মঙ্গলবার, ২ জুলাই, ২০১৩

সত্যের পথ ধরে নস্যাৎ করতে হবে সব ষড়যন্ত্র


সত্যের পথ ধরে

নস্যাৎ করতে হবে সব ষড়যন্ত্র

 
* আর যারা মন্দ কাজের ষড়যন্ত্র করে তাদের জন্য আছে কঠিন শাস্তি। তাদের ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হবেই। - সূরা ফাতিরঃ ১০

* তারা পৃথিবীতে ঔদ্ধত্য দেখাতো ও কূট ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল। যারা ষড়যন্ত্র করে, ষড়যন্ত্র তাদেরকেই ঘিরে ফেলে। - সূরা ফাতিরঃ ৪৩

* যারা অপরাধ করেছে ষড়যন্ত্র করার জন্য, আল্লাহ্‌র কাছ থেকে তাদের উপর লাঞ্ছনা ও কঠোর শাস্তি পড়বে। - সূরা আনআমঃ ১২৪

* ওদের পূর্ববর্তীরাও ষড়যন্ত্র করেছিল, আল্লাহ্‌ ওদের ষড়যন্ত্রের কাঠামোর ভিত্তিমূলে আঘাত করেছিলেন (আর সেই) কাঠামোর ছাদ ওদের উপর ধ্বসে পড়েছিল। আর ওদের ওপর এমন দিক থেকে শাস্তি এলো যা ছিল ওদের ধারণাতীত। - সূরা নাহলঃ ২৬

 সংলাপ ॥ নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা নাটকের একটি বিখ্যাত সংলাপ এক সময় মানুষের মুখে মুখে ছিলো। নাটকে নবাবের মুখ নিঃসৃত বহুল উচ্চারিত ওই সংলাপটি ছিলো ‘বাংলার ভাগ্যাকাশে আজ দুর্যোগের ঘনঘটা, কে তাকে দেবে আশা, কে দেবে ভরসা, কে শোনাবে সান্তনার বাণী’।

ইংরেজ বেনিয়াদের বাংলা তথা গোটা ভারতবর্ষ দখলের আগের পটভূমি ফুটিয়ে তুলতেই আশ্রয় নেয়া হয়েছিল এই রূপকের। যার অন্তর্নিহিত রূপ ছিল বাংলাকে ঘিরে ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত। কাশিমবাজার কুটিরকে ঘিরে পরিচালিত সেই ষড়যন্ত্র-চক্রান্তের এক মাথায় ছিল এদেশীয় বিশ্বাসঘাতকের দল, অপর প্রান্তে ছিল বৃটিশ বেনিয়া ইংরেজ। বলা বাহুল্য এই চক্রান্তেরই ফসল ছিল বাংলা তথা গোটা ভারতবর্ষে দু’শ বছর ইংরেজের গোলামী। আজ আবারও তৈরি হচ্ছে সেই একই পটভূমি। নাটুকে ভাষায় যাকে বলা যেতে পারে ‘বাংলার দুর্বাঘাসে আজ চক্রান্তের জাল পাতা।’ এই জালের এক মাথায় উগ্র ধর্মান্ধ, ধর্ম ব্যবসায়ী, ধর্মবেত্তা ও তাদের দেশীয় সহযোগী রাজনীতিকরা যাদের অবস্থান ক্ষমতার ভেতর ও বাইরে এবং জালের দড়িটাকে ধরে,  আর এক প্রান্তে বসে আছে পশ্চিমা প্রশাসন ও তার সহযোগী সৌদি আরবের সেবাদাস বেনিয়ারা।

এই চক্রান্ত বাংলার অমিত সম্ভাবনাকে ঘিরে। বাংলার মাটির তলায় ছড়িয়ে থাকা প্রাকৃতিক সম্পদকে ঘিরে। হাজার হাজার বছর ধরে পরিপুষ্ট বাংলার সোনালী ঐতিহ্যকে ঘিরে। অগণিত সাধকের পদধূলি ধন্য বাংলার পবিত্র জমিনকে ঘিরে এবং বাংলার মাটি-জল-বায়ু মথিত করে উঠে আসা এর ‘অমৃতের সন্তান’দের ঘিরে।

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় বাংলাকে ঘিরে বাংলার মানুষকে ঘিরে, সমৃদ্ধ তিন হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতিকে ঘিরে চক্রান্ত-ষড়যন্ত্র নতুন নয়। এই চক্রান্তেরই ধারাবাহিকতায় ইতিহাসের পরতে পরতে দেখা যায় বাংলার ভাঙ্গা-গড়া, বিশেষ করে ১৯০৫ সালের ‘বঙ্গভঙ্গ’ এবং ১৯৪৭ সালের মহা প্রতারণার বাংলা বিভক্তি।

১৯৭১। বাঙালির সশস্ত্র যুদ্ধ। এই যুদ্ধে বাঙালি অসম্পূর্ণ এক খন্ডিত বাংলার পূর্বাংশ নিয়ে প্রতিষ্ঠা করে একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশ - বাংলাদেশ। কিন্তু, বাঙালির বিরুদ্ধে, বাংলাদেশের বিরুদ্ধে চক্রান্ত থেমে থাকেনি। ’৭১-এ স্বাধীনতা যুদ্ধের বিরুদ্ধে অবস্থানকারী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন পদলেহী শাসকরা ষড়যন্ত্রকারীদের যোগাচ্ছে অর্থ, অস্ত্র, প্রশিক্ষণ সহ প্রয়োজনীয় উপকরণ। ১৯৭৫ সাল থেকে ধর্মান্ধতার বিষবৃক্ষের চাষ আবারও শুরু হয় বাংলার জমিনে। এই বিষবৃক্ষের বীজ আমদানী হচ্ছে সৌদী গবেষণাগার থেকে।?চারা ফুটানো হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যে আর পাকিস্তান- আফগানিস্তানের  মাটিতে। বপনের পালা চলছে সমগ্র এশিয়ায় এবং বাংলাদেশের মাটিতে মসজিদ-মাদ্রাসা আর তথাকথিত ইসলামী নামের প্রতিষ্ঠান-সংগঠনগুলোর মধ্যে।

চার দশকে দেশব্যাপী ধর্মান্ধদের মস্তিষ্কে বিছানো ষড়যন্ত্রের জাল এখন সুবিস্তৃত সুসংহত। এখন চলছে বিভিন্ন পটভূমি তৈরির পালা।

ওদের দরকার বাংলাদেশ। দরকার বাংলাদেশের সমুদ্র বন্দর। দরকার এদেশের মাটির তলায় পড়ে থাকা প্রাকৃতিক সম্পদ। দরকার পার্বত্য-চট্টগ্রাম। চট্টগ্রাম-পার্বত্য চট্টগ্রাম কেন্দ্র করে ভারতের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় ‘সেভেন সিস্টার’ বলে পরিচিত সাতটি রাজ্য নিয়ে প্রতিষ্ঠা করতে চায় আর একটি রাষ্ট্র - ঠিক ইসরাইলের স্টাইলে। যে রাষ্ট্র দিয়েই গোটা এশিয়া বিশেষত ভারত ও চীনকে তাদের ইচ্ছা দাসে পরিণত করার মহাপরিকল্পনা।

এ লক্ষ্যেই বাংলাদেশের মাটিতে চাই ধর্মের নামে সন্ত্রাসীদের ঘাঁটি। এক্ষেত্রে পাশে পেতে চাইছে প্রতিবেশী ভারতের ধর্মীয় সন্ত্রাসীদের। বাংলাদেশকে জঙ্গি অধ্যুষিত অকার্যকর রাষ্ট্র হিসাবে তুলে ধরার সকল পদক্ষেপও নেয়া হয়েছিল কিন' ব্যর্থ হয়েছে। একের পর এক বিস্তৃত করা হচ্ছে ষড়যন্ত্রের জাল সন্তর্পণে। এখন চলছে আগ্রাসনের নতুন পটভূমি তৈরির পালা।

