্যও চিন্তা করে দেখছে না অনুভূতি কি? বাংলাদেশে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের বিষয়টি সংক্রামকের রূপ ধরে সমাজে ছড়াচ্ছে। বিষয়টি তলিয়ে দেখলে দেখা যাবে এর মূলে রয়েছে খোদ বাংলাদেশের রাজনীতিকরা। যে সাংবিধানিক ধর্ম নিরপেক্ষতা নিয়ে এই দেশ স্বাধীন হয়েছে সেই ধর্ম নিরপেক্ষতা রাজনীতিকদের অদূরদর্শীতা, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতালোভ এবং মুহাম্মদী ইসলাম সম্বন্ধে অজ্ঞতা ধীরে ধীরে চল্লিশ বছরে বাঙালি ধর্মভীরু মুসলমানদেরকে ধর্মান্ধতার বেড়াজালে আবদ্ধ করে দেশকে সাম্প্রদায়িক দেশে পরিণত করছে। এর মধ্য দিয়ে স্বাধীনতার পর হতে যত সরকার এসেছে তারা একদিকে যেমন ধর্ম নিরপেক্ষতা বজায় রাখেনি, অপরদিকে সাম্প্রদায়িক হানাহানি, বিভেদ ও অপরের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করার পথও সুগম করে দিয়েছে।
ইসলাম (শান্তি) ধর্মকে রাষ্ট্রধর্ম করার মাধ্যমে কাগজে-কলমে ইসলাম ধর্মের অনুসারিদের বেশি প্রাধান্য দেয়া হলেও রাষ্ট্রের প্রতি স্তরে সমাজের মধ্যে শান্তি (ইসলাম) প্রতিষ্ঠিত হয়নি এবং আজ পর্যন্ত কোন যুগোপযোগী কার্যক্রমও গ্রহণ করা হয়নি। ধর্মীয় অঙ্গনে সত্য-মিথ্যা যাচাই করতে গিয়ে ধর্মভীরু জাতি বিভ্রান্তির বেড়াজালে আবদ্ধ হয়ে পড়ছে।  তাই সমাজের প্রতি স্তরে একটি প্রশ্ন বাঙালি জাতির উর্দ্ধারণের সময়কে নষ্ট করছে আর তা হল - ধর্ম কি মানবজাতির জন্য পালনীয় বিষয় নাকি ধারণ ও লালন করার বিষয়? একজন বাঙালি ধর্মভীরু মুসলমানকে যখন প্রশ্ন করা হয় আপনার ধর্ম কি? সে মুসলমান জবাব দেন আমার ধর্ম ইসলাম। কোন্‌ ইসলাম-সৌদী ইসলাম, ওহাবী ইসলাম, পার্সিয়ান ইসলাম, পাকিস্তানী ইসলাম না মুহাম্মদী ইসলাম-এ প্রশ্ন করা হলে সেই ধর্মভীরু মুসলমান বিভ্রান্তিতে পড়ে যেহেতু রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম করা হলেও বাঙালি জাতির জন্য কোন দিক-নির্দেশনামূলক কার্যক্রম কোন সরকারের ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয় হতে নেয়া এবং দেয়া হয়নি। গড্ডালিকা প্রবাহে চলছে ধর্মমন্ত্রণালয়, চলছে এদেশের ধর্মভীরু মুসলমান! আর তাই ধর্মীয় তথা রাষ্ট্রীয় অঙ্গনে ক্ষমতালোভী ধর্মান্ধদের আধিপত্যবাদ বেড়েই চলেছে।
তাহলে বাংলাদেশের ধর্ম কেমন করে ইসলাম হল? বাংলাদেশ কেমন করে মুসলমান হল? বাংলাদেশ কেমন করে নবী মুহাম্মদ (স) এঁর ইসলাম (শান্তি) ধর্মে সমর্পণ করলো? তাহলে কি বাংলাদেশের কোন ধর্ম নেই? বাংলাদেশ কি ধর্মহীন? না, জবাব আসে বাংলার মাটি-বাংলার জল-বাংলার বাতাস ভর করে জবাব আসে বাংলাদেশ ধর্মহীন নয়। বাংলাদেশেরও ধর্ম আছে। বাংলাদেশের ধর্ম সুন্দরভাবে লিপিবদ্ধ আছে। আর তা হল বাংলাদেশের সংবিধান। কিন্তু রাষ্ট্রীয় ক্ষমতালোভী বকধার্মিকগণ সংবিধানে ইসলাম ও বিসমিল্লাহ্‌ শব্দ যোগ করে বাংলাদেশের ধর্মকে বিপথগামী করে দিয়েছে। বাংলাদেশের সকল মানুষের সমান অধিকারকে নষ্ট করা হয়েছে। ধর্ম বিশ্বাসের জায়গায় জাতিকে দিকভ্রান্ত ও বিভ্রান্ত করা হয়েছে এবং হচ্ছে। যার ফলশ্রুতিতে ‘ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত’ নামক কথাটি সমাজের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে এবং ধর্মান্ধরা চালাচ্ছে হত্যাযজ্ঞ। রাষ্ট্রে বসবাসরত সকল নাগরিকের রাষ্ট্রধর্ম আমাদের সংবিধান। ধর্মীয় জীবন হলো ব্যক্তির যার যা পালন করতে ভাল লাগে তা তার পালন করার স্বাধীনতা। সরকার তার সাংবিধানিক ধর্ম অর্থাৎ সংবিধানের আইন কানুন সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করুক এবং রাষ্ট্রের সকল নাগরিক তা পরিপূর্ণভাবে লালন-পালন করুক তাহলে রাষ্ট্রের ধর্ম প্রতিষ্ঠিত হওয়ার রূপ ধারণ করবে। রাষ্ট্রীয় ধর্ম সকলের এক। কোন ভিন্নতা এতে নেই। যে কেউ এ ধর্ম প্রতিপালনে ব্যর্থ হবে সে রাষ্ট্রধর্মের আইন অনুযায়ী শাস্তি পাবে। রাষ্ট্রের কিংবা রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় কোন সরকারের ক্ষমতা নেই ধর্ম পালনে কাউকে বাধ্য করার। এটা প্রত্যেক মানুষের স্বাধীনতা এবং অধিকার।

