বৃহস্পতিবার, ৯ জুলাই, ২০১৫

রাজনীতি নয় জননীতি হাতছানি দিচ্ছে


রাজনীতি নয় জননীতি হাতছানি দিচ্ছে

সংলাপ ॥ বাংলাদেশ-পাক-ভারত উপমহাদেশের মধ্যে পাকিস্তানের প্রভু যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক নীতির মূল লক্ষ্যসমূহে আজও কোন পরিবর্তন হয়নি। চীনের সমপ্রসারণ ঠেকাতে তার দরকার ভারতের; বাংলাদেশকে দরকার বার্মা (মায়ানমার)কে  শায়েস্তা করে রাখার জন্য। আবার উঠতি পরাশক্তি হিসেবে ভারতকে চোখে চোখে রাখতে হবে। ভারত বেশি বেয়াড়াপনা দেখালে তাকে উপযুক্ত শিক্ষাও দিতে হবে। উপমহাদেশের সব রাষ্ট্রের সরকারগুলোকে রাতারাতি ঘোলাপানি খাওয়াতে হলে ধর্মকে তাসের তুরুপ হিসেবে সব সময় ব্যবহার করতে হচ্ছে। জন্মগতভাবে ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশকে ধর্মের আফিম খাইয়ে ভারতের অবস্থা টালমাতাল করে দেয়া সহজেই সম্ভব হবে - এ চিন্তা থেকেই যুক্তরাষ্ট্র নিজ থেকে আগবাড়িয়ে বাংলাদেশকে চারদলীয় জোটের আমলে ‘মডারেট মুসলিম কান্ট্রি’ হিসেবে একটি সত্যায়নপত্র দিয়ে রেখেছে যাতে ওরই ছত্রছায়ায় যে কোন সময় ধর্মীয় সন্ত্রাস ও উগ্রবাদীদের ব্যবহার করা যায়।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক নির্বাচনের রায়ে এদেশ সংক্রান্ত আমেরিকান পররাষ্ট্র নীতিও বদলাবে বলে আশা করা যায় না। আমেরিকার ইতিহাসে প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্ট, তথাকথিত মানবতাবাদী বারাক ওবামার সরকার ভারত উপমহাদেশে আমেরিকান নীতি না পাল্টালে, বাংলাদেশকে সব সময় আমেরিকার আজ্ঞাবহ হয়ে থাকতে হবে। বর্তমান সরকারের কোন কোন অঙ্গনের ব্যর্থতায় আবারও ধর্মীয় উগ্রবাদ চাড়া দিয়ে তোলার চেষ্টা করা হবে। সামপ্রদায়িকতার বিষবাষ্প ছড়াতে ইতোমধ্যেই কাজ শুরু হয়েছে; জনগণকে স্মরণ রাখতে হবে এর পেছনেও আমেরিকা ও সৌদি আরবের হাত আছে। আমাদের জনগণ স্পষ্ট রায় দিয়েছে বাংলাদেশে ধর্মের নামে রাজনীতি চলবে না। অতএব ১৯৭২ সনের সংবিধানে ফিরে যাওয়া শেখ হাসিনার মহাজোটের জন্য জনতার ম্যানডেট। কিন্তু বর্তমান সরকার তা করতে পারল না এবং করবেও না এটা চিন্তাবিদদের অভিমত। কারণ বহিঃবিশ্বের চাপ ও ক্ষমতার লোভ।
১৯৭২ সনের সংবিধানের চার রাষ্ট্রীয় মূলনীতি বাঙালি জাতীয়তাবাদেরই প্রাতিষ্ঠানিক রূপ।
ইতিহাস বলে বাংলার মাটিতে সবচেয়ে বেশি নরবলীর নায়ক অখ্যাত প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান সামরিক শক্তির জোরে এবং দিল্লীর চাপে ওই নীতিগুলো যথেচ্ছা বদলিয়ে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ প্রচলন করে। এতদিন পর সম্বিৎ ফিরে পেয়ে জনগণ ওই ভুয়া জাতীয়তাবাদকে ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়েছে। মোদ্দাকথায়, জনতার রায়ের সারাংশ হল ১৯৭২ সনের সংবিধান পুনরুদ্ধার এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় রাষ্ট্র পরিচালনা। বিজ্ঞদের মতে এটা বলা সহজ কিন্তু বাস্তবায়ন করা কঠিন।
মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন ছিল বাঙালির প্রথম জয়।
এখন হাসিনা সরকারের যুক্তিসঙ্গতভাবে নৈতিক ও রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম অনুসারে অতি দ্রুত প্রথম বিজয়ের উপর জমে থাকা ময়লা আবর্জনা সাফ করা এবং জনগণের দেয়া প্রতিশ্রুতি মোতাবেক পরবর্তী  জয়ের জন্য সার্বিক অঙ্গনে কার্যক্রম হাতে নেয়া। দলের মধ্যে দুর্নীতিবাজ, মিথ্যাচারী ও চাটুকারী রাজনীতিকদের বহিঃস্কার করে অথবা সংশোধনের ধারায় পরিবর্তনের সুযোগ দিয়ে ধীরে ধীরে সংস্কারের মাধ্যমে আবর্জনা পরিষ্কার করে জননীতি প্রণয়ন করা। জনগণ যে লক্ষ্যসমূহ ঠিক করে দিয়েছে সেগুলো হচ্ছেঃ অর্থনৈতিক স্বাচ্ছন্দ্য, প্রগতি ও আধুনিকতায় উত্তরণে রাজনীতির বদলে জননীতি প্রনয়ন করা এবং সামাজিক কাঠামোর পরিবর্তন করা। রাষ্ট্র জনতার রায়কে শিরোধার্য করে নিলে মাদ্রাসা শিক্ষা আধুনিকীকরণ, ছাত্র-রাজনীতি বন্ধ, সন্ত্রাস ও দুর্নীতির ঘাঁটিগুলি ধ্বংস এবং প্রশাসনে আমলাতন্ত্রের পাশাপাশি অভিজ্ঞ, পারদর্শী এবং দূরদর্শিদের নিয়ে প্রত্যেক মন্ত্রনালয়ে একটা করে পরামর্শ সেল গঠন সময়ের দাবী যাতে বৈপ্লবিক কর্মকান্ডের ধারাবাহিকতায় জয়ের ধারা বজায় রাখতে পারা যায়।
আর তাহলেই স্বাধীনতার অন্তর্নিহিত শক্তি স্বয়ংক্রিয়ভাবে এগিয়ে নেবে বাঙালির সহজ সরল চৈতন্যের আনন্দময় জীবনের স্বপ্নকে। বাঙালি চাই চাই করে রব তুলতে চায় না বরং সত্যের প্রতিধ্বনিতে সোচ্চার হয়ে উঠতে চায়।