পরিকল্পনা মতোই ষড়যন্ত্রের জালের পরতে পরতে ছেড়ে দেয়া হয়েছে ধর্মের নামে সন্ত্রাসের ভয়ঙ্কর কীট। এর বিষাক্ত কামড়ে গত কয়েক বছরেই জর্জরিত রক্তাক্ত হয়েছে মাজার, উরস, সভা-সমাবেশ, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, সাংস্কৃতিক  সভা-সমাবেশ,  সাংস্কৃতিক ও বিনোদন কেন্দ্রস'ল।

আতঙ্কিত মানুষের মনে স্বভাবতই জিজ্ঞাসা এই চক্রান্ত ষড়যন্ত্রের পরিণতি কী? শান্তির ধর্ম ইসলামের  পবিত্র গ্রন্থ আল কুরআনে এর ফয়সালা দেয়া আছে সুস্পষ্টভাবে।
তাই সকল অঙ্গনে ষড়যন্ত্রকে নস্যাৎ করার জন্য সংকীর্ণতার উর্দ্ধে উঠে সত্যের পথ ধরে বাঙালি জাতিকে আবারও প্রস্তুত হতে হবে শান্তি (ইসলাম) ধর্ম প্রতিষ্ঠায়। সময়ই বলে দেবে কখন কি করতে হবে।

জাতির কাছে আজ সাংস্কৃতিক আন্দোলনের বিকল্প নেই


জাতির কাছে আজ সাংস্কৃতিক আন্দোলনের বিকল্প নেই

 
আবু নাঈম ॥ ধর্মীয় রাজনীতির পথ ধরে ধর্মজীবী, ধর্মবেত্তা ও রাজনীতিকরা বাংলার উর্বর ভূমিতে মধ্যপ্রাচ্যের বিপুল পেট্রো-ডলার পেয়ে বিভিন্ন ইসলামপন্থী ইতোমধ্যেই নিজেদের বহু নামে সংগঠিত দল হিসাবে গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে। যদিও তথাকথিত ইসলামী শাসনব্যবস্থার স্বরূপ নিয়ে তাদের মধ্যেও তীব্র মতবিরোধ বিদ্যমান। আমেরিকার মদদপুষ্ট মধ্যপ্রাচ্যের টাকায় পরিচালিত তথাকথিত বিভিন্ন ইসলামী দল ও এনজিওদের প্রধান কাজ হলো দেশব্যাপী সমস্ত মাদ্রাসা ও মসজিদগুলোতে ধর্মীয় উগ্রবাদের পৃষ্ঠপোষকতা করা যাতে করে সামাজিক বিশৃঙ্খলা সর্বদা বজায় থাকে। মধ্যপ্রাচ্যের টাকায় উপরোক্ত রাজনৈতিক ইসলামপন্থী দলগুলো এ দেশের সাধারণ মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিকে পুঁজি করে আল্লাহ্‌র দুনিয়ায় আল্লাহ্‌র শাসন কায়েমের জিগির তুলে দেশের শাসনব্যবস্থায় এবং বিশেষভাবে  গ্রামের দরিদ্র ও অশিক্ষিত জনগোষ্ঠীর মধ্যে একটি সমর্থকগোষ্ঠী সৃষ্টি করতে প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। এজন্য তারা টার্গেট করেছে গ্রামের মসজিদ ও মাদ্রাসাগুলোকে। গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর দারিদ্র্যের সুযোগে তারা তাদের মেয়ে ও ছেলেদের সহজে প্রলুব্ধ করতে পারছে। নগর সভ্যতার বিকাশ ও পাশাপাশি গ্রামীণ সমাজব্যবস্থার সীমাহীন দারিদ্র্য ও পশ্চাদপদতা, শহরের সাথে গ্রামের বৈষম্য ধর্মীয় উগ্রতার ধারণা প্রসারের জন্য উর্বর ক্ষেত্র তৈরি করে রেখেছে।

রাজনৈতিক ইসলামপন্থীদের ধর্মীয় উগ্রতা প্রসারের মূল কারণ হচ্ছে বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলগুলোর সীমাহীন ব্যর্থতা এবং কাপুরুষতা। স্বাধীনতার দীর্ঘ চার দশক পরেও আমাদের দেশে যেমন রাজনীতিকদের দিয়ে একটি সত্যিকার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বিকশিত হয়নি, তেমনি দেশের অর্থনৈতিক সমস্যা সমাধানেও তারা চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। মুক্তবাজার অর্থনীতিকে উন্নয়নের মডেল হিসাবে গ্রহণ করা হলেও বস্তুতঃ দেশে কাঙ্খিত শিল্পায়ন ঘটেনি। ফলতঃ সমাজে যেমন শ্রেণী বৈষম্য তীব্র হচ্ছে তেমনি বৃদ্ধি পাচ্ছে গ্রাম ও শহরের মধ্যে বৈষম্য। উৎপাদন ব্যবস্থার সাথে সম্পর্কহীন এক শ্রেণীর শহুরে লুঠেরা ধনীদের সীমাহীন জৌলুস-আধুনিক জীবনযাপন আর অন্যদিকে গ্রামের বিশাল দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকার প্রাণান্তকর আদি সংগ্রাম - এ স্ববিরোধী কোনো সমাজ কখনো স্থিতিশীল হতে পারে না। বেকারের সংখ্যা তিন কোটির উপরে। ফি বছর ২১/২২ লক্ষ শিক্ষিত বেকার শ্রমের বাজারে প্রবেশ করছে। দুর্নীতি সর্বগ্রাসী রূপ পরিগ্রহ করে পুরো সমাজকে গিলে ফেলেছে। স্বাধীনতার পর হতে আমাদের দেশের শাসকগোষ্ঠীর ধারাবাহিক ব্যর্থতার ফলশ্রুতিতে আজ গ্রামীণ ও শহরে নিম্ন-মধ্যবিত্ত দরিদ্র যুবশ্রেণীর মনে যে হতাশা দানা বেঁধেছে তাকেই সুপরিকল্পিতভাবে কাজে লাগাবার প্রয়াস পাচ্ছে ধর্মীয় উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলো। আলজেরিয়া, মিশর ও তুরস্কের ঘটনাবলী পর্যবেক্ষণ করলেও আমরা একই রকম চিত্র দেখতে পাবো যে, সে সব দেশেও সামাজিক বৈষম্য ও দারিদ্র্য দূরীকরণে মূল রাজনৈতিক শক্তিগুলোর ব্যর্থতা ধর্মীয় উগ্রবাদ ও সন্ত্রাসের উদ্ভব ও বিকাশের উর্বর ক্ষেত্র তৈরি করে দিয়েছে। এহেন একটি আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে ক্ষমতাসীন চক্র রাজনৈতিক ইসলামকে মোকাবেলার পরিবর্তে তাদের কর্মসূচীকেই গোপনে এবং প্রকাশ্যে সহযোগীতা ও আত্মীকরণ করার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। দুঃখের বিষয় এ ক্ষেত্রে বৃহৎ রাজনৈতিক দলগুলো কে কতটুকু বক-ধার্মিক, তা প্রমাণের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত।