জাতীয় জীবনের এই ক্রান্তিলগ্নে শেখ হাসিনার সরকারই কেবল পারে ধর্মীয় অঙ্গনে সত্য প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম (শান্তি) বাস্তবায়ন করতে, তাহলেই বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা নির্মাণের ভিত মজবুত হবে।

সময়ের সাফ কথা.... আল্লাহ্‌ সাবধানীদের সাথে থাকেন!

সময়ের সাফ কথা....
আল্লাহ্‌ সাবধানীদের সাথে থাকেন!

সংলাপ ॥ ‘ষড়যন্ত্র-চক্রান্তের অজগর গিলে খেতে চায় এই দেশকে, দেশের সম্পদকে, আর তার জন্য প্রয়োজনপটভূমি। প্রয়োজন অকার্যকর জাতীয় সংসদ, প্রয়োজন রাজনীতি আর রাজনীতিকদের বিবস্ত্রকরণ, প্রয়োজন রাজনৈতিক সংঘাত, উত্তরোত্তর দলীয় হানাহানির আতংক জাগানো বিস্তৃতি। সর্বোপরি প্রয়োজন রাজনীতিক এবং রাজনীতির গণধীকৃতকরণ এবং সম্পূর্ণভাবে গণবিচ্ছিন্নকরণ।
বিএনপি নেত্রী বেগম জিয়া ইতোমধ্যে ঘোষণা করেছেন- ‘মেয়াদ পূরনের আগেই সরকারকে বিদায় নিতে হবে’। সবকিছু মিলিয়ে মানুষের মধ্যে আশংকার দানা বাঁধছে ক্রমশই। নবাব সিরাজউদ্দৌলা নাটকের সেই বিখ্যাত সংলাপের মতই যেন বলা যায় - ‘বাংলার ভাগ্যাকাশে আজ চক্রান্তের ঘনঘটা’! চক্রান্ত-ষড়যন্ত্র এদেশে নতুন নয়। বাঙালির ভাগ্যকে নিয়ে, বাংলার সম্পদকে নিয়ে দেশী-বিদেশী চক্রান্তের বয়স শতক শতক। চক্রান্ত-ষড়যন্ত্রের বিষবৃক্ষের জন্য এদেশের জমিন বড়ই উর্বর। স্বাধীনতা তথা স্বাধীতার স্বপক্ষের শক্তি তথা স্বাধীনতার স্বপক্ষের প্রধান নেতৃত্ব আওয়ামীলীগও চক্রান্তের শিকার হয়েছে অতীতে বারবার, সে ক্ষমতায় থাকুক, আর ক্ষমতার বাইরেই থাকুক। প্রশ্ন হচ্ছে সরকার তথা আওয়ামীলীগের নেতৃত্ব কি এ চক্রান্ত-ষড়যন্ত্র সম্পর্কে সচেতন? সাবধানী? কেন ঘটনা ঘটে যাওয়ার পরে ত্বড়িৎ পদক্ষেপ গ্রহণে ব্যতিব্যস্ততা দেখা যায় সংশ্লিষ্টদের? কেন ঘটনা ঘটার পূর্বেই প্রশাসন ষড়যন্ত্র চক্রান্তকে নিষ্ফল করে তোলায় সক্রিয় থাকে না? কেন ষড়যন্ত্র চক্রান্তকারীদের নিস্ক্রিয় করা যায় না চক্রান্তের জাল গুটানোর আগেই?

