বৃহস্পতিবার, ৮ নভেম্বর, ২০১৮

পরগাছা-আগাছামুক্ত রাজনীতি



সংলাপ ॥ গাছ-গাছালির মধ্যে যে ক্ষতিকর ও অপ্রয়োজনীয় গাছ বেড়ে উঠে সেটাই আগাছা। গাছের যতœ নেয়া না হলে আগাছাই সেখানে বড় হয়ে দেখা দেয়। এমনকি প্রয়োজনীয় গাছটিকে প্রায় নিঃশেষও করে দিতে পারে আগাছা আর স্বর্ণলতার মতো পরগাছারা। অযত্ন-অবহেলায় থাকা এদেশের যে-কোনো ফসলের জমি, বাগান বা বাগানের গাছের দিকে তাকালে এমন দৃশ্য চোখে-পড়ে সহজেই। গাছের মতো রাজনীতির অঙ্গনেও আগাছা ও পরগাছা জন্মে। কয়েকশ’ বছর ধরে এই বাংলা তথা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় অসংখ্য বিপ্লবী, স্বাধীনতা সংগ্রামীর নিরবচ্ছিন্ন আন্দোলন ও লড়াই সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় বঙ্গবন্ধু ১৯৭১’র ৭ মার্চে লক্ষাধিক মানুষের সামনে এসে ঘোষণা দিলেন, ‘এবারের সংগ্রাম, আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’। এরই ধারাবাহিকতায় বহু আত্মত্যাগে এলো ১৬ ডিসেম্বর, বিশ্বের মানচিত্রে স্থান পেলো স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। পাকিস্তানের কারাগার থেকে ফিরে এসে ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান লাখো জনতার সমাবেশে বললেন, ‘আমার স্বপ্ন আজ পূরণ হয়েছে, বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে’।
২৪ জানুয়ারি কাদেরিয়া বাহিনীর অস্ত্র সমর্পণ অনুষ্ঠানে মুক্তিযোদ্ধাদের উদ্দেশে বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘আমি তোমাদের তিন বছর কিছু দিতে পারবো না। আরো তিন বছর যুদ্ধ চললে, তোমরা যুদ্ধ করতে না? (উত্তর, ‘করতাম, করতাম’) তা হলে মনে কর যুদ্ধ চলছে, তিন বৎসর যুদ্ধ চলবে। সেই যুদ্ধ দেশ গড়ার যুদ্ধ। অস্ত্র হবে লাঙ্গল আর কোদাল।’-তারপর যুদ্ধ-বিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনে চললো ব্যাপক আয়োজন। সেদিন সবই হয়তো ঠিক ছিল, কিন্তু রাজনীতিতে যে আগাছা ও পরগাছা রয়ে গিয়েছিল এবং নতুন করে জন্ম নিচ্ছিল সেদিকে খেয়াল দেয়ার সময় পাননি তিনি, কারণ তিনি সার্বক্ষণিক নিয়োজিত ছিলেন বাংলা ও বাঙালি জাতির উন্নতির ভাবনায়। কিন্তু এরই মাঝে বাংলাদেশের রাজনীতিতে কত আগাছা ও পরগাছা জন্ম নিয়েছিলো তা জাতি বুঝতে পেরেছিল ৭৫’র ১৫ আগষ্টের পর।
বঙ্গবন্ধু সরকারকে বাঙালি জাতীয়তাবাদী রাজনীতির গাছ ধরলে সেই গাছেই আগাছা ও পরগাছা হিসেবে খন্দকার মোশতাক গং (বঙ্গবন্ধু সরকারের বাণিজ্যমন্ত্রী!) যে কীভাবে পেঁচিয়ে ধরে জীবনীশক্তি শোষণ করেছিল এবং আজও করছে তা বাঙালি জাতির উপলব্ধিতে আজও বিদ্যমান। বঙ্গবন্ধু সরকারের কোনো মন্ত্রী, সশস্ত্রবাহিনীর কেউ তাঁর দলের কোনো নেতা-কর্মী, সেদিন সেই হত্যাকান্ডের প্রতিবাদ করার সৎ সাহস দেখায় নাই। রাজনীতির আগাছা-পরগাছাগুলো বড় হয়ে যাওয়ার কারণে সেদিন বাঙালি জাতি হয়ে পড়েছিল নেতৃত্বহীন এবং বাকরুদ্ধ। মোশতাক স্বাধীনতার পর কীভাবে বঙ্গবন্ধু সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হয়ে উঠেছিল, মুজিবনগর সরকারের নির্ভিক প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদকে তৎকালীন সরকার থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়েছিল, সেই ঘটনাগুলোকে বাস্তবতার নিরীখে উপলব্ধি করা আজও বড় বেশি প্রয়োজন।