বিভিন্ন ইসলামপন্থীদের এবং রাজনৈতিক ইসলামকে কেবল রাজনৈতিকভাবে পরাজিত করে রোখা যাবে না। চূড়ান্তভাবে ঠেকাতে হলে সত্য মুহম্মদী ইসলাম প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তাদেরকে রুখতে হবে আদর্শিকভাবে। সারা দেশে ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে ওঠা মসজিদ ও মাদ্রাসাগুলোতে শিক্ষার নামে যা ছড়ানো হচ্ছে তা মূলত ধর্মাশ্রয়ী কূপমন্ডুকতা ও অজ্ঞতা। ধর্মীয় উগ্রবাদ ও সন্ত্রাসের প্রধান আশ্রয় হলো এই অজ্ঞতা। যুগোপযোগী বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা ও নারী শিক্ষার বিস্তার সে অজ্ঞতা রোধে প্রধান ভূমিকা নিতে পারে। বিজ্ঞানভিত্তিক আধুনিক শিক্ষা অসামপ্রদায়িক গণতান্ত্রিক চেতনার প্রসার ঘটাবে ও তার লালন রাজনৈতিক ইসলামের অসহিষ্ণুতার বিরুদ্ধে বর্ম হিসাবে কাজ করবে। বিভিন্ন ইসলামীদের বা রাজনৈতিক ইসলামপন্থীদের সন্তুষ্ট করার জন্য সরকার একের পর এক ধর্মীয় মূল্যবোধ বিবর্জিত আনুষ্ঠানিক ধর্ম পালনের দায়িত্ব যদি নিজের কাঁধে তুলে নেয়, তাতে ধর্মের নামে মিথ্যাচারিতার ভিত্তি কেবল শক্তই হবে। তাই যুক্তি ও সত্যের মাধ্যমে সর্বাগ্রে আমাদের মধ্যযুগীয় ধ্যান-ধারণার অসারতা, অপ্রাসঙ্গিকতা-পশ্চাদপদতা ও গণবিমুখতা তুলে ধরতে হবে আম জনগণের কাছে - বিশেষভাবে বর্তমান প্রজন্মের কাছে। সেজন্য বর্তমানে একটি দেশব্যাপী সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে তোলা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।

কুরআনের আলোকে বাকস্বাধীনতা


কুরআনের আলোকে বাকস্বাধীনতা

 
আরিফিন হক ॥ বাকস্বাধীনতা মৌলিক মানবাধিকার। মানুষকে চিন্তাশীল জীব হিসেবে মর্যাদা দেয়ার ক্ষেত্রে যেমন বাকস্বাধীনতার প্রয়োজন আছে তেমনি ভিন্ন মতামত উপস্থাপনের মাধ্যমে মানুষের তথ্যভান্ডারকে সমৃদ্ধ করতেও বাক-স্বাধীনতার প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। মানবীয় মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত কোন ধর্মই বাক-স্বাধীনতা বিরোধী হতে পারে না।

কুরআন অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে মানুষের বাকস্বাধীনতার স্বীকৃতি দিয়েছে। ইহুদি, খ্রিষ্টান কিংবা অন্য কোন ধর্মাবলম্বীদেরকেও তাদের দাবির পক্ষে যুক্তি ও প্রমাণ উপস্থাপনের অধিকার দেয়া হয়েছে। কুরআন বলছে - “তারা বলে, ‘ইহুদি ও খ্রিষ্টান ব্যতীত কেউ কখনও জান্নাতে প্রবেশ করবে না।’ এ তাদের মিথ্যা আশা। বলো, ‘যদি তোমরা সত্যবাদী হও, তবে প্রমাণ উপস্থিত করো।’ (২ সুরা বাকারা : ১১১)।

ইসলামের বিরুদ্ধে কেউ বক্তব্য দিলেও এমন পাল্টা বক্তব্য দেয়া যাবে না যাতে  উত্তেজনার সৃষ্টি হয় কিংবা শাস্তিদানের ক্ষমতা থাকলেও শাস্তি দেয়া যাবে না কিংবা তাকে দেশত্যাগে বাধ্য করা যাবে না। কুরআন সাবধান করে দিচ্ছেন - “স্মরণ করো যখন তোমাদের কাছ থেকে আমি এই অঙ্গীকার নিয়েছিলাম যে, তোমরা কেউ কারও রক্তপাত করবে না ও নিজেদের লোকজনকে দেশ থেকে তাড়িয়ে দেবে না।” (২ সুরা বাকারা : ৮৪)।

মুসলিম মাত্রই আল্লাহ্‌র একত্বে বিশ্বাসী।

মুসলিম জানেন এক ব্যতীত আর কিছু নেই। সর্বাবস্থায় এক-এ থাকাই মুসলিমের সার্বক্ষণিক প্রচেষ্টা। যদি কেউ তাঁকে ব্যতীত অন্য কাউকে উপাস্য হিসেবে গ্রহণ করে তাহলে কুরআনিক মুসলিম ক্রোধান্বিত হবে না। কারণ তিনি জানেন, মানুষের কোন ক্ষমতা নেই আসমান ও জমিনের মালিক সর্বশক্তিমানকে অবমাননা করে। তাই মুসলিম কুরআন মেনে এমন ব্যক্তিকে স্বপক্ষে বক্তব্য ও প্রমাণ উপস্থাপনের সুযোগ দেয়। মহান প্রভুর আদেশ - “ওরা কি তাঁকে ছাড়া অন্য উপাস্য গ্রহণ করেছে? বলো, ‘তোমরা প্রমাণ উপস্থিত করো।’ (২১ সুরা আম্বিয়া : ২৪)। “তবে কি তোমরা উপদেশ নেবে না? নাকি তোমাদের কাছে কোনো সুস্পষ্ট প্রমাণ আছে? তোমরা যদি সত্য কথা বল তবে তোমাদের কিতাব নিয়ে এসো”। (৩৭ সুরা সাফ্‌ফাত : ১৫৫-১৫৭)।

এমনকি শেষ বিচারের দিন যেদিন কোন যুক্তি তর্ক ব্যতীতই মহাপরাক্রমশালী আল্লাহ্‌ তায়ালা প্রত্যেকের বিচার করতে পারেন এবং সত্য-মিথ্যা সকলের সামনে উপস্থিত করতে পারেন সেদিনও আল্লাহ তায়ালা প্রত্যেক সমপ্রদায় থেকে একজন সাক্ষী দাঁড় করাবেন এবং তাকে প্রমাণ উপস্থাপনের সুযোগ দেবেন (২৮ সুরা কাসাস : ৭৫)।

কুরআন বাকস্বাধীনতার পক্ষে কিন্তু বাকস্বাধীনতার নামে হিংসা, বিদ্বেষ কিংবা সামপ্রদায়িক উস্কানির পক্ষে নয়। মহান প্রভু বিশৃঙ্খলা ও ফেৎনা ফ্যাসাদ পছন্দ করেন না। তাই কুরআনে সত্যানুসন্ধানের যে কোন প্রয়াসকে উৎসাহিত করা হয়েছে। কিন্তু সত্যানুসন্ধানের বদলে বাদানুবাদের মাধ্যমে নিজের কৃতিত্বকে জাহির করার চেষ্টাকে আল্লাহ্‌ তায়ালা ধিক্কার দিয়েছেন। গোঁয়ার্তুমিতে উদ্বুদ্ধ হয়ে যারা কোনো বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করেন, স্বীয় মতকে প্রাধান্য দেয়ার জন্য যারা ভ্রান্তযুক্তির আশ্রয় নেন, তাদের বিষয়ে সুরা বাকারার ২০৪ ও ২০৫ নং আয়াতে আল্লাহ বলেন, “মানুষের মধ্যে এমন কিছু লোক আছে, যাদের পার্থিব জীবনের কথাবার্তা তোমাকে চমৎকৃত করবে। আর তারা নিজেদের মনের কথার ব্যাপারে আল্লাহ্‌কে সাক্ষ্য স্থির করে। আসলে তারা (সত্যের) জঘন্যতম শত্রু। আর যখন তারা ফিরে যায় তখন প্রচেষ্টা চালায় যাতে সেখানে অকল্যাণ সৃষ্টি এবং শস্যক্ষেত্র ও জীবন ধ্বংস করতে পারে। নিশ্চয়ই আল্লাহ বিশৃঙ্খলা-অরাজকতা পছন্দ করেন না।”

