মঙ্গলবার, ৮ অক্টোবর, ২০১৩

নির্বাচনই কি সমাধান ?

নির্বাচনই কি সমাধান ?

মহিউদ্দীন মাসউদ ॥ সংবিধানের বাইরে কিছুই হবে না - ক্ষমতাসীনদের এক কথা। নির্বাচন তারা করবেন তবে তা সংবিধান মোতাবেকই হতে হবে। আমরাও   তাই-ই বলবো সংবিধানের বাইরে গিয়ে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা চলতে পারে না। নির্বাচন  সাংবিধানিক বিধি মোতাবেকই হতে হবে। কিন্তু ক্ষমতাকাঙক্ষী বিরোধীরা তা মানবেন না, তাই তাদের সিদ্ধান্ত নির্বাচন প্রতিহতের। তাদের নেত্রী ঘোষণা দিয়েই রেখেছেন - নির্বাচন প্রতিহতের জন্য সংগ্রাম কমিটি করার। এরকম দুই ধারী তলোয়ারের উপর দাঁড়িয়ে আমরা সাধারণ মানুষ। আমাদের রাজনীতিতে এটা কোন নতুন ঘটনা নয়, যারা যখন ক্ষমতায় থাকেন তখন ক্ষমতায় টিকে থাকবার জন্য সংবিধান একটি অস্ত্র হয়ে যায়। কিন্তু যেই সংবিধান মানুষদের রক্ষাকবজ বলে স্বীকৃত সেই সংবিধান মানুষকে কোন কালেই রক্ষা করতে পারেনি।
এই সরকারের মেয়াদ শেষ। বলতে গেলে হাতে গোনা কয়টি দিন মাত্র। তারপর কী হবে ? নির্বাচন কী হবে? হলে কোন্‌ নির্বাচন হবে? বিরোধীরা কী নির্বাচন করতে দেবে? না দিলে তাদের রাজনীতি কোন্‌ পথে চলবে? এসব প্রশ্নে এখন আলোড়িত সারাদেশ। আমরা জানি, আমাদের রাজনীতিতে গ্রহণযোগ্যতা আর বিশ্বাসযোগ্যতা বলে কোন শব্দ নেই। একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করার জন্য একটি মধ্যস্থতাকারী সরকার প্রস্তুত হলে তাতে সংবিধানের পবিত্রতা নষ্ট হবে এমনটা কোন যৌক্তিক মানুষ বিশ্বাস করবে না।
যে রাজনীতি আমাদেরকে সাড়ে চার দশকে এখানে এনে দাঁড় করিয়েছে সে রাজনীতি সম্পর্কে আমরা উদাসীন কেন? একটি জাতি তার স্বাধীনতার চার দশক পার করে বার বার একই আবর্তে আবর্তিত হতে পারে না। একদিন যে দেশ রক্তের বন্যা বইয়ে স্বাধীনতা এনেছিলো গণতন্ত্র ধর্মনিরপেক্ষতার মতো মৌলিক চেতনাকে ধারণ করে, আজ তারাই গণতন্ত্রের দুর্ভিক্ষে।
এক ভাষা এক সংস্কৃতির এক জাতি এখন ভিন্ন দুই ধারায়। আমরা নির্বোধের মতো যুগ যুগ ধরে এদেরই হাতে প্রতারিত হবার পরও এদের ক্ষমতায়নের রাজনীতিকে সমর্থন যুগিয়ে যাচ্ছি।
নির্বাচন আজ আর আমাদের রাজনীতির কোন সমাধান নয়। সংকট সমাধানের জন্য ভোগবাদের আসুরিক রাজনীতিকে 'না' বলতে হবে। নয়তো বার বারই একই সংকটের আবর্তে আবর্তিত হবে এ দেশের গণমানুষ।

