বৃহস্পতিবার, ২৭ অক্টোবর, ২০১৬

মিথ্যাচারের জন্য শাস্তির বিধান


মিথ্যাচারের জন্য শাস্তির বিধান

* যারা সত্যকে মিথ্যা বলেছিলো তাদের কি পরিণাম হয়েছিলো (৬:১১)।
* আল্লাহ্ মিথ্যাকে মুছে ফেলেন এবং সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করেন (৪২:২৪)।
* তারা সত্যকে ব্যর্থ করে দেয়ার জন্য অসার যুক্তিতর্কে মত্ত ছিলো। তাই আমি ওদের ওপর শাস্তির আঘাত হানলাম (৪০:৫)।
* আমি মিথ্যাকে চূর্ণবিচূর্ণ করে দিই আর তৎক্ষণাৎ মিথ্যা নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় (২১:১৮)।
* সত্য এসেছে আর মিথ্যা অন্তর্ধান করেছে। মিথ্যাকে অন্তর্ধান করতেই হবে (১৭:৮১)।
সংলাপ ॥ বর্তমান বাংলাদেশ প্রেক্ষাপটে মিথ্যা বলা বা মিথ্যাচারের জন্য শাস্তির বিধান থাকা জরুরি বলে ইসলামী চিন্তাবিদগণ মত প্রকাশ করেছেন। আমাদের দেশে রাজনীতিক বা রাজনীতিজীবীদের জন্য মিথ্যা বলা বা মিথ্যাচারের জন্য কোনো শাস্তিমূলক আইন নেই তবে সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে মিথ্যা সাক্ষী দেয়ার জন্য আদালত ইচ্ছা করলে শাস্তি দিতে পারে বলে জানা যায়। অন্য কোনো দেশে মিথ্যা বলা বা মিথ্যাচারের জন্য কোনো শাস্তির বিধান আছে কিনা নির্দিষ্ট করে তা আইনজ্ঞরা বলতে পারেন। বাংলাদেশের সংবিধানে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে অন্তর্ভুক্ত রেখে সত্য-মিথ্যার মিশ্রনে দেশ পরিচালনা সমীচীন হবে কিনা প্রশ্ন উঠেছে।
বর্তমান সরকারের যোগ্য নেতৃত্বে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে উন্নত দেশ হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে আরও যুগোপযোগী কর্মপদ্ধতি ও আইন-কানুন প্রয়োজন, যাতে করে রাজনীতিজীবীরা ভবিষ্যতে দেশকে আর অস্থিতিশীল করে তুলতে না পারে। রাজনীতিজীবীরা নির্বিবাদে দেশবাসীর সামনে নিজেদের মতো করে মিথ্যা বলে যাচ্ছেন। কোন সময় প্রশ্নের সম্মুখীন হলে অস্বীকার করেন অথবা বলেন - এটা রাজনৈতিক বক্তব্য বা ভাষা। অর্থাৎ রাজনীতিতে তারা মিথ্যা জায়েজ করে ফেলছেন। এই জায়েজ করার ক্ষেত্রে আমাদের দেশে যারা ধর্মের নামে রাজনীতি করছেন এবং ধর্মবেত্তা যারা ধর্ম নিয়ে ব্যবসা করে খাচ্ছেন তারাও পাল্লা দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন সামনের কাতারে থেকেই।
পরিতাপের বিষয় যারা বিভিন্ন অঙ্গনে ব্যক্তিস্বার্থে কিংবা গোষ্ঠীস্বার্থে মিথ্যা বলছেন বা মিথ্যাচার চালাচ্ছেন তারা কোনো না কোনো তথাকথিত ধর্মাবলম্বী। আমাদের দেশে ইসলামকে রাষ্ট্র ধর্ম করা হয়েছে রাজনৈতিক ফায়দা লুটার জন্য। ইসলাম-এর নামে বহু রাজনৈতিক দলও গজিয়ে উঠেছে যেমন উঠেছে ব্যাংক ও ইনসিওরেন্স কোম্পানীগুলো। দেশবাসী জানতে চায় এসব ইসলামিক (!) রাজনৈতিক দল ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোর কোথাও কি সত্য আছে?
কুরআনে বহু সতর্কীকরণ আয়াত আছে যা পৃথিবীর মুসলমানদের কুরআনিক মুসলিম হওয়ার জন্য জীবন চলার পথে দিক্-নির্দেশনামূলক। কিন্তু আমরা বাংলাদেশী মুসলমান হয়ে কি এগুলো মানছি? যদি না মানি তাহলে আমাদের মধ্যে কুরআনিক মুসলমানিত্ব কতটুকু? আমাদের মুখে ধর্মের কথা বা ইসলামের (শান্তি) কথা কি মানায়? নাকি শুধু মধ্যপ্রাচ্যের শরিয়তী পোশাক পরিধান করলেই আমাদের মুসলমানিত্ব থাকবে? আমাদের দেশের বেশিরভাগ রাজনীতিকরাই বলেন যে, তারা (শান্তি) ইসলাম ধর্মে বিশ্বাস করেন। তারা বিশ্বাস করুন আর নাই করুন অন্ততঃ তাদের নামের সাথে আরবি বা ফার্সি শব্দের যোগ আছে। ওইসব শব্দের মর্মার্থ লালন করেন কিনা তারাই বলতে পারবেন। অপরদিকে  ‘বিশ্বাস করেন’ কথাটা শুধু মুখের কথা হলে বলার কিছু নেই কিন্তু ইসলাম (শান্তি) এর ধারক-বাহক হয়ে থাকলে তারা নিশ্চয়ই জানেন সত্য-মিথ্যার তফাৎ ও পরিণাম।

দেশবাসী, শিক্ষিত, পেশাজীবী, বুদ্ধিজীবী বিশেষ করে আইনজ্ঞদের কাছে জিজ্ঞাসা সব কিছু জেনেও যারা অর্থাৎ আমরা বা আমাদের মধ্যে বেশির ভাগ মানুষ মিথ্যা বলছেন এবং কর্মের মাধ্যমে মিথ্যাচার চালাচ্ছেন দেশের আপামর জনগণের কাছে, পরিবার ও সমাজের মধ্যে, সর্বোপরি নিজের সঙ্গে নিজে যারা মিথ্যাচার করছেন তাদেরকে সঠিক পথে আনার জন্য মিথ্যা বলা এবং মিথ্যাচারের জন্য শাস্তির বিধান করে কোনো আইন প্রণয়ন করা যায় কিনা তা দেশের বর্তমান সময়ে গভীরভাবে ভেবে দেখার সময় এসেছে। তাহলে অন্তত দেশ ও জাতি কিছুটা হলেও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারবে জীবন চলার পথে। 

সময়ের সাফ কথা.... রাজনীতির সুখ-অসুখ

সময়ের সাফ কথা....

