মঙ্গলবার, ১৩ আগস্ট, ২০১৩

শোক নয় - আদর্শ ধারণ করে এগিয়ে চলাই হোক দৃঢ় প্রত্যয়

শোক নয় -
আদর্শ ধারণ করে এগিয়ে চলাই হোক দৃঢ় প্রত্যয়


শেখ উল্লাস ॥  ১৫ই আগষ্ট। বাঙালি শোক করছে কিন্তু শোককে শক্তিতে পরিণত করতে পারছে না।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার  চার দশক পরও বঙ্গবন্ধু হত্যার পর দেশে আজ সার্বিক ক্ষেত্রে যে অবস্থা তাতে  ‘আদর্শ চাই’ - আহ্বানটির বাস্তবায়নই বেশি উপলব্ধি করছে জাতি।  বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের সারা জীবনের রাজনীতি ছিল আদর্শের। চিন্তা-চেতনা, ত্যাগ, পারস্পরিক ভক্তি-শ্রদ্ধা, মানবিকতা, দেশপ্রেম, বাঙালি জাত্যাভিমান এবং  সর্বোপরি মানবতার মহান ব্রতে নিয়োজিত হয়ে এই মহান পুরুষ তাঁর জীবনে আদর্শিক ত্যাগের যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন তা আজকের দিনেও এদেশের জনগণের এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের জন্য বিরাট শিক্ষণীয় বিষয় ও নির্দেশনা।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রস্তুতি ও নির্দেশনা দিতে গিয়ে ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘আমি প্রধানমন্ত্রিত্ব চাইনা, আমি এদেশের মানুষের অধিকার চাই’। সংক্ষেপে বলতে গেলে, এদেশের মানুষের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক মুক্তিই ছিল বঙ্গবন্ধুর জীবনের একমাত্র কামনা যা তাঁর বিভিন্ন সময়ে দেয়া ভাষণে স্পষ্টভাবেই ব্যক্ত করে গেছেন। আর আদর্শগতভাবে এবং কর্মের মাধ্যমে এদেশের কৃষক-শ্রমিক ও মেহনতি মানুষের মুক্তির জন্য যখনই তিনি কর্মসূচি ঘোষণা দিয়ে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন তখনই তাঁকে হত্যা করলো স্বাধীনতাবিরোধী তথা গণবিরোধী শক্তি।
সেই ১৫ই আগষ্ট এখন রাষ্ট্রীয়ভাবে জাতীয় শোক দিবস হিসেবে পালিত হচ্ছে। এই শোক দিবসে কালো ব্যাজ ধারণ, বঙ্গবন্ধুর ভাষণ ও মুক্তিযুদ্ধের গান শোনা, বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ, কাঙালী ভোজের আয়োজন ইত্যাদি আনুষ্ঠানিকতা তখনই সার্থকতা পেতে পারে যখন বঙ্গবন্ধুর আদর্শ  তাঁর দেশের বিশেষ করে তাঁর দলের প্রতিটি নেতা-কর্মী, সমর্থক ও তাঁর আশীর্বাদপুষ্ট প্রতিটি নাগরিক তাদের নিজেদের জীবনে ধারণ করবে। অথচ দুঃখজনক হলেও একথা আজ সত্য যে, তাঁর আদর্শকে ধারণ করে এরকম নেতা-কর্মীর সংখ্যা এখন ক’জন পাওয়া যাবে? ত্যাগের মানসিকতাসম্পন্ন, দেশের কৃষক-শ্রমিক, সাধারণ মানুষের স্বার্থকে নিজের স্বার্থ বলে ভাবছে এবং তাদের সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে রাজনীতি করছে এমন নেতা-কর্মীর সংখ্যা এখন নিদারুণভাবে কমে যাচ্ছে অথবা তাদের প্রয়োজন গৌণ হয়ে পড়েছে যা দেশের সার্বিক উন্নতির পথে মারাত্মক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে। সরকারি টাকা খরচ করে যে বঙ্গবন্ধুর নামে অনুষ্ঠান, ব্যানার-ফেষ্টুন তৈরি করে বঙ্গবন্ধু-দরদী সাজা যায়, কিন্তু বঙ্গবন্ধুর আদর্শের একজন সৈনিক হওয়া এবং তাঁর আদর্শকে ধারণ, লালন ও পালন করে দেশকে অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিকভাবে মুক্তি দেয়ার লক্ষ্যে কাজ করা যায় না তা বোধ হয় এখন জরুরি ভিত্তিতে ভেবে দেখার সময় এসেছে। আর তা না হলে দেশ আরও সাংস্কৃতিক সংকটের দিকেই অর্থাৎ অন্ধকারের দিকেই ধাবিত হবে।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের জীবদ্দশায় তাঁর দেয়া ভাষণগুলোর যে কোনোটির দিকে তাকালে তাঁর আদর্শ কী ছিল তা বুঝতে সহায়ক হতে পারে।  কৃষক-শ্রমিকদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল বঙ্গবন্ধু বলতেন, ‘করাপশন আমার বাংলার কৃষকরা করেনা। করাপশন আমার বাংলার মজদুররা করেনা। করাপশন করি আমরা শিক্ষিত সমাজ’। তাই দেশের কৃষক, শ্রমিক ও মেহনতি মানুষের প্রতি শিক্ষিতদের আহ্বান জানিয়ে বঙ্গবন্ধু বলেছেন, ‘ওদের সম্মান করে কথা বলুন, ইজ্জত করে কথা বলুন। ওদের দ্বারাই আপনার সংসার চলে। আমাদের লেখাপড়া শিখিয়েছে কে? ডাক্তারি পাস করায় কে? ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করায় কে? বৈজ্ঞানিক করে কে? অফিসার করে কে?-বাংলার দুখী জনগণের টাকায়’।
বঙ্গবন্ধুর রক্তঋণে অর্জিত এই দেশে আজ রাজনীতি, ব্যবসা ও আমলাতন্ত্রের সুবিধা নিয়ে একটি অতি সুবিধাভোগী রাজনীতিকদের হাতে দেশটি যেভাবে কুক্ষিগত হয়ে পড়েছে, বিশাল জনগোষ্ঠীকে যেভাবে বঞ্চনা ও উপহাসের পাত্র করে তোলা হচ্ছে সাম্প্রতিক তার সর্বশেষ উদাহরণটি হচ্ছে সাম্প্রতিক রাজনীতিকদের সাথে সাধারণ মানুষের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া। তাই আর সময় নেই। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের আদর্শকে যারা ধারণ করেনা তাদেরকে তাঁর নামে পরিচালিত দল থেকে ছুড়ে ফেলে দেয়ার এখনই সময়। বাংলার মানুষের মুক্তির জন্য মুজিব যে ত্যাগ স্বীকার করেছিলেন তা আজও প্রতিষ্ঠিত হয়নি। সময় এসেছে তাঁর আদর্শ বাস্তবায়নে দৃঢ় প্রত্যয়।