সময়ের সাফ কথা....বান্দার দেলে আল্লাহর জাতের প্রকাশই হকিকি হজ

সময়ের সাফ কথা....
বান্দার দেলে আল্লাহর জাতের প্রকাশই হকিকি হজ

সাদিকুল হক ॥ খাজা মুঈনুদ্দিন হাসান চিশতি বলেন - 'ইনসানের দেল খানায়ে কাবা এবং মোমিনের দেল আল্লাহর আরশ। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেছেন 'আমি তোমাদের নফস-এর সাথে মিশে আছি, তোমরা কি দেখতে পাও না'। মানুষের দেলে আল্লাহ অবস্থান করেন বিধায় দেলকে খানায়ে খোদা বা আল্লাহর আরশ আখ্যা দেয়া হয়েছে। বান্দা যখন নফস্‌-এর বন্দেগীরূপ পর্দা দূর করে দেয় এবং আবেদ ও মাবুদের মধ্যে যখন কোন পর্দা অবশিষ্ট থাকে না তখন সে সিফাতে এলাহিতে সামিল হয়ে যায় এবং তখন তার দেলে জাতে এলাহি প্রকাশ পায়। খাজা বলেন, 'বান্দার দেলে আল্লাহর জাতের প্রকাশ হওয়াই কাবায়ে হজ বা হকিকি হজ'।
বাহ্যিক জগত থেকে অসংখ্য বিষয় ভেতরে ঢুকে অভ্যন্তরীণ জগতকে কলুষিত করে। ফলে আমরা প্রবৃত্তির দাসত্ব করতে শুরু করি এবং বিপথগামী হই। তাই অভ্যন্তরীণ জগত থেকে সকল প্রকার সন্দেহ, গোমরাহি ও গায়রুল্লাহর পর্দা দূরীভূত করলে দেলরূপ আয়নায় আল্লাহর জাতের জলোয়া প্রত্যক্ষ নজরে আসবে। এটাই খানায়ে কাবার হজের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। তাঁর মতে, হকিকি হজের আর একটি উদ্দেশ্য হলো স্বীয় হাস্তীকে এমনভাবে মিটিয়ে ফেলা যেন হাস্তীর কোন অস্তিত্বই না থাকে। এ স্তরে বাহির ও অভ্যন্তর সমভাবে পবিত্র হবে এবং ইনসানের দেল আল্লাহর গুণে গুণান্বিত হবে। তাঁর মতে - 'মাহবুবে হকিকি অর্থাৎ আল্লাহর আশেক হলেই আপন হাস্তি ফানা করা সম্ভব। খাজা মুঈনুদ্দিন হাসান চিশতির তত্ত্বে বাহির থেকে ভেতরে প্রবেশের প্রাক্কালে বিষয়রাশিকে যাচাই-বাছাই করা হলো সালাত, তাকে প্রতিরোধ করা হলো সিয়াম, তাকে বিতাড়িত করা হলো যাকাত। লক্ষ্যের সাথে সঙ্গতিহীন বিষয়গুলো বিতাড়িত করলেও আবার আসতে পারে। তাই আত্মদর্শনের মাধ্যমে তত্ত্বদর্শনে উন্নীত হয়ে এসব বিষয়রাশিকে চূড়ান্তভাবে চিহ্নিত করে জবাই করে দেয়া হলো কুরবানি। এতে অনাকাঙ্খিত বিষয়গুলো আর আগমন করতে সক্ষম হবে না। তাই হজের একটা বিশিষ্ট অঙ্গ হলো কুরবানি।
