মঙ্গলবার, ৫ নভেম্বর, ২০১৩

হরতালে বিপন্ন মানবতা!



হরতালে বিপন্ন মানবতা!

আরিফিন হক ॥ বাংলাদেশে হরতাল এখন একটি ধ্বংসাত্মক, আতঙ্কের শব্দে পরিণত হয়েছে। এ দেশের শতকরা ৯৫ ভাগ লোকই হরতাল পছন্দ করে না। তা সত্ত্বেও এদেশের জনগণকে বার বার হরতালের কালো থাবার কবলে পড়তে হচ্ছে। গত হরতালে বিএনপি-জামাতের সহিংস পিকেটিংয়ে ১৯ জন প্রাণ হারিয়েছে। সামপ্রতিককালে হরতালের চরিত্রই পাল্টে গেছে প্রতিহিংসাপরায়ণ হিংস্র রাজনীতির ঘৃণ্য তৎপরতায়। গত ২৭ থেকে ২৯ অক্টোবর ৬০ ঘণ্টার হরতালের আগের দিন অর্থাৎ ২৬ অক্টোবর সন্ধ্যায় আগামী নির্বাচন সম্পর্কে আলোচনা করার লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা টেলিফোনে বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়াকে ২৮ অক্টোবর গণভবনে আসার আমন্ত্রণ জানানোসহ দেশ, জাতি ও জনগণের স্বার্থে হরতাল প্রত্যাহার করার আহ্বান জানান কিন্তু বিরোধী দলীয় নেতা প্রধানমন্ত্রীকে জানিয়ে দেন - ‘হরতাল প্রত্যাহারের সুযোগ নেই। বিরোধীদলীয় নেতার মনোভাব এমন ছিল যে - হরতাল হতেই হবে। হরতাল হলোও বটে কিন্তু হরতালে ঝড়ে গেলো ১৯টি তাজা প্রাণ। ৪ নভেম্বর থেকে দ্বিতীয় দফায় ৬০ ঘন্টার হরতাল চলছে। এ পর্যন্ত পাওয়া খবরে হরতালের প্রথম দিনে সহিংসতায় নিহত হয়েছে অন্তত ২ জন। ব্যাপকভাবে নাশকতা ও সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। নানা স্থানে বোমাবাজিসহ ট্রেনে হামলা হয়েছে। এর দায় কে নেবে? যারা প্রাণ হারাল তাদের কী অপরাধ? তারা কেন রাজনৈতিক সহিংসতার বলি হলো? বাংলাদেশ একটি স্বাধীন-সার্বভৌম গণতান্ত্রিক দেশ অথচ মানুষের জীবন কত তুচ্ছ? কুকুর-বেড়ালের জীবনের চেয়েও অধম। পশু-পাখির মতো মারা যাচ্ছে মানুষ। বাংলাদেশে এখন মানুষের মূল্য সবচেয়ে কম। কার কখন কোথায় প্রাণ যাবে বলা মুশকিল। এর জন্য কারো কোনো দায় বা জবাবদিহিতাও নেই। এটা কি গণতান্ত্রিক দেশের চিত্র? বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে হরতালের উপযোগিতা ও কার্যকারিতা নেই বললেই চলে। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে জনস্বার্থ সংরক্ষণ বা গণদাবির সঙ্গে হরতালের কোনো সম্পর্ক নেই। এমতাবস্থায় হরতালের  চেয়ে বড় মানবাধিকার লঙ্ঘন আর কোনোটা নয়। হরতাল এখন একটি জনআতঙ্কের নাম, নাশকতার নাম। হরতাল ডাকলেই দেশের জনগণ আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়ে। হয়ে পড়ে নিরাপত্তাহীন। হরতাল চলাকালে জননিরাপত্তা পদে পদে বিঘ্নিত হয়, বিপন্ন হয় মানবতা। দীর্ঘ দিন থেকে আমরা  দেখে আসছি হরতাল শুরুর আগের দিন থেকেই চলে ব্যাপক নাশকতা ও ভাংচুর। হরতালে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশের অর্থনীতিও। শত শত কোটি টাকার জাতীয় সম্পদ বিনষ্ট হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছে লাখ লাখ শির্ক্ষার্থী। ৪ নভেম্বর থেকে শুরু হবার কথা ছিল জেএসসি ও জেডিসি পরীক্ষা, যাতে ২০ লাখ শিক্ষার্থী অংশ নেবার কথা রয়েছে। এ ছাড়া চলছে ২০১৪ সালের এসএসসি পরীক্ষার্থীদের নির্বাচনী পরীক্ষা। অথচ এরই মধ্যে টানা তিন দিনের হরতালের কবলে পড়ল দেশ! হরতাল আহ্বানকারীরা কি পরীক্ষার খবর রাখে না? তাদের সন্তানরা কি স্কুল কলেজে লেখাপড়া করে না? পরীক্ষা চলাকালে হরতাল দেয়া কোনো রাজনৈতিক দলের সুবিবেচনাপ্রসূত সিদ্ধান্ত হতে পারে না। কারণ জাতীয় স্বার্থের পাশাপাশি ছাত্রছাত্রীদের ভবিষ্যৎও  দেখতে হবে। সুতরাং রাজনৈতিক আবেগের বশবর্তী হয়ে বা খামখেয়ালিবশত যখন তখন হরতাল ডাকাতে রাজনৈতিক দূরদর্শিতার কোন পরিচয় মেলে না। এটা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির মধ্যেও পড়ে না। হরতালে আজ মানবতা বিপন্ন। হরতালে সরকার বিপদে পড়ে না। বিপদে পড়ে দেশের সাধারণ মানুষ। হরতালে রক্ত ঝড়ে, মানুষ মরে। রক্তের এই হোলিখেলা বন্ধ করতেই হবে। আমরা আশা করি, বিরোধী জোটের শুভবুদ্ধির উদয় হবে এবং ভবিষ্যতে তারা প্রতিবাদ ও আন্দোলনের ক্ষেত্রে হরতালের বিকল্প খুঁজে বের করবে।

এখন বিভেদের সময় নয়



সময়ের সাফ কথা ....
এখন বিভেদের সময় নয়

সাদিকুল হক ॥ ইসলাম অর্থ শান্তি। আল্লাহর কাছে নিজেকে সমর্পন করে শান্তি লাভের ধর্ম হচ্ছে ইসলাম। বাংলাদেশে ইসলাম এবং স্বাধীনতার শত্রুরা অভিন্ন। স্বাধীনতার শত্রুরা এখন এক জোট হয়ে মরণ কামড় দিচ্ছে। বাঙালী জাতির অস্তিত্বের লড়াই চলছে এখন। তাই যারা দেশকে ভালবাসেন, স্বাধীনতাকে ভালবাসেন তাদের ভেবে দেখা উচিত - এখন বিভেদের সময় নয়, সমালোচনার সময় নয়। ঐক্যবদ্ধভাবে স্বাধীনতার শত্রুদের প্রতিহত করার সময় এসেছে। পলাশীর যুদ্ধে সিরাজউদদ্দৌলার পতনের পর ২০০ বছর ইংরেজের গোলামী করতে হয়েছে, এবারের লড়াইয়ে যদি স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি পরাজিত হয় তাহলে আগামী ২শ বছরেও মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে কি না সন্দেহ আছে। মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী শক্তি ক্ষমতায় এলে যুদ্ধাপরাধীদের বেকসুর খালাস দেবে, সংবিধান পরিবর্তন করবে এবং দেশে তালেবানী শাসন কায়েম করবে। তাই স্বাধীনতা, ভাষা, ধর্ম এবং সর্বপরি বাঙালি জাতির অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদে এখন একাত্ম হবার সময় এসেছে।
নীল নদের পানি যেমন নীল নয়, তেমনি জামাতে ইসলামও ইসলাম নয়। জামাতে ইসলামী যে একটি সন্ত্রাসী সংগঠন তা এখন আদালতেও প্রমাণিত। কিন্তু তবুও নিষিদ্ধ নয় তাদের কর্মকান্ড। তাই নির্বিঘ্নে তারা দেশব্যাপী সন্ত্রাসী তান্ডব চালিয়ে যাচ্ছে। বাসে, গাড়িতে, ট্রাকে আগুন দিচ্ছে। হরতাল ও অযৌক্তিক রাজনৈতিক কর্মসূচীর নামে বিভিন্ন স্থানে নৈরাজ্য ও সন্ত্রাসী কর্মকান্ড চালাচ্ছে।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ থেকে এখন পর্যন্ত আমরা বহুবার তাদের বীভৎসতা দেখেছি এবং নিরীহ জনগণ বারবার তাদের বীভৎসতার শিকার হয়েছে। জনসমর্থন থাকলে কোনো দল বা সংগঠনকে উগ্র জঙ্গিবাদী তৎপরতার আশ্রয় নিতে হয় না। জনসমর্থন কমলে বা শূন্যে নেমে গেলেই তথাকথিত অন্ধ বিশ্বাসীরা জ্ঞানশূন্য হয়ে মানুষের প্রতি নৃশংস ও নিষ্ঠুর আচরণ  করে।
মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সকল ব্যক্তি ও সংগঠনকে ঐক্যবদ্ধভাবে মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধ শক্তিকে মোকাবেলা করতে হবে। প্রগতিশীল সব সংগঠন ও মানুষকে নিয়ে স্বাধীনতার পক্ষে ব্যাপক জনমত গড়ে তোলার সময় এখন। ১৯৭১ সালে এ দেশের মানুষ দলমত-নির্বিশেষে যেমন ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল স্বাধীনতা রক্ষায় এখনও সেই ঐক্যবদ্ধতা চাই। মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে সকল ষড়যন্ত্রকে প্রতিহত করতে হবে। এ সময় কারও চুপ করে থাকা ঠিক হবে না।
বিরোধী দলেও অনেক মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তবুদ্ধির মানুষ আছেন। তাঁদেরও বুঝতে হবে, উগ্রপন্থী-ধর্মান্ধরা কেবল ক্ষমতাসীনদের জন্য বিপদ নয়, গোটা দেশের জন্যই বিপজ্জনক।