রাজনীতির সুখ-অসুখ

নজরুল ইশতিয়াক ॥ রাজনীতির সুখ-অসুখ সমীকরণটা সহজ নয়। এটি জানতে হলে প্রত্যেক ব্যক্তির রাজনীতি সচেতন হওয়া খুব জরুরি। রাজনীতি বিমুখ জাতি মুখ থুবড়ে পড়ে। রাজনীতি সচেতন জাতি সময়, বাস্তবতাকে অনুধাবন করে এগুতে পারে। জাতিস্বত্ত্বার পরিচয় সূত্র সোপানে সংযুক্ত থাকার অন্যতম প্রধান অনুসঙ্গ রাজনীতি। রাজনৈতিক দল জাতি চরিত্রের পরম্পরা স্রোতধারা বহন করে চলে। একটি জাতিকে চিনতে সেখানকার রাজনীতিকে দেখতে হয়। একটি জনপদের মানুষকে জানতেও সেই জনপদের রাজনীতি কিংবা দেশ পরিচালনায় ক্ষমতার উৎস দেখতে ও জানতে হয়। রাজনীতির রূপ দেখে চিহ্নিত করা যায় সেই সমাজ কতটা কার্যকর, কতটা পশ্চাৎপদ কতটা অসুস্থ। রাজনৈতিক দল গঠন মানেই রাজনীতি করা নয়। নানা অদ্ভুত কাল্পনিক গোষ্ঠীগতস্বার্থেই রাজনৈতিক দল গঠন হতে পারে। সময় বাস্তবতাও সাময়িকভাবে রাজনৈতিক দলের জন্ম দিতে পারে। তার অর্থ এই নয় যে রাজনীতিতে অন্তর্ভুক্তি মানেই সেটি রাজনৈতিক দল। ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যাবে আমাদের দেশে নাম স্বর্বস্ব বহু রাজনৈতিক দলের অস্তিত্ব ছিল। সেগুলো রাজনৈতিক দলে রূপান্তরিত হয়ে উঠেনি। কোন কোনটি কিছু সময়ের জন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন ও জনগণের আস্থা অর্জন করলেও নেতৃত্বের অভাবে তা মুখ থুবড়ে পড়েছে। আবার কেউ কেউ সামান্য দিনের জন্য রাজনৈতিক ঐক্যের ভিত্তিত্বে পুরোনো দল ছেড়ে এসে নয়া রাজনৈতিক দল গঠন করলেও তা গঠনের চেয়ে বেশি দ্রুত ভেঙে গেছে। রাজনৈতিক দল গঠন যতটা সহজ তার নেতৃত্ব দেয়া ততটা সহজ নয়। লক্ষ্য ও নেতৃত্বের উপর নির্ভর করে রাজনৈতিক দলের অগ্রযাত্রা। রাজনৈতিক দলের অগ্রযাত্রার ক্ষেত্রে নেতৃত্ব ও সামাজিক বাস্তবতার গভীর যোগসূত্র রয়েছে। নেতৃত্ব নির্বাচনে দক্ষতা দেখাতে ব্যর্থ হলে চরম খেসারত দিতে হয়। ঘরের শত্রুকে না চিনলে সমূহ বিপদ আসে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর আশেপাশে ঘাতক নেতাদের উপস্থিতি ছিল। ফলে ১৫ আগষ্টের কিছু সময় পরই ভোলপাল্টে ঘাতকের অট্রহাসি পুরো জাতিকে দেখতে হয়েছে। যাদের হাসি দেখতে হয়েছে তারা দীর্ঘদিন আওয়ামীলীগ নামক রাজনৈতিক দলের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে বঙ্গবন্ধুর পাশে ছিল। কি ছিল তাদের আদর্শ তা অনুসন্ধান করলে রাজনীতির অসুখ বের হয়ে আসবে। ’৭৫ এর পর বেচা বিক্রির হাটে দেদারসে অনেক আওয়ামীলীগার নিজেকে বিক্রি করেছে। পুরো মাত্রায় দেশ ও জাতি বিরোধী অবস্থান গ্রহণ করেছে। এসবই রাজনীতির অসুখ। 
রাজনীতি রাজার নীতি নয়, রাজনীতি হচ্ছে রাজ যুক্ত নীতি যা উচ্চ নীতি বোধকে নির্দেশ করে। এই উচ্চতা প্রথমত ব্যক্তির সামাজিক দার্শনিক দায়িত্বশীলতার উচ্চতা। এই উচ্চতা পরিবর্তনের পথ ধরে চলে। সেই বিচারে রাজনৈতিক দলের যে কেউ রাজনীতিক নয় আবার যত গুরুত্বপূর্ণ পদবীতে থাকুক না কেন রাজনীতিবীদও নয়। নীতি বোধের উচ্চতা না থাকলে রাজনীতিবীদ হতে পারেন না। লক্ষ্য ও আদর্শের পথে একনিষ্ঠ না হলে দলের বড় বড় পদধারীও নেতা তবে রাজনীতিবিদ নন। রাজনৈতিক দল একটি বৃহত্তর সামাজিক সংগঠন যা জনগণের সম্মিলিত সামাজিক সঞ্চিত শক্তিকে ধারণ-লালন-পালন করে সেবা ও সৃজনশীলতার ধারা প্রবাহমান রাখে। মানুষ মাত্রই সুযোগ ও সহায়ক পরিবেশ পেলে নিজেদেরকে যোগ্য করে তোলার প্রয়াসী। এই প্রচেষ্টা তার অভ্যন্তরীন। জন্মগতভাবেই স্বীয় শক্তি নিয়েই তার আগমন। যথাযথ পরিবেশ পেলে তার জাগরণ ঘটে।
কিন্তু আমাদের দেশে নানান কিছিমের রাজনৈতিক অবস্থা বিরাজ করছে। কারো কাছে ধর্মকে আশ্রয় করে, কারো কাছে কোন দেশের বিপ্লবী ঘটনাকে আশ্রয় করে আবার কাছে কাছে বিশেষ কোন গোষ্ঠীর ইচ্ছা পূরণ প্রবল হয়ে উঠেছে। একটি পক্ষ আরেকটি পক্ষকে ঘায়েল করতে সদা মরিয়া। ন্যূনতম মূল্যবোধ মানবতাও কখনো কখনো উপেক্ষিত হয়ে পড়ে। রাজনীতির নামে বহুমুখী চরম সাংঘর্ষিক অবস্থা বিদ্যমান রয়েছে। যার রুগ্ন প্রকাশ অতীতে বিভিন্ন সময়ে দেখা গেছে। বিশেষ করে স্বাধীনতার প্রশ্নে বড় ধরনের ক্ষত, জাতির জনকের হত্যাকারীদের পুরস্কৃত করা এবং যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের মুখোমুখি করতে বাধা প্রদান সেই রুগ্ন ক্ষতকেই তুলে ধরে।

গবেষণা বলছে রাজনীতি একটি অগ্রসরমান নীতিকৌশল প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের ক্ষমতার ধারক। আবার হাল আমলে রাজনীতির সংজ্ঞায় বলা হচ্ছে রাজনীতি এমন একটি ক্ষমতা যা সেবা ও সৃজনশীলতার ধারাকে গতিশীল রাখে। রাজনীতির সুখ হচ্ছে এটি দেশ-জাতিকে নির্মাণ করে। প্রকৃষ্ট গতি সৃষ্টি করা যাতে সেবা ও সৃজনশীলতার ধারা চলমান থাকে। অসুখ হচ্ছে বিকাশের ধারাকে বাধা দেয়া, নিজেদের মতো করে চলতে না দেয়া, সব জায়গায় অন্ধ কর্তৃত্ব আরোপের অপচেষ্টা করা। অসুখ হচ্ছে যখন এটি লুটপাট ধ্বংসের হাতিয়ার হয়ে উঠে। ’৭৫ ছিল বাংলাদেশের রাজনীতির জন্য অসুখ। রাজনীতির কারণেই বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্র স্বীয় অস্তিত্বকে আদায়ের পথে সামর্থ্যরে প্রমাণ দিয়েছে। বাঙালির অন্তরে স্বাধিকারের যে বীজ শিল্পী সাহিত্যিক সাধক কৃত্বিমান ব্যক্তিত্বরা জাগ্রত করেছেন তা বাঙালির রাজনৈতিক শক্তির উৎস। সমাজে নিরবে-নিভৃতে মহান ব্যক্তিত্বদের সব বুননই এক সময় মহীরূহে পরিণত ও উদ্ভাসিত হয়। পুরো আঠারো শতাব্দীতে অসংখ্য সৃষ্টিশীল বাঙালীকে খুঁজে পাওয়া যাবে যারা নিরবে-নিভৃতে কাজ করেছেন। সে সব কৃত্বিমান সত্য মানুষদের কর্মের ফলেই  বিট্রিশ বেনিয়াদের বিভাজন সৃষ্টির চক্রান্ত রুখে দেয়া ও জাতি সনাক্তের বীজমন্ত্র খুঁজে পাওয়া সম্ভব হয়েছে। তারই ফল স্বদেশী আন্দোলনের বুৎপত্তি। রাজনৈতিক শক্তির উন্মেষপর্ব। অনুসন্ধানে দেখা যায় পুরো উনিশ শত সাল বাঙালির রাজনৈতিক উত্থানের সময়। তীব্র রাজনৈতিক জাগরণ বাঙালির প্রাণপ্রাচুর্যে বিপুল শক্তি সৌন্দর্যের স্বাক্ষর বহন করে। কালোত্তীর্ণ রাজনৈতিক উত্থান পর্বের অপরূপ জাগানিয়া মাহেন্দ্রক্ষণ। বাঙালি করেছে রাজনীতি আর শোষক পাকিস্তান বিট্রিশরা করেছে শোষণ।  ৫২, ৬২, ৬৪, ৬৯,৭১। এগুলো সবই রাজনীতির সুখ। একদিকে সত্যেন সেন, বিপ্লবী বিনোদ বিহারী, সুভাস বোস, ক্ষুদিরাম, প্রীতিলতা, কাজী নজরুল ইসলাম, মণিসিংহ , ফজলুল হক,  ভাসানী, বঙ্গবন্ধু, তাজউদ্দীন, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, ক্যাপ্টেন মনসুর, কামরুজ্জামান, প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান, শেখ হাসিনা এসব মহান ব্যক্তিত্ব দেশের রাজনীতির সুখ সমৃদ্ধি বন্ধুত্বের দৃষ্টান্ত। রাজনীতি করে এরা কেউই কোটি কোটি টাকার মালিক বনে যাননি। এদের নামে বিদেশে টাকা পাচারের কোন অভিযোগ নেই। দেশের জেলা শহরে অসংখ্য নেতার নাম পাওয়া যাবে যারা আমৃত্যু আদর্শিক রাজনীতি করেছেন। ৭১’ এর মহান মুক্তিযুদ্ধে, নব্বই এর স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে যারা প্রাণ দিয়েছেন তারা সবাই রাজনীতির সুখ হিসেবে অম্লান থাকবে। পরিবর্তিত সময়ের চাহিদা ও বাস্তবতায় রাজনীতির রূপ গতি পাল্টাবে এটা স্বাভাবিক। কিন্তু সৌন্দর্যহানী অসুখও কি পাল্টা দিয়ে বেড়ে যাবে। রাজনীতির নামে দখল জিম্মির অসুখের জ্বলজ্বলমান ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছে পুরো জাতি। বাঙালির অমিত শক্তি সৌন্দর্যের উপর আজও ছুরি চালানো হচ্ছে। সৃষ্টিশীল মানুষের অবদানকে খাটো করে দেখার অসুখের রাজনীতিই তো সব কিছু ছাপিয়ে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে। দমিয়ে রাখা, মিথ্যা প্রতারণা ছলা-কলা অপকৌশলের আশ্রয় নিয়ে সাধারণ কর্মী সমর্থক দেশের মানুষের সাথে ছিনিমিনি খেলা রাজনীতির মহা অসুখ। যে রাজনীতি নেতাদের আচরণে চিন্তায় পরিবর্তন ঘটাতে সক্ষম হয়নি সে রাজনৈতিক দলের ফলাফল হচ্ছে অসুখ। রাজনীতির অসুখই বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে বর্তমান বাংলাদেশে।  এই অসুখ থেকে কি বাঙালি জাতি মুক্তি পাবে না!!! 