মৃত্যু বলে কিছু নেই, আছে রূপান্তর


মৃত্যু বলে কিছু নেই, আছে রূপান্তর
অনন্ত অসীম স্রষ্টা, অ-জর অ-মর

সংলাপ ॥ জীবনের সত্য-সোপান ধরে যাঁরা রেখে যান কর্মে ও মর্মে জাগ্রত জীবনের অনুধ্যান-তাঁদেরই একজন মোঃ সিরাজুল ইসলাম। কর্ম-মানবতা-শান্তির উত্থিত পতাকা হাতে ধাবমান হাক্কানী মিশন বাংলাদেশে-এর আদর্শে ও কর্মে তিনি ছিলেন একাত্ম। তাঁর অকৃত্রিম আন্তরিকতা, সময়নিষ্ঠতা ও কর্তব্য সচেতনতা তাঁকে অধিষ্ঠিত করিয়েছিল হাক্কানী মিশন বাংলাদেশে-এর মহাসচিব পদে। মিশন প্রকাশিত পত্রিকা - বর্তমান সংলাপ-এর জন্মলগ্নে সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি পদেও তাঁর মহান কর্মানুশীলনের স্বাক্ষর রেখেছেন।
১৯২৭ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে ৩ মাইল দূরে পয়াগ গ্রামে এই মহান ব্যক্তিত্বের জন্ম। তাঁর পিতা আলহাজ্ব মোঃ সেকান্দর আলী ছিলেন পয়াগ গ্রামের প্রাইমারী স্কুলের হেডমাস্টার। তিনিও ছিলেন অত্যন্ত ধার্মিক, কর্মঠ, বিচক্ষণ ও বিদ্যোৎসাহী ব্যক্তি। ছয় ছেলে ও চার মেয়ে মোট দশ সন্তানের জনক হয়েও তিনি প্রত্যেককেই নিজ আদর্শে অত্যন্ত যত্ন সহকারে মানুষ করেছেন। ভাইদের মধ্যে সিরাজুল ইসলাম ছিলেন সবার বড়। বাবার স্কুলেই তিনি প্রাইমারী শিক্ষা নেন। তখনকার যুগে চতুর্থ শ্রেণী ও ষষ্ঠ শ্রেণীতে বৃত্তি পরীক্ষা হত। তিনি চতুর্থ শ্রেণীতে বৃত্তি পান। প্রাইমারী স্কুল শেষ করে তিনি ভর্তি হন ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের বিখ্যাত অন্নদা হাইস্কুলে। উল্লেখ্য যে, ঐ স্কুলে তখন ৩/৪ জন ছাড়া অন্য সবাই ছিল হিন্দু ছাত্র। হাইস্কুলের প্রথম দিনেই একজন মুসলমান ছাত্র হিসেবে অংক ক্লাসে সবগুলো অংক বোর্ডে করতে পারায় তিনি সকল ছাত্র ও শিক্ষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
ষষ্ঠ শ্রেণীতেও তিনি বৃত্তি পান। মেধাবী ছাত্র ছিলেন তিনি। দশম শ্রেণী পর্যন্ত প্রতিটি ক্লাসে প্রথম হতেন। ক্লাস নাইনে উঠে তাঁকে হোস্টেলে থেকে, অন্যের বাড়িতে জায়গীর থেকে পড়ালেখা চালাতে হয়। অনেক কষ্টের পরও তিনি মেট্রিকে প্রথম শ্রেণীতে পাস করেন ১৯৪৩ সালে। এরপর তাঁর প্রবল ইচ্ছা ছিল ঢাকায় গিয়ে ঢাকা কলেজে বিজ্ঞান বিভাগে ইন্টারমিডিয়েট পড়বেন। কিন্তু তাঁর বাবা বললেন, “তোমার মামা সাতবার পরীক্ষা দিয়ে আইএসসি পাস করেছে। তুমি আই.এ. পড়বে।” ভয় এবং ভালবাসার মিশ্রণে পিতৃভক্ত তিনি বাবার কথা মেনে নিয়েছেন ছল ছল চোখে। ১৯৪৫ সালে ইন্টারমিডিয়েট পাশের পর তিনি ঢাকা ভার্সিটিতে অর্থনীতিতে ভর্তি হন। অর্থনীতিতে অনার্স করে মাষ্টার্স শেষ করেন ১৯৪৯ সালে। এ সময় তিনি সলিমুল্লাহ হলে থাকতেন। এরপর তিনি চট্টগ্রামে এক প্রাইভেট কলেজে অধ্যাপনার চাকুরি নেন।
১৯৫২ সালে তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাওয়াট নিবাসী বিশিষ্ট সমাজসেবী আব্দুল হামিদ ভূঁইয়ার ৩ ছেলে, ২ মেয়ের অর্থাৎ মোট ৫ ছেলে-মেয়ের সবচেয়ে বড় মেয়ে বেগম শামসুন্নাহারের সাথে বৈবাহিক সূত্রে আবদ্ধ হন। বেগম শামসুন্নাহারও ছিলেন শিক্ষিতা এবং চাকুরিজীবী। (ঢাকা ভার্সিটিতে পলিটিক্যাল সাইন্সেসে এমএ তে অধ্যায়নরত অবস্থায় তিনি বিটিটি করে ঢাকা কামরুন্নেসা সরকারি স্কুলে শিক্ষকতার চাকুরি নেন। পরবর্তীকালে তিনি বিভিন্ন স্কুল ঘুরে সবশেষে ওই স্কুল থেকে ১৯৮৭ সালে হেড মিসট্রেস পদ থেকে দীর্ঘ চাকুরি জীবনের অবসর নেন।)