খাজার দরশনে আত্মদর্শনই হজ। আত্মদর্শনের শেষ স্তরে আল্লাহ দর্শন হয়। আত্মদর্শন অর্থ নিজেকে দেখা। মানুষের একমাত্র সমস্যা হচ্ছে সে নিজেকে দেখতে পারে না। পরিবেশের সাথে মিথস্ক্রিয়ায় কে কিভাবে সাড়া দেয়, কোন্‌ পরিবেশ তার মধ্যে কি ধরনের উদ্দীপনার সৃষ্টি করে মানুষ এ সম্পর্কে সচেতন নয়। প্রতিমুহূর্তে পরিবেশ থেকে নিজের মধ্যে অগণিত বিষয় প্রবেশ করছে এবং নিজ থেকে অগণিত বিষয় পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ছে কিন্তু এসব বিষয়রাশির গ্রহণ-বর্জন থাকছে অজ্ঞাত। এসব বিষয়কে জানার চর্চাই আত্মদর্শন বা হজ। হজের মাসগুলো আত্মদর্শনের মাস। যে মাসেই মানুষ আত্মদর্শন করে তা তার হজের মাস। আত্মদর্শনের আবহ সৃষ্টি করতে শওয়াল, জেলক্কদ, জেলহজ্ব এই তিন মাস সকলের জন্য নির্ধারিত  হয়েছে। যারা আত্মদর্শন বা হজ করবেন তারা আত্মদর্শনকে ব্রত হিসেবে গ্রহণ করবেন এবং নির্ধারিত তিনটি মাস এমন সচেতনভাবে যাপন করবেন যেন গৃহীত বিষয়গুলো চিহ্নিত হয়। হজ করতে হলে তা করার সামর্থ্য অবশ্যই থাকতে হবে, এজন্য সর্বোত্তম সামর্থ্য হচ্ছে তাকওয়া। একই সাথে আনুষ্ঠানিক হজে যেমন পথের সম্বল হিসাবে পাথেয় দরকার হয় তেমনই নির্জনে আত্মদর্শন করতেও নিজের এবং পোষ্যদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা থাকতে হয়।
প্রবৃত্তির দাসত্বেই মানবের মানবিকতা ধ্বংস হয়। নিজের উপর নিজের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত মানুষ প্রবৃত্তির দাসত্বে লিপ্ত থাকে। প্রবৃত্তির দাসত্ব তো শয়তানেরই দাসত্ব। শয়তানের দাসত্ব করলে কোন কর্মই আল্লাহর বিধানানুযায়ী হয় না। যে ব্যক্তি প্রবৃত্তির নির্দেশানুযায়ী চলে, সে আল্লাহ্‌র বান্দা নয়, শয়তানের বান্দা।
আল্লাহর বান্দা হতে হলে আল্লাহ্‌র গুণে গুণান্বিত হবার জন্য আত্মদর্শন অপরিহার্য। আত্মদর্শন একটি জটিল বিষয়। আপন দেহের মধ্যে যা সংঘটিত হয় তা অবলোকন অর্থাৎ গ্রহণ-বর্জন পরিপূর্ণভাবে অনুধাবন করা কঠোর সাধনা সাপেক্ষ। মাথা মুন্ডন করা হজের অবশ্য পালনীয় একটি প্রতীকানুষ্ঠান।
জীবন চলার পথে যেসব বিষয় বারবার গ্রহণ করার মাধ্যমে মগজে স্থায়ীত্ব লাভ করেছে সেসব বিষয় সমূহ নিজের চিন্তাকে অধ্যয়ন করার মাধ্যমে চিহ্নিত করে মুছে ফেলা হচ্ছে মাথা মুন্ডনের হাকিকত। প্রতীক রূপে মাথা মুন্ডন তখনই যথার্থ হয় যখন সাধক দীর্ঘদিনের লালিত বিষয়গুলো আল্লাহর নৈকট্য লাভের উদ্দেশে ত্যাগ করতে পারেন। যাদের মধ্যে বিষয়গুলো এমন দৃঢ় অবস্থান নিয়েছে যে এগুলো ত্যাগ করা যাচ্ছে না তাদের হজ সুসম্পন্ন হয় না। এরূপ ব্যক্তিদের হজ সুসম্পন্ন করার জন্য ত্যাগ ও সংযমের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। অভ্যাসের দাসত্ব থেকে মুক্ত হওয়া সহজ নয়। অভ্যাসের দাসত্বে আত্মসচেতনতা থাকে না। অভ্যাসই আত্মবিস্মৃত মানুষকে আধারে নিমজ্জিত করে। হজ বা আত্মদর্শন হচ্ছে একটি সাধন পদ্ধতি। এ পদ্ধতি পথপ্রদর্শক বা গুরুর কাছ থেকে শিখতে হয়।  গুরুর কাছ থেকে শিক্ষা ও পর্যায়ক্রমে দীক্ষা না নিয়ে কেউ আত্মদর্শনের প্রক্রিয়ায় নিজেকে পরিশুদ্ধ করতে পারে না।