এ সরকার ক্ষমতায় আসার সঙ্গে সঙ্গে দেশের ইতিহাসে ভয়ংকরতম হত্যাযজ্ঞ। অকালে প্রাণ হারাতে হয় কয়েক হাজার বাঙালিকে। জবাবদিহিতা ও বিভাগীয়  শাস্তির কাঠগোড়ায় দাঁড় করানো হয়েছে কি’না গোয়েন্দা প্রধানসহ দায়িত্বপ্রাপ্ত গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের তা জানা নেই দেশবাসীর। বিশেষ করে পঁচাত্তর পরবর্তী গত চৌত্রিশ বছরে ক্ষমতায় থাকা স্বাধীনতা বিরোধী কিংবা স্বাধীনতা বিরোধীদের সমর্থনপুষ্ট, তাদের লালন পালন ও রক্ষাকারী সরকারসমূহ গোয়েন্দা সংস্থাগুলোতে যে লোকবলের সমাবেশ ঘটিয়েছে সেখানে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণকারীদের সংখ্যা কত তা নিশ্চয়ই গুরুত্বপূর্ণ ভাবনার বিষয়। স্বাধীনতা বিরোধী দেশের বিরুদ্ধে চক্রান্ত-ষড়যন্ত্রকারী অপশক্তিসমূহ দেশের গোয়েন্দা সংস্থা প্রশাসনযন্ত্রের স্পর্শকাতর বিভাগ এবং সরকারের সর্বস্তরের নীতি নির্ধারক পর্যায়ে কতটুকু, কতদূর পর্যন্ত শেকড় বিস্তৃত করে বসে আছে তাও নিশ্চয়ই খুঁজে দেখা জরুরি। প্রবাদে আছে - ‘সাবধানের মার নেই’। কুরআনে আছে - ‘আল্লাহ্‌ সাবধানীদের সাথে আছেন’। 