প্রত্যাশা উন্নত রাজনৈতিক সংস্কৃতি

প্রত্যাশা উন্নত রাজনৈতিক সংস্কৃতি

শেখ উল্লাস ॥ সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ধর্মগ্রন্থ শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার সারাংশ হিসেবে প্রচলিত আছে, ‘যা হয়েছে তা ভালই হয়েছে, যা হচ্ছে তা ভালই হচ্ছে, যা হবে তাও ভালই হবে।  ..তোমার কি হারিয়েছে, যে তুমি কাঁদছ? তুমি কি নিয়ে এসেছিলে, যা তুমি হারিয়েছ? তুমি কি সৃষ্টি করেছ, যা নষ্ট হয়ে গেছে? তুমি যা নিয়েছ, এখান থেকেই নিয়েছ। যা দিয়েছ, এখানেই দিয়েছ। তোমার আজ যা আছে কাল তা অন্য কারো ছিল। পরশু সেটা অন্য কারো হয়ে যাবে। পরিবর্তনই সংসারের নিয়ম’।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিককালের রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের ওপর সাধারণ মানুষের আন্তরিক ভক্তি-শ্রদ্ধা-ভালোবাসা-আস্থা-বিশ্বাস কী বা কতটুকু আছে তা সচেতন মহলের কারো কাছেই ব্যাখার প্রয়োজন পড়ে না। এক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের মতো একটি বৃহৎ রাজনৈতিক দলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম তার কথা, উদার দৃষ্টিভঙ্গি, সাহসিকতা, ব্যবহার, চিন্তা-চেতনা, বিশেষ করে দল ও দলের প্রধানের প্রতি আনুগত্য প্রকাশের মধ্য দিয়ে সাধারণ সচেতন মানুষদের, এমনকি তার দলের বিরোধী মহলের একটি বড় অংশের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তাই রাজধানীর ঐতিহাসিক সোহারাওয়ার্দী উদ্যানে স্মরণাতীতকালের সবচেয়ে বড় জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত জাতীয় সম্মেলনের সমাপনী দিনে দলের সাধারণ সম্পাদক থেকে সৈয়দ আশরাফের বিদায় সচেতন অনেককেই নাড়া দিয়ে গেছে-এটাই হয়তো স্বাভাবিক। এই পরিবর্তনই হয়তো এই জগৎ-সংসারের নিয়ম।
পলিটিক্যাল কালচার তথা রাজনৈতিক সংস্কৃতি বলতে যে কথাটি শিক্ষিত সমাজে প্রচলিত আছে তারও এক নতুন উদাহরণ সৃষ্টি হলো এবারের আওয়ামী লীগের জাতীয় সম্মেলনে। দলের সভাপতির পদে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা আবারো নির্বাচিত হবেন-এ নিয়ে কাউন্সিলরসহ সকলের মাঝেই ঐক্যমত্য ছিল।
কিন্ত সাধারণ সম্পাদক পদের দায়িত্ব কে পাচ্ছেন এ নিয়ে যখন দেশের রাজনীতিসংশ্লিষ্ট সকল মানুষ, গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমগুলোতে তোলপাড় হচ্ছিল, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের পার্শ্ববর্তী ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনকে ঘিরে, সবাই তাকিয়ে ছিল গণমাধ্যমের পর্দার দিকে, ঠিক তখনই জানা গেল সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম নিজেই প্রস্তাব করেছেন ওবায়দুল কাদেরের নাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই তা অনুমোদন হয়ে গেল সর্বসম্মতভাবে। অনেককেই অবাক করে দিয়ে সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম যে কাজটি করলেন তা তিনি কেন করলেন, এর জন্য তার ওপর কোনো চাপ ছিল কি-না সেটা জানা গেল না। যে-কারণেই হোক সৈয়দ আশরাফ যা করলেন তা দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে উদারতার এক নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি তৈরি করলেন। প্রধানমন্ত্রী তাকে ‘আমার ছোট ভাই ও শহীদের সন্তান’ হিসেবে সম্বোধন করে রাজনীতির অঙ্গনে তাদের চলার পথে এক নতুন অধ্যায়ের অবতারণা করলেন। সাধারণ সম্পাদক হিসেবে নেতৃত্ব বেছে নিতে অনেক জটিল অংকের সহজ সমাধান দিয়ে রাজনীতিতে সংস্কৃতির যে নতুন ধারা তিনি সৃষ্টি করলেন তা তার দল ও দেশের জন্য কল্যাণ কতটুকু বয়ে আনতে পারে সেটাই এখন দেখার বিষয়। সাধারণ সম্পাদক পদে ওবায়দুল কাদেরের আগমন নতুন হলেও দেশের এবং বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের রাজনীতির সর্ব অঙ্গনে তার মতো বিচরণকারী খুব কমই আছে- একথা অনস্বীকার্য। ১৯৭৫’এর ১৫ই আগষ্ট-পরবর্তী বাংলাদেশ ছাত্রলীগ (কাদের-চুন্নু) পরিষদের সভাপতি হিসেবে ওবায়দুল কাদের নামটি রাজনীতিসংশ্লিষ্ট সাধারণ মানুষের কাছে বিশেষ পরিচিতি পেয়েছিল, সাংবাদিকতার সাথে, লেখালেখির সাথে যুক্ত ছিলেন দৈনিক বাংলার বাণীতে, এক এগারোর সময় জেল খেটেছেন দীর্ঘ দিন। সবচেয়ে বড় কথা, বর্তমান সরকারের আমলে প্রথমে যোগাযোগ মন্ত্রী এবং পরবর্তীতে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী হিসেবে তার কর্মকাণ্ড সর্বমহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। এ লেখায় আগেই বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগে এমন কি জাতীয় রাজনীতির অঙ্গনে বিচরণকারী তার মতো নেতা এদেশে কমই আছে। তবে এ নিয়ে বিভিন্ন কথাও আছে। রাজনৈতিক দল হিসেবে বর্তমানে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গ-সংগঠন ছাত্রলীগের মধ্যে, এমনকি সরকার ও প্রশাসনের মধ্যেও নবাগত বা রবাহুত অনেক নেতা-কর্মী এবং জামাত-বিএনপির এজেন্টরা যেভাবে ঢুকে পড়েছে-সে পরিস্থিতি মোকাবেলা করে তিনি দলকে কতটুক এবং কীভাবে এগিয়ে নিয়ে যাবেন-সেটা নিঃসন্দেহে এক চ্যালেঞ্জের বিষয়। দল ও সরকারের ভেতরকার দুর্নীতিবাজ, হাইব্রিড নেতাকর্র্মী, সুবিধাভোগী, টেন্ডারবাজ এক কথায় লুটেরাদেরকে সামলাতে না পারলে আগামীতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির জগতে সমূহ অবনতি ঘটবে বলে আশংকা তৈরি হয়েছে।
আওয়ামী লীগ সরকারের ভেতরে, দলের ভেতরে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির অনুপ্রবেশ, তাদের তৎপরতা ও কর্মকান্ড প্রকাশিত হবে (আল্লাহ্ না করুক) কোনোদিন তারা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর। এখনো দেশের সর্বত্র যে হারে দারিদ্র্য, ধর্মান্ধতা, দুর্নীতি ও মিথ্যাচার রয়েছে, তার দায়-দায়িত্ব মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দল হিসেবে আওয়ামী লীগকেই বহন করতে হবে। আওয়ামী লীগ দেশ ও জাতির জন্য অনেক কিছু করেছে যেমন সত্য, আরও অনেক কিছু করতে পারেনি-এ অভিযোগও তেমনভাবে সত্য। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘আমার জীবনের একমাত্র কামনা, বাংলাদেশের মানুষ যেন তাদের অন্ন পায়, বস্ত্র পায় এবং উন্নত জীবনের অধিকারী হয়।’ বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার কতভাগ মানুষ বর্তমানে উন্নত জীবনের অধিকারী হয়েছে তা হিসেব করলে নিশ্চয়ই খুশি হওয়ার মতো কোন চিত্র উঠে আসবে না। বিপুল সংখ্যক মানুষ এখনো দারিদ্র্যসীমার নীচে অসহায়ের মতো জীবন-যাপন করে। তবে দারিদ্র্যের সাথে যুদ্ধ করে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে সেটা এখন বিশ্বব্যাংকও স্বীকার করে। এর জন্য বর্তমান সরকারের কৃতিত্ব বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বের লোকজনই এখন স্বীকার করছে। তবু যে আরো অনেক পথ পাড়ি দেওয়া বাকী। যে পথে পা পিছলে গেলে দেশকে আবারো অনেক নীচে চলে যেতে হবে। স্বাধীনতাবিরোধী দেশি-বিদেশি শক্তির একটাই তো চেষ্টা-দেশ যেন উঠে দাঁড়াতে না পারে এবং সে চেষ্টা তারা বিভিন্নভাবে করে যাচ্ছে। সরকার ও প্রশাসন এমনকি পুলিশ প্রশাসনের ভেতরে থেকে জামাত-বিএনপির লোকেরা কীভাবে সরকারের ভাবমূতি বিনষ্ট করছে, শান্তিপ্রিয় মানুষদের ওপর হামলা করছে তার জন্য উদাহরণ হওয়ার মতো একটি ঘটনা সম্প্রতি ঘটেছে যশোরের অভয়নগর উপজেলায়। সেখানকার ভবদহ এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে বিস্তীর্ণ জনপদে জলাবদ্ধতার কবলে পড়ে সাধারণ মানুষ সীমাহীন কষ্ট ও দুর্ভোগে রয়েছে যার সমাধানে সরকারের পক্ষ থেকে আজ পর্যন্ত কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। সম্প্রতি সেখানে পানিবন্দী মানুষদের সমস্যা সমাধানের দাবিতে ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে হামলা চালায় অভয়নগর থানার ওসি। এই হামলায় রক্তাক্ত হন ওয়ার্কাস পার্টির পলিটব্যুরোর সদস্য ইকরাব কবির জাহিদসহ ৫০ জন সাধারণ মানুষ। দৈনিক সংবাদ গত ১৯ অক্টোবর এক অনুসন্ধানমূলক সংবাদ প্রতিবেদনে লিখেছে, ওসি আনিসুর রহমানের (ডাক নাম লিটন) বাড়ি নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলার ধোপাদহ গ্রামে। তার দাদার দুই ভাই মোফাজ্জেল মোল্লা ও আবুল হোসেন মোল্লা মুক্তিযুদ্ধের সময় রাজাকার বাহিনীতে যোগ দেন এবং এলাকার সংখ্যালঘু সম্প্রদায় ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের লোক জনের বাড়িঘর লুটপাট করে ও পুড়িয়ে দেয়। মুক্তিকামী মানুষ এক পর্যায়ে মোফাজ্জল মোল্লাকে হত্যা করে, আর আবুল হোসেন পালিয়ে বাঁচেন। বিএনপি গঠিত হবার পর লিটনের জ্ঞাতি গোষ্ঠী জামায়াতের খোলস পাল্টিয়ে বিএনপিতে যোগ দেয়। লিটন যুক্ত হয় ছাত্রদলের সঙ্গে। তার বড়ভাই মিজানুর রহমান স্বপন ও চাচা আজিজুর রহমান ফুল লোহাগড়া বিএনপির চালিকা শক্তি। এই সুবাদে রাজাকার আবুল হোসেন মোল্লার ছেলে অর্থাৎ, লিটনের চাচা সাইফুর রহমান ও লিটন ১৯৯০-এর দশকে বিএনপি আমলে এক সঙ্গে পুলিশের সাব-ইনস্পেক্টর পদে চাকরি পান। লিটনের আর এক চাচা বিএনপি নেতা হিসেবে খুলনায় খালেদা জিয়ার জনসভায় অংশ নিতে গিয়ে বাস দুর্ঘটনায় নিহত হন। জামায়াত-বিএনপি দলের আনিসুর রহমান লিটন আওয়ামী লীগ ও মহাজোটের নেতৃত্বাধীন জোটের বিরুদ্ধে প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে চান’। এই প্রতিহিংসারই বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছেন পানিবন্দী মানুষদের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে হামলার মধ্য দিয়ে। এই ছোট্ট ঘটনাটির মধ্য দিয়ে তারা তাদের আজকের দিনের রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি রূপ দেখিয়েছেন। আওয়ামী লীগ সরকার, প্রশাসন এবং তাদের দলের ভেতরে সর্বস্তরে এ ধরনের জামায়াত-বিএনপিপন্থী অনেক কর্মকর্তা-নেতা-কর্মী বিভিন্ন অপকৌশলে শান্তিপূর্ণ মানুষদের ওপর হামলা চালিয়ে সরকারের ভাবমূর্তি নানাভাবে বিনষ্ট করছে।
এদেরই আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছে সরকার ও দলের মধ্যে ঘাপটি মেরে থাকা অনেক অপশক্তি। জনগণের পাশে থেকে, জনগণের স্বার্থ উদ্ধারে আন্দোলন-কর্মসূচি গ্রহণ না করে তাদের দুর্দশা-দুর্ভোগ বৃদ্ধিতে সহযোগিতা করছে এমন রাজনৈতিক শক্তি দেখতে চায় না এদেশের বিবেকবান মানুষ। বরং এই জাতীয় অপশক্তি ও অপসংস্কৃতিকে প্রতিরোধ করে দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি (পলিটিক্যাল কালচার)কে উন্নত ও যুগোপযোগী করতে পারলেই কেবল সমাজ ও জাতি সমৃদ্ধ হবে-মানুষ উন্নত জীবনের অধিকারী হওয়ার পথে এগিয়ে যাবে। বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনা, সাড়া জাগানো ও জাঁকজমকপূর্ণ জাতীয় সম্মেলনের আয়োজন স্বার্থক হয়ে উঠবে-এটাই আজকের জাতির বিবেকের প্রত্যাশা। 