খাজা মুঈনুদ্দিন হাসান চিশতি বলেন - আল্লাহর নৈকট্য প্রত্যাশীদের চারটি দলে বিভক্ত করা যায়। এ চারটি দলের মধ্যে জ্ঞানে-গুণে পরস্পরকে বিচার করলে আকাশ-পাতাল পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। প্রথম দল হলো - আওয়ামুল আলম বা সাধারণ মুসলিম। এরা বাহ্যিক আনুষ্ঠানিকতাকে গুরুত্ব দেয়। এরা শরীয়ত পন্থী। এশকে এলাহির পথে চারটি সিড়ির প্রথম সিড়িতে এদের অবস্থান। এরা যদি পরবর্তী মারেফাতের সিড়ি অতিক্রম করার চেষ্টা না করে তবে দ্বিন-দুনিয়ার প্রকৃত উদ্দেশ্য থেকে বঞ্চিত হয়ে জাহের পরস্ত অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে। এ দলকে আনুষ্ঠানিকতা সর্বস্ব দল বলা হয়। দ্বিতীয় দল হলো - আওয়ামুল খাস অর্থাৎ সাধারণের মধ্যে বিশিষ্ট দল। এ দলে সাধারণ ও বিশিষ্ট উভয়বিধ গুণাবলি পরিলক্ষিত হয়। এরা আধ্যাত্মিকতার দিকে আকৃষ্ট, কিন্তু আধ্যাত্মিকতার তাৎপর্য সম্পর্কে অজ্ঞ। এরা কখনো দুনিয়ার দিকে আবার কখনো দ্বিনের দিকে আকৃষ্ট হয়। এজন্য এদের বাতেনি চক্ষু নূরে বাতেনি দ্বারা পরিপূর্ণভাবে আলোকিত হয় না। এরাই আহলে তরিকত বলে পরিচিত। তৃতীয় দল হলো খাস ব্যক্তিগণ। এরা শুধু দ্বিনের প্রতি আকৃষ্ট এবং এদের বাতেনি চক্ষু নূর দ্বারা আলোকিত। এরাই আহলে হকিকত। চতুর্থ দল হলো অতি খাস। এদের উদ্দেশ্য কেবলমাত্র আল্লাহ। আল্লাহর পবিত্র জাতের মজুদ এরা সর্ব অবস্থায় দর্শন করে এবং মনে-মুখে-দেলে বিশ্বাস করে। সর্বপ্রকার কলুষতা ও গায়রুল্লাহর পর্দা এরা একেবারে নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছে। দুধের মধ্যে যেমন চিনি মিশে যায় এরাও তেমনি আল্লাহর সাথে মিশে যায়। এরাই আহলে মারেফাত।
সাধারণের মধ্যে বিশিষ্টদের প্রতি খাজা মঈনুদ্দিন হাসানের উপদেশ - 'জাহেরি উলামাগণের (শরিয়ত পন্থীদের) সাথে এসব নিয়ে ঝগড়া-বিবাদ করো না। তাদের চিকিৎসা খোদ আল্লাহই করতে সমর্থ।' প্রত্যেক তরিকতপন্থীদের একথা স্মরণে রাখা দরকার। এর অন্যথা হলে সত্যানুসন্ধান জাহেরি আলেমদের দ্বারা বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