সময়ের তাগিদঃ রাজাকারদের তালিকা

সময়ের তাগিদঃ রাজাকারদের তালিকা

সংলাপ ॥ মুক্তিযোদ্ধাদের আবারো তালিকা করছে সরকার। যার দ্বারা নির্ণীত হবে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রকৃত সংখ্যা এবং চিহ্নিত হবে কারা প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা! স্বাধীনতা উত্তর গত প্রায় ৪৪ বছরে ক্ষমতায় এসে বিভিন্ন সরকার এই মুক্তিযোদ্ধা তালিকা প্রস্তুতের কাজটি করে আসছে সরকারের একটি ‘রুটিন ওয়ার্ক’ হিসেবে! মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামীলীগ ইতোপূর্বে ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় এসে একবার মুক্তিযোদ্ধা তালিকা প্রস্তুত করেছিল। এবার আবারো একই উদ্যোগ চলছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা করাটা কি জরুরি? অস্ত্র হাতে যারা জীবন দিয়েছিল বা লড়াই করেছিল রণাঙ্গনে, তারাই কি কেবল মুক্তিযোদ্ধা? যুদ্ধটা কি কেবল ২৫ মার্চ রাত থেকে ১৬ ডিসেম্বর বিজয় পর্যন্ত সীমাবদ্ধ ছিল?
১৯৭১ সালে ৩ মার্চ জাতীয় সংসদ আহ্বান করে তা স্থগিত ঘোষণার পর থেকে সারা বাংলাদেশে যে আগুন জ্বলে উঠেছিল ধারাবাহিকভাবে, তা অসহযোগ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছিল গোটা দেশে এবং এরই পরিণতিতে সারা দেশে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর গুলিতে ২৫ মার্চের পূর্ব পর্যন্ত যারা জীবন দিয়েছিল তারা কি মুক্তিযোদ্ধা নয়? নৌকায় ভোট দেয়ার অপরাধে পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠীর ভাষায় ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী শেখ মুজিবকে’ ভোটে জয়যুক্ত করার অপরাধে যে সাধারণ বাঙালিদেরকে নির্বিচারে হত্যা করা হয়েছিল তারা কি মুক্তিযোদ্ধা নয়?
জীবনের ঝুকি নিয়ে যারা মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দিয়েছিল, খাদ্য যুগিয়ে ছিল নিজেদের জীবন বিপন্ন করে কিংবা পাক সেনাদের গতিবিধির সংবাদ পৌঁছে দিয়েছিল মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে, এমনকি এ অপরাধে যাদের বাড়িঘর ভষ্মিভূত হয়েছিল, জীবন দিতে হয়েছিল নিরস্ত্রভাবে, তারা কি মুক্তিযোদ্ধা নয়? আসলে মুষ্ঠিমেয় রাজাকার, আলবদর, আলসামস্‌ ও শান্তি বাহিনীর সদস্য তথা স্বাধীনতা বিরোধী জামাত ইসলামি, মুসলিম লীগ নেজামী ইসলামির মতো গণবিরোধী দলগুলো ছাড়া বাকি তখনকার প্রায় সাড়ে সাত কোটি বাঙালিই ছিল মুক্তিযোদ্ধা। তাহলে কেন এই উদ্যোগ? এ উদ্যোগ তো কেবল মুক্তিযোদ্ধাদের বিতর্কিত করে বিচ্ছিন্ন একটি ক্ষুদ্র সংখ্যালঘু গোষ্ঠীতেই পরিণত করে।
দেখা যায়, ’৭৫ পূর্ব আওয়ামী লীগ সরকারের সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকরা যেখানে যুদ্ধের পরে মুক্তিযোদ্ধার সনদ বিতরণ করেন ৩৩ লাখের মতো সেখানে অভিযোগ আসে এর ৩০ লাখই নাকি ছিল ভুয়া। ৫ই ফেব্রুয়ারি ১৯৯২ সালে আয়োজিত এক সাংবাদিক সম্মেলনে তৎকালীন মুক্তিযোদ্ধা সংসদের নেতৃত্ব এ অভিযোগ করেন। এ অভিযোগের প্রতিধ্বনি পাওয়া যায় মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সেক্টর কমান্ডার কাজী নুরুজ্জামানের এক লেখায়। এতে তিনি প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা সোয়া দুই লক্ষের উপরে হতে পারে না বলে উল্লেখ করেন। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সরকারের করা মুক্তিযোদ্ধার তালিকা থেকেও দেখা যায় মুক্তিযোদ্ধার পরিসংখ্যানে চরম বিভ্রান্তি। বিগত আওয়ামীলীগ সরকারের সময় প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী হিসেবে লেঃ জেঃ (অব:) নুরুদ্দীন জাতীয় সংসদকে জানিয়েছিলেন দেশে যাচাইকৃত ও তালিকাভুক্ত মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা ১ লাখ ১৮ হাজার ৫ জন। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতীয় সংসদে মুক্তিযোদ্ধাদের যে পরিসংখ্যান দেন তাতে দেখা যায় তার শাসন আমলেই করা নতুন তালিকায় মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা ৩৬ হাজার বেড়ে গিয়ে মোট পরিমাণটি দাঁড়িয়েছিল এক লাখ ৫৪ হাজারে।
সুতরাং এবারও সরকার নতুন করে মুক্তিযোদ্ধার তালিকা করছে এবং সেই তালিকা মুক্তিযোদ্ধার পরিসংখ্যান বিভ্রান্তির দিকে যে ঠেলে দেবে তা অনুমান করাটা মোটেও অসংগত হবে কি?
মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দানকারী, এবারে নির্বাচিত বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের নিকট দেশবাসীর এ নিয়ে ন্যায় সংগত দাবি একটাই: তা হচ্ছে মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা আর নয়, রাজাকার স্বাধীনতাবিরোধীদের তালিকাতৈরি করুন। প্রাসঙ্গিক হওয়ায় এক্ষেত্রে ১৯৯২ সালের ৫ ডিসেম্বর  দৈনিক সংবাদে প্রকাশিত একটি সংবাদের উদ্ধৃতি দেয়া হলো - ১৯৮৮ সালে মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের উদ্যোগে রাজাকারদের একটি তালিকা প্রণীত হলেও রহস্যজনক কারণে সেই তালিকা পরে ভষ্মিভূত হয়ে যায়। অনুসন্ধানে দেখা যায় ১৯৭১ সালে ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত মোট ৫০,০০০ রাজাকার সংগ্রহ ও তাদের প্রশিক্ষণ সম্পন্ন হয়েছিল। লক্ষ্যমাত্রা ছিল এক লাখ। ট্রাস্টের কাছে ৫০,০০০ রাজাকারের তালিকা ছিল। ট্রাস্টের-ই একজন মাঝারি পর্যায়ের কর্মকর্তার নেতৃত্বে ওই তালিকাটি ভষ্মিভূত করা হয় বলে ট্রাস্টের একটি সূত্রে জানা যায়।