তাঁদের সাংসারিক জীবন সুখেরই ছিল। দু’জনেরই শিক্ষিত মননশীলতার দ্বারা তাঁদের ১ ছেলে ৩ মেয়েকে শিক্ষা-দীক্ষায় বড় করে তোলেন। বর্তমানে সিরাজুল ইসলামের একমাত্র ছেলে সালাহউদ্দিন শাহরিয়ার আমেরিকায়। ছোট মেয়ে ডাঃ মিমিও আমেরিকায় অবস্থান করছে। অন্য মেয়ে দু’জন ঢাকাতেই থাকে। বড় মেয়ে ডাক্তার শাহীন শাহরিয়ার ও মেঝ মেয়ে শামীম শাহরিয়ার।
অধ্যাপনার পর তিনি ঢাকায় কৃষি ব্যাংকে ম্যানেজার পদে চাকুরি পান ১৯৫৭ সালে। এই কৃষি ব্যাংকেই কাটে তাঁর চাকুরি জীবনের দীর্ঘ ৩০ বছর। পদোন্নতি হতে হতে এক সময় তিনি দায়িত্বপ্রাপ্ত ‘জেনারেল ম্যানেজার’ হন। ১৯৮৬ সালে তিনি চাকুরি থেকে অবসর গ্রহণ করেন। চাকুরি ক্ষেত্রে তিনি সুনামের অধিকারী ছিলেন। তাঁর অমায়িক ব্যবহারে অধীনস্ত ও সহকর্মীরা বিরোধে নামার সুযোগ পায়নি কখনো। বরং মানুষকে আপন করে নেবার স্বভাবজাত গুণে তিনি প্রিয় ব্যক্তিত্বে পরিণত হন। তাঁর হৃদয়ের গভীর মমত্ববোধের পরিচয় পাওয়া যায় সামান্য রাস্তার কুকুর গুলোকে প্রতিদিন দু’বেলা রুটি, ভাত লুকিয়ে খাওয়ানোয়। চাকুরিকালীন গরু পালনেও তার পশুপ্রীতি দেখা  যায়।
সন্তানদের প্রতি যোগ্য অভিভাবকত্বের গুণে তিনি প্রত্যেককেই যথার্থ শিক্ষায় গড়ে তুলেছেন। বরাবরই তিনি সন্তানদের প্রতি বন্ধুত্ব সুলভ আচরণ করতেন। প্রত্যেকের লেখা-পড়ার প্রতি তীক্ষ্ণ নজর রাখতেন। নিজের জীবনের অপূর্ণ সাধ তিনি পূরণ করেন ছেলে-মেয়েদের ভিতর দিয়ে। তাঁর দু’মেয়ের ডাক্তার হওয়ার পিছনে এই উদ্দীপনা কাজ করেছিল। সেই সাথে আরো ছিল তাঁর স্বভাবে লালিত পরোপকারের সুতীব্র বাসনা। ইতিবাচক চিন্তায় তিনি নিজে যেমন কখনো হতাশ হতেন না, সন্তানদেরকেও সেই শিক্ষা দিতেন। সন্তানদের কাছে তাই তিনি ছিলেন আদর্শ পিতা। ১৯৯১ সালের ২৪ অক্টোবর হাক্কানী মিশন বাংলাদেশ-এর সদস্য লাভের মধ্য দিয়ে তিনি নিজেকে আরো একধাপ এগিয়ে নেন ‘সেবাপরায়ণ’ হিসেবে। কর্মে বিশ্বাসী তিনি খুব সহজেই তাঁর উন্মুক্ত মানসিকতায় হাক্কানী মিশনের কর্মকান্ডের সাথে একাত্ম হয়ে ওঠেন। তাঁর কর্মস্পৃহা যোগ্য নেতৃত্ব এবং মিশনের প্রতি প্রগাঢ় ও নিরবিচ্ছিন্ন ভালবাসায় অকৃত্রিম ভূমিকা রেখে ১৯৯২ সালে মিশনের মহাসচিব পদে দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। মহাসচিব পদেই তিনি জীবনের অন্তিম লগ্ন পর্যন্ত অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে কাজ করে গেছেন। হাক্কানী মিশন বাংলাদেশ পরিচালিত হাক্কানী বিদ্যাপীঠ, হাক্কানী ফ্রি ফ্রাইডে ক্লিনিকসহ মিশনের প্রতিটি কর্মকান্ডেই ছিল তাঁর সফল অংশগ্রহণ। তাঁর কর্মময় স্মৃতিকে ধারণ করে হাক্কানী মিশন বিদ্যাপীঠ আজ হাক্কানী মিশন মহাবিদ্যালয়ে উন্নিত হয়েছে এবং হাক্কানী বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হওয়ার প্রক্রিয়ায় রয়েছে; বর্তমান সংলাপও রূপ নিয়েছে সাপ্তাহিকে। প্রখর সময় সচেতন ছিলেন তিনি। মিশনের প্রত্যেক সভা, অনুষ্ঠানে তাঁর নিয়মিত ও সঠিক সময়ের উপস্থিতি সেই স্বাক্ষরই দেয়।
শিশুর মত সারল্যতা দিয়েই তিনি সবার সাথে মিশেছেন বয়সের বিভেদ না টেনে। তাঁর নিরহংকার মনে ছিল মানুষের প্রতি গভীর বিশ্বাস। এই বিশ্বাসের সোপান ধরেই তাঁর কর্মনিষ্ঠতা তাঁকে মুক্তির সত্যতায় উপনীত করেছিল। মনুষ্যত্বের জাগরণ ঘটিয়ে দিক-নির্দেশনা দিয়ে তিনি বিদায় নিলেন ১৯৯৪ সালের ৮ জুলাই শুক্রবার রাত ১১-৩০ মিনিটে, মিশন কর্মীদের কাছে তিনি এক অবিস্মরণীয় সত্তা হয়ে ছিলেন-আছেন-থাকবেন।