জীবন নিয়ে খেলা !

জীবন নিয়ে খেলা !

শেখ সাহিদ ॥ জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে প্রায় ১০০ কোটি টাকার ওষুধ আমদানির চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে। একশ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই বেআইনিভাবে এসব পণ্য আমদানি করেছে। স্বাক্ষর জাল ও ভুয়া চালান দাখিল করে গত দুই বছরে দেশের বিভিন্ন কাস্টম হাউস দিয়ে 'জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকিস্বরূপ' মানহীন এসব পণ্য খালাস হয়েছে। এর সঙ্গে কাস্টমস কর্মকর্তাদের যোগসূত্র রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবি আর) অধীনে শুল্ক গোয়েন্দা অধিদফতরের এক তদন্তে জালিয়াতির এ ঘটনা ধরা পড়েছে। শুল্ক গোয়েন্দা কর্মকর্তারা অভিযুক্ত ব্যবসায়ীদের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জব্দ করে প্রমাণ পেয়েছেন, গত দুই বছরে ৫৯৮টি চালান খালাস হয়েছে, যার সবই ভুয়া। ঔষধ প্রশাসন কর্তৃপক্ষের স্বাক্ষর জাল করে, ভুয়া ছাড়পত্র দাখিল করে এগুলো খালাস করা হয়েছে। ঢাকা কাস্টম হাউস, চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস, কমলাপুর আইসিডি, বেনাপোল কাস্টম হাউসসহ দেশের সব শুল্ক বন্দর দিয়ে এসব পণ্য খালাস করা হয়েছে। গোয়েন্দা কর্মকর্তারা এ রকম ১৫৮টি আমদানিকারকের নাম খুঁজে পেয়েছেন, যারা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের স্বাক্ষর নকল করে অতি প্রয়োজনীয় এসব ওষুধপণ্য দেশে এনেছে। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১১ সালের জুলাই থেকে চলতি বছরের জুলাইয়ের মধ্যে ইনফিউশন সেটের ৫৯৮টি চালান খালাস হয়েছে, যার আর্থিক মূল্য প্রায় ১০০ কোটি টাকা। এ তো শুধু জালিয়াতি নয়, জীবন নিয়ে খেলা। পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে শুল্ক ফাঁকি দেওয়া কিংবা মিথ্যা ঘোষণার নজির আমাদের দেশে বিরল নয়। কিন্তু জীবন রক্ষাকারী ঔষধ নিয়ে এতো বড় জালিয়াতি কি করে হয়? আমদানিকারকরা নিয়ম অনুযায়ী ঔষধ প্রশাসন অধিদফতরের ছাড়পত্র তো সংগ্রহ করেইনি, উপরন্তু কর্তৃপক্ষের স্বাক্ষর জাল এবং ক্ষেত্রবিশেষে ভুয়া একদিন-দু'দিন নয়; টানা দুই বছর ধরে তারা এই অপকর্ম চালিয়ে গেছে! জালিয়াতির এই ঘটনা নিয়মিত নজরদারিতে ধরা পড়েনি কেন? শুল্ক গোয়েন্দা অধিদফতরে অভিযোগ আসার পরই কেবল তদন্ত টিমটি গঠিত হয় এবং কেঁচো খুঁড়তে গিয়ে এই আজদাহা বের হয়ে আসে। এ প্রসঙ্গে এমন প্রশ্ন ওঠা অস্বাভাবিক নয় যে, জালিয়াত প্রক্রিয়ার সঙ্গে আমদানি নথিপত্র পরীক্ষা-নিরীক্ষাকারীদেরও একটি অংশ যুক্ত ছিল। দুই বছর ধরে দেড় শতাধিক প্রতিষ্ঠান ভুয়া কাগজপত্র ও স্বাক্ষর দেখিয়ে চিকিৎসা উপকরণের মতো স্পর্শকাতর পণ্য আমদানি করে গেছে, আর তারা কিছুই ধরতে পারেননি বিশ্বাস করা কঠিন। অভিযোগের পরই কেবল জালিয়াতির এত বড় ঘটনাটি ধরা পড়া খোদ শুল্ক গোয়েন্দা অধিদফতরের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তোলে। রাষ্ট্রীয় অর্থে পরিচালিত এই প্রতিষ্ঠান তা হলে করছে কী? আমরা চাই, আমদানি নথিপত্র পরীক্ষা-নিরীক্ষার দায়িত্বপ্রাপ্তদেরও বিস্তৃত তদন্তের আওতায় আনা হবে। জবাবদিহি করতে হবে শুল্ক গোয়েন্দা অধিদফতরকেও। জালিয়াত আমদানিকারকদের তো দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বিকল্প নেই। অনেক সময় দেখা যায় তদন্ত হয়, মামলাও হয়; কিন্তু দুর্বল অভিযোগপত্র ও সাক্ষ্য-প্রমাণের অভাবে ছাড় পেয়ে যায় অপরাধীরা। এ ক্ষেত্রে এর পুনরাবৃত্তি আমরা দেখতে চাই না। শুল্ক গোয়েন্দা অধিদফতর এবং ঔষধ প্রশাসনের উচিত হবে, জালিয়াত আমদানিকারকদের নাম-পরিচয়ও জনপরিসরে প্রকাশ করা। জনস্বার্থেই এদের চিহ্নিত হওয়া প্রয়োজন রয়েছে। সবাই স্বীকার করবেন, চিকিৎসা উপকরণ আমদানির বিষয়টি আর দশটা পণ্য ব্যবস্থাপনার মতো নয়। এর সঙ্গে দেশের বিপুল মানুষের জীবন-মৃত্যুর বিষয়টি জড়িত। সিরিঞ্জ কিংবা অস্ত্রোপচার যন্ত্রপাতি মানসম্মত না হলে চিকিৎসকের দক্ষতা ও আন্তরিকতাও বিফলে যেতে বাধ্য। আলোচ্য আমদানিকারক ও তার সহযোগীরা সাধারণ জালিয়াত হতে পারেন না, তারা জনবিরোধী অপরাধী। তদন্ত ও মামলা প্রক্রিয়া এবং জালিয়াতির পুনরাবৃত্তি রোধে প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের সময় সংশ্লিষ্টদের তা মনে রাখতে হবে।