সুতরাং আজ অনেক অনেক বিলম্বে হলেও জরুরি হয়ে পড়েছে এলাকা ধরে ধরে স্বাধীনতা বিরোধী রাজাকার আলবদর, আলসামস্‌ এবং তাদের সহযোগীদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা করা। স্বাধীনতা বিরোধী এই গণ দুশমনদের বর্বরতার শিকার, আর প্রত্যক্ষ স্বাক্ষী প্রজন্মটি পুরোপুরি নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার আগেই এই কাজটি সম্পন্ন করা অতি জরুরি। স্বাধীনতা সংগ্রামের অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনার নিজের এবং তার সরকারের জন্য এটি একটি পবিত্র দায়িত্ব।  

১৫ আগস্ট পোস্টমর্টেম জরুরি

১৫ আগস্ট পোস্টমর্টেম জরুরি

সগীর ॥ ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট একজন কন্যা শেখ হাসিনা একজন পিতা শেখ মুজিবকে হারিয়েছিলেন মা ভাইসহ পরিবারের আরও অনেককে এটা বাস্তব। কিন্তু  এটাই কেবল বাস্তবতা নয়, বাস্তবতা হচ্ছে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি নিহত হয়েছিলেন। আবার, কেবল এটাও বাস্তব নয়, চরম বাস্তবতা হচ্ছে ১৯৭৫ এর সেই ভয়াল রাতে কেবল পিতা মুজিবকে নিহত করা হয়নি, কেবল রাষ্ট্রপতি মুজিবকে নিহত করা হয়নি, নিহত করা হয়েছিল ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে, ৩০ লক্ষ শহীদের স্বপ্নকে। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড তাই কেবল একটি পারিবারিক ট্র্যাজেডি মাত্র নয়, কেবল ফৌজদারি অপরাধের আইনি মামলা নয় !
তাই কেন ঘটেছিল ১৯৭৫ এর ১৫ আগস্টের সেই ট্র্যাজেডি তার উত্তর খোঁজা, তার মূল কারণগুলো সন্দেহাতীতভাবে চিহ্নিত করা, তার উদ্দেশ্য ও উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে মূল ষড়যন্ত্রী কারা কারা ছিল তা সুনিশ্চিত করা জরুরি। জরুরি আজকের নয়, জরুরি ছিল বহু আগেই। অন্তত ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে প্রথম আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পরেই যেমনটি সে সময় শুরু হয়েছিল হত্যাকাণ্ডের বিচার আয়োজনের পর্ব, তেমনি তখনই দরকার ছিল উপরিল্লেখিত প্রশ্নগুলির ফায়সালা করার জরুরি উদ্যোগটি গ্রহণের। তাহলে হয়তো ২০০১-এ স্বাধীনতা বিরোধী, বাঙালি বিরোধী বিএনপি জামাত জোট ক্ষমতায় আসতে পারত না।
আজ প্রশ্নটি তীব্র জরুরি হয়ে উঠে এসেছে যখন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জনপ্রশাসন মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম এবারের আগস্টে তার প্রকাশ্য বক্তৃতায় কয়েক বার সতর্কবাণী উচ্চারণ করলেন যে -‘যেন আবারো ১৫ আগস্টের ঘটনা না ঘটে’।
১৯৭৫ এর ১৫ আগস্টের পর ৩ নভেম্বর সৈয়দ আশরাফের পিতা মুক্তিযুদ্ধকালীন সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম অসহায়ভাবে নিহত হয়েছিলেন জেলখানায় অপর তিন জাতীয় নেতার সাথে নৃশংসভাবে। আজ যখন সৈয়দ আশরাফ বলছেন ‘যেন ১৫ই আগস্টের সেই ঘটনা আর না ঘটে’ জনমনে তখন সংশয় দেখা দেয়। যখন রাস্তায় ট্রাফিক নির্দেশনায় লেখা থাকে - ‘হর্ণ বাজাবেন না’ তাতে বোঝা যায় সংশ্লিষ্ট স্থানটিতে হর্ণ বাজানোর ঘটনা ঘটে বলেই সতর্কবাণী লিখে রাখার প্রয়োজনটি পড়েছিলো।
৭৫ এর ১৫ আগস্টের পুনরাবৃত্তি রোধের জন্য তাই শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আজকের আওয়ামী লীগ সরকারকে জরুরি ভিত্তিতে ১৯৭৫ এর হত্যাকাণ্ড এবং তার পূর্বাপর ঘটনায় ফিরে যেতে হবে। সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে উপযুক্ত তদন্ত কমিশন গঠন করে, সুদক্ষ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ অনুসন্ধানী টিম এবং বাঙালি-প্রাণ গবেষকদের দিয়ে খুঁজে বের করতে হবে কারা ছিল ১৯৭৫ এর ১৫ আগস্টের ঘটনার পিছনে মূল ষড়যন্ত্রী। বঙ্গবন্ধু সরকারের ভিতরে-বাহিরে আওয়ামী মুখোশধারী কুশিলবদের ভূমিকা কি ছিল তা চিহ্নিত করতে হবে এবং নির্মোহভাবে আরও চিহ্নিত করতে হবে অন্তত ১৯৭২-৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুর সরকারের দুর্বল দিকগুলি কি কি ছিল। কি কি ভুল ছিল। এমনকি আত্মঘাতী পদক্ষেপ কি কি ছিল  সে সবও চিহ্নিত করতে হবে। কেবল তাই নয়, সঙ্গত কারণেই কান টানলে মাথা চলে আসার মত এই গবেষণার আওতায় আনতে হবে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সংশ্লিষ্ট সকল শক্তিসমূহের কর্মকাণ্ড, গতিবিধি ও  প্রবণতাসমূহ এবং আরো আরো অনেক কিছু।