বৃহস্পতিবার, ১৩ অক্টোবর, ২০১৬

অযোগ্য ও নীতিহীন নেতা দিয়ে দেশ ও জনগণের সর্বনাশই বেশি হয় - বঙ্গবন্ধু


অযোগ্য ও নীতিহীন নেতা দিয়ে দেশ ও জনগণের 

সর্বনাশই বেশি হয় - বঙ্গবন্ধু

শেখ উল্লাস ॥ তথ্য প্রযুক্তির অভাবনীয় আশীর্বাদের এই যুগে একজন সাধারণ মানুষও ফেসবুকে পোস্ট আর স্ট্যাটাস দিয়ে সামাজিক গণমাধ্যমে অংশ নিয়ে বিভিন্ন বিষয়ে মন্তব্য করতে পারছে। এই অর্থে মানুষ এখন কতই না স্বাধীন ও সুবিধাভোগী। কিন্তু বিজ্ঞানের (বিশেষ জ্ঞান) এই পর্যায়ে আসতে কত  সাধকের কত সাধনা, গবেষণা ও ত্যাগ-তিতিক্ষা করতে হয়েছে তা ভেবে দেখেন কয়জন? ঠিক একইভাবে স্বাধীন বাংলাদেশ অর্জনের লক্ষ্যে এদেশের মানুষকে জাগানোর দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কত সাধনা, গবেষণা ও ত্যাগ-তিতিক্ষা করেছিলেন তা-ই বা চিন্তা করার  সময় ক’জনের হয়? সাধারণভাবে সবাই অনেক কিছুই জানেন, কিন্তু গভীরভাবে বিষয়টি অনুভূতিতে বা উপলব্ধিতে নেয়াটাই বড় কথা। উপলদ্ধি সত্যিকার অর্থেই অনেক দূরের ও কঠিন বিষয়। আর কঠিন বলেই রাজনৈতিক দলের ভেতরে ঢুকে বিভিন্ন সময়ে অনেকে এমন কিছু কাজ-কর্ম করে গেছেন যা তাঁর আদর্শের রাজনীতির সম্পূর্ণ পরিপন্থী-বিশেষ করে এদেশের সর্ববহৎ ও মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামী লীগে বিভিন্ন সময়ে অনেক সুযোগসন্ধানী এর ভেতরে ঘাপটি মেরে থেকে নিজেদের কায়েমী স্বার্থ উদ্ধার করে গেছেন। এদেরই ষড়যন্ত্রে  জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর রাজনৈতিক জীবন হয়তো সমাপ্ত করে যেতে পারেননি। কিন্তু এদেশের মানুষের কাছে আধ্যাত্মিকভাবে তিনি চিরস্মরণীয় ও চিরঅম্লান হয়ে থাকবেন অন্ততপক্ষে যতদিন বাংলাদেশ থাকবে। বিগত শতাব্দীর ত্রিশ-চল্লিশের দশক থেকে এই বাংলার মাটি-মানুষ-জনপদ-শিক্ষা-সংস্কৃতি-সমাজ-রাজনীতির সাথে মিশে গিয়ে তিনি এদেশ সম্পর্কে একজন বড় গবেষকও হয়ে উঠেছিলেন। ওই সময়ের রাজনীতির প্রতিটি ঘটনার সাথে তিনি ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন, নেতৃত্ব দিয়েছিলেন এবং সে কারণেই তিনি যা বলতেন, মন্তব্য করতেন সেটা ছিল তাঁর অনুভূতি ও উপলব্ধিরই বাস্তব প্রকাশ।  ১৯৫৪’এর নির্বাচনে বাঙালিদের জয়লাভের কয়েক মাস না যেতেই পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ৯২ (ক) ধারা জারি করে যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভা ভেঙ্গে দেয়। ‘৫৪ সালের নির্বাচনে জয়লাভ করেও আমরা গদিতে বসতে পারি নাই’- (৭ই মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধু)। পরিণতিতে এদেশের মানুষের ভাগ্যে নেমে আসে বিপর্যয়। দেশে বিরাজ করতে থাকে দুর্ভিক্ষাবস্থা। ওই সময়  ক্ষমতালিপ্সু রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের কর্মকা- দেখে বঙ্গবন্ধু পরিস্থিতি সম্পর্কে যথার্থভাবেই উপলব্ধি করেছিলেন। তিনি লিখেছেন, ..‘যদি সেইদিন নেতারা  জনগণকে আহ্বান করত তবে এত বড় আন্দোলন হতো যে কোনোদিন আর ষড়যন্ত্রকারীরা সাহস করত না বাংলাদেশের উপর অত্যাচার করতে। শতকরা সাতান্নব্বই ভাগ জনসাধারণ যেখানে যুক্তফ্রন্টকে ভোট দিল ও সমর্থন করল, শত প্রলোভন ও অত্যাচারকে তারা ভ্রুক্ষেপ করল না - সেই জনগণ নীরব দর্শকের মতো তাকিয়ে রইল! কি করা দরকার বা কি করতে হবে, এই অত্যাচার নীরবে সহ্য করা উচিত হবে কি না, এ সম্বন্ধে নেতৃবৃন্দ একদম চুপচাপ।..  দেড় ডজন মন্ত্রীর মধ্যে আমিই একমাত্র কারাগারে বন্দি। যদি ৬ই জুন সরকারের অন্যায় হুকুম অমান্য করে (হক সাহেব ছাড়া) অন্য মন্ত্রীরা গ্রেফতার হতেন  তা হলেও স্বতঃস্ফূর্তভাবে আন্দোলন শুরু হয়ে যেত। দুঃখের বিষয় একটা লোকও প্রতিবাদ করল না। এর ফল হল ষড়যন্ত্রকারীরা বুঝতে পারল যে, যতই হৈচৈ বাঙালিরা করুক না কেন, আর যতই সমর্থন থাকুক না কেন, এদের দাবিয়ে রাখতে কষ্ট হবে না। পুলিশের বন্দুক ও লাঠি দেখলে এরা পালিয়ে গর্তে লুকাবে। এই সময় যদি বাধা পেত তবে হাজারবার চিন্তা করত বাঙালিদের উপর ভবিষ্যতে অত্যাচার করতে। এই দিন থেকেই বাঙালিদের দুঃখের দিন শুরু হলে। অযোগ্য নেতৃত্ব, নীতিহীন নেতা ও কাপুরুষ রাজনীতিবিদদের সাথে কোনো দিন একসাথে হয়ে দেশের কোনো কাজে নামতে নেই। তাতে দেশসেবার চেয়ে দেশের ও জনগণের সর্বনাশই বেশি হয়’। (অসমাপ্ত আত্মজীবনী- শেখ মুজিবুর রহমান, পৃষ্ঠা-২৭২-২৭৩)।
নীতিহীন,  অযোগ্য ও কাপুরুষ নেতারা দেশ ও জাতির কী সর্বনাশা ডেকে আনতে পারে তার বড় প্রমাণ জাতি পেয়েছিল ৭৫’এর ১৫ই আগষ্ট এবং ১৫ আগষ্টকে কেন্দ্র করে সংগঠিত বিভিন্ন ঘটনাবলীতে। বঙ্গবন্ধুর সারাজীবনের শ্রম-মেধা-সাধনার ফসল জনগণের দল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত আওয়ামী লীগ সময়ের বিবর্তন ও পরিবর্তনের সুদীর্ঘ পথ বেয়ে আজ বাংলাদেশের গদিতে উপবিষ্ট।  নেতা বলতে এখন শুধু রাজনৈতিক দলের নেতাদেরই বোঝানো হয় না, স্বাধীনতার পর থেকে আমলারাও (উর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তারা) দেশ পরিচালনার বিভিন্ন স্তরে নেতার আসনে বসতে পেরেছেন। স্বাধীনতার আগে এই কর্মকর্তারা পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠীর অধীনে কাজ করতেন বলে তাদের প্রায় সব কাজই ছিল পাকিস্তানী শাসন-শোষণ টিকিয়ে রাখার স্বার্থে, বাংলার মানুষের ক্ষতি হবে-এটা দেখার বিষয় তাদের ছিল না। তৎকালীন আমলারা (যারা জন্মগতভাবে এদেশেরই সন্তান ছিলেন) ঔপনিবেশিক পাকিস্তানী সরকারের স্বার্থ রক্ষায় কী ধরনের ছলা-কলা ও ধূর্ততার আশ্রয় নিতেন, সে বিষয়ে প্রত্যক্ষর বিবরণ বঙ্গবন্ধুর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে সুন্দরভাবেই উঠে এসেছে। বর্তমানে প্রশাসন ক্যাডারসহ বিভিন্ন বিভাগের কর্মকর্তারা দেশের বিভিন্ন পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছেন। এইসব কর্মকর্তাদের জন্য সরকারি সুযোগ-সুবিধা রাষ্ট্রীয়ভাবেই নিশ্চিত করা হয়েছে। দেশ স্বাধীন না হলে তাদের এই সুযোগ-সুবিধা কল্পনাও করা যেত না। তারা রাষ্ট্রের বা প্রজাতন্ত্রের কর্মচারি। বর্তমানে দেশের আঞ্চলিক ক্ষেত্রের সার্বিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে বিশেষ করে উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) ও জেলা প্রশাসক (ডিসি)গণ গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্বের আসনে অধিষ্ঠিত। বলা হয়ে থাকে, দেশ চালান মূলত সচিবগণই। সংবিধান অনুযায়ী প্রজাতন্ত্রের এ কর্মচারিগণ সর্বদা দেশ ও জনগণের সেবায় নিয়োজিত থাকবেন। ক্ষেত্র বিশেষে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো কোনো শিক্ষকও নেতৃত্বের আসনে বসেন। প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নে, শিক্ষাব্যবস্থার সার্বিক উন্নয়নে কাজ করার, সেবা করার সুযোগ পান। স্বাধীন দেশে এই সব সেবায় নিয়োজিত থাকাই বঙ্গবন্ধুর ভাষায় দেশসেবা। এইসব গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্বের আসনে বসে কেউ যদি অযোগ্য, নীতিহীন ও কাপুরুষ হন তবে তার কুপ্রভাব দেশ ও জনগণের ওপর পড়তে বাধ্য। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন উপজেলা-জেলায় কোনো কোনো ইউএনও, ডিসি তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব সুচারুভাবে পালন করে সংশ্লিষ্ট এলাকার উন্নয়নে উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন এবং তারা রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃত ও পুরষ্কৃতও হচ্ছেন। স্বাধীন দেশে এসব কিছুই আজ সম্ভব হচ্ছে।
কিন্তু নেতৃত্বের সবচেয়ে বড় জায়গা অর্থাৎ, রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বে যারা আসীন হন- এখান থেকে যারা এমপি, মন্ত্রী হন, তাদের মধ্যে অযোগ্য, নীতিহীন ও কাপুরুষ মানসিকতাসম্পন্ন লোকেরা স্থান পেয়ে গেলে সমাজ ও দেশের জন্য কী সর্বনাশা পরিস্থিতি তৈরি করতো সে সম্পর্কে সচেতন মানুষেরাই কেবল উপলব্ধি করতে পারেন। অপার সম্ভাবনার এই দেশে আসলে কোনো সমস্যাই নেই। সমস্যা সৃষ্টি করে রেখেছে শুধু তারাই যারা বিভিন্ন স্তরের নেতৃত্বের আসনে থেকে নীতিহীন কাজ করে নিজেদের পার্থিব ভোগ-বিলাসে লিপ্ত থেকে এক ধরনের মোহাচ্ছন অবস্থায় দিনাতিপাত করছেন। ঔপনিবেশিক আমলের ঘুণে ধরা মানসিকতা, সংকীর্ণতা তাদেরকে এমনভাবে পেয়ে যায় যে, তারা জীবনের মূল্যবান সময়টুকু অযথাই ব্যয় করেন। হাক্কানী সাধক-এঁর বাণী হচ্ছে, ‘বিদ্যা, বুদ্ধি, বল-বিক্রম গর্ব দোষে খর্ব হয়’। আজকের দিনেও এ সমাজ ও দেশের কোনো কোনো নেতা এমনভাবে কথা বলেন, আচরণ করেন, বক্তৃতা দেন যেন তাদের কথা কেউই কিছু বুঝে না। আসলে এভাবে তারা নিজেরা নিজেদেরই সাথে প্রতারণা করে থাকেন। বর্তমানে সরকারের আশ্রয়-প্রশ্রয় ও সুযোগ-সুবিধা ভোগকারী কোনো কোনো আমলা ও নেতার মধ্যে দেখা যায়, বঙ্গবন্ধুর কথা বলতে তারা অজ্ঞান, প্রশংসায় পঞ্চমুখ। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর আদর্শ তাদের বাস্তব জীবন ও কর্মে একেবারেই অনুপস্থিত। এদের ব্যক্তিগত জীবনাচরণ ও দুর্নীতির প্রকৃত চিত্র যারা অনুভব ও উপলব্ধি করতে পারেন, তারাই তাদের আসল রূপটি জানেন।
তারাই আসলে দেশের শত্রু, নিজেদের শত্রু, প্রতারক।  তাদের বেলায়, ‘তাহারা চতুরতা করিল, ঈশ্বর চতুরতা করিলেন, ঈশ্বর চতুর শ্রেষ্ঠ’-এই মহাবাণীই সত্য হয়ে দেখা দেয়। ক্ষণিকের  মোহ, ভোগ-বিলাস, নেতৃত্ব ও ক্ষমতার আসনচ্যুত হওয়ার পর সমাজে তাদের আর কোনো মূল্য থাকে না। অন্যসব প্রাণীর মতোই জীবন-যাপন ওদের, মৃত্যুর পর কেউই তাদের স্মরণ করে না। ইংরেজ আমলের ঔপনিবেশিক মানসিকতার এই সব ধূর্ত নেতা-পাতি নেতাদের বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধু অনেক সতর্কবাণী আমাদের জন্য রেখে গেছেন। আগামী ২১-২২শে অক্টোবর বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ২০তম জাতীয় সম্মেলনের মধ্য দিয়ে যে নতুন নেতৃত্ব উঠে আসবে সেখানে এ রকমের নীতিহীন কেউ যাতে স্থান না পায় সে ব্যাপারে যত সতর্ক হওয়া যাবে, এক্ষেত্রে যতটুকু সফলতা পাওয়া যাবে, দেশের সার্বিক উন্নয়ন ও অগ্রগতির সফলতাও হবে ততটুকু। কারণ, এই দলটি স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছে, সকল গণতান্ত্রিক আন্দোলনের নেতৃত্ব, দেশের সকল সামাজিক শক্তিগুলোর সাথে এ দলেরই যোগসূত্র সবচেয়ে বেশি। এ দলের নেতৃত্ব থেকে স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ মানুষের আশা-আকাঙ্খাও বেশি।

বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের মানুষের আজ ভাগ্য ভাল যে, বহু ঘাত-প্রতিঘাত ও জীবনের ওপর হুমকি মোকাবেলা করে অপরিসীম সাহসিকতা নিয়ে দেশ পরিচালনার নেতৃত্বে আছেন বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা। পাকিস্তানী আমলেও বঙ্গবন্ধু নিজেও এমন সাহসিকতা নিয়ে রাজনীতি করে গেছেন। দেশকে স্বাধীনতা দিয়েছেন। এদেশের মানুষ অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক মুক্তি পাবে-এটাই ছিল বঙ্গবন্ধু জীবনের একমাত্র কামনা। সে কারণেই বঙ্গবন্ধুর এই কামনা-বাসনা পূরণ করতে যারা নিবেদিত নন, তাদেরকে এদলের নেতৃত্বের কোথাও স্থান দেয়া হবে-না-এটাই আজ দেখতে চায় দেশবাসী। দেশ আজ যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে, দেশি-বিদেশি সকল শুভ শক্তির সমর্থন ও আশীর্বাদ রয়েছে এই দল ও তার সরকারের ওপর। দলের আসন্ন সম্মেলনকে কেন্দ্র করে সারা দেশের রাজনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক সচেতন মানুষদের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে বিপুল ঔৎসুক্য। কিন্তু ষড়যন্ত্রকারীরা কোনো দিন বসে ছিল না, এখনো নিশ্চয়ই বসে নেই-এটাই স্বাভাবিক। সেই প্রেক্ষাপটে স্বাধীনতা যুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দলের এই সম্মেলনের মধ্য দিয়ে যোগ্য, মেধাবী, জনমুখী, দক্ষ নেতৃত্ব গড়ে উঠবে এবং তারা ২০২১ সালের মধ্যে দেশকে মধ্য আয়ের এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশ বিনির্মাণে সফলভাবে এগিয়ে যাবে-এটাই আজ দেশের সচেতন ও বিবেকবান মানুষদের প্রত্যাশা। তবেই হবে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের স্বপ্ন ও আদর্শের বাস্তবায়ন এবং তাঁর প্রতি যথার্থ শ্রদ্ধা জ্ঞাপন।