কওমি মাদ্রাসায় হেফাজতি বিস্ফোরণ



কওমি মাদ্রাসায় হেফাজতি বিস্ফোরণ

সংলাপ ॥ হেফাজতে ইসলামের নায়েবে আমির মুফতি ইজহারুল ইসলাম চৌধুরী পরিচালিত কওমি মাদ্রাসা জামিয়াতুল উলুম আল ইসলামিয়ার (লালখান বাজার মাদ্রাসা) একটি কক্ষে গত সোমবার সকালে বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে। পুলিশ কমিশনার উপস্থিত সাংবাদিকদের বলেন, ওই কক্ষে অতি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন একাধিক হাতে তৈরি গ্রেনেড একসঙ্গে বিস্ফোরিত হয়েছে। বিস্ফোরণের পর ভবনটির আশপাশের এলাকা থেকে পুলিশের বিস্ফোরকদলের সদস্যরা বোমায় ব্যবহৃত মার্বেল, সিসা ও ব্যবহার হওয়া কয়েকটি গ্রেনেডের খোসা উদ্ধার করেন। যে কক্ষে বিস্ফোরণ ঘটে তার পাশের কক্ষেই গত ১২ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশে নিয়োজিত অস্ট্রেলিয়ার ডেপুটি হাইকমিশনার টিম বলটিন কফ মুফতি ইজহারুল ইসলাম ও মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন। বিস্ফোরণে কক্ষের পলেস্তরা খসে পড়ে। দুটি সিলিং ফ্যানের মধ্যে একটি উড়ে যায় এবং অন্যটি বাঁকা হয়ে যায়। কক্ষের দু'পাশের জানালার কাচ পাশের কয়েকটি ভবনের ছাদে গিয়ে পড়ে। জানালায় ব্যবহৃত লোহার গ্রিলগুলো বাঁকা হয়ে যায়। বিস্ফোরণের পর কক্ষটিতে আগুন ধরে যায়। এতে ওই কক্ষে থাকা একটি কম্পিউটার, আসবাবপত্র ও কাপড়চোপড় পুড়ে যায়। বিস্ফোরণে ৭ জন গুরুতর আহত হয়েছেন বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। এদের মধ্যে গোপনে হাসপাতালে চিকিৎসা নেয়ার সময় পুলিশ পাঁচলাইশ ও হালিশহর থেকে ৪ জনকে আটক করেছে। ঘটনার পর থেকে মুফতি ইজহারকে খুঁজছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। গত সোমবার সন্ধ্যায় পুলিশের বিস্ফোরকদলের সদস্যরা ওই কক্ষ থেকে অবিস্ফোরিত ৩টি গ্রেনেড এবং বোমা তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধার করেছে। এরমধ্যে একটি গ্রেনেডের সঙ্গে মোবাইল ফোন লাগানো আছে। গোয়েন্দা পুলিশের এসআই সন্তোষ চাকমা বলেন, মোবাইলে নির্দিষ্ট সময়সূচি ঠিক করে এটি যেকোনও জায়গায় বিস্ফোরণ ঘটানো সম্ভব।
২০০১ সালের নির্বাচনের আগে ইসলামী ঐক্যজোটের একাংশের নেতা হিসেবে বিএনপির সঙ্গে ছিলেন মুফতি ইজহারুল ইসলাম চৌধুরী। ২০১০ সালের ১৩ ডিসেম্বর জঙ্গি তৎপরতার সাথে যুক্ত থাকার অভিযোগে লালখান বাজার মাদ্রাসা থেকে মুফতি ইজহারকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। ওই ঘটনায় মুফতি ইজহারের বিরুদ্ধে রাঙ্গুনিয়া থানায় দুটি মামলা করা হয়। বর্তমানে মামলা দুটি হাইকোর্টের নির্দেশে স্থগিত রয়েছে।
মাদ্রাসায় গ্রেনেড ও বিস্ফোরক থাকা খুবই উদ্বেগের বিষয়। দেশের মাদ্রাসা শিক্ষার ধারাটি গড়ে উঠেছে কওমী মাদ্রাসাকে কেন্দ্র করে। কওমী মাদ্রাসায় রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রন নেই। ফলে গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের ভিতরেই বেড়ে উঠছে অগণতান্ত্রিক ও  আধুনিকতা, ধর্ম নিরপেক্ষতা, নারী স্বাধীনতা পরিপন্থী হেফাজতি শক্তি। রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ বর্হিভূত ধর্ম ভিত্তিক শিক্ষা টিঁকে থাকলে এমনটি হবেই, রাষ্ট্র আরো বিপন্ন হবে, বিপন্ন হবে ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদ ও মানবাধিকার।  ধর্মীয় শিক্ষার কওমী ধারা দেশকে কোথায় নিয়ে যাবে তা ভেবে দেখার সময় এসেছে। এভাবে চলতে থাকলে খুব দ্রুতই রাজনৈতিক ইসলাম ঐক্যবদ্ধ হয়ে ক্ষমতার দিকে হাত বাড়াবে। সাম্প্রতিক সময়ে জামাত ও হেফাজতের ঐক্যবদ্ধ তান্ডবলীলা আমাদেরকে সে ইঙ্গিতই দেয়।