দেশসেবাই দেশপ্রেম কবে হবে?


দেশসেবাই দেশপ্রেম কবে হবে?

শেখ উল্লাস ॥ বর্তমান দুনিয়ায় একজন মানুষের নিজস্ব দেশ বা নাগরিকত্ব না থাকলে তার কী অবস্থা হতে পারে তা হয়তো ছিটমহলের বাসিন্দারাই বুঝতে পারেন! অপরদিকে, নিজের দেশে সুবিধামতো কাজ না পেয়ে যারা বিদেশে গিয়ে কাজ করছেন তারা ওই দেশটির উন্নয়ন তথা দেশগঠনের কাজেই অংশ নিচ্ছেন। মালয়েশিয়া বা মধ্যপ্রাচ্য বা ইউরোপ-আমেরিকার যেখানেই আজ এদেশের দক্ষ-অদক্ষ শ্রমিক বা শিক্ষিত মানুষেরা কাজ করছেন, দেশে টাকা পাঠাচ্ছেন বা ওই দেশে স্থিত হচ্ছেন, তারা শুধুই কাজ করেন, কাজের জন্যই তারা সেখানে যান, দুর্নীতি করলে কঠিন শাস্তি ভোগ করতে হয় তাদের। অথচ এই মানুষদেরই স্বজন, বন্ধুবান্ধব ও নিকট আত্মীয়রা যারা এদেশে সরকারি বা বেসরকারি চাকুরি করে জীবিকা নির্বাহ করছেন, তাদের মধ্যে এখনো ‘দেশসেবাই দেশপ্রেম’ এই মনোবৃত্তি (ইচ্ছা) জাগ্রত করা যায়নি বা হয়নি। এটা দুঃখজনক হলেও বাস্তব। তারা শুধুই চাকরি করেন, অর্থাৎ, বেতনের বিনিময়ে কাজ করেন। বাস্তবতা এই যে, দেশসেবার মহান ব্রতে নিজেদের কর্মে নিজেদের মধ্যে বেশিরভাগ অংশকেই নিয়োজিত থাকতে দেখা যায় না যদিও তারা মুসলমান বলে নিজেদেরকে জাহির করতে দ্বিধাবোধ করেন না। বরং ধর্মের আনুষ্ঠানিকতার ছত্রছায়ায় থেকে তাদের অনেকের মধ্যে দুর্নীতির আশ্রয় নিয়ে রাতারাতি ‘বড়লোক’ হওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়েছে - হচ্ছে। সমাজের অবস্থাটাও আজ এ রকম যে, দুর্নীতি করে রাতারাতি বাড়ি-গাড়ির মালিক হওয়া যায়। এই প্রবণতাই এখন বেশির ভাগ চাকুরিজীবীর মধ্যে মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। এ সমস্যা শুধু আজকের নয়, স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত কোনো সময়েই এ অবস্থার ব্যতিক্রম ছিল না। বঙ্গবন্ধু নিজেই বলতেন, ‘যেদিকে তাকাই সব খানেই চোর, .... সবাই পায় সোনার খনি, আমি পেয়েছি চোরের খনি”। নিজের এতটুকু স্বার্থের জন্য দেশের অনেক বড় ক্ষতি হয়ে গেলেও এই চোরদের কিছু যায় আসে না। অথচ এই মনোবৃত্তির সম্পূর্ণ বিপরীত দৃষ্টিভঙ্গী ছিল সেইসব মানুষদের যারা এই দেশটির স্বাধীনতা সংগ্রামে আত্মাহুতি দিয়েছেন বা দিতে গিয়েছিলেন, দেশকে স্বাধীন করেছিলেন। চরম কষ্টার্জিত একটি স্বাধীন দেশের চাকুরিজীবী বা কর্মজীবী মানুষদের এই জাতীয় মনোবৃত্তির জন্যই বিগত বছরগুলোতে কয়েকবার দুর্নীতিতে চ্যম্পিয়ন হওয়ার দুর্ভাগ্য অর্জন করেছিল বাংলাদেশ! এর জন্য দায়ী নিশ্চয়ই এদেশের সাধারণ মানুষ নন!
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ২০-অনুচ্ছেদের (১) ধারা অনুযায়ী, কর্ম হইতেছে কর্মক্ষম প্রত্যেক নাগরিকের পক্ষে অধিকার, কর্ম ও সম্মানের বিষয়, এবং ‘প্রত্যেকের নিকট হইতে যোগ্যতানুসারে ও প্রত্যেককে কর্মানুযায়ী-’ এই নীতির ভিত্তিতে প্রত্যেকে স্বীয় কর্মের জন্য পারিশ্রমিক লাভ করিবেন। ২১-অনুচ্ছেদের (২) ধারা অনুযায়ী, সকল সময়ে জনগণের সেবা করিবার চেষ্টা করা প্রজাতন্ত্রে কর্মে নিযুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তির কর্তব্য।
ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ আমলে এক বাঙালি কবি গেয়ে উঠেছিলেন, ‘স্বাধীনতাহীনতায় কে বাঁচিতে চায়, কে বাঁচিতে চায়?’ বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৪৪ বছর পর আজো এদেশের চাকুরিজীবী বিশেষ করে সরকারি চাকুরিজীবীরা নিজেকে দেশসেবক হিসেবে জনগণের কাছে প্রতিষ্ঠিত করতে পারলেন না সেটাই আজ বড় প্রশ্ন হিসেবে দেখা দিচ্ছে? সরকারি চাকুরি যে সোনার হরিণ! সে কথাটিও কারো অজানা নয়। একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে দেশ তো এই সরকারি চাকুরিজীবীদের কম দেয়নি। উচ্চপদে চাকুরিজীবীর সংখ্যাও তো দেশে দিন দিন বেড়েই চলেছে, দেশ স্বাধীন না হলে এইসব পদে চাকুরি করা এদেশের ক’জনের ভাগ্যে জুটতো? এসব প্রশ্ন আজো বাংলার আকাশে-বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে। কারণ, শোষণমুক্ত ও বৈষম্যহীন একটি সমাজ প্রতিষ্ঠা হবে-এইতো ছিল স্বাধীনতার জন্য আত্মোৎসর্গকারী সকল শহীদের স্বপ্ন। তাই, চাকুরিজীবী, বিশেষ করে সরকারি চাকুরিজীবীরা এক একজন প্রকৃত দেশসেবক হিসেবে জনগণের কাছে প্রতিষ্ঠিত হবেন, নিজেদের ব্যক্তিগত সম্পদ বৃদ্ধির মনোবৃত্তি থেকে বের হয়ে দেশ ও তথা রাষ্ট্রীয় সম্পদ বৃদ্ধির দিকে মনোনিবেশ করবেন - সেটাই আজ জাতির প্রত্যাশা। 