আজ মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বাংলাদেশের অগ্রযাত্রাকে অব্যাহত রাখা, সমৃদ্ধ বাংলাদেশ এবং গর্বিত বাঙালি জাতির পুনরোভ্যুদয়ের নিশ্চয়তা তৈরির জন্য আজ যেমন দরকার বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনা সরকারের নিরঙ্কুষ কর্তৃত্ব ও ক্ষমতাসীন থাকা, তেমনি আজ জরুরি হয়ে উঠেছে এই সরকারকে, এমনকি ক্ষমতায় থাকার জন্যে হলেও ১৯৭৫ এর ১৫ আগস্টের পোস্টমর্টেম করা। আরেকটি ১৫ আগস্ট ঠেকাতে হলেও ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টে ফিরতেই হবে। 

যুগোপযোগী গণতন্ত্র সময়ের দাবী

যুগোপযোগী গণতন্ত্র সময়ের দাবী

সংলাপ ॥ জোর আবেদন সর্ব মহল থেকে বর্তমান সরকারের কাছে। সংলাপ শুরু করুন রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে। কারণ দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। রাজনীতির মাঠে যারা আছেন তারা তো অবশ্যই, বুদ্ধিজীবী, বিশ্লেষক, গবেষক সকলেরই এক কথা - সমাজে সর্বস্তরে দ্রুত সংলাপের ব্যবস্থা নেয়া। বিদেশী বন্ধুরাও পিছিয়ে নেই। তারাও যথারীতি পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছেন। বিভিন্ন গণমাধ্যমে তা বেশ জোরের সাথে প্রচারিত হচ্ছে, যাতে জনসমর্থন সংলাপের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নেয়। সকলের একই কথা দ্রুত নির্বাচন দিয়ে গণতন্ত্রে ফিরতে হবে যদিও বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন আছে কোন গণতন্ত্র ? সরকারী মহলেও প্রচ্ছন্ন নমনিয়তা সংলাপ আয়োজনে। সর্বদিক থেকে বিষয়টি ইতিবাচক। রাজনৈতিক দল ছাড়া যেহেতু রাজনীতি চলবে না আর রাজনীতি না থাকলে যে কোন পদ্ধতির গণতন্ত্র থাকবে কোথায়? নিঃসন্দেহে এর চেয়ে যৌক্তিক বিবেচনা আর কি হতে পারে? এমন সরল সমীকরণ অস্বীকার করবে কে?
সংলাপ বা আলোচনা যেহেতু গণতন্ত্রের একটি ভীত, সুতরাং তাকে বাদ দিয়ে গণতন্ত্র মনষ্কতা নিশ্চয়ই সুচিন্তার নয়। কাজেই সর্বস্তরে সংলাপ হোক। আমাদের গণতন্ত্র ছিলো, একসময় আমরা হারিয়েছি, এখন আমরা আবার হাঁটি হাঁটি করে সেখানে ফিরে যাচ্ছি। আর সে যাওয়ার পথে দেশ ও জাতির উপযোগী গণতান্ত্রিক পদ্ধতি বাস্তবায়নের দায় বর্তমান সরকারের। তারা হাত ধরে জাতিকে গণতন্ত্রেও পথে নিয়ে যাবেন।