গণজাগরণ মঞ্চের দাবি -দ্রুত রায় কার্যকর করুন



গণজাগরণ মঞ্চের দাবি -
দ্রুত রায় কার্যকর করুন

শাহ্‌ আব্দুল বাতেন ॥ গত ২ নভেম্বর শনিবার বিকেল ৩টায় গণজাগরণ মঞ্চ ঢাকার শাহ্বাগ চত্বরে এক বিক্ষোভ সমাবেশের আয়োজন করে। বিক্ষোভ সমাবেশে দ্রুত যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের রায় কার্যকর ও জামাত-শিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবি জানিয়েছে গণজাগরণ মঞ্চের নেতাকর্মীরা। এতে বিভিন্ন ছাত্র, সাংস্কৃতিক, গবেষণাধর্মী ও পেশাজীবী সংগঠনসহ সর্বস্তরের মানুষ অংশগ্রহণ করে। একই সঙ্গে আগামী জাতীয় নির্বাচনে স্বাধীনতার পক্ষের শক্তিকে জয়যুক্ত করারও আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
গণজাগরণমঞ্চের মুখপত্র ডা. ইমরান এইচ সরকার বলেন, ‘সরকারকে অবিলম্বে সকল যুদ্ধাপরাধীদের রায় কার্যকর ও জামাত-শিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধ করতে হবে।আগামী জাতীয় নির্বাচন বিষয়ে দুদলকে উদ্দেশ্য করে ইমরান বলেন, আপনারা সংলাপ বা আলোচনা যাই করেন না কেন ইশতেহারে সুস্পষ্ট করতে হবে জঙ্গিবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার সঙ্গে আপনাদের কী সম্পর্ক। আগামী জাতীয় নির্বাচন হবে সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে ও জামাত-শিবিরের বিরুদ্ধে নির্বাচন।
তিনি আরো বলেন, সম্প্রতি দেশে স্বাধীনতাবিরোধীরা রাজনৈতিক কর্মসূচির নামে নাশকতামূলক কর্মকা- চালাচ্ছে। গণমাধ্যম কর্মীদের ওপর আক্রমণ করছে, বিচারকদের বাসায় বোমা মারছে তা কোনোভাবেই কাম্য নয়। অবিলম্বে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার আহ্বান জানান তিনি।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ বলেন, যারা বোমা মেরে প্রতিবাদের ভাষা প্রকাশ করে, জাতীয় পতাকাকে সম্মান করে না আর জাতীয় সঙ্গীত গায় না তাদের এ দেশে রাজনীতি করার কোনো অধিকার নেই।
নারীশ্রমিক জোটের সভাপতি উম্মে হাবিবা ঝলমল বলেন, যারা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চায় না, সাম্প্রদায়িকমুক্ত বাংলাদেশ চায় না তাদের এদেশে থাকার কোনো অধিকার নেই।
ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক শাবান মাহমুদ বলেন, মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষের শক্তিকে রুখে দাঁড়ানোর সময় এসেছে। বর্তমানে স্বাধীনতাবিরোধীরা দেশের গণমাধ্যম কর্মীদের ওপর আক্রমণ চালাচ্ছে ও উসকানি দিয়ে তাদের টার্গেটে পরিণত করছে।
সমাবেশে বাংলাদেশ হাক্কানী খানকা শরীফের মহাসচিব শাহ্‌ আব্দুল বাতেন বলেন, এই শাহবাগ চত্বর সংলগ্ন ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দি উদ্যান থেকেই শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ নেতৃত্ব বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ডাক দিয়েছিলেন। আজ সেই স্বাধীনতা রক্ষায় স্বাধীনতা বিরোধী সকল যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবীতে এই শাহ্বাগ চত্বর থেকে নতুন প্রজন্মের স্বতস্ফূর্ত দুঃসাহসিক নেতৃত্ব সৃষ্টি হয়েছে। যে নেতৃত্বকে দেশের সর্বস্তরের মানুষ সমর্থন জানিয়ে আসছে। যে নেতৃত্বে রাজনীতির ছোঁয়া নেই। আছে কলঙ্কমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার অনির্বান স্লোগান আর আহবান। সত্য প্রতিষ্ঠায় সূফী সাধকদের আশীর্বাদ ও স্বাধীনতাপ্রেমী জনস্রোতের আনুকুল্যতাই তাদের এই প্রত্যয়ী আহবান ও সংগ্রামী পথের পাথেয়। সমাবেশে আরো বক্তব্য রাখেন ছাত্রমৈত্রীর সাধারণ সম্পাদক তানবীর রুসমত, ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক সাধারণ সম্পাদক হাসান তারেক প্রমুখ।