উপমহাদেশে ধর্মীয় আধিপত্যবাদী নীতি ঘুরছে


উপমহাদেশে ধর্মীয় আধিপত্যবাদী নীতি ঘুরছে

সংলাপ ॥ যতদিন যাচ্ছে ততোই তথাকথিত ইসলামিক জিহাদের আদর্শ বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানে বিস্তার লাভ করেছে না কমছে তা বলা খুব দুরুহ। তালিবান যেমন পাকিস্তানের সৃষ্টি, আল-কায়েদারও তেমনই পাকিস্তানে মূল ঘাঁটি। ধীরে ধীরে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীতে ও প্রশাসনে জিহাদি আদর্শ ছড়িয়ে পড়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পাকিস্তানের তালিবানিকরণ ঘটছে দ্রুত। তালিবানি শাসন ভারত সীমান্ত থেকে বেশী দূরে নয়। ভারতের বিভিন্ন সংবাদপত্রে বলা হয়েছে, লক্ষ্নৌ থেকে দিল্লির দূরত্ব যতটা (৪০৭ কিমি.), তালিবানরা ভারত সীমান্ত থেকে তার চেয়েও কাছে ঘাঁটি গেড়েছে। কিন্তু ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে এবং হচ্ছে ভারত, বাংলাদেশ, নেপাল। পাকিস্তানে তালিবানি এলাকার প্রসার ঘটেই চলেছে। আল-কায়েদা, তালিবান, লস্কর-ই-তৌয়েবা তথা জামাত-উদ-দাওয়া, জয়েশ-ই-মহম্মদ এবং পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর একটা অংশ এখন এক ঐক্যবদ্ধ শক্তি। পাকিস্তানে যে সরকারই গড়া হোক, তা ওই শক্তির নির্দেশে চলতে বাধ্য।
ওই শক্তিরই পিছনে খেলা করতে এসে দাঁড়িয়েছে চীন ও আমেরিকা। তাই চীনের সংবাদপত্রগুলো লিখেছিলঃ ‘বিদেশি শক্তিরা মুম্বইয়ে আক্রমণ চালিয়েছিল বলে ভারত সরকার প্রচার করছে নিজেদের ভিতরকার স্ব-বিরোধিতা আড়াল করার উদ্দেশ্যে।’ চীন সরকারের মুখপত্র ‘পিপলস ডেইলি’ লিখেছিলঃ ‘ভারতের শক্তিধর রাষ্ট্র হয়ে ওঠার বাসনায় বড় রকম আঘাত দিয়েছে জঙ্গিরা (এ মেজর ব্লো টু ইন্ডিয়া বিগ পাওয়ার এম্বিশন)। মুম্বইয়ে জঙ্গি আক্রমণ শেষ হওয়ার পরই চীনা সরকারের এই মন্তব্য! বলার ধরণ দেখে চিন্তা করা যায়, মুম্বইয়ের জঙ্গি আক্রমণ নিয়ে উপমহাদেশের আঞ্চলিক আধিপত্যবাদী নীতির মোড় ঘুরছে ।
চীনা সরকারের বিদেশমন্ত্রকের অধীন ‘ইনস্টিটিউট অব স্ট্রাটেজিক স্টাডিজ’-এর তরফে বলা হয়েছে, ‘ভারত বিতর্কিত কাশ্মীরে নিজেদের দখল বাড়ানোর জন্য পাকিস্তানের নিন্দামন্দ করছে’ এবং ‘যদি যুদ্ধ হয় তাহলে চীন পাকিস্তানকে সমর্থন করতে পারে। ভারত-পাক যুদ্ধ হলে চীন কী করবে? উপরোক্ত সংস্থার পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ‘চীন দক্ষিণ তিব্বত তথা অরুণাচল প্রদেশের জনগণকে পুরোপুরি মুক্ত করতে সামরিক ব্যবস্থা নেবে’। অর্থাৎ চীন অরুণাচল প্রদেশে ভারতের সাথে যুদ্ধে নামবে। এখন অবস্থার পরিবর্তন ঘটছে। চীন ও ভারত কাছাকাছি আসার চেষ্টা করছে।