এ আয়াতে তিন ধরনের বাদানুবাদের নিন্দা করা হয়েছে। ১. ‘মিরা’ অর্থ কারও বক্তব্য শুধু ভাষাগত ত্রুটি দেখিয়ে অমত করা। এর উদ্দেশ্য বক্তাকে তুচ্ছ এবং নিজেকে উত্তম প্রমাণ করা। ২. ‘জিদাল’ অর্থ ভিন্নমত প্রকাশ করা এবং স্বীয় মতকে প্রাধান্য দেয়ার জন্য সচেষ্ট হওয়া। জিদাল বা ভিন্ন মত পোষণ ন্যায়ের কিংবা অন্যায়ের পক্ষে, দুই ধরনেই হতে পারে। ৩. ‘খুসুমাত’ অর্থ জোরালোভাবে অযৌক্তিক দাবি উপস্থাপন করা। এর লক্ষ্য হচ্ছে, অর্থ-সম্পদ বা অন্য কোন স্বার্থ হাসিল করা। কখনো কখনো উপযাচক হয়ে এ বিতর্ক সৃষ্টি করা হয়। আবার কখনো বা অন্যের কথার রেশ ধরে বিতর্ক বাধানো হয়। ‘মিরা’ কখনো নিজে উপযাচক হয়ে করা হয় না, কোনো বক্তব্যের সূত্র ধরেই করা হয়। আর শেষের দুটি কারও কোনো কথার আগে উপযাচক হয়েও করা যায়, আবার পরেও করা যায়। এ তিন ধরনের বিতর্কের প্রতিটির উদ্দেশ্যই খারাপ ও গর্হিত।

মানুষ ধর্মে বর্ণে যত ভিন্নই হোক না কেন সকলেই এক আল্লাহ্‌র সৃষ্টি। মানবজাতিকে ঐক্যবদ্ধ থেকে শান্তিতে থাকার জন্যই আল্লাাহ্‌পাক যুগে যুগে নবী-রাসূল পাঠিয়েছেন। মানুষে মানুষে কোনও ভেদাভেদ নেই।  তাই একজন মানুষ যে ধর্মের অনুসারীই হোক না কেন মানুষ হিসেবে সবাই একই সম্প্রদায়ভুক্ত। তাই কাউকে অবজ্ঞা করার কোনও সুযোগ নেই। আল্লাহ্‌ তায়ালা ইচ্ছা করলে সবাইকে এক ধর্মেরই অনুসারী বানাতে পারতেন, কিন্তু তিনি তা করেননি। তিনি নিজেই যেহেতু মানুষকে বিভিন্ন দলে-উপদলে বিভক্ত করেছেন, তাই আমাদেরও ভিন্নমত পোষণকারীদের প্রতি মন্দ আচরণ করা ঠিক নয়। মুসলিমের দায়িত্ব হলো উত্তম কৌশল ও সুন্দর যুক্তি দিয়ে নিজের বক্তব্য উপস্থাপন করা। কেউ আক্রমণাত্মক মনোভাব প্রকাশ করলেও যে নম্রভাবে উত্তর দেয় এবং উত্তেজিতদের শান্ত থাকার জন্য আহ্বান জানায় তারাই কুরআনের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে।

প্রত্যেক মুসলিমকে জনসমক্ষে বক্তব্য রাখার সময় বিশেষভাবে সতর্ক থাকতে হবে যেন এমন কোন কথা না বলে যার ফলে ফ্যাৎনা-ফ্যাসাদের সৃষ্টি হয়। যুক্তিসহকারে নীচু স্বরে কথা বলা হবে। দ্বীনের নবী (সা.) এমনভাবে কথা বলতেন যেন সবাই অনায়াসে তা শুনতে পায় তিনি আস্তেও বলতেন না আবার উচ্চস্বরেও বলতেন না। প্রয়োজনাতিরিক্ত উচ্চ স্বরে কথা বলা কুরআনে নিষিদ্ধ হয়েছে। কুরআনের আদেশ - “তুমি সংযতভাবে পা ফেলো ও তোমার গলার আওয়াজ নিচু করো; গলার আওয়াজের মধ্যে গর্দভের গলাই সবচেয়ে শ্রুতিকটু”। (৩১:১৯-২০)। নবী (সা.) সর্বদা প্রসন্ন ও হাস্যোজ্জ্বল ছিলেন। তার চরিত্রে ছিল নম্রতা, আচার ব্যবহারে বিনয়। তিনি উচ্চস্বরে কথা বলতেন না এবং কাউকে দোষ দিয়ে বক্তব্য রাখতেন না। কুরআনের আদেশ মতো তিনি অন্যদের দোষত্রুটি উপেক্ষা করতেন। কুরআনের উপদেশ হলো - মূর্খ ধর্মান্ধদের সাথে তর্কে লিপ্ত না হয়ে তাদেরকে উপেক্ষা করাই শ্রেয় (৭ সুরা আরাফ :১৯৯)।

কুরআন মতে, প্রত্যেক মানুষেরই কথা বলার অধিকার আছে, আছে আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার। কিন্তু তাই বলে নিরঙ্কুশ স্বাধীনতার ধারণা ফাঁকা, উদ্ভট ও অবাস্তব। প্রত্যেকেরই বাকস্বাধীনতা আছে কিন্তু গালাগালি দেবার, অপমান করার, নিন্দা করার, দোষারূপ করার, উপহাস ও বিদ্রুপ করার, অবমাননা করার কিংবা গর্দভের মতো চিৎকার করার স্বাধীনতা নাই। প্রত্যেকের স্বাধীনতা অন্যের স্বাধীনতাকে হরণ না করা পর্যন্ত সীমাবদ্ধ।

রাজনৈতিক অঙ্গনে ভন্ডামি!


রাজনৈতিক অঙ্গনে ভন্ডামি!

 

সংলাপ ॥ ধর্মীয় অঙ্গনে ভন্ডামি চলছে। ১৯৮৬ সালে এরশাদের অধীনে নির্বাচন নিয়ে রাজনীতিকরা ভন্ডামি করেছিলো।

যে মহল থেকে বিএনপি’র জন্ম সেই মহলের নির্দেশে ’৮৬ সালে নির্বাচনে না গিয়ে ‘আপসহীন’ ভাবমূর্তি গড়ে তোলার প্রচেষ্টায় ছিলেন খালেদা জিয়া।?

অভিজ্ঞ মহলের মতে, হিসাবে বড় ভুল করে ফেলছে বিএনপি ১৯৮৬ সনে নেতৃত্ব এবং তাদের নেপথ্যের মুরুব্বিরা। তারা ভুলে গেছেন যে, এটা ১৯৮৬ সাল নয়, আর বর্তমান সরকারটি আর যাই হোক এরশাদ সরকার নয়। বিএনপি’র মূল নেতৃত্ব খালেদা জিয়ার পরিবার অর্থাৎ সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া, হাওয়া ভবনের তারেক জিয়া, কোকো, খালেদা জিয়ার ভগ্নি, ভাগ্নে, ভাইরা মিলে পুরো পরিবার দুর্নীতি, লুটপাট, অপশাসন, বিদেশে সম্পদ পাচার, এতিমখানার অর্থ লুট করা থেকে হেন অপকর্ম নেই যা করেননি এই মর্মে দৈনিক সংবাদপত্রগুলোতে তৎকালীন সময়ে অনেক সংবাদ দেশবাসী জেনেছে। ছেঁড়া গেঞ্জি আর ভাঙ্গা স্যুটকেস থেকে কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছেন, বিদেশে পাচার করেছেন। ক্ষমতার শেষভাগে এসে কয়েক ডজন স্যুটকেস (কারো কারো মতে ৫৫টি) লুন্ঠিত মালামাল নিয়ে সৌদি আরব রেখে এসেছে এসব খবর দেশের মানুষ এখনও ভুলে যায়নি। ট্যাক্স না দিয়ে খালেদা জিয়ার কালো টাকার মালিক হওয়া, হত্যা-খুন-গ্রেনেড হামলা, ধর্মের নামে জঙ্গি উত্থানের কথাও মানুষ ভুলে যায়নি। কোটি কোটি টাকা নিয়ে হাওয়া ভবন খ্যাত-তারেক খুনিকে বিদেশে যে পাচার করে দিয়েছে সে কথাও বিভিন্ন পত্রিকায় এসেছে। তারেক-মামুন-বাবর গংয়ের চাঁদাবাজি, ব্যাংক লুট, সন্ত্রাসী লালনের কথাও এসেছে দেশ বিদেশের বিভিন্ন পত্রিকায়। এই বাস্তবতায় সম্প্রতি বেগম খালেদা যে আবার ‘আপসহীন’ হওয়ার মহড়া দেয়ার প্রচেষ্টা চালিয়েছিলো। সেটা ব্যর্থ হয়েছে। বর্তমানে স্থানীয় সরকারের নির্বাচনে অংশগ্রহণ  করছে। ১৯৮৬-তে সফল হলেও ২০১৩ তে ‘আপসহীন’ হওয়ার চালটি একেবারে মাঠে মারা গেছে। দেশের মানুষকে এখন বোকা ভাবলে নিজেই বোকা বা ধূর্ত বলে প্রমাণিত হবেন দেশের মানুষের কাছে। কিন্তু রাজনৈতিক ভন্ডামিটা এখনও রয়ে গেছে দুঃখজনকভাবে।