অবৈধ হলো জামাতের নিবন্ধন



অবৈধ হলো জামাতের নিবন্ধন

সংলাপ ॥ রাজনৈতিক দল হিসেবে জামাতে ইসলামীকে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) দেওয়া নিবন্ধন অবৈধ ও বাতিল উল্লেখ করে হাইকোর্টের ঘোষণা করা পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়েছে। আদালত বলেন, 'নিবন্ধনের সময় দাখিলকৃত জামাতে ইসলামীর গঠনতন্ত্রের উল্লেখযোগ্য ধারা বা বিধান সাংঘর্ষিক ছিল সংবিধানের সঙ্গে। একই সঙ্গে সাময়িকভাবে রাজনৈতিক দল হিসেবে নিবন্ধন দেয়ার এখতিয়ার ইসির নেই।' পূর্ণাঙ্গ রায়ে এ মন্তব্য করেছেন বিচারপতি এম মোয়াজ্জাম হোসেন, বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম এবং বিচারপতি কাজী রেজা-উল হকের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের একটি বৃহত্তর বেঞ্চের সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারপতি। জামাতে ইসলামীর নিবন্ধন নিয়ে চলমান ইস্যুটি ইসিতে নিষ্পত্তির মত দিয়েছেন বেঞ্চের সর্বজ্যেষ্ঠ বিচারপতি। তবে বেঞ্চের সিনিয়র এই সদস্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে অপর দুই বিচারপতি বলেছেন, 'নিবন্ধনটিকে সাময়িক বলে জামাতে ইসলামী এবং নির্বাচন কমিশন যুক্তি দিলেও এ ধরনের নিবন্ধন দেয়ার বিধান গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের (আরপিও) কোথাও নেই। এ ছাড়া সাময়িক নিবন্ধন বলে কোনো বিষয় পাওয়া যায়নি নিবন্ধন সনদেও।' এদিকে জামাতে ইসলামীর আইনজীবী ব্যারিস্টার বেলায়েত হোসেন জানিয়েছেন, 'এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করা হবে।' একটি রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে জারি করা রুল অ্যাবসল্যুট করে নির্বাচন কমিশনে জামাতে ইসলামীর নিবন্ধন ১ আগস্ট অবৈধ ও বাতিল ঘোষণা করেন হাইকোর্ট। বেঞ্চের তিন সদস্য স্বাক্ষরের পর এ রায় প্রকাশ করে সুপ্রিমকোর্টের সংশ্লিষ্ট দফতর।
জামাতে ইসলামীর নিবন্ধন বাতিলের পক্ষে মূল রায়টি লেখেন বিচারপতি কাজী রেজা-উল হক। তিনি বলেন, 'সংশ্লিষ্ট বিধিতে অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে এটা বলা হয়েছে, শর্ত পূরণ না করে দেওয়া গঠনতন্ত্রের ভিত্তিতে এ ধরনের কোনো নিবন্ধন দেয়ার এখতিয়ার নির্বাচন কমিশনের নেই। অথবা নির্বাচন কমিশন ওই গঠনতন্ত্র সংশোধনের মাধ্যমে শর্ত পূরণে জামাতকে অনুরোধ করতে পারে না। কারণ ওই নিবন্ধন প্রথম আইনি কর্তৃত্ব বহির্ভূতভাবে করা হয়েছে।' আদালত বলেন, 'এটা বলা যায়, এ বিষয়ে জারি করা রুলের গুরুত্ব রয়েছে। রুলকে চূড়ান্ত করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে ২০০৮ সালের ৪ নভেম্বর জামাতে ইসলামীকে দেয়া নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধন কর্তৃত্ববহির্ভূত এবং ফলহীন বলে ঘোষণা করা হচ্ছে।' বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম এই বিচারপতির সঙ্গে একমত পোষণ করে একটি সংযুক্তি দেন। নির্বাচন কমিশনে জামাতে ইসলামীর দেওয়া প্রতিশ্রুতি ও আশ্বাস প্রসঙ্গে এই বিচারপতি বলেন, 'আমি নিঃসংকোচ ও দ্ব্যর্থহীনভাবে এ কথা বলতে পারি যে, নিবন্ধন  নেয়ার জন্য নির্বাচন কমিশনে আলোচ্য দলটির ওই ধরনের মৌখিক প্রতিশ্রুতি ও আশ্বাস ছিল ইসিকে বিভ্রান্ত করে কৌশল ও শঠতার আশ্রয় গ্রহণের মাধ্যমে তর্কিত নিবন্ধনটি আদায় করা; এবং অবশেষে তা করতে সক্ষমও হয়েছে দলটি। অতএব ওই নিবন্ধনটি ছিল অশুদ্ধ ও অকার্যকর।' এই দুই বিচারপতির দেয়া রায়ে বলা হয়, 'আরপিওর ৯০সি অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ছয় মাসের মধ্যে আইনগত শর্তপূরণ করতে হবে। পরবর্তীতে এই মেয়াদ বাড়িয়ে ১২ মাস করা হয়। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শর্ত পূরণ হয়নি। এ কারণে জামাতে ইসলামীর নিবন্ধন কেন অবৈধ ও বাতিল ঘোষণা করা হবে না মর্মে জারি করা রুল মঞ্জুর করা হলো।' তবে বিচারপতি এম মোয়াজ্জাম হোসেন বেঞ্চের অপর দুই সদস্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে রায়ে বলেন, 'জামাতে ইসলামীর নিবন্ধন নিয়ে করা রিট গ্রহণযোগ্য নয়।' এই বিচারপতি বলেন, 'আমি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারি যে, নির্বাচন কমিশনকে বাংলাদেশ জামাতে ইসলামীর নিবন্ধন ইস্যু নিষ্পত্তির নির্দেশনা দিয়ে রুল নিষ্পত্তি করলে ন্যায়বিচার হবে। এ কারণে যুক্তিসঙ্গত দ্রুত সময়ে আইন অনুসারে জামাতে ইসলামীর নিবন্ধন ইস্যু নিষ্পত্তি করার নির্দেশনা দিচ্ছি।' রাজনৈতিক দল হিসেবে জামাতে ইসলামীর নিবন্ধনের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ২০০৯ সালে এই রিট আবেদনটি দায়ের করেন বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশনের তৎকালীন মহাসচিব ও বর্তমান প্রেসিডিয়াম সদস্য সৈয়দ রেজাউল হক চাঁদপুরীসহ ২৫ ব্যক্তি। আবেদনে বলা হয়, চারটি কারণে জামাতে ইসলামী রাজনৈতিক দল হিসেবে নিবন্ধন পেতে পারে না। প্রথমত, জনগণকে সব ক্ষমতার উৎস বলে নীতিগতভাবে মনে করে না জামাত। একই সঙ্গে আইন প্রণয়নে জনপ্রতিনিধিদের নিরঙ্কুশ ক্ষমতাকেও স্বীকার করে না দলটি। দ্বিতীয়ত, গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশ অনুসারে কোনো সামপ্রদায়িক দল নিবন্ধন পেতে পারে না। অথচ কার্যক্রম ও বিশ্বাসে দলটি সামপ্রদায়িক। তৃতীয়ত, নিবন্ধন পাওয়া রাজনৈতিক দল ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গের  কোনো বৈষম্য করতে পারে না। কিন্তু এই দলের শীর্ষপদে কখনো কোনো নারী বা অমুসলিম যেতে পারবে না। চতুর্থত, বিদেশের কোনো সংগঠনের শাখা হিসেবে এ দেশে কোনো রাজনৈতিক দল পরিচালিত হতে পারবে না।