ভারত সরকারকে তাই চীনের কথাও ভাবতে হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী চীন-ভারত মৈত্রীকে গভীরে নিয়ে যেতে চাচ্ছেন।
যতদূর জানা যায়, পাক-আফগান সীমান্ত জুড়ে এখন তালিবানের রাজ্য প্রসারিত হচ্ছে। কেন্দ্রশাসিত এলাকাগুলি, স্বোয়াত উপত্যকা, ওয়াজিরিস্তান ও উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ চলে গিয়েছে তালিবানের নিয়ন্ত্রণে। পেশোয়ার শহরও তাদের কার্যত দখলে। পাকিস্তান তালিবানকে দমিয়ে রাখতে ওই অঞ্চলে সৈন্য মোতায়েন করতে বাধ্য হয়েছিল। সৈন্যদের ওই অঞ্চল থেকে সরিয়ে আনা হলে তালিবানের হবে পোয়া বারো। ওই বিশাল এলাকায় তারা সরকার গড়তে উঠে পড়ে লেগেছে। তারপর সেখান থেকে আফগানিস্তানের ভিতরে শুধু হামলা চালাবে না, হামলা চালাবে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যেও জঙ্গি কার্যক্রম সম্প্রসারণ করে।
আফগানিস্তানের লড়াই এখন আমেরিকার কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সে জন্য বারাক ওবামা ঘোষণা করেছেন, তিনি যুদ্ধ পছন্দ করেন না।
ভারত সরকার জানতে পেরেছে, পাকিস্তান তাদের আইএসআইকে নিয়োগ করেছে ২০২০ সালের মধ্যে ভারতকে তচনচ করে খণ্ড-বিখণ্ড করে ফেলার জন্য। গোটা উত্তর ভারতকে পরিণত করা হবে তথাকথিত ইসলামিক রিপাবলিক অব পাকিস্তানে। দক্ষিণ ভারতকে করে তুলতে হবে বিতর্কিত স্থান। পশ্চিমবঙ্গ ও বিহারের ব্যাপক অঞ্চল, অসম ও উত্তর পূর্বাঞ্চলকে তথাকথিত ইসলামিক রিপাবলিকের অন্তর্ভুক্ত করার জন্য জঙ্গি কার্যক্রম ত্বরান্বিত করার মাধ্যমে বাংলাদেশকে ঘাঁটি করে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করার স্বপ্ন নিয়ে আইএসআই এগুচ্ছে।
চীন ও আমেরিকা কার্যত পাকিস্তান নিয়ে ব্যস্ত এবং পরোক্ষভাবে অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করছে। ভারত সহানুভূতি ছাড়া আর কিছুই কারও কাছ থেকে চাচ্ছে না এবং ভবিষ্যতে চাইবে বলে বর্তমান পরিস্থিতি বলছে না কারণ ভারত স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে এখন এগিয়ে যাচ্ছে। তাই বন্ধু হিসেবে ভারতকে প্রয়োজন। এই প্রয়োজন বাংলাদেশ সরকার ষড়যন্ত্রের কবলে পড়ে  হাতছাড়া করলে ভুল করবে মারাত্মক।