বর্তমান সরকার জনপ্রতিনিধিত্বশীল সরকার। দেশে যুগোপযোগী গণতন্ত্রে ফিরতে এই সরকার কর্তৃক বিভিন্ন আঙ্গিকে সংস্কার ও বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে যা বাংলার ও বাঙালি জাতির ঐতিহ্য রাখতে পারে। তাই আবার ফিরতে হবে শিঁকড়ের সন্ধানে এবং যাদের দ্বারা তা কার্যকর হবে তাদেরই কাছে অর্থাৎ নতুন প্রজন্মেও হাতেই তুলে দিতে হবে দেশকে গণতান্ত্রিক শাসনে ফিরিয়ে আনতে। তাই সর্বস্তরে সংলাপ জরুরি।
কোনো সন্দেহ নেই গণতন্ত্রের জন্য নির্বাচন অবশ্যই অপরিহার্য আর সে নির্বাচনের জন্য রাজনৈতিক দল তো থাকতেই হবে। কিন্তু যে দলগুলো বিগত সাড়ে তিন দশক রাষ্ট্রক্ষমতা পরিচালনা করে গণতন্ত্রের নামে যে বন্যতা, বর্বরতা উপহার দিয়েছিলো আমরা কি আবার তাদেরই কাছে ফিরে যাবো গণতন্ত্রের জন্য? যদিও গ্রহণযোগ্যতায় এই সরকার কর্তৃক নির্বাচন আইনগত বৈধতা আছে। সরকারী চিন্তাভাবে স্পষ্ট না হলেও কর্মকান্ডে মোটামুটি প্রতীয়মান যে খুব বেশি হার্ডলাইনে তারাও আর অবস্থান নিতে চাচ্ছেন না।
গণতন্ত্রে দেশ আছে কিন্তু দেশ ও জাতির জন্য যুগপোযোগী গণতন্ত্র আজও প্রতিষ্ঠিত হয়নি। জনসমর্থন পেয়ে বছর অতিক্রান্ত করে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত বর্তমান সরকার। কিন্তু সেই জনগণতান্ত্রিক গণতন্ত্র এবং জনগণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত করতে হলে রাজনীতির অঙ্গনে খোলনলচে পাল্টাতে হবে স্বদেশী ধারায়। এক কথায় যারা ছিলো দেশ ধ্বংসকারী, মানবাধিকার লংঘনকারী, দানবীয় রাজনীতির প্রবর্তনকারী, দুর্বৃত্তায়িত চিন্তা পরিবেষ্টিত হিংস্র শ্বাপদ তারা যেন আবার অপরিহার্য হয়ে উঠতে না পারে দেশ পরিচালনায় গণতন্ত্রের নামে।
শুধুমাত্র নির্বাচন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে জনগণ তাদের প্রতিনিধিত্বশীল সরকার পরিচালনা করতে পারবে না। সূক্ষ্ম প্রক্রিয়ায় গণদাবি, ন্যায়বিচারকে পাশ কাটিয়ে চলা, সেই সব দুর্বৃত্ত রাজনীতিকদেরকে রাজনীতিতে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার হীনচক্রান্ত রুখতে হবে। গত এক বৎসরের অভিজ্ঞতা বলছে ন্যায়বিচারের দরজা এখনো যথারীতি রুদ্ধ হয়ে যায়নি। ইঁদুর-বিড়ালের খেলা আর মিডিয়ায় নানা নাটক, সংস্কারের মৌলিকত্বকে এখন যে চোরা গলিপথের দিকেই ঠেলে দিতে চাচ্ছে, তা কি সচেতন রাজনীতিকরা অনুধাবন করতে পারছেন না? শুরুতে দৃঢ়তা না থাকলে লক্ষ্যের স্থিরতা থাকবে না, লক্ষ্যে পৌঁছানোও যাবে না।