শান্তির পথ প্রদর্শনে লালন সাঁইজী


সময়ের সাফ কথা....
শান্তির পথ প্রদর্শনে লালন সাঁইজী

আল্লাহর নাম সার করে যেজন বসে রয়
তাহার কিসের কালের ভয় ॥

সময় বয়ে গেল আল্লাহর নাম বল
মালেকুত মউত এসে বলিবে চল
যার বিষয় সে লয়ে যাবে
সেকি করবে ভয় ॥

আল্লাহর নামের নাই তুলনা
সাদেক দেলে সাধলে পরে বিপদ থাকে না
যে খুলবে তালা, জ্বালবে আলো
দেখতে পাবে জ্যোতির্ময় ॥

ভেবে ফকির লালন কয়
নামের তুলনা দিতে নয়
আল্লাহ্ হয়ে আল্লাহ ডাকে
জীবে কি তার মর্ম পায় ॥

সংলাপ ॥ জাতি ধর্ম-বর্ণ, গরীব-ধনী, শিক্ষিত-মূর্খ-জ্ঞানী নির্বিশেষে পৃথিবীর সকল মানুষই শান্তি চায়। কিন্তু খুব কম মানুষই শান্তি পায়। তাই যুগে যুগে পৃথিবীর একপ্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে স্ব-স্ব জাতির মধ্যে শান্তির পথ প্রদর্শক আবির্ভূত হয়েছেন। বাংলার বুকে অন্য জাতি, অন্য ভাষা ও অপসংস্কৃতি যখন বারবার হানা দিচ্ছিল সেই সময় লালন সাঁইজীর আবির্ভাব ঘটে। বাংলা ১২৯৭ সালের ১ লা কার্তিক, ১৮৯০ খ্রিস্টাব্দের ১৭ অক্টোবর ১১৬ বৎসর বয়সে লালন সাঁইজী দেহত্যাগ করেন।
সাঁইজীর দর্শনে রয়েছে - সবার উপরে মানুষ সত্য, মানুষ মানুষের জন্য। মানুষ হওয়ার জন্যে দরকার সৎ-স্বভাব যার পরিচয় মেলে কথা ও কাজে। এই পরিপ্রেক্ষিতে তাঁর অমূল্য বাণী - ‘সত্য বল্ - সুপথে চল্’ - বাংলার আকাশে বাতাসে ধ্বনিত হয়ে বাঙালি জাতিকে দিয়ে আসছে দিক নির্দেশনা। গ্রাম বাংলার আনাচে-কানাচে সাঁইজীর দর্শন বাংলার মানুষকে দেখালো নতুন দিগন্ত, নতুন প্রাণ যার ধারাবাহিকতা আজও বিদ্যমান।
লালন সাঁইজী একজন বাঙালি। এই বাংলায় বাঙালিদের মধ্যে বাংলা ভাষায় শান্তি-ধর্ম প্রতিষ্ঠায় তিনি ছিলেন বদ্ধপরিকর। শান্তি-ধর্ম প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি যে দর্শন দিয়েছেন তা বাঙালি জাতিকে একটি উন্নত জীবনধারার সন্ধান দিয়েছে। সহজ সরল সাধারণের ভাষায় কবিতার ছন্দে, গানের মরমী সুরে তিনি যে ‘লালন সংস্কৃতি’ সৃষ্টি করে গেছেন, তা বাঙালি জাতির অস্তিত্বের সাথে অবিচ্ছেদ্য। পৃথিবীর বুকে বাঙালি জাতির অস্তিত্ব যতদিন থাকবে, ততদিন লালনও হয়ে থাকবেন স্মরণীয় এবং বরণীয়।
পূজিত হবেন একজন অসাম্প্রদায়িক চিন্তা-চেতনার উর্ধ্বে ‘শান্তি-ধর্ম’ প্রচারক হিসেবে। তাঁর সম্পর্কে অভিমত প্রকাশ করতে গিয়ে মনসুর উদ্দীন বলেছেন, ‘লালন ছিলেন ভোরের কোকিল, আটপৌরে ভাষার প্রাণবান কবি। হৃদয়ের অনুভূতি, দার্শনিক তত্ত্ব এমন সরল করে বাংলায় আর কোনো কবি বা গীতিকার প্রকাশ করতে পেরেছেন বলে আমার জানা নেই।’ একথা অনস্বীকার্য যে, তৎকালীন সময়ে বাংলার বঞ্চিত, নিপীড়িত, নির্যাতিত ও অবহেলিত মানুষদের মন্দির-মসজিদের প্রচলিত সংকীর্ণ ধর্মীয় উগ্রতার রুদ্ধ কক্ষে বন্দি না করে উদার, উন্মুক্ত খোলা আকাশের নিচে বসে দেশ-মাটি-প্রকৃতির নিবিড় পরশে পরম স্রষ্টার সাথে এক প্রত্যক্ষ মধুর ও বন্ধুত্বপূর্ণ প্রেমময় সম্পর্ক সৃষ্টির শাশ্বত শান্তির ধর্মে আহ্বান জানিয়েছেন ভোরের কোকিলের মতোই। আত্মদর্শনের লালনীয় তত্ত্বাদর্শে বাংলার মানুষ খুঁজে পেয়েছিল মুক্তির পথ।
সাধকদের মতে বাঙালি জাতির প্রাণপুরুষ এই মহান দার্শনিকের দর্শন জেনে-বুঝে চর্চা করে নিষ্ঠার সঙ্গে  চিন্তা-চেতনায় ধারণ করলে সুস্থ সুন্দর সত্য স্বসংস্কৃতি সম্পন্ন একটি অসাম্প্রদায়িক মানব গোষ্ঠী গড়ে উঠতে বাধ্য।
তাই লালন সাঁইজী বাঙালির ঐতিহ্যের লালন, ইতিহাসের লালন, সংস্কৃতির লালন। সাঁইজী বাঙালির পরিচিতি। তিনি শেকড়ের সন্ধান দিয়েছেন। তাঁর প্রেরণাতেই বাংলার বুকে বহু সাধক আজও নিয়োজিত নিরবচ্ছিন্ন কর্ম সাধনায়। সাধন-ভজনের পদ্ধতির বীজমন্ত্রও তিনি দিলেন -
‘ভবে মানুষ গুরু নিষ্ঠা যার
সর্ব সাধন সিদ্ধি হয় তার।’

সমাজের প্রতিটি  স্তরে সাঁইজীর দর্শন অনুসারী রয়েছে, যারা প্রকৃতই চিন্তা- চেতনায় লালন পূজারী। বাউল সাধকদের কাছে লালন সাঁইজী তাদের ধর্মগুরু। তাঁর সমাধিস্থল তাদের কাছে তীর্থভূমি। কোনো আঙ্গিকেই সাঁইজীর সামান্যতম অবমাননা, বাঙালি জাতি সহ্য করবে না - হোক তা লালন নামের গায়ে সাম্প্রদায়িক রঙ চড়ানোর কসরৎ অথবা তাঁকে ব্যক্তি ও গোষ্ঠী স্বার্থে ব্যবসায়িক হাতিয়ার বানানোর কূটচাল অথবা শুধুমাত্র কবি, বাউল, ফকির বানানোর অপচেষ্টা। অপরদিকে নিছক সাংবিধানিক অধিকার আদায় অথবা প্রত্নতাত্ত্বিক পূরাকীর্তি নিদর্শন সুরক্ষা জাতীয় মানবিক বিষয় মনে করলেও আমাদের ভুল হবে। আমদানীকৃত অপসংস্কৃতির হাত ধরে নগরায়ণ ও উন্নতির নামে বাঙালি জাতির ভাষা ও সংস্কৃতির পীঠস্থানগুলোর আগ্রাসনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। 