বুধবার, ২৪ জুন, ২০১৫

আমি চিনেছি আমারে, আজিকে আমার খুলিয়া গিয়াছে সব বাঁধ

আমি চিনেছি আমারে, আজিকে আমার খুলিয়া গিয়াছে সব বাঁধ

সংলাপ ॥ মুসলমান - ‘পোষা জানেয়ার, বুনো জানোয়ার, যে বলে সে মুসলিম জিভ ধরে টানো তার’ ....... এই শব্দগুলো মোটেও ইসলাম বিদ্বেষী কোনো বিধর্মীর মুখের কথা নয়। নয় উগ্র কোনো ধর্মান্ধ ইহুদি-খ্রীষ্টান বা হিন্দুর কলমের লেখা। গত শতাব্দির গোঁড়ার দিকে অগ্নি-বীণার আনোয়ার কবিতায় এই কথাগুলো বলেছিলেন সাধক কাজী নজরুল ইসলাম। আজকে বাংলাদেশে যাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে ভূষিত করা হয়েছে ‘জাতীয় কবি’ হিসেবে!
সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন জাগে, সাধক নজরুল কেন মুসলমানদের ‘বুনো জানোয়ার’ ও ‘পোষা জানোয়ার’ বলে আখ্যায়িত করলেন? মুসলিম বলে দাবিদারের জিভ টেনে ছিঁড়ে ফেলতে বললেন? নজরুল কি তবে স্বজাতি বিদ্বেষী ছিলেন? অথবা এজেন্ট ছিলেন বিধর্মীদের? নজরুলের গোটা জীবন ও তাঁর কর্ম, তাঁর প্রকৃতি, তাঁর চরিত্র সর্বোপরি সময়ে সাক্ষ্য দেয় - নজরুল ছিলেন একজন খাঁটি মুসলিম, একজন নিখাঁদ মানুষ, ছিলেন একজন মহান সাধক। তাই নজরুলের পক্ষে স্বজাতি তো বটেই কোনো জাতির প্রতিই বিদ্বেষপরায়ণ হওয়া সম্ভব ছিলো না। সত্য সাধক নজরুলের কন্ঠে তাই প্রতিধ্বনিত হয়েছে সত্যেরই অমর ধ্বনি।
মুসলমানদের সম্পর্কে সাধক নজরুলের উপলব্ধি, তাঁর উচ্চারণ যে কত বড় সত্য তা অনুধাবন করার জন্য একশ’ বছর পেছনে যেতে হবে না, আজকের সমসাময়িক বিশ্ব মুসলমান পরিচয়দানকারী জনগোষ্ঠীর দিকে তাকালেই তা ধরা পড়ে একটু খুঁটিয়ে দেখলেই।
সামপ্রতিক বছরগুলোতে ঘটে যাওয়া চরম হিংসাত্মক ঘটনাগুলো পর্যালোচনা করলেই ফুটে ওঠে নজরুল আখ্যায়িত ‘মুসলমান (?) চরিত্র’। ধরা পড়ে মুসলমান নামধারীদের যুগপৎ ‘বুনো’ ও ‘পোষা’ জানোয়ার চরিত্র!
উপমহাদেশের চলমান শান্তি প্রক্রিয়ার আকাশ ঢেকে দিচ্ছে সংঘাত-হানাহানির আশঙ্কার কালো মেঘ। বলার অপেক্ষা রাখে না এই হামলাকারীদের পরিচয় মিডিয়ার ভাষায়, ওরা ‘ইসলামি জঙ্গি (!)’।
এসব হামলাকারীদের চরিত্র নিয়ে বিতর্ক তুলতে গিয়ে প্রশ্ন উঠবেইঃ ইসলাম কি? কুরআনিক মুসলিম কে? মুসলমান কে? ইসলাম সন্ত্রাস সমর্থন / অনুমোদন করে কিনা? বাংলায় ‘শান্তি’ই আরবীতে ‘ইসলাম’। সেই শান্তি বা ইসলামের নামে অশান্তি-হানাহানি সৃষ্টি সম্মত কিনা? কিংবা মুসলিম তথা ভদ্র পরিচিত ইসলাম ধর্মাবলম্বীরা ‘বুনো’ হিংস্র পশুর মতো আচরণে মত্ত হয়ে উঠতে পারে কিনা? এসব প্রশ্ন নিয়ে ইসলাম নির্ভর ধর্মজীবীরা গভীর তাত্ত্বিক বিতর্কেও ডুবে থাকতে পারেন। পারেন ফতোয়াবাজিতে লিপ্ত হতে। কিন্তু এসব হিংসাত্মক ঘটনায় তাৎক্ষণিক ও মেয়াদী কড়া মাশুল গুনতে হয় যে কোটি কোটি ধর্মভীরু মুসলমানদের। তাত্ত্বিক বিতর্ক বা ফতোয়া কোনোই কাজে আসে না তাদের দৈনন্দিন জীবনে। ইসলাম রক্ষা বা মুসলমানদের স্বার্থ প্রতিষ্ঠার কথা বলে পরিচালিত এসব জঙ্গি হামলার ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার মাঝেই ধর্মভীরু মুসলমানদের খুঁজতে হচ্ছে এসব তৎপরতার অন্তর্নিহীত অর্থ, অঘোষিত লক্ষ্য ও চেপে রাখা ইতিহাস ও বর্তমান উদ্দেশ্য।
এই ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া বিশ্লেষণে প্রথমেই দেখতে হবে এসব হামলায় লাভবান তথা ‘বেনিফিসিয়ারী’ কারা। উল্লেখ্য, গভীর রহস্যময় ক্লুবিহীন খুনের ঘটনায় তদন্তকারী দল প্রথমেই খোঁজে খুনের সম্ভাব্য বেনিফিসিয়ারী কে বা কারা। এ পথে এগোতে গিয়েই ধরা পড়ে সম্ভাব্য খুনীর পরিচয়। এ ক্ষেত্রেও গভীর বিশ্লেষণ ছাড়াই এটা দিবালোকের মতো স্পষ্ট এসব জঙ্গি হামলার ফসল সরাসরি ঘরে উঠছে ইসলাম বিদ্বেষীদের। সমষ্টিগত ভাবে বিশ্বে সমগ্র মুসলমানরা পরিচিত হয়ে উঠছে জঙ্গি, মধ্যযুগীয়, আদিম, বর্বর হিসেবে। নতুন প্রজন্মের বিশ্ব নাগরিক কিংবা ইসলাম সম্পর্কে অজ্ঞ বিশাল জনগোষ্ঠীর কাছে শান্তি বা ইসলামকে উপস্থাপিত করা হচ্ছে আদিম বর্বরতার প্রতীক হিসাবে। ঘৃণা, অবজ্ঞা, নিস্পৃহতা জন্ম নিচ্ছে এদের মাঝে ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে।