অথচ জামাত বিদেশের একটি সংগঠনের শাখা। সদস্যরাও স্বীকার করেন দলটির জন্ম ভারতে। দলটির শাখা রয়েছে বিশ্বজুড়ে। রিট আবেদনের প্রাথমিক শুনানি শেষে ওই বছরের ২৭ জানুয়ারি বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক (পরবর্তীতে প্রধান বিচারপতি হয়ে ইতোমধ্যে অবসরে) এবং বিচারপতি আবদুল হাইয়ের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ রুল জারি করেন। নির্বাচন কমিশনসহ জামাতের আমির মতিউর রহমান নিজামী ও সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদকে রুলের জবাব দিতে বলা হয়। পরে রুলটি উত্থাপন করা হয় বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন হাইকোর্ট বেঞ্চে। সেখানে আংশিক শুনানির পরই পরিবর্তন হয় ওই বেঞ্চের এখতিয়ার। এর পর আর রুলের শুনানি করার উদ্যোগ নেয়নি কোনো পক্ষই। ফলে এটি আদালতের কার্যতালিকায়ও আসেনি। সমপ্রতি মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার ও জামাতে ইসলামীকে নিষিদ্ধের জোর দাবি ওঠায় ওই রুলের শুনানি শুরুর জন্য প্রধান বিচারপতির কাছে আবেদন করে রিটকারী পক্ষ। পরে প্রধান বিচারপতি ওই বিষয়টি শুনানির জন্য বিচারপতি এম মোয়াজ্জাম হোসেন এবং বিচারপতি কাজী রেজা-উল হকের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ নির্ধারণ করেন। এই বেঞ্চ বিষয়টি শুনানির জন্য বৃহত্তর বেঞ্চ গঠনের প্রয়োজনীয়তা বোধ করলে বিচারপতি এম  মোয়াজ্জাম হোসেন, বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম এবং বিচারপতি কাজী রেজা-উল হকের সমন্বয়ে বৃহত্তর বেঞ্চ গঠন করেন প্রধান বিচারপতি। গত ১২ জুন রুলের ওপরে শুনানি শেষ হয় এই বেঞ্চে। এর আগে ১১ এপ্রিল রুলের চূড়ান্ত শুনানি শুরু হয়। ওই দিন আদালতে হলফনামা আকারে ইসির জবাব দাখিল করা হয়। ১৮ এপ্রিল রিটের পক্ষে শুনানি শেষ করেন ব্যারিস্টার তানিয়া আমীর। আর ২৫ এপ্রিল শুনানি শেষ করেন ইসির আইনজীবী মহসীন রশীদ। এর পর ২২ মে থেকে জামাতে ইসলামীর পক্ষে ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক, ব্যারিস্টার  বেলায়েত হোসেন এবং অ্যাডভোকেট জসিম উদ্দিন সরকার শুনানি করেন। ২০০৮ সালের ৪ নভেম্বর ৩৮টি দলের সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধন পায় জামাতে ইসলামী।