রাজনীতিতে তারেক-কোকোকে ইস্যু করার চেষ্টা করছেন বিএনপি তথা খালেদা জিয়া। এটা তিনি ভালো করেই জানেন এবং অন্য সবার চেয়ে বেশি করেই জানেন দেশে থাকলে বিচারে তারেক-কোকোর শাস্তি হয়ে যাবে হয়তো। সুতরাং তাদের রক্ষা করার একমাত্র উপায় হিসাবে ‘চিকিৎসার জন্য’  পাঠিয়েছেন এবং নিজেও গেছেন। কিন্তু ‘বিদেশে চিকিৎসা’ যখন রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে যায় তখন কী সেটা সমর্থনযোগ্য? তারেক এবং কোকোর সম্পর্কে দলের ‘রাজনৈতিক ইস্যু’ তৈরি করে চাপ দেয়ার কৌশলটি খুব উৎকটভাবে জনগণের সামনে প্রকাশ হয়ে পড়ছে এবং রাজনীতিকে জটিল করে তুলছে। ব্যক্তিগত সমস্যাকে জাতির জন্য রাজনৈতিক সমস্যায় পরিণত করে খালেদা রাজনীতিকে আরও সংকটের মুখে ঠেলে দিচ্ছেন।

সরকার যে কালো টাকা এবং পেশীশক্তিমুক্ত নির্বাচন করার ঘোষণা দিয়েছে সেটাও ব্যর্থ হতে পারে বলে আশংকা করছে অভিজ্ঞমহল। ৪ সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনে যারা জয়ী হয়েছেন তাদের মধ্যে অনেকেই পুলিশের তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী, দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত এবং অনেক দলীয় (আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি’র) ক্যাডার প্রার্থী হয়েছেন।  নির্বাচনে প্রার্থীদের অনেকের বিরুদ্ধেই থানায় হত্যা, অস্ত্রবাজি, চাঁদাবাজি, ছিনতাই, ডাকাতি, টেন্ডারবাজি, অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ আজও আছে। অনেক এলাকায় এসব অভিযুক্ত প্রার্থীর পক্ষে নির্বাচনী মাঠে নেমেছে ভাড়াটে সন্ত্রাসীরা। কালো টাকা, পেশীশক্তি এবং সন্ত্রাস আবার ফিরে আসছে। সারা দেশে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, হত্যা যে বেড়েছে সেটা এখন অস্বীকার করার উপায় নেই।

সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী কিছুই ঘটছে না যেমন, তেমনি রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেও দায়িত্বশীলতার কোনো লক্ষণ নেই। থাকলে খালেদা জিয়া সংসদে দাঁড়িয়ে নির্লজ্জভাবে তার আমলের দুর্নীতি, লুটপাট, অপশাসন আর ধর্মীয়?মিথ্যাচারের পক্ষে সাফাই গাইতে পারতেন না। রাজনীতির এই জটিলতা, ধর্মীয় সন্ত্রাস-কালো টাকা-পেশীশক্তির পুনরুত্থান এবং সরকারের নিজস্ব ‘স্কিম’ বাস্তবায়নের পরিকল্পনার মধ্য দিয়েই মিথ্যাচারের পথ ধরে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে ২০১৪ সালের  দিকে। কী হবে সেটা সময় বলে দেবে তবে আন্দাজ করা সাধারণ মানুষের জন্য কঠিন নয়!

নির্বাচনঃ ধর্মের নামে রাজনীতি কোন পথে....


নির্বাচনঃ ধর্মের নামে রাজনীতি কোন পথে....

 
সংলাপ ॥ ব্যক্তি জীবনে মানুষ শান্তি প্রতিষ্ঠার পথ খুঁজে পায়  তার ধর্মীয় রীতি-নীতি অনুসরণ করে-নিজ নিজ ধর্মকে ব্যক্তি জীবনে ধারণ, লালন ও পালন করে। অপরদিকে, রাষ্ট্রের সকল নাগরিকের জীবনে কল্যাণ, তাদের মৌলিক মানবিক অধিকার নিশ্চিত করার যে নীতি তা-ই হচ্ছে রাজনীতি। ধর্ম ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে, রাজনীতি সমষ্টিকে ঘিরে রাষ্ট্রকে কেন্দ্র করে। ধর্ম যখনই রাজনীতির ঘাড়ে বে আইনীভাবে সওয়ার হয়েছে তখনই তা মুষ্টিমেয় নাগরিকের সংকীর্ণ স্বার্থের অনুকূলে গেছে, আর বিপক্ষে গেছে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের স্বার্থের। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, ধর্মীয় হানাহানিতে পৃথিবীতে যত মানুষের জীবন গেছে এবং ধর্মের নামে রাজ্য দখলের যুদ্ধ বিগ্রহে প্রাণ হারিয়েছে তার চেয়ে অনেক কম মানুষ প্রাণ হারিয়েছে স্বাভাবিকভাবে। এই ধর্মীয় হানাহানি যতটা না এক ধর্মের অনুসারীদের সঙ্গে অপর ধর্মের অনুসারীদের, তার চেয়ে বেশি হয়েছে একই ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে অন্তঃকলহে।  অভিজ্ঞতা এও বলে যে ধর্মের এই অ-ধর্মদশা তখনি দেখা গেছে যখন ধর্মব্যবসায়ী - মতলববাজরা ধর্মান্ধতার বিষাক্ত ধোঁয়ায় মানুষকে আচ্ছন্ন করে ধর্মকে টেনে এনেছে রাজনীতিতে-ধর্মকে ব্যবহার করেছে রাজনৈতিক স্বার্থ সিদ্ধির হাতিয়ার হিসাবে নিছক ব্যক্তি ও গোষ্ঠী স্বার্থের প্রয়োজনে।

এই উপমহাদেশের-এমনকি এই দেশের গত ৬০ বছরের ইতিহাস দেখলেই তা টের পাওয়া যায় হাড়ে হাড়ে। ধর্মের নামে, স্বঘোষিত ইসলামের নামে ১৯৪৭ সালে ‘ঐতিহাসিক প্রতারণার’ মধ্য দিয়ে ধর্মব্যবসায়ী রাজনীতিকরা সৃষ্টি করেছিল রাষ্ট্র ফাঁকিস্তান (কাগজে-পত্রে দলিলে যা পরিচিত ছিল পাকিস্তান বলে)। ধর্মের দোহাই দিয়েই বাংলার মানুষকে চরম শোষণ-নির্যাতন চালিয়েছিল এই ফাঁকিস্তান রাষ্ট্রের মদ্যপ-মাতাল দুশ্চরিত্র পাকি জেনারেল  আর শঠ রাজনীতিকরা। যার পরিণতিতে ঘটেছিল ১৯৭১ সালে মহান  মুক্তিযুদ্ধ  যে যুদ্ধে  মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল, মা-বোনের ইজ্জত লুন্ঠন করা হয়েছিল ইসলামের নামে, ঘৃণিত তথাকথিত ইসলামি রাষ্ট্র   ফাঁকিস্তান রক্ষার নামে।