অপরদিকে বিশ্বজুড়ে ব্যক্তিগত ভাবে ধর্মভীরু মুসলমান কিংবা জন্মসূত্রে মুসলমান পরিচয়ধারী কোটি কোটি মানুষ নিগৃহীত হচ্ছে নানাভাবে। বিশেষত ইউরোপ-আমেরিকায় ব্যক্তিগতভাবে আক্রান্ত, বঞ্চিত, নিগৃহীত হচ্ছে মুসলমানরা ব্যাপকভাবে। ব্যক্তি, গোষ্ঠী এমনকি রাষ্ট্রীয়ভাবে সমগ্র পৃথিবীতে মুসলমান পরিচয়ধারী মানুষ বৈষম্য আর অবজ্ঞা-ঘৃণার মুখোমুখি হচ্ছে প্রতিদিন। বিঘ্নিত হচ্ছে তাদের ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও পেশাগত নিরাপত্তা। ফলে ধর্মান্ধ জঙ্গিদের ‘বুনো’ চরিত্র দেখার পরও কি ধর্মভীরু মুসলমানদের মানতে হবে এরা কুরআনিক মুসলিম? সাধক নজরুলের কথা মতো জিভ ধরে টান না দিলেও এদের ইসলামি (?) ছদ্মাবরণ টেনে ছিঁড়ে ফেলাটা ধর্মভীরু বৃহৎ জনগোষ্ঠীর জন্য কি জরুরি নয়? ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার ফলাফল দেখেও কি বুঝতে অসুবিধা হয় যে এরা কারো না কারো ‘পোষা’। আর এদের গলায় বাঁধা অদৃশ্য শেকলের ও মাথায় ধরা হাতটি কার তা বুঝার জন্যও কি অনেক গবেষণার প্রয়োজন? আল-কায়েদার জন্ম কোন ল্যাবরেটরীতে? ওসামা বিন লাদেনের জন্মদাতা কে? সাদ্দাম, আরাফাত, গাদ্দাফী, জিয়াউল হক সহ বিভিন্ন স্বৈরাচারী কারা তৈরি করছে? সমগ্র বিশ্বে মুসলমান
অধ্যুষিত দেশসমূহে কারা বাদশাহী অথবা ক্ষমতা আঁকড়ে ধরে রাখার কৌশল ও অস্ত্র সরবরাহ করছে? তালেবানদের লালন-পালন আর প্রশিক্ষণ ও অস্ত্রদাতা কে এর কোনটাই আজ অজানা নয়। হয়তো এখনও অপ্রমাণিত। কিন্তু পঁচিশ-ত্রিশ বছর পরে মার্কিনীরা যখন নিয়মানুযায়ী হোয়াইট হাউস আর পেন্টাগণের ‘ক্লাসিফাইড ডকুমেন্টস্তুগুলো জনসমক্ষে প্রকাশ করবে তখন সেসব গোপন নথিতে উঠে আসবে লাদেন, আল-কায়েদা, সাদ্দাম আর তালেবান সৃষ্টির মার্কিনী পরিকল্পনা প্রণয়ন ও  বাস্তবায়নের অজানা কাহিনী। জানা যাবে তাবৎ বিভিন্ন ধর্মের ধর্মান্ধ জঙ্গিদের জন্ম জঙ্গলে (আমেরিকা!)। যেমনটি প্রকাশিত করা হয়েছে ত্রিশ বছর আগের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক হোয়াইট হাউসের বেশ কিছু ‘ক্লাসিফাইড’ দলিল। ফলে এই উপমহাদেশের মানুষ জানতে পারলো ‘সার্বভৌম’ (!) ‘মুসলিম’ (!) রাষ্ট্র পাকিস্তানের সেনাপতি ইয়াহিয়া খান দেশে সামরিক শাসন জারির আগাম অনুমতি নিয়েছিলেন তৎকালীন মার্কিন প্রভু নিক্সনের কাছ থেকে, ১৯৭১-এ।
মার্কিনীদের আজকের ক্লাসিফাইড দলিলের কাহিনী জানতে হলে বিশ্বকে অপেক্ষা করতে হবে হয়তো পরবর্তী পঁচিশ-ত্রিশ বছর। কিন্তু ততদিনে বিশ্বের কোটি কোটি ধর্মভীরু মুসলমানদের কি হবে? কি হবে পবিত্র ধর্ম ইসলামের, যা কিনা সাম্য-মৈত্রী-ভ্রাতৃত্ব তথা মানবতার মাধ্যমে ‘শান্তি’র মূলমন্ত্রে উজ্জীবিত?
কি হবে তা নিয়েই ভাবার সময় নেই আজ বিশ্বের ধর্মভীরু মুসলমানদের সামনে। ধার্মিকদের কাছ থেকে জরুরি তাগিদ আসছেঃ জেগে ওঠো। ধর্মভীরু মুসলমানরা জেগে ওঠো। কুরআনিক মুসলিম হও। চৌদ্দশ’ বছর আগে যে কুরআনকে ধারণ-লালন-পালন করে রাসুল (সাঃ) হয়ে উঠেছিলেন জীবন্ত কুরআন সেই পবিত্র কুরআনের আলোকে সত্যিকারের মুসলিম হিসাবে নিজেদের গড়ে তোলো। চৌদ্দশ’ বছর আগের সেই দ্যূতি ছড়ানো ঝলসানো আলোর মতোই বিশ্বমানবের সামনে আবারও নিজেদের তুলে ধরো সভ্যতার কান্ডারী হিসাবে - এক একটি অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত হিসাবে। ধ্বনিত হোক প্রতিটি মুসলমানের কন্ঠে সাধক নজরুলেরই সেই অমর বাণী -

‘আমি চিনেছি আমারে, আজিকে আমার খুলিয়া গিয়াছে সব বাঁধ!!’