গণতন্ত্র কোনো পণ্য নয়, যা মুদি দোকানে বিক্রি হতে পারে। রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতায় আসলেই অমনি তা জনগণ প্রয়োজন মতো মুদি দোকান থেকে কিনতে পারবে। এর কোনো অলৌকিকত্বও নেই যা আলাদিনের প্রদীপ হয়ে আমাদেরকে গণতান্ত্রিক বানিয়ে ফেলবে কিংবা আমাদের রাজনীতিকদেরকে সত্যি সত্যিই গণতান্ত্রিক চিন্তাধারায় বদলে দেবে। এমন নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারবেন না। স্বাধীনতার উত্তরকালে ক্ষমতায় থাকাকালীন সব দলের রাজনীতিকদের চরিত্রগুলো দেশবাসীর কাছে একেবারেই অপরিচিত নয়। এদের মধ্যে থেকে পাঁচ শতাংশ বের করা যাবে না যাদের ন্যূনতম দেশপ্রেম ছিলো বা আছে। তাই দেশ ও জাতির চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যগুলো বিবেচনায় এনে যুগোপযোগী গণতান্ত্রিক পদ্ধতি প্রণয়ন করে নতুন প্রজন্মকে সামনে এগিয়ে না দিতে পারলে বর্তমান সরকারকেও পিছু হঠতে হবে যা কোনভাবেই আকাঙ্খিত নয়। তাই সময়ের সাথে সাথে সত্য প্রতিষ্ঠার কাণ্ডারি হওয়া বর্তমান সরকারের নৈতিক দায়িত্ব ও কর্তব্য।