জাতির লক্ষ্য পূরণের সম্মেলন


জাতির লক্ষ্য পূরণের সম্মেলন

নজরুল ইশতিয়াক ॥ ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের এবারের সম্মেলন একটি অগ্নি-পরীক্ষা। ভবিষ্যত দেশ পরিচালনা,   বৈশ্বিক তথা এশিয়া-দক্ষিণ এশিয়ায় সামগ্রিক যোগযাত্রা, ২১-৪১ সালের লক্ষ্য ভিত্তিক বাংলাদেশ অনেকটাই নির্ভর করছে এবারের সম্মেলনের উপর। আগামী নির্বাচন পর্যন্ত এ কমিটিই দলকে সুসংগঠিত করে জনগণের আস্থা, ভালবাসা অর্জনে কাজ করবে। রাজনীতির নামে অতীতের যে ভয়াবহতা জাতিকে দেখতে হয়েছে তার পুনরাবৃত্তি  রুখে দেয়ার কাজটিও বর্তাবে দলটির নেতৃত্বের উপর। সময়ের  চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে রাজনীতিকে রাজনীতির জায়গায় ফিরিয়ে আনা, জনগণকে সাথে নিয়ে, জনগণের শক্তির উপর নির্ভর করে এগিয়ে যাবার কোন বিকল্প নেই। সেক্ষেত্রে সরাসরি বলা যেতে পারে নাজুক একটি পরিস্থিতির ঘুর্ণাবর্তে হাবুডুবু খাচ্ছে দেশের রাজনীতি। যার দায় দল হিসেবে আওয়ামীলীগ এড়াতে পারে না।
সম্মেলন নিয়ে নানা বিশ্লেষণ, মতামত পত্রপত্রিকায় প্রকাশ হচ্ছে। সকাল-বিকাল গভীর রাত পর্যন্ত হিসেব- নিকেষের বাড়াবাড়ি চলছে। লবিং-গ্রুপিং-তদবির চলছে জোরসে। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা রুগ্ন রাজনীতি, পকেট রাজনীতি, রেওয়াজের রাজনীতিই দলীয় অফিস থেকে আড্ডা আলাপচারিতায়। এমন কি পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যাচ্ছে পত্রপত্রিকায়, টিভি, রেডিওতে এসব রুগ্ন পর্যবেক্ষণই শোনানো হচ্ছে, দেখানো হচ্ছে। এমন কি কোন কোন পত্র-পত্রিকা নিজেদের মতো করে রীতিমতো পুর্ণাঙ্গ কমিটিই তুলে ধরছে। কোন্ নেতার সাথে কোন্ সাংবাদিকের ব্যক্তিগত পরিচয়, গোষ্ঠীগত যোগাযোগ রয়েছে তা স্পষ্টতই ফুটে উঠছে সংবাদচিত্রে। এ এক দারুন দৌঁড়ঝাপ প্রতিযোগিতা চলছে, চোখে না দেখলে অনুমান করাও কঠিন। কারো কাছে আবার পদ-পদবী পাওয়ার একমাত্র যোগ্যতা হচ্ছে গ্রুপিং। সেলফি, ফটোসেশন, স্থির ও ভিডিও চিত্রে নিজেদের বারবার দেখানোর মতো নিম্নমানের অসহায়ত্বও চোখে পড়ে। দলীয় সংবাদ সম্মেলন ও প্রধানমন্ত্রীর অনুষ্ঠানগুলোতে চেয়ার দখল করে সস্তা উপস্থিতি দলটির এক শ্রেনীর নেতা কর্মীও করুণ দশাকে তুলে ধরে। দলের জন্য, দেশের জন্য, লক্ষ্য পুরণের রাজনীতির জন্য দলীয় ও নিজ নিজ অবস্থান থেকে তাদের যেন তেমন কিছু করার নেই, সব করে দেবেন শেখ হাসিনা। পদধারী এবং যারা পদে আসতে চান তাদের অনেকেরই ব্যক্তিগত, সামাজিক ইমেজ শূন্যের কোঠায়। এসব জানেন দলীয় প্রধান। বিশ্লেষকদের ভাষ্য তিনি একটি গুণগত মানের কমিটি উপহার দিবেন। জানা যাচ্ছে তারুণ্য নির্ভর কমিটিই হবে। ত্যাগী, পরীক্ষিত নেতাদের মূল্যায়ণ হতে যাচ্ছে। দলীয় প্রধান নিজেই কমিটি গঠন প্রক্রিয়া নিয়ে সতর্কভাবে কাজ করছেন। আবেগ, বিরাগের উর্ধ্বে চুলচেরা বিশ্লেষণ করছেন। অনেক চেনা মুখকে এবারে তিনি সাইডবারে বসিয়ে দিবেন এতে কোন সন্দেহ নেই। আবার সৎ, যোগ্যদের দলের মূল স্থানে আসন দিতে যাচ্ছেন। সুষ্পষ্টতই বলা যায় সম্মেলনে দরুন চমক অপেক্ষা করছে।

লক্ষ্যের পথে যেতে হলে ক্ষেত্র প্রস্তুত ও জনবল তৈরি করা দরকার সবার আগে। আজকের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে কালকের ফলাফল। আজ ও কালের ফারাক বুঝতে পারাটা  দূরদর্শিতা। আপাতদৃষ্টিতে মাঠ ফাঁকা দেখালেও তা বেশিদিন ফাঁকা থাকে না। ষড়যন্ত্রের রাজনীতিটাই এমন। কাচের ঘরে বসে কাপুরুষেরা একটার পর একটা ট্রাম কার্ড খেলতেই থাকে। অপেক্ষায় থাকেন, কেবলই অপেক্ষার প্রহর গুনেন। আওয়ামীলীগের মধ্যে যারা বলেন বিএনপি নির্বাচনে না এসে ভুল করেছে তাদের পান্ডিত্যের দুর্দশা দেখলে করুণা হয়। বিএনপি-কে আসতে দেয়া হয়নি কারণ তাদের মুরুব্বীরা বলেছিল নির্বাচন হবে না। বিএনপি নির্বাচনই চায় নি, অথচ সরকারী দলের নেতারা বলেন নির্বাচনে না এসে ভুল করেছে। ফলে পর্যবেক্ষণ বাস্তবতার আদলে নতুন কমিটি গঠনই দল হিসেবে আওয়ামীলীগের জন্য ফরজ হয়ে দাড়িয়েছে। যার প্রতিফলন দেখার অপেক্ষায় পুরো জাতি। ঘুনেধরা বস্তাপচা জরাজীর্ণ পশ্চাৎপদদের সরিয়ে রাখার সময় এসেছে। শৈথিল্যতা দেখানো হলে পরিণাম হয় ভয়াবহ, লক্ষ্য পূরণ হয় না। দেশপ্রেমিক জনগণ শেখ হাসিনার উপর আস্থাশীল। কারণ তিনি লক্ষ্য নির্ধারণ করে চলছেন। জনগণের আস্থা আর শেখ হাসিনার দূরদর্শিতা উভয়ই একটি নিবিড় যোগে পরিণত হয়েছে। একমাত্র তিনিই বাস্তবতা অনুধাবণ করেন। তার সামনে কোন্ কোন্ চ্যালেঞ্জ রয়েছে তা বোঝেন-জানেন। তিনি লক্ষ্য পুরণের জন্যই যুদ্ধপরাধীদের বিচার করছেন। প্রায় একক সিদ্ধান্তে বিগত জাতীয় সংসদ নির্বাচন করেছেন দেশী-বিদেশী ঘাতকের মুখে চুনকালি মেরে। বিশ্বব্যাংকের সাথে লড়ে নিজস্ব তহবিল থেকে পদ্মাসেতু করছেন। জ্ঞানভিত্তিক ডিজিটাল বাংলাদেশ বির্নিমাণের পথে এগিয়ে চলেছেন। তিনি বিনয়ী-কঠোর স্বজনপ্রীতির উর্ধ্বে নিয়ে গেছেন নিজেকে। মন্ত্রী পরিষদে দলীয় পদ-পদবীতে বহুক্ষেত্রে তিনি দূরদর্শিতার স্বাক্ষর রেখেছেন। চরিত্র বদলের রাজনীতিকে রুখে দিয়েছেন দৃঢ় দেশপ্রেমের অঙ্গীকারে। পর্যবেক্ষণ ও অনুসন্ধানে ধরা পড়ে দলীয় প্রধান ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রায়শই যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। দলের সর্বোচ্চ বৈঠকে তা নিয়ে আলোচনা হয়। ইতোপূর্বে দলীয় পদ-পদবীতে এবং সরকারের মন্ত্রী পরিষদে তিনি এমন অনেককে এনেছেন যাদের নিয়ে পত্র-পত্রিকায় ও নিজ দলের নেতারাও কোনদিন আলোচনা করেননি। ফলে চুলচেরা বিশ্লেষণ করে বলা যায় দেশরত্ন শেখ হাসিনা জাতির স্বপ্ন পূরণের দিক নির্দেশনাকে বাস্তব করে তুলবেন আসন্ন সম্মেলনে। বাস্তবতা অনুধাবন, পর্যবেক্ষণ-বিশ্লেষণই দিক্নির্দেশনা বয়ে আনে। 

বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবসঃ কিছু ভাবনা


 বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবসঃ কিছু ভাবনা

শাহ্ শাহনাজ সুলতানা ॥ মন থেকে মানসিক। কথায় বলি তার মানসিক অবস্থা ভাল না। ঠিক কোন অবস্থায় এই মানসিক খুঁটিনাটি বিষয়গুলো স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়ায়, সাধারণ মানুষ বুঝতে পারে  না। পারলে শারিরীক স্বাস্থ্যের মতো যথাসময়ে এই সমস্যা সমাধানে তৎপর হতো। অবজ্ঞা আর অবহেলায় ছোটখাটো মামুলি ব্যাপার থেকে একসময় বিশাল কিছুতে পরিণত হয়। এমন একটা সমস্যার নাম মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা।
১০ অক্টোবর বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস। সারা বিশ্বে বিভিন্ন প্রতিপাদ্য বিষয় নিয়ে এই দিবসটি পালন করা হয়ে থাকে। বাংলাদেশে  এই দিবসটিকে সামনে রেখে আলোচনা সেমিনার আয়োজন করা হয়ে থাকে।
মানসিক সমস্যা তারই হয় যার অনভূতি আছে অনুভূতিহীন কাউকে মানুষ বলা যায় না। নিজের অজান্তেই চারপাশের কিছু ঘটনা, কোন কথা, অথবা চিন্তার বাড়াবাড়ি চাপের সৃষ্টি করে। বেলা রহমান (আসল নাম নয়) একসময় এতটা মানসিক চাপের মধ্যে থেকেছেন যে, ঘুমানোর সময় বাদে বাকি সময়টা কেটেছে দুশ্চিন্তায়। রিকশায় উঠলে মনে হতো এই বুঝি গাড়ির সাথে চাকাটা লেগে গেল। ঘরের বাইরে বেরুতে চাইতেন না। পরিবারের কোন সদস্য কাজের প্রয়োজনে বাইরে অবস্থান করলে সারাক্ষণ চিন্তা করা, অথবা অযথা মাথা গরম করা ছিল তার নিত্য কাজ। সমীক্ষায় দেখা যায়, অধিকাংশ মহিলা মানসিক  রোগে ভোগে। কোন সুনির্দিষ্ট কারণে এই সমস্যার সৃষ্টি হয় না। সমষ্টিগত কারণ এক হয়ে ধীরে ধীরে তাকে বা কোন ব্যাক্তিকে রোগীতে পরিণত করে। যার শিকার হয় পরিবারের সদস্য নিরীহ শিশুরা।
সফল পিতামাতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ  বিষয় হচ্ছে সন্তানের মনস্তাত্বিক দিকটা বুঝতে পারা। আজকাল পিতা-মাতা দুজনেই ব্যস্ত থাকে। একই সাথে তাদের অনেক কাজ করতে হয়। কিন্তু এই ব্যস্ত জীবনের ফাঁকে এমন একটা সময় আসে যখন তারা দেখতে পায় তাদের প্রিয় সন্তানটি সম্পর্কের বেড়াজালে নামমাত্র জড়িয়ে আছে। আসলে সে কোন এক দূরের দ্বীপ। কথা হয়, আবার হয়না। দেখা হয়, ভালো করে কথা হয় না। মুক্ত হয়ে কথা বলা, পারস্পরিক লেনদেন হচ্ছে না। যদি কোন পিতা-মাতা ভাবেন শুধুমাত্র ডাইনিং টেবিলে খাওয়ার সময় একটু সময় দেয়া, কথা বলা, অথবা গাড়ি চালানোর সময় পাশে বসিয়ে খোঁজখবর নেয়া যথেষ্ট তবে এটাই বলতে হবে তিনি ভুলের স্বর্গে বাস করছেন। সবসময় সন্তানের পিছনে এটাসেটা নিয়ে লেগে থাকা, তার জন্য সময় দেয়া বুঝায় না।  ঠিক তেমনি নিজের কাছে প্রশ্ন রেখে বের করতে হবে সারা দিনের একটা সময় শুধুমাত্র তাকে দেয়া বা তার পিছনে উৎসর্গ করা হয় কিনা। যার নাম কোয়ালিটি টাইম দেয়া। কোয়ালিটি টাইম দেয়া মানে সবসময় তার সাথে কথা বলা বা কিছু একটা একসাথে করা নয়। মাঝে-মাঝে তাদের সাথে বসে তাদের আচরণ পর্যবেক্ষণ করা , তাদের আচরণগত দিক ও অভ্যন্তরিণ বিষয় খতিয়ে দেখা। পর্যবেক্ষণ করা আর দেখাকে এক করে ফেললে সমস্যা সৃষ্টি হয়। এর জন্য দরকার পরিপূর্ণ মনোযোগ দেয়া : যখন সময় দেয়া হবে শুধু তাকেই দেয়া হবে। সম্পূর্ণ মনোযোগ পাওয়া শিশুর অধিকার। রান্নার সময় কথা বলা, ড্রাইভিং এর সময় কথা বলা যথেষ্ট নয়। তার প্রতি অখন্ড ভালবাসা সন্তান বড় না হওয়া পর্যন্ত নিজেকে নিরাপদ ভাবে এবং নিজেকে মেলে ধরে। আমার জানামতে ১১ বছরের এক শিশু আছে যে বাসায় গাছের সাথে কথা বলে। কারণ তার সাথে কথা বলার মানুষ নেই। এখানে কথা বলার মানুষ আছে কিন্তু শোনার মানুষ নেই। কারণ এখন প্রায় প্রত্যেক পরিবারে একটি সন্তানের বেশী নেয়া হয়না। নিলে বড়জোর দু’টি সন্তান। আমেরিকার লেখক ও গবেষক ড. স্টিফেন কোভ তার ‘দি সেভেন হ্যাবিটস অব হাইলি ইফেক্টিভ পিপল’ বইতে চার ধরণের শোনার কথা উল্লেখ করেছেন। যা সাধারণ মানুষ করে থাকে। যেমন হেলায়- হেলায় কারও কথা শোনা। ব্যাপারটা এরকম তুমি তোমার কথা বলে যাও আমি আমার কাজ করি।
আরেকটা হলো শোনার ইচ্ছা নেই তবু চেষ্টা করি। অনেকটা ভনিতা করা। চুপ করে শুনছে মনে হচ্ছে কিন্তু সে অন্য কোন চিন্তা করছে। অবচেতন চিন্তার স্তর থেকে শোনা। একটু শোনার পর প্রশ্ন করা কি বললে? অর্থাৎ কিছুটা শোনা। চার নম্বর হলো মনোযোগ দিয়ে শোনা। মনোযোগ দিয়ে শোনার বিষয়টা বোধের ব্যাপার। তার মানে এই নয় তার কথা গিলে খাওয়া। দু’জন ব্যাক্তি যে কোন বিষয় নিয়ে এক হতে পারে না।
এক হওয়ার নাম যুক্ত হওয়া, যেখানে পারস্পরিক সম্পর্ক দৃঢ় হয়। যদি হাজারটা প্রশ্নের মধ্যে একটা প্রশ্ন খুঁজে বের করতে বলা হয় তবে এটাই সত্য সেই প্রশ্ন হবে - সম্পর্ক কি ? আমাদের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্কের সমন্বয়হীনতা, উত্তর না জানার কারণেই হয়। একই ছাদের নিচে অবস্থান করে একটি মানুষের অনুরক্ত হতে পারিনা। কেন? কারণ পাশাপাশি অবস্থান করেও সর্বদা বর্তমানকে অবজ্ঞা করে সহ-অবস্থান করা হয়। যার শিকার হয় পরিবারের শিশুরা। শিশুদের ব্যক্তিত্ব, স্বভাব পরিবেশের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। দৃষ্টিভঙ্গিও গড়ে উঠে এই আদলে। পরিবেশ সন্তানের মনস্তাত্বিক দিক উন্নত করে  বা অবদমন করে। অবদমন প্রক্রিয়া একটি সর্বনাশা দিক যা তাদের মানসিক সমস্যার দিকে  ক্রমশ নিয়ে যায়।  প্রথমদিকে পুরো ব্যাপার অগোচরে থেকে যায় যতক্ষণ পর্যন্ত  মানসিক সমস্যার লক্ষণগুলো না দেখা যায়। অনেক পিতা-মাতা সন্তানকে প্রশ্নের খাতিরে প্রশ্ন করে থাকে। যা একবারেই অনুচিত। তার মতামত পাওয়া বিশেষ করে বয়সের কারণে, হরমোনের পরিবর্তনের কারণে তাদের মুড বুঝা, বুঝার চেষ্টা খুব কম পিতা-মাতা করে থাকে। একশতে ২০ জন পিতা-মাতা এর ব্যতিক্রম হলে বর্তমান সমাজে বিরাজ করা তরুণ সমাজ নিয়ে অভিভাবকদের আহাজারি কমবে। এটাই আশার কথা। আশা বুঝতে হলে নিরাশাকে বুঝতে হয়। আশা-নিরাশা পাল তোলা নৌকা। আবেগ হয় বৈঠা, নৌকার ভারসাম্য রাখতে হলে আনন্দকে বাতাস হিসেবে নিতে হয়।

তাই সন্তানের বিভিন্ন ধাপের সাথে পরিচয় রাখা বাঞ্ছনীয়। এজন্য দরকার পিতা-মাতার ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি। দরকার স্ব-শিক্ষা। অন্য সন্তানকে পর্যবেক্ষণ করলে নিজের সন্তানের অনেক সমস্যার সমাধান আসে। তুলনা নয় শুধু পর্যবেক্ষণ শক্তি দিয়ে বুঝার চেষ্টা করা। সমানুভূতি বলে একটা শব্দ আছে অভিধানে। সহানুভূতির চেয়ে সমানুভূতি দরকার অন্তত, আজকের প্রযুক্তির যুগে। কোন কোন পিতা-মাতা ধারণা পুষে রাখেন তার ছেলে অথবা মেয়ে কোন অভিযোগ করেনা চুপচাপ থাকতে পছন্দ করে। এ ধরণের ধারণা পুষে রাখা সন্তানের জন্য মঙ্গলজনক নয়। চোখ খোলা রেখেও তারা বন্ধ করে রাখছেন। অভিযোগ না থাকা, বা  কোন কিছু না বলা মানে এই নয় তার কোন চাওয়া-পাওয়া নেই। অযাচিত চাওয়া যেমন ভাল না ঠিক তেমনি কিছুই না বলা ভাল না। পরিস্কার ভাবে কথা বলে তার সাথে পারস্পরিক সম্পর্কের বন্ধন দৃঢ় করা প্রয়োজন। হয়না বলেই পরিবারে বেড়ে উঠা একমাত্র মেয়েটি পোষা প্রাণীর সাথে কথা বলে, একা একা বিড় বিড় করে। পড়াশুনায় কোন মনোযোগ নেই। কোন গতি নেই। সন্তানরা তাদের কিছু আচরণ আয়ত্ব করে পিতা-মাতার কাছ থেকে, পরিবার থেকে, সমাজ থেকে, পরিবেশ থেকে। যে আচরণ অস্বাভাবিক, মাত্রাধিক্য তার নাম মানসিক রোগ। দেখা যায় বিষন্নতা, দ্রুত মুড পরিবর্তন, অস্থিরতা, আবেগ প্রবণতা, হতাশা। এক্ষেত্রে সন্তানরা কোন সময় নিজেদের নিঃসঙ্গ করে ফেলে। তথাকথিত বড়রা (!) চিন্তাভাবনা করে তাদের দিক থেকে অবস্থান করে। এটা না ভেবে সন্তানের বয়সের অবস্থানে নিজেদের কিছুটা সময় ভাবতে সক্ষম হলে তখন দেখতে পায় তারা কতটা অধৈর্য। এই সময়ে এই বয়সে তারা কি ছিল?  নিশ্চয় সমাজের আঙ্গিক পরিবর্তন হয়েছে সময়ের হাত ধরে। শিশু  বিকাশের ধাপ সময়ের সাথে পরিবর্তন হয়নি, হয়েছে কেবল পদ্ধতিগত দিক। আগে আমরা মাইলের পর মাইল হেঁটে স্কুলে যেতাম এখন আজকের অনেক শিশু তা ভাবতে পারেনা। শিশুদের নিজস্ব পৃথিবীটা মঙ্গলগ্রহ হয়ে যায়। জনমানবহীন এই গ্রহে তারা মানসিক রোগী হয়ে বসবাস করে যখন পিতামাতা দু’জনেই কোন না কোন ভাবে মানসিক সমস্যায় ভুগে থাকে। মোহ, পরশ্রীকাতরতা, সংকীর্ণতা, হিংসা ইত্যাদির জালে পিতামাতারাই একবার ডুবে একবার ভাসে। আমরা যেমন শারীরিক স্বাস্থ্যের প্রতি লক্ষ্য রাখি তেমনি মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতিও লক্ষ্য রাখা দরকার। বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় যাই হোক না কেন উপলব্ধির উপরে আর কোন শব্দ থাকতে পারে না। সচেতনতার সাথে পথ চলায় আনন্দ যোগ হলে আর কি প্রয়োজন পড়ে?