যুদ্ধোত্তর স্বাধীন বাংলাদেশে ঠকে, ঠেকে আর উচ্চমূল্যে কেনা অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ নীতি নির্ধারকরা তাই দেশের সংবিধান প্রণয়ন করতে গিয়ে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করে নিয়েছিলেন  নীতিটি তা প্রতিফলিত হয়েছিল যে সংবিধানের ৩৮ অনুচ্ছেদে। এতে দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘোষণা করা হয়, ‘জনশৃঙ্খলা ও?নৈতিকতার স্বার্থে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গত বাধানিষেধ সাপেক্ষে সমিতি বা সংঘ গঠন করার অধিকার প্রত্যেক নাগরিকের থাকবে। তবে শর্ত থাকে যে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সম্পন্ন বা পক্ষানুযায়ী কোন সামপ্রদায়িক সমিতি বা সংঘ কিংবা অনুরূপ উদ্দেশ্য সম্পন্ন বা লক্ষ্যানুসারী  ধর্মীয় নামযুক্ত বা ধর্মভিত্তিক অন্য কোন সমিতি বা সংঘ গঠন করায় বা তার সদস্য হওয়ার বা অন্য কোন প্রকারে তার তৎপরতায় অংশগ্রহণ করার অধিকার কোন ব্যক্তির থাকবে না।’

কিন্তু জাতির চরম দুর্ভাগ্য ক্ষমতায় টিকে থাকার স্বার্থে ১৯৭৮ সালে সেনানায়ক জেনারেল জিয়াউর রহমান সংবিধানের এ-বিধানটি সংশোধন করে ধর্মের ভিত্তিতে সংগঠন করার অধিকার দেন। আর বলার অপেক্ষা রাখে না, জিয়ার কেটে দেয়া এই খাল দিয়ে তিন হাজার বছরের অসামপ্রদায়িক এই বাংলার জনপদে ঢুকে পড়ে ধর্মান্ধতার সন্ত্রাসীরা, একে একে - যা অব্যাহত আছে আজও। এরই অনিবার্য পরিণতিতে সামপ্রদায়িকতার বিষ বাষ্পে আচ্ছন্ন হতে থাকে গোটা দেশ, ধর্মান্ধতার বিষাক্ত নখরাঘাতে ক্ষতবিক্ষত রক্তাক্ত হয় বাংলার সবুজ জমিন, ধর্মব্যবসায়ীদের চক্রান্ত ষড়যন্ত্র কবলিত হয়ে পড়ে দেশের রাজনীতি, আর তারই উপসর্গ হিসাবে ঘুষ, দুর্নীতি, কালো টাকার স্রোতে ভাসতে থাকে রাষ্ট্রীয় অর্থনীতি।

সুযোগ এসেছে আইন, নীতি-?নৈতিকতা আর মূল্যবোধ ভিত্তিক দেশ-সমাজ গড়ে তোলার। রাজনীতির জটিল অংকে পড়ে সব সম্ভাবনা যদিও আজ ‘হওয়া-না-হওয়ার’ দোলাচালে দুলছে, তথাপি হাতে এসে যাওয়া পরিস্থিতি ও কতক অর্জনকে কিন্তু সত্যের পথ ধরে সহজেই দেয়া যায় স্থায়ী রূপ। বর্তমান নির্বাচন কমিশনের উদ্যোগে রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও কিছু অর্জন আজ জাতির সামনে এসে গেছে। প্রয়োজন তাকে অনতিবিলম্বে মুঠোবন্দী করে কাজে লাগানো সহজ ও সরল পথে।

সামপ্রদায়িকতার রাজনীতি বন্ধে কমিশন ইতোমধ্যে যে গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশ নিয়ে এসেছে তার ৯০-সি (১/এ), ৯০ সি(১/বি), ও ৯০-সি (১/সি) ধারাসমূহ মুক্তিযুদ্ধের লুন্ঠিত চেতনা পুনরুদ্ধারে হয়ে উঠতে পারে মোক্ষম হাতিয়ার। এই গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশের ৯০-সি (১/এ) ধারায় রাজনৈতিক দলের নিবন্ধনের শর্তে বলা হয়েছে যে, দলীয় গঠনতন্ত্রের উদ্দেশ্যসমূহ সংবিধানের পরিপন্থী হতে পারবে না। ৯০-সি (১/বি) ধারায় বলা হয়েছে, রাজনৈতিক দলের গঠনতন্ত্রে ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, ভাষা ও লিঙ্গভেদে কোন বৈষম্য থাকতে পারবে না। ৯০-সি (১/সি) ধারায় বলা হয়েছে দলীয় নাম, পতাকা, চিহ্ন বা অন্য কোন কর্মকান্ড দ্বারা এমন কিছু করা যাবে না, যার মাধ্যমে ধর্মীয় বা সামপ্রদায়িক সমপ্রীতি নষ্ট হওয়ার কিংবা দেশকে বিচ্ছিন্নতার দিকে নিয়ে যাবার আশংকা থাকে।

উল্লেখ্য, ধর্ম ব্যবসায়ী রাজনৈতিক দলগুলো এই অধ্যাদেশ-এর বিরুদ্ধে স্বাভাবিক কারণেই এখনো মারমুখি।

নির্বাচন কমিশন গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশ-এর যে উদ্যোগ নিয়েছে  দেশবাসীর সামনে আজ তা এক বিরল সুযোগ এনে দিয়েছে। প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল ও অপরাপর শক্তিসমূহকে এ সুযোগ কাজে লাগাতে হবে সবরকম ঝুঁকি নিয়েই। বিষয়টি কেবল প্রগতিশীল-গণতান্ত্রিক শক্তির কর্তব্যের মধ্যেই পড়ে না, দেশের সিংহভাগ ধর্মভীরু ও ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের জন্য এটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ধর্মকে বার বার রাজনীতির প্রয়োজনে, ক্ষমতার স্বার্থে যে ভাবে ব্যবহার করা হয়েছে, টেনে আনা হয়েছে রাজনীতিতে, তা ইতিহাস স্বাক্ষী দেয়, তাতে ধর্মই  কেবল বিতর্কিত হয়েছে। কলুষিত হয়েছে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে ধর্মীয় শিক্ষা; পবিত্র ধর্ম পরিচিত হয়ে পড়েছে ব্যক্তি ও গোষ্ঠী স্বার্থের হাতিয়ার রূপে।  আজ তাই সময় এসেছে ধর্মকে ধর্মের স্থানে, ব্যক্তিগত বিশ্বাস, ধারণ-লালন ও পালনের বিষয় রূপে স্থান দিয়ে রাজনীতিকে ধর্মব্যবসায়ীদের হাত থেকে মুক্ত করার। ধর্মকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করার পথ বন্ধ করার আজ তাই একটা মোক্ষম সময় এসেছে জাতির সামনে। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে একবিংশ শতাব্দীর পথে এগিয়ে যাওয়ার এখনই সময়। 

দেশবাসী জানতে চায় - ভেজাল ওষুধ প্রস্তুতকারীরা কিভাবে পার পেয়ে যাচ্ছে বছরের পর বছর