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দেশরত্ন কন্যা ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবারের জাতীয় শোক দিবসের এক অনুষ্ঠানে দুঃখ করে বলেছেন, মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে দেশ স্বাধীন করে যে জাতি বীরের জাতিতে পরিণত হয়েছে, ৭৫’এর ১৫ আগষ্টে তাঁকে হত্যার মধ্য দিয়ে সেই জাতির একাংশ দেশ ও জাতির কাছে ঘাতক হিসেবে  পরিচিতি লাভ করেছে। বঙ্গবন্ধুর সাথে একজন মেজরকে তুলনা করার ধৃষ্টতা দেখানো হয়েছে, যা শান্তি (ইসলাম) ধর্মের পরিপন্থী। দুঃখের বিষয় এখনো ষড়যন্ত্র চলছে। দীর্ঘ একুশ বছর খোদ্ বঙ্গবন্ধুর নামটিকেই বাংলাদেশে সরকারিভাবে নিষিদ্ধ করে রাখা হয়েছিল। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মধ্য দিয়ে রাজনীতির পরগাছা ও আগাছাগুলোই ডালপালা মেলে এদেশের গণমানুষের রাজনীতি ও রাষ্ট্রের চালিকা শক্তিকে আদর্শহীন ও লুটপাটতন্ত্রে পরিণত করেছিল। এর সংক্রমণ দেশের প্রশাসনসহ সর্বস্তরে আজও বর্তমান। জিয়াউর রহমানের আমলে দেশের ছাত্র-যুবসমাজের চরিত্রকে কলংকিত করার জন্য যে ইয়ুথ কমপ্লেক্স গঠন এবং হিজবুল বাহার জাহাজে চড়ানো হয়েছিলো সেই ধারাবাহিকতা অর্থাৎ, রাজনীতিতে আগাছা তৈরির যে বীজ বপন করা হয়েছিল তার পরিণতি আজও বহন করতে হচ্ছে দেশ ও জাতিকে। এদেশের যে রাজনীতি একদিন ছিল সমাজসেবা, আজ তাই হয়ে উঠেছে ব্যক্তি ও কায়েমী স্বার্থ উদ্ধার এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুণ্ঠনের হাতিয়ার। এরই ধারাবাহিকতায় ছাত্র রাজনীতির নামে আজ দেশসেবা নয়, সন্ত্রাস ও নিজের আখের গুছানোর রাজনীতি হচ্ছে। আর এ কাজটি করার জন্যই আগাছা-পরগাছা রাজনীতিক ও ছাত্র-যুবকেরা ছাত্রলীগ তথা আওয়ামী লীগের মতো ঐতিহ্যবাহী একটি সংগঠনের ভেতরে ঢুকে পড়েছে, কলংকিত হচ্ছে ছাত্রলীগ আর আওয়ামী লীগ এর রাজনীতিকরা।
রাজনীতির অঙ্গনে এই দুরাবস্থার জন্য যারা শুধুমাত্র ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগকে দোষারূপ করে এর সমাধান খোঁজার চেষ্টা করছে তারা বিভ্রান্তির বেড়াজালে আবদ্ধ হয়ে শুধুমাত্র রাজনীতির পানি ঘোলাটে করছে, তাই রাজনীতির অঙ্গনে সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য দেশের গোটা রাজনৈতিক অঙ্গনকেই আগাছা ও পরগাছা মুক্ত করা আজ জরুরি হয়ে পড়েছে। এর জন্যে সব অঙ্গনেই যত ত্যাগের প্রয়োজন তা দৃঢ় প্রত্যয়ী হয়ে বাঙালি জাতিকেই করতে হবে দেশরত্ন শেখ হাসিনার নেতৃত্বেই, যেহেতু তিনি জাতির কাছে ওয়াদাবদ্ধ।
ইংরেজী শব্দ ‘পলিটিক্স-এর বাংলা ‘রাজনীতি’ শব্দটির সংস্কার প্রয়োজন। ইংরেজ আমলের তথাকথিত বাঙালি পন্ডিতদের করা অনুবাদ ‘রাজনীতি’র পরিবর্তে এখন ‘জননীতি’ শব্দটি চালু করলে অনেক বেশি প্রান্তিক মানুষের কাছাকাছি আসা যাবে এবং এর কার্যকারিতা জাতিকে আরও বলিষ্ঠ করবে। নিজের সমাজ ও দেশ গঠনে মনোনিবেশ না করে যারা শুধুমাত্র নিজেদের আখের গোছানোর জন্য রাজনীতিতে প্রবেশ করে তারাই লাখো শহীদের আত্মার সাথে বিশ্বাসঘাতকতাকারী এবং নিজ নিজ কামনায় ধরা পড়ে তারাই রাজনৈতিক অঙ্গনে আগাছা হয়ে আজও বর্তমান। এরাই ‘ইন্দুরের’ মতো ধানের গোলা থেকে ধান নষ্ট করে ফেলছে। সার্বিক অঙ্গনে এইসব আগাছা-পরগাছাদের সংস্কারের মাধ্যমে যতো বেশি সম্ভব উপড়ে ফেলা যাবে এবং নির্মূল করার চেষ্টা করা যাবে, দেশ ততো দ্রুত ক্রমোন্নতির দিকে এগিয়ে যেতে পারবে। 

স্ব-ভাব


মানুষ জন্মাবার পর পারিপার্শ্বিকতা হতে তার অভ্যাস গড়ে তোলে। প্রথমে সে চোখকে বেশি কাজে লাগায়। অনুকরণ ও অনুসরণ করতে চেষ্