আল্লাহ মানুষকে পরীক্ষা করেন কেন ?



আল্লাহ মানুষকে পরীক্ষা করেন কেন ?

আরিফিন হক ॥ অতীত বর্তমান ভবিষ্যত সবকিছুই আল্লাহ জানেন। তিনি সর্বজ্ঞ। মানুষ ভবিষ্যতে কে কী করবে তাও আল্লাহ জানেন তবু মানুষকে আল্লাহ পরীক্ষা করেন কেন? একজন শিক্ষক কেন ছাত্রের পরীক্ষা নেন? যে শিক্ষক ছাত্রকে পাঠ দান করেন তিনি ভালো করেই জানেন, তার কোন্‌ ছাত্র পরীক্ষায় কি ফলাফল করবে তবু শিক্ষক ছাত্রের পরীক্ষা নিয়ে থাকেন, যেন ছাত্র অধ্যয়নে আরো বেশি মনোযোগী হয়। ছাত্রের ধীশক্তি বিকশিত করার জন্য পরীক্ষা একটি বাড়তি চাপ। শিক্ষক যেমন তার নিজের কোন লাভ-ক্ষতির জন্য ছাত্রের পরীক্ষা নেন না তেমনি আল্লাহ তায়ালাও তার নিজের জন্য বান্দাদের পরীক্ষা নেন না। পরীক্ষা বান্দাদের উপকারের জন্য। পরীক্ষার প্রস্তুতিকালে বান্দা পরিশুদ্ধ হয়, শক্তিশালী হয়। যেসব ছাত্ররা সঙ্গদোষে কিংবা সাময়িক স্ফূর্তি করতে লেখাপড়ার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলে পরীক্ষা আসলে তাদের আগ্রহ সৃষ্টি হয়। তিনিই ভালো শিক্ষক যিনি ছাত্রদের ঘন ঘন পরীক্ষা নেন। বার বার পরীক্ষা দিয়ে ছাত্রও আরো ভাল হয়ে উঠে।
পরীক্ষায় কে কেমন ফলাফল করবে তা আল্লাহ আগে থেকেই জানেন। কিন্তু তিনি খারাপ ফল করবে জেনেও তার বান্দাকে বিরত করেন না। বাহিরে বৃষ্টি হচ্ছে এমতাবস্থায় আমি বাহিরে যাবো কি-না তা আমার উপরই নির্ভর করে। আল্লাহ জানেন আমি কি সিদ্ধান্ত নেবো কিন্তু আমার সিদ্ধান্তে তিনি বলপ্রয়োগ করেন না।
যদি বাহিরে যাই আমি ভিজে যাবো। কিন্তু আমি যে ভিজে গেলাম এ জন্য আল্লাহ দায়ী নন। শরীরে পানি লাগলে শরীর ভিজবে, আগুন লাগলে পুড়ে যাবে এসব ফলাফল পূর্ব নির্ধারিত কিন্তু আমি কি করবো তা পূর্ব নির্ধারিত নয়। আল্লাহর হিসাব আর মানুষের হিসাব এক নয়। তার সমতুল্য কেউ নেই, তিনি অনন্য, তার জন্ম-মৃত্যু নেই। তিনিই সৃষ্টি করেছেন সময়। তার প্রবল ক্ষমতায় তিনি একমাত্র ভবিষ্যতের দ্রষ্টা। কিন্তু মানুষের ভবিষ্যতের রূপকার মানুষ নিজে।