ধারণ পদ্ধতির সংস্কার ব্যতীত - ধার্মিক হওয়া যায় না



ধারণ পদ্ধতির সংস্কার ব্যতীত
ধার্মিক হওয়া যায় না

সাদিকুল হক ॥ দৈনন্দিন জীবনে এমন কোন বস্তু নেই যা মানুষ ব্যবহার করে কিন্তু সংস্কার করে না। বাড়ী, গাড়ি, কম্পিউটার ইত্যাদি প্রতিটি বস্তুই ব্যবহার উপযোগি রাখতে প্রতিনিয়ত সংস্কার করতে হয়। ঠিক তেমনি নিজেকে সময়োপযোগি করতে হলেও সংস্কার করতে হয়। নিজেকে সংস্কার করার অর্থ - আচার, আচরণ ও কথাবার্তায় নিজেকে পরিবেশের কাছে আকর্ষণীয় ও গ্রহণযোগ্য করে তোলা। নিজেকে আরো উন্নত ও উদার করার লক্ষ্যে নতুন উদ্যমে নতুন পথে যাত্রা করা, নিজের জীবনে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করা।
সংস্কারকরা যে সব সংস্কার এনেছিলেন তার জন্য আধুনিক বিশ্বের মানুষ তাঁদেরকে সম্মান করে। এ কথা সত্য প্রত্যেক সংস্কারের ক্ষেত্রে কোন সংস্কারকই মানুষের অবহেলা ও অত্যাচার থেকে রেহাই পাননি। মানুষ সুদূর অতীতে যে সব সংস্কার এনেছে তা মেনে নেয় কিন্তু বর্তমানে সংস্কারের উদ্যোগ নিলে কেউ তা মেনে নিতে চায় না। যে আরব জাতি নবী মোহাম্মদ (সা.)-কে পাথর ছুঁড়ে আঘাত করেছে সে আরব জাতি তথা গোটা পৃথিবীতেই তিনি (সা.) এখন শ্রেষ্ঠ মানবের আসনে অধিষ্ঠিত। কিন্তু এখনও নবী (সা.)-এঁর অনুসরণে যদি কোন মানুষ রীতি-নীতি ও প্রথা সংস্কার করতে চায়, তাহলেও একইভাবে তার ওপর অত্যাচার করা হয়ে থাকে। জগতে এমন কোন সংস্কারক নেই যাকে সাদরে গ্রহণ করা হয়েছে।
তবু যুগে যুগে এসেছেন সংস্কারক নিন্দা ও নির্যাতন উপেক্ষা করে। জীবনের সাথে সম্পৃক্ত প্রতিটি বিষয়ে সংস্কারও চলছে সেই আদি কাল থেকেই বাধা বিপত্তি অতিক্রম করে জীবনেরই প্রয়োজনে।
মানুষ সর্বদাই চেয়েছে তার কায়িক শ্রম ও কষ্ট লাঘব করতে। আদিম যুগে মানুষ ছিল কেবল পেশিশক্তি সর্বস্ব। কালের প্রবাহে মানুষ তার সৃজনশক্তির বিকাশ ঘটিয়েছে। মানুষ শিখেছে জীবনের প্রয়োজনে ব্যবহার করতে বাতাসের শক্তিকে। ধীরে ধীরে শিখেছে পানি, বাষ্প, আর পরমাণু শক্তির ব্যবহার। শক্তির ব্যবহারে মানুষের কায়িক শ্রম লাঘব হয়েছে। ফলে মানুষ এখন পারছে তার বুদ্ধি ও বিবেচনা শক্তিকে আরো উন্নততর উদ্দেশে কাজে লাগাতে। এই বিবেচনা-শক্তিই মানুষকে মহৎ করেছে এবং একে অপরের সহযোগিতার ক্ষেত্রকে প্রশস্ত করেছে, দিয়েছে সমাজ সংস্থাকে দৃঢ়তা। মানুষ কতটা তার পেশি শক্তির ব্যবহার কমাতে পেরেছে, কতটা প্রাকৃতিক শক্তিকে কাজ লাগাতে পারছে, তা দিয়ে মানুষের সমাজে পিছিয়ে থাকা বা এগিয়ে যাওয়ার বিচার-বিশ্লেষণ করা হয়। মানুষ ব্যতীত আর কোন প্রাণী শক্তিকে ব্যবহার করতে শিখেনি তাই পারেনি নিজেদের বিকাশ ঘটাতে। ধর্ম কাজ করেছে সৃজনশক্তির সহায়ক শক্তি হিসেবে। মানুষ এক ব্যতিক্রমী প্রাণী। সে শুধুমাত্র বেঁচে থাকতে চায় না, আরো কিছু করতে চায়, যা অন্য প্রাণীদের পক্ষে এখনো সম্ভব হয়নি। এই অসীম সৃষ্টির প্রবাহে সে শুধু প্রকৃতির অংশ ও প্রাণী জগতে সদস্য হিসাবে থাকতে চায় না। মানুষ এই জৈব প্রবাহের তরঙ্গে জেগে ওঠা এক সচেতন সত্তা,  যে সত্তা চায় এই প্রবাহকে নিয়ন্ত্রণ করতে, সব কিছুকে আপন আশা-আকাঙ্খা দিয়ে গড়তে। এই গড়ার ইচ্ছা থেকেই উদ্ভব হয়েছে মানুষের ধর্ম্ম ও সংস্কৃতি। ধর্ম্মের মাধ্যমে মানুষ চেয়েছে তার জীবনকে অর্থময় করে তুলতে। মানুষ যেমন প্রকৃতিকে বুঝতে শিখেছে তেমনি বুঝতে শিখেছে নিজের ধর্ম্মকে।
ধর্ম্ম ধারণ করা। যা ধারণায় ছিল এবং দৈনন্দিন কর্মপ্রবাহে যা ধারণ করছি তা-ই তো ধর্ম! কী ধারণ করবো আর কী ধারণ করবো না, কীভাবে, কতটুকু ধারণ করবো এইসব নিয়েই তো ধর্ম! প্রযুক্তির উন্নয়নে বদলে গেছে ধারণের বিষয়বস্তু, গতি, গুণ ও পরিমাণ। সুতরাং ধর্মজগতেও চলছে সংস্কার অবিরাম। সংস্কার যত উন্নত ও সময়োপযোগিই হোক না কেন তাকে আবার সংস্কার করতে হয়। সংস্কারের কোন শেষ নেই। সংস্কার এক অন্তহীন অভিযাত্রা। সংস্কার শেষ হয়ে গেলো তো বিকাশ থেমে গেলো। পুরাতন ধারণ পদ্ধতি পালনে নতুনকে ধারণ করা যায় না। তাই ধর্ম হয় না। ধার্মিক হতে হলে সংস্কার আনতেই হবে ধারণ পদ্ধতিতে। ধারণ পদ্ধতির সংস্কার ব্যতীত কেউ ধার্মিক হতে পারবে না।

ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করাই ধর্মদ্রোহীতা

ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করাই ধর্মদ্রোহীতা

সংলাপ ॥ ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, পৃথিবীতে যখনই কোনো সম্প্রদায় ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করেছে তখনই তাদের পতন হয়েছে। ধর্মের ব্যাপারে সীমা লঙ্ঘন করে অনেক জাতি-গোষ্ঠী ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে। ধর্মের নামে অনাচার, ধর্মকে ব্যক্তি ও গোষ্ঠীস্বার্থে ব্যবহার, ধর্মের মর্মবাণীর বিকৃতি, ধর্মের বিধানকে এড়িয়ে চলা, ধর্মের নামে অন্ধত্ব, ধর্মের সহজ-সরল সাবলীল রূপকে রুক্ষ-শুষ্কভাবে উপস্থাপন, ধর্ম পালনের আড়ালে ধর্মব্যবসা ও ধর্মের আশ্রয়ে অমানবিকতা ও অধর্ম চর্চার মাধ্যমে বিশ্বসমাজ থেকে বহু ধর্মের বিলুপ্তি ঘটেছে। ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি হলে ধর্ম তার শাশ্বত ও চিরন্তন অবস্থানকে হারিয়ে ফেলে এবং মানব সমাজে তার গ্রহণযোগ্যতা ও উপযোগিতা হ্রাস পায়। ধর্ম নিয়ে ইতিহাসের এই শিক্ষাকে পাশ কাটিয়ে বর্তমানে বাংলাদেশে ধর্মের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি পরিলক্ষিত হচ্ছে যা কোনো ধর্মপ্রাণ মানুষের কাজ হতে পারে না।
ধর্মের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, যুগে যুগে ধর্মের নামে বাড়াবাড়ি হয়েছে। হজরত মুসা (আ.)-এর সময়ে তাঁর অনুসারীদের মধ্য থেকে একটি অংশ চরম ধর্মীয় বাড়াবাড়িতে লিপ্ত হয়েছিল। কুরআনে তাদের কার্যক্রম ও পরিণতির বর্ণনা রয়েছে। একইভাবে হজরত ঈসা (আ.)-এর সময়ও ধর্মীয় বাড়াবাড়ি ছিল। তাকে ক্রুশবিদ্ধ করেছিল সমসাময়িক আদালত। মুহাম্মদ (সা.)-এঁর সময়েও ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি হয়েছে। এসব বাড়াবাড়িকে উপেক্ষা করে মহানবী (সা.) আল্লাহ কর্তৃক আদিষ্ট হয়ে পরিষ্কারভাবে  জানিয়ে দিয়েছেন - ‘লাকুম দিনুকুম ওয়ালিয়াদিন’ অর্থাৎ তোমাদের ধর্ম তোমাদের জন্য আর আমাদের ধর্ম আমাদের জন্য। রাসুল (সা.) অবিশ্বাসীদের সঙ্গে কোনো প্রকার বাদানুবাদে লিপ্ত হননি; তিনি কৌশলে ধর্মীয় উস্কানি ও সংঘাতকে এড়িয়ে গেছেন। ধর্মের ব্যাপারে অন্যরা বাড়াবাড়ি করলেও মহানবী (সা.) ও তাঁর অনুসারীদের পক্ষে তা করা সম্ভব নয়। আর সে জন্যই আল্লাহ তায়ালা নির্দেশ করেছেন - ‘লা ইক্রাহা ফিদ্দিন’ অর্থাৎ ধর্মের ব্যাপারে কোনো জোর-জবরদস্তি নেই। ধর্ম তার উদার, নৈতিক ও চিরন্তন বিধিবিধান নিয়ে সত্য-ন্যায় ও ইনসাফের যাত্রায় এক চলমান শান্তিময় প্রত্যয়; পরম করুণাময়ের কৃপাধন্য অভিযাত্রীরাই তাতে পথ চলে সমস্যাসংকুল জীবনের কণ্টকাকীর্ণ যাত্রায় উত্তীর্ণ হয়ে অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছে নিজেকে প্রশান্ত করেন। আল্লাহপাক বলেন, ‘ফাদ্‌খুলি ফি ইবাদি ওয়াদ্‌খুলি জান্নাতি’ অর্থাৎ আমার অনুগত বান্দাদের দলে প্রবিষ্ট হও আর আমার শান্তিরজগতে প্রবেশ কর। সুতরাং প্রত্যেকেই তার নিজস্ব প্রয়োজনে ধর্মের প্রতি আনুগত্যশীল হবে অথবা হবে না কিন্তু কাউকে ধর্ম পালনের জন্য জোরজবরদস্তি করা কোনোমতেই কুরআন সমর্থন করে না।
ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ির কুফল সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি অবগত ছিলেন আমাদের প্রিয় মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)। আর তাই তিনি সবাইকে সতর্ক করে দিয়ে বলেছিলেন - ‘সাবধান! ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি কর না। এ বাড়াবাড়ির ফলে তোমাদের পূর্বে অনেক জাতি ধ্বংস হয়ে গেছে।’
ধর্ম মানুষকে পুণ্যবান ও ধার্মিক করে, উদারতা ও সহনশীলতার শিক্ষা দেয়। ধর্মের মূল বাণীসমূহ পবিত্র, উন্নত ও মানবিক জীবন-যাপনে মানুষকে সহায়তা করে। সমাজ-সভ্যতা ও পরিবেশ থেকে যাবতীয় অন্ধকার, কুসংস্কার ও অজ্ঞতা দূরীভূত করে সত্য, সুন্দর ও ন্যায়ের আলোকবর্তিকা প্রজ্বলিত করে ধর্ম। সব ধর্মই এসেছে এমন এক মহান সত্তার পক্ষ থেকে, যিনি পৃথিবী ও এর মধ্যকার সব কিছুরই স্রষ্টা। সৃষ্টি কিসের মাধ্যমে ভালো থাকবে, কিভাবে সমৃদ্ধ হবে, কোন পন্থায় জীবনযাপন করলে শান্তি আসবে, মুক্তি মিলবে, সে সম্পর্কে তিনি সম্যক অবহিত। তাই তো পৃথিবীতে ধর্মের আগমন; ধর্মের মাধ্যমেই ভালো-মন্দের, পাপ-পুণ্যের বিচার-বিবেচনা নিহিত রয়েছে। মানুষ ও মানবতার প্রকৃত শান্তি ও সার্বিক মুক্তি ধর্মের মাধ্যমেই অর্জিত হয়।
পবিত্র ধর্ম ইসলামের নির্দেশ হলো - ‘উদ্‌উ ইলা সাবিলি রাব্বিকা বিল হিকমাতি ওয়াল মাউইযাতিল হাসানা’ অর্থাৎ ‘তোমরা মানুষকে আল্লাহর পথে আহ্‌বান কর হেকমত ও প্রজ্ঞার সঙ্গে এবং উত্তম উপদেশ সহকারে।’ এ নির্দেশে দুটি বিষয় খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। প্রথমটি হলো, মানুষকে ইসলামের পথে আহ্‌বান করতে হলে প্রয়োজন হেকমতের। হেকমত অর্থ - জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও কৌশল। সুতরাং ইসলামের কথা বলতে হলে জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও কৌশল প্রয়োজন। আর দ্বিতীয়টি হলো উত্তম উপদেশ। ইসলামকে যারা ধারণ করবেন তাদের মধ্যে মানুষকে উত্তম উপদেশ বা সৎ পরামর্শ দানের যোগ্যতা থাকতে হবে। যাদের মধ্যে প্রজ্ঞার অভাব থাকবে আর যারা উত্তম উপদেশ দানের অযোগ্য তারা যখন ইসলাম হেফাজতের দায়িত্ব নিবেন তখন সেটি ইসলামের হেফাজত না হয়ে তা ধর্মের নামে বাড়াবাড়ির রূপ পরিগ্রহ করবে। তাতে ধর্মের কোনো কল্যাণ হবে না, বরং মানুষ বিভ্রান্ত হবে এবং সমাজে অস্থিরতা বৃদ্ধি পাবে।
বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ ধর্মভীরু। ধর্মীয় আবেগ এ অঞ্চলের জনমানুষকে আপ্লুত করে। এ দেশের সব ধর্মাবলম্বী মানুষ আবহমান কাল থেকে পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির সঙ্গে বসবাস করছেন। ইসলাম, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান - এ দেশের প্রধান চারটি ধর্ম। জনসংখ্যার অনুপাতে ইসলাম ধর্মাবলম্বী মুসলমানদের সংখ্যা শতকরা নব্বই ভাগ। ইসলামের উদার নীতি ও অসাম্প্রদায়িক আদর্শের কারণেই হাজার বছর ধরে জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে এখানে সবার শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান বিদ্যমান। যেহেতু এদেশে মুসলমানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ সেহেতু অন্য ধর্মাবলম্বীরা যেন কোনো অবস্থাতেই তাদের ন্যায্য, ন্যায়সঙ্গত, ধর্মীয় ও সাংবিধানিক অধিকার থেকে বঞ্চিত না হয় সে বিষয়টি সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগণকেই নিশ্চিত করতে হবে। ইসলামের ইতিহাসে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর অত্যাচার, নিপীড়ন বা নির্যাতনের কোনো নজির তো নেই-ই বরং তাদের সব মৌলিক ও মানবিক অধিকার প্রাপ্তির বিষয়টি সুদৃঢ়ভাবে স্বীকৃত রয়েছে। অসাম্প্রদায়িক চেতনার মূর্ত প্রতীক মহানবী (সা.) বলেছেন- ‘কোনো সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম এলাকায় যদি সংখ্যালঘু অমুসলিম সম্প্রদায়ের ওপর কোনো ধরনের অত্যাচার-নির্যাতন হয় তাহলে কেয়ামতের ময়দানে আমি সেই এলাকার অমুসলিম সংখ্যালঘুদের পক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের বিরুদ্ধে আল্লাহর দরবারে মামলা দায়ের করব।’ রাসূল (সা.)-এর এমন কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণের পরও যদি কোন মুসলমান ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করে তাহলে সে আর যাই হোক, মুসলমান থাকে না। সে হয়ে যায় অবাধ্য তথা সীমালঙ্ঘনকারী আর তার পরিণতিতে সে হয় আল্লাহ-রাসূলের ক্রোধের পাত্র; যা থেকে কেউ তাকে হেফাজত করতে পারবে না।
বাংলাদেশ পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম জনঅধ্যুষিত দেশ। হজরত শাহজালাল ইয়ামেনি, হজরত শাহ সুলতান রুমি, হজরত শাহ পরাণ, হজরত খানজাহান আলী, হজরত শাহ মাখদুমসহ অসংখ্য অলি-আউলিয়া, সুফি-সাধক ও গাউস-কুতুবের পদভারে আজ পর্যন্ত ধন্য এই দেশ। সুফি-সাধকদের নির্মোহ চরিত্র, নির্লোভ চিত্ত আর তপস্যাময় জীবনের স্পর্শে এ দেশের জনমানুষের হৃদয়ের মণিকোঠায় ইসলাম এক মানবতাবাদী ধর্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। ইসলামের প্রচার-প্রসারে সাধকদের অবর্ণনীয় ত্যাগ-তিতিক্ষা, কষ্ট-যাতনা ও দুর্ভোগের কাহিনী আমাদের জাতীয় ও ধর্মীয় ইতিহাসের এক অনবদ্য দলিল হয়ে আছে। এ মহান ধর্মের মৌলিকত্ব ও পবিত্রতা রক্ষা করা আমাদের অন্যতম দায়িত্ব। আমাদের আচরণে-ব্যবহারে, বক্তৃতা-বিবৃতিতে, কার্য সম্পাদনে বা কর্মসূচি প্রণয়নে এ ধর্ম যেন আঘাতপ্রাপ্ত না হয়, বিতর্কিত বা অবমাননার শিকার না হয়। ধর্ম পালন হৃদয়ের ব্যাপার, বিশ্বাস ও ভক্তির বিষয়; এতে যেন জোর-জবরদস্তি না থাকে এটাই কাম্য।

সময়ের সাফ কথা....রাজনীতিকদের ব্যবসা ও ব্যবসায়ীদের রাজনীতি



সময়ের সাফ কথা....
রাজনীতিকদের ব্যবসা ও ব্যবসায়ীদের রাজনীতি

আরিফীন হক ॥ রাজনীতি কি এবং কেন এসব বিষয় নিয়ে তাত্ত্বিক আলোচনা এখন অনাবশ্যক ও হাস্যকর। যে সব তত্ত্বের কোন প্রয়োগ নেই সেসব নিয়ে কথা বলে কোন লাভও নেই। যখন কোন রাজনীতিক দেশ ও জাতির কল্যাণে নয়, নিজেদের দলের স্বার্থে এবং নিজের সাময়িক লাভ-ক্ষতির নিমিত্তে দলাদলি এবং কর্মনীতি পরিচালনা করেন তখন তাকে রাজনীতিক বলা যায় না। বলতে হয় - রাজনীতিকদের ব্যবসা।
দেশে এখন এই রাজনীতিক ব্যবসারই জয়জয়কার। রাজনীতিকদের সকল কর্মকান্ড ক্ষমতাকে ঘিরে। কেউ ক্ষমতায় যেতে চায় আর যারা ক্ষমতায় আছে তারা ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করতে চান। এর বাইরে মানুষের জন্য কোন রাজনৈতিক কর্মতৎপরতা এখন আর চোখে পড়ে না। কে কতটা দেশ ও জাতির কল্যাণ করতে পেরেছেন  এর উপর ভিত্তি করে আর রাজনীতিকদের মর্যাদা দেয়া হয় না। রাজনীতিকদের মর্যাদা এখন ক্ষমতা কেন্দ্রিক।
দেশের প্রতিটি ক্ষেত্রে  এখন ছড়িয়ে পড়েছে রাজনীতি। এমন কোন প্রতিষ্ঠান নেই যে প্রতিষ্ঠানে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে রাজনীতি লালিত হয় না। দেশে এখন কোন বিশুদ্ধ শিল্পপতি বা বুদ্ধিজীবী নেই, আছেন এদল বা ওদলের সমর্থক।
ব্যসায়ীরাও রাজনীতি করতে পারেন আবার রাজনীতিকরাও ব্যবসা করতে পারেন, কোন বাধা নেই। কিন্তু যেসব ব্যবসায়ী রাজনীতিতে এসেছেন তাদের উদ্দেশ্য কি দেশ ও জনগণের কল্যাণ, না-কি রাজনৈতিক প্রভাব-প্রতিপত্তি ও ক্ষমতাকে ব্যবহার করে নিজের ব্যবসা সমপ্রসারণ - এটি দেখতে হবে। অন্যদিকে যেসব রাজনীতিক ব্যবসায় জড়িয়ে  পড়েছেন তারাও কি ক্ষমতাকে নিজ স্বার্থে ব্যবহার করছেন না?
আসলে বাংলাদেশের রাজনীতি এখন অতি সামান্য ব্যতিক্রম ব্যতিত আগে ব্যবসায়ী ও পরে রাজনীতিক এবং আগে রাজনীতিক ও পরে ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণে। দেশের রাজনীতি বিপর্যস্ত হবার এটাই মূল কারণ।
সাধারণ মানুষও এ বলয়ে আবদ্ধ হয়ে আছে। জনগণের একটা বিরাট অংশ তাদের রায় অল্পমূল্যে বিক্রি করে। তাই দলের মনোনয়ন পেতে এখন নীতি, আদর্শ বা ত্যাগ বিবেচনায় আসে না, কে কতটা অর্থ-বিত্তের মালিক  সেটাই হয়ে আছে যোগ্যতার মানদন্ড। মনোনয়নের এ অগণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতাই রাজনীতিকদের ব্যবসার দিকে এবং ব্যাবসায়ীদের রাজনীতির দিকে আকর্ষণ সৃষ্টি করছে। ফলে বাংলাদেশ একটি জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্র না হয়ে ক্রমেই ব্যক্তি-দল এবং গোষ্ঠীকল্যাণ মূলক রাষ্ট্রে পরিণত হচ্ছে। দেশে এখন গণতন্ত্রের বদলে কায়েম হতে চলেছে ব্যবসাতন্ত্র!

মঙ্গলবার, ৩০ জুলাই, ২০১৩

সময়ের কান্ডারী



সময়ের কান্ডারী

সংলাপ ॥ আওয়ামী লীগ আবারও ক্ষমতায় আসবে বলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের মন্তব্য রাজনীতিতে বিতর্কের পরিবেশ সৃষ্টি করেছে, একই সঙ্গে তার রাজনীতিতে আগমনকে বিতর্কিত করছে । রাজনীতির শুরুতেই তার এই বক্তব্য দুষ্ট রাজনীতিকদের মধ্যে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। তিনি রাজনীতি শুরু করেছেন যুবলীগের রাজনীতির সঙ্গে একাত্ম হয়ে, যে রাজনীতিকে সত্যের পথে চাঙ্গা করে তুলতে হবে আগামী চার মাসের মধ্যে তবেই দেশবাসী তাকে আপন করে নেবে। জয়ের এখন সময় তৃণমূলে যাওয়া তারপরে রাজনীতিতে নিজস্ব মেধায় রূপরেখা প্রনয়ণ করা। রাজনীতিতে তার  আগমন তরুণ সমাজ ও নেতৃত্বের মধ্যে আলোড়ন সৃষ্টি করুক এটাই জাতির কামনা।
রাজনীতিতে জয়ের আগমন আকস্মিক নয়। গত নির্বাচনের আগেও গুঞ্জন উঠেছিল তিনি রাজনীতিতে আসছেন। এবার তিনি এসেছেন কিন্তু  রাজনীতির মাঠটি কর্দমাক্ত। আওয়ামী লীগের বর্তমান অবস্থায় নেতৃত্বে তরুন প্রজন্মের বিকল্প নেই । রাজনীতিতে আসার আগে জয়ের যে রাজনৈতিক শিক্ষা নেয়া হয়েছে তার প্রতিফলনের জন্য তৃণমূল পর্যায়ে যাওয়া সময়ের দাবী। বছরের পর বছর রাজনীতি করে আওয়ামী নেতৃত্ব আদর্শিক যায়গায় দিশেহারা হওয়ার পথে, তাই এখন নতুন প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায়  যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও শাস্তির নিশ্চয়তা করনের পথ ধরে জনতাকে সঙ্গে নিয়ে মাঠে নামতে হবে তবেই আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসবে। সংকীর্নতা আর মিথ্যাচার পরিহার করে সত্যের ঝান্ডা ধরে সাংষ্কৃতিক আন্দোলনের পথই এখন জাতীয় জীবনে কাম্য। এ নিয়ে বিতর্কের কিছু নেই। জয় যে বলেছেন, তার কাছে তথ্য-উপাত্ত রয়েছে। সেই তথ্য উপাত্ত কী তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে ঘূর্নিঝড় উঠেছে। তার এই বক্তব্য নতুন করে বিরোধী মহল ভয়ে বিচলিত হয়ে বিতর্কের সৃষ্টি করছে।
জয়কে এখন সিদ্ধান্ত নিতে হবে রাজনীতিতে তিনি কী ভূমিকায় থাকবেন-বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও সমাজ পরিবর্তন না শুধু ক্ষমতায় যাওয়ার রাজনীতি। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পুত্র না বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের দৌহিত্র? বঙ্গবন্ধু ছিলেন হৃদয়বান এবং বাঙালি মনষতার শীর্ষে। বঙ্গবন্ধুর নাতি হিসেবে জনমনে যে উচ্ছাস রয়েছে তা নিয়েই রাজনীতিতে তার যাত্রা হোক শুরু। জয়ের মধ্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে দেখতে চায় জাতি। 
বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বঙ্গবন্ধুর মতো একটি বিশাল ভুমিকা রাখার সুযোগ এখন জয়ের সামনে। নির্বাচন ব্যবস্থা কী হবে কার অধীনে হবে এমন বিতর্ক চলছে। রয়েছে এক ধরনের অনিশ্চয়তাও। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য জয় নতুন প্রজন্মের কান্ডারি হয়ে একটি জাতীয় গ্রহণযোগ্য উদ্যোগ নিক এবং বঙ্গবন্ধুর মতোই বাঙালির ভালোবাসা পাক এটাই সময়ের প্রত্যাশা।