দেশবাসী জানতে চায় -

ভেজাল ওষুধ প্রস্তুতকারীরা কিভাবে পার পেয়ে যাচ্ছে বছরের পর বছর

 
সংলাপ ॥ ভেজাল ওষুধ প্রস্তুত ও বাজারজাতকারী দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল বর্তমান সরকার কিন্তু কোন ফল?পায়নি দেশবাসী। র‌্যাপিড একশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) গোয়েন্দা শাখার কর্মকর্তাদের একটি রিপোর্টের ভিত্তিতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বহু উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু জাতির স্বাস্থ্যের উন্নতি হয়নি। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় নিম্নমানের ভেজাল ওষুধ প্রস্তুত ও বাজারজাত করার পাশাপাশি সরকারের রাজস্ব ফাঁকি দেয়ার অভিযোগে বেশ কিছু ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানকে সন্দেহের তালিকায় রেখেছিল। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জরুরি বৈঠক করার পর ওষুধ প্রশাসন পরিদপ্তর কর্তৃপক্ষ অভিযুক্ত ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর অনিয়ম নিয়ে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেবে বলে জানা গেছে কিন্তু কারও শাস্তি হয়েছে বলে জানা যায়নি। র‌্যাবের গোয়েন্দা শাখার একটি টিম তদন্ত ও অভিযান চালিয়ে ভেজাল ওষুধ প্রস্তুতকারী কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে চিহ্নিত করেছে। এছাড়াও ভেজাল ওষুধ প্রস্তুতকারী ও ওষুধের কাঁচামাল আমদানি করে অবৈধভাবে বাজারে বিক্রয়কারী কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে চিহ্নিত করে সরকারের উচ্চপর্যায়ে একটি তদন্ত প্রতিবেদন ও করণীয় সম্পর্কে গাইডলাইন দিয়েছে। ওই গাইডলাইনে ওষুধ নীতিমালা অনুযায়ী শক্তিশালী টাস্কফোর্স গঠন করে ভেজাল ওষুধ প্রস্তুতকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়াসহ বিভিন্ন সুপারিশ করা হয়েছিল বলে জানা যায়।

জানা যায়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দেয়া সুপারিশ অনুযায়ী ওষুধ প্রশাসন পরিদপ্তর কর্তৃপক্ষ নিম্নমানের ভেজাল ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো সম্পর্কে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেবেন এটাই ছিল জাতির প্রত্যাশা। প্রশ্ন আসে - তাহলে কি ওষুধ প্রশাসন পরিদপ্তরের অজান্তে ভেজাল ওষুধ তৈরি হচ্ছে?

দুর্নীতিবাজ অসাধু ওষুধ ব্যবসায়ীরা দীর্ঘদিন ধরে নিম্নমানের ভেজাল ওষুধ উৎপাদন ও বাজারজাত করে আসছে। এছাড়াও অসাধু ব্যবসায়ীরা ওষুধের কাঁচামাল (বিক্রি নিষিদ্ধ) আমদানি করে বাজারে এনে তা বেশি দামে পাইকারি কেমিক্যাল মার্কেটে বিক্রি করছে। এসব নিয়ে বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে একাধিক রিপোর্ট প্রকাশ হয়েছে। বর্তমান সরকারের আমলে র‌্যাবের গোয়েন্দা শাখা সরেজমিনে কয়েকটি ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানে গিয়ে তদন্ত করে এবং ক্রেতা সেজে ভেজাল ওষুধ কিনে জালিয়াতির তথ্য উদ্‌ঘাটন করে। এ নিয়ে কয়েকটি ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের মালিককে র‌্যাব গোয়েন্দা শাখার কর্মকর্তারা জিজ্ঞাসাবাদ করে চাঞ্চল্যকর তথ্যও উদ্‌ঘাটন করে। র‌্যাব সদস্যরা নানা বেশে ঢাকা, গাজীপুর ও মিটফোর্ডসহ বিভিন্ন জায়গায় পাইকারি ওষুধ মার্কেটে তদন্ত করে ভেজাল ওষুধের লেভেল, নমুনা সংগ্রহ করে সরকারের উচ্চপর্যায়ে তদন্ত রিপোর্ট দিয়েছে। এ নিয়ে  স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সচিবের সভাপতিত্বে বহু জরুরি সভাও অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৈঠকে ওষুধ প্রশাসন পরিদপ্তর, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি, ওষুধ বিশেষজ্ঞ, ওষুধ শিল্প সমিতি ও কেমিস্ট এন্ড ড্রাগিস্ট সমিতির নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

অসাধু ব্যবসায়ীরা অধিক মুনাফা লাভের জন্য জনজীবনকে জিম্মি করে এবং ওষুধনীতিকে না মেনে জনস্বাস্থ্যে যে ধ্বস নামিয়ে আনার চেষ্টা করছে তার বিরুদ্ধে আপামর জনগণকে রুখে দাঁড়াতে হবে। নচেৎ ওই ব্যবসায়ীদের নীতি আয়ত্তে আনা যাবে না। তারা ট্যাক্স ও ভ্যাট ফাঁকি দিয়ে সরকারের রাজস্ব ক্ষতি করছে। বাজারে বেশি চালু ওষুধ কোম্পানির মোড়ক ও প্রোডাক্ট নকল করা হচ্ছে। এছাড়াও বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানির কারখানা তদন্ত করে অপরিচ্ছন্নভাবে ওষুধ উৎপাদন করতে দেখা গেছে। ওষুধের কাঁচামাল সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা সন্তোষজনক নয় বলে  বহু রিপোর্টে বলা হয়েছে।

ওষুধ প্রশাসন, এনবিআর ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয়ে টাস্কফোর্স গঠন করে নিম্নমানের ভেজাল ওষুধ প্রস্তুত ও বাজারজাতকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া ও ভেজাল বিরোধী অভিযানকে সামাজিক আন্দোলনে রূপ দিতে বর্তমান সরকারকে আরও কঠোর হতে হবে। এছাড়াও সন্দেহভাজন ভেজাল ওষুধ প্রস্তুতকারী ও সরকারের রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে আসছে এমন প্রতিষ্ঠানকে শুধু সন্দেহের তালিকায় রাখা হলে সেটা নিয়েও দুর্নীতি হবার সম্ভাবনা থাকবে। তাই প্রতিটি ক্ষেত্রে জনগণকে সম্পৃক্ত করে সত্যের পথে এগিয়ে যাবার জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও ওষুধ প্রশাসন পরিদপ্তরের মধ্যে যারা স্বচ্ছতার আওতাভুক্ত নয় তাদেরকে সরিয়ে সৎ ও দেশপ্রেমিকদের নিয়ে জনস্বাস্থ্য রক্ষার্থে বারবার অভিযান চালাতে হবে। তবেই হয়তো দেশের মানুষ আস্থা আনতে পারবে, যে ওষুধ খাওয়া হচ্ছে তার মান আন্তর্জাতিক সম্পন্ন এবং ঔষধ খেয়ে?মরবো না।

সর্বশেষে জানা গেছে সর্বোচ্চ ১৪ বছর কারাদন্ডের বিধান রেখে নিরাপদ খাদ্যআইন-২০১৩ এর খসড়ায় অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। গত সোমবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার নিয়মিত বৈঠকে এ অনুমোদন দেয়া হয়।

অনুমোদিত আইনের খসড়ায় খাদ্যে ক্ষতিকর রাসায়নিক দ্রব্য ও ভেজাল মেশানোর জন্য ৭ বছরের জেল অথবা ১০ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। একই অপরাধ দ্বিতীয় বার করলে ১৪ বছরের জেলের বিধান রাখা হয়েছে। এছাড়া মাতৃদুগ্ধের বিকল্প খাদ্যদ্রব্যের বিজ্ঞাপন প্রচারে নিষেধাজ্ঞা এনে বিকল্প শিশুখাদ্যের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে শিশুখাদ্য আইনে চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। এ আইনে ৫ লাখ টাকা জরিমানা ও তিন বছর কারাদন্ডের বিধান রাখা হয়েছে।

পরিত্রাণ কি কোন ধর্মের একচেটিয়া অধিকার?


পরিত্রাণ কি কোন ধর্মের একচেটিয়া অধিকার?