৩ নভেম্বর ইতিহাসের কলঙ্কিত দিন



৩ নভেম্বর ইতিহাসের কলঙ্কিত দিন

সংলাপ ॥ ৩ নভেম্বর বাঙালি জাতির ইতিহাসে একটি কলঙ্কিত দিন। ১৯৭৫ সালের এই দিন ভোরে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে চার জাতীয় নেতাকে সুপরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়। ঢাকা জেলে নিহত এই চার মহান জাতীয় নেতা হচ্ছেন- স্বাধীনতাযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী মুজিবনগর সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ও উপ-রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ, মন্ত্রী এম মনসুর আলী ও এ এইচ এম কামরুজ্জামান।
১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর চার জাতীয় নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দিন আহমেদ, এএইচএম কামরুজ্জামান এবং ক্যাপ্টেন মনসুর আলীকে গ্রেপ্তার করে কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠায় তৎকালীন সরকার। ১৫ই আগস্টের নির্মম হত্যাকান্ডের পর তিন মাসেরও কম সময়ের মধ্যে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের সেলের অভ্যন্তরে জাতীয় এ চার নেতাকে হত্যা করা হয়। বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রিসভার সবচাইতে ঘৃণিত বিশ্বাসঘাতক সদস্য হিসেবে পরিচিত এবং তৎকালীন স্বঘোষিত প্রেসিডেন্ট খন্দকার মোস্তাক আহমদের প্ররোচনায় এক শ্রেণীর উচ্চাভিলাসী মধ্যম সারির জুনিয়র সেনা কর্মকর্তা এ নির্মম হত্যাকান্ড ঘটায়। দেশের এই চার শ্রেষ্ঠ সন্তানকে ১৫ই আগস্টের হত্যাকান্ডের পর কারাগারে পাঠিয়ে ষড়যন্ত্রকারীরা প্রথমে গুলি এবং পরে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করে। জাতীয় এ চার নেতা মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানি সামরিক জান্তার হাতে আটক বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে নেতৃত্ব দান করেন। বঙ্গবন্ধুর আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতা ঘোষণার পর পরই পাকিস্তানের সামরিক জান্তা ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ রাতে বঙ্গবন্ধুকে ধানমন্ডির বাসভবন থেকে গ্রেপ্তার করে। পরে দীর্ঘ নয় মাস সৈয়দ নজরুল ইসলাম যুদ্ধকালীন বাংলাদেশ সরকারের ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাজউদ্দিন আহমেদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। বঙ্গবন্ধুর অপর ঘনিষ্ঠ সহযোগী এএইচএম কামরুজ্জামান ও ক্যাপ্টেন মনসুর আলী আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে গেরিলা যুদ্ধ পরিচালনার ক্ষেত্রে নীতি ও কৌশল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, মনসুর আলী ও এএইচএম কামরুজ্জামান শুধু বড় মাপের রাজনৈতিক নেতাই ছিলেন না, সামাজিক ও ব্যক্তি জীবনেও তারা ছিলেন অসাধারণ মানুষ। তাদের হত্যাকান্ডের বিচার করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। তবে দেশের রাজনীতিকরাও তাদের নৈতিক দায়িত্ব এড়াতে পারেন না। এ হত্যাকান্ডের পেছনের ষড়যন্ত্রে কারা জড়িত ছিল, সে ব্যাপারে রাজনীতিকদের উচিত ছিল ব্যাপক অনুসন্ধান করা এবং সত্য খুঁজে বের করা। সেই কাজটি তাদের রাজনৈতিক সহকর্মী ও সহযোগীরা এখনো করতে পারেনি। বাংলাদেশের রাজনীতিকদের এ জন্য ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে জবাবদিহি করতে হবে।
আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য চারনেতার হত্যার বিচার হওয়া জরুরি। জাতি আশা করে জাতীয় চারনেতার হত্যার সুষ্ঠু বিচার এদেশে সম্পন্ন হবে। জাতি হত্যার কলঙ্ক থেকে মুক্তি চায়। খুনিদের শাস্তি চায়। সেই সঙ্গে হত্যা ও নৃশংসতাকে যারা উৎসাহ দিয়েছে তাদেরও বিচার করা জরুরি।