 
দিগন্ত ॥ কোন একটা বিশেষ ধর্ম যখন ঘোষণা করে যে, যারা সেই ধর্মের অনুসারী হবে না তাদের ধ্বংস অনিবার্য, তারা সৃষ্টিকর্তাকে সন্তুষ্ট করার জন্য যত প্রচেষ্টাই করুক না কেন, যত ন্যায়পরায়ণ ও সত্যবাদীই হোক না কেন তারা নিশ্চিতভাবে জাহান্নামী হবে তখন অন্য ধর্মের অনুসারীদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগে। এই ধরণের কট্টর, সংকীর্ণ ও অসহিষ্ণু ঘোষণার ফলে সমাজে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে এবং সামপ্রদায়িক দাঙ্গার সৃষ্টি হয়। দুঃখজনক যে, এখন ধর্মান্ধ মুসলমানরা বেশ দৃঢ়তার সাথেই একই দাবি করে। ধর্মান্ধরা বলে - মোহাম্মদ (সা.) -এঁর অনুসারীগণ ব্যতীত অন্য কেউ বেহেস্তে যাবে না। তাদের মতে মোহাম্মদ (সা.) এর আবির্ভাবের পর যারা ইসলাম গ্রহণ না করে মারা যায় তাদের কোন পরিত্রাণ নেই, তারা অনন্তকাল জাহান্নামের আগুনে জ্বলবে। কুরআন সাক্ষী দেয় অতীতে ইহুদি ও খ্রিষ্টানরা এমন দাবি করতো। এ বিষয়ে সুরা বাকারার ১১১, ১১২ এবং ১১৩ নং আয়াতগুলো বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য। যেখানে বলা হয়েছে- “এবং তারা বলে, ইহুদি বা খ্রিষ্টান ছাড়া অন্য কেউ বেহেস্তে প্রবেশ করতে পারবে না।’ এটি তাদের মিথ্যা আশা। বল! ‘যদি তোমরা সত্যবাদী হও, তবে প্রমাণ পেশ কর’। হ্যাঁ, যে কেউ আল্লাহর কাছে সম্পূর্ণরূপে আত্মসমর্পণ করে এবং সৎ পরিশ্রমী হয় তার ফল তার প্রতিপালকের কাছে রয়েছে এবং তাদের কোনো ভয় নেই ও তারা দুঃখিত হবে না। ইহুদিগণ বলে, খ্রিষ্টানদের কোনো ভিত্তি নেই; খ্রিষ্টানগণ বলে, ইহুদিদের কোনো ভিত্তি নেই। অথচ তারা সবাই আল্লাহর কেতাব পাঠ করে। এভাবে যারা কিছুই জানে না তারাও অনুরূপ কথা বলে। সুতরাং যে বিষয়ে তাদের মতভেদ আছে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তার মীমাংসা করবেন।”

“ভক্তগণ (মুসলিমগণ), ইহুদি, খ্রিস্টান ও ছাবেঈনগণ যারাই আল্লাহ ও ভবিষ্যতে (পরকাল) বিশ্বাসী এবং সৎ পরিশ্রমী, তাদের জন্য পুরস্কার রয়েছে তাদের প্রতিপালকের কাছে। তাদের কোনো ভয় নেই এবং তারা আযাবপ্রাপ্ত হবে না।” (২ সুরা বাকারাঃ ৬২, ১৭৭) এবং “যারা ইমান এনেছে (মুসলিম) এবং যারা ইহুদি, সাবেইন, খ্রিস্টান ও অগ্নিপূজক এবং যারা মুশরিক অবস্থায় আছে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাদের বিচার-মীমাংসা করবেন। আল্লাহ সমস্ত কিছুর সাক্ষী।” (২২ সুরা হাজ্জঃ ১৭)।

কুরআন মতে পৃথিবীতে এমন কোন ধর্ম নেই যে ধর্ম পরিত্রাণের উপর একচেটিয়া অধিকার রাখে। ধর্ম অনেক কিন্তু আল্লাহ এক এবং অদ্বিতীয়। কোন একটা নিদিষ্ট ধর্মমতের অনুসারী না হলেও যদি কেউ সৎকাজ করে এবং এক ও অদ্বিতীয় সৃষ্টিকর্তার উপর বিশ্বাস ও নির্ভর করে তবে সে তাঁর পরিত্রাণ থেকে বঞ্চিত হবে না। বিষয়টি আরও পরিষ্কারভাবে বলা হয়েছে সুরা হাজ্জের ৬৭, ৬৮ ও ৬৯ নং আয়াতে - “আমি প্রত্যেক সমপ্রদায়ের জন্য নিয়মকানুন নির্ধারণ করে দিয়েছি যা ওরা পালন করে। সুতরাং ওরা যেন তোমার সঙ্গে এ ব্যাপারে বিতর্ক না করে। তুমি ওদেরকে তোমার প্রতিপালকের দিকে ডাক দাও। তুমি তো সরল পথেই আছ। ওরা যদি তোমার সঙ্গে তর্ক করে তবে বলো, ‘তোমরা যা কর সে সম্বন্ধে আল্লাহ ভালো করেই জানেন। তোমরা যে বিষয়ে মতভেদ করছ আল্লাহ কিয়ামতের দিন সে বিষয়ে তোমাদের মধ্যে মীমাংসা করে দেবেন।”

একইভাবে সুরা মায়েদার ৬৯ নয় আয়াতে দৃঢ়তার সাথে বলা হয়েছে - “নিশ্চয়ই যারা বিশ্বাসী, ইহুদি, সাবেয়ি ও খৃষ্টান তাদের মধ্যে যে কেউ আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস করবে ও সৎকাজ করবে তাদের কোন ভয় নেই আর সে দুঃখিতও হবে না।”

যারা ইসলামের পতাকাতলে আসেনি তাদের সবাইকে নির্বিচারে নিন্দা বা ভৎসনা করার বিরুদ্ধে কুরআনের নির্দেশ হচ্ছে- “তারা সকলে একরকম নয়। তাহলে কিতাবের মধ্যে একদল আছে অবিচলিত। তারা রাত্রিতে সিজদারত অবস্থায় আল্লাহর আয়াত আবৃত্তি করে। তারা আল্লাহ ও শেষদিনে বিশ্বাস করে, সৎকর্মের নির্দেশ দেয়, অসৎকর্ম নিষেধ করে এবং তারা সৎকর্মে প্রতিযোগীতা করে। বস্তুতঃ তারাই সৎকর্মশীলদের অন্তর্ভূক্ত এবং তারা যে কোন সৎকাজই করুক না কেন তাদেরকে প্রতিদানে কখনও অস্বীকার করা হবে না। বস্তুতঃ আল্লাহ মুত্তাকীদের সম্পর্কে সবিশেষ অবহিত।” (সুরা আল্‌- ই ইমরান : ১৩-১৫)। “এবং মুসার জাতির মধ্যে এমন এক সমপ্রদায় আছে যারা সত্যের সাহায্যে হেদায়াত পাচ্ছে এবং তার সাহায্যে ন্যায় বিচার করছে।” (৭ সুরা আরাফ : ১৫৯)।

সুতরাং, কুরআনসূত্রে এটি প্রমাণিত যে, পরিত্রাণ কোন ধর্মের একচেটিয়া ব্যাপার নয়। যে কেউ প্রতিপালকের কাছে আত্মসমর্পণ করে এবং সৎ পরিশ্রমী হয় তার ফল তার প্রতিপালকের কাছে রয়েছে এবং তাদের কোনো ভয় নেই ও তারা দুঃখিত হবে না। এমন কোন প্রমাণ কেউ উপস্থাপন করতে পারবে না যে, কেবল তার সমপ্রদায়ই পরিত্রাণ পাবে আর অন্যরা বঞ্চিত হবে। আল্লাহর বিধান এই যে, যে কোন ব্যক্তি তাঁর উপর নির্ভর করলে, তার উপর বিশ্বাস স্থাপন করলে এবং কর্মের মাধ্যমে তাঁর প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করলে প্রতিদান অবশ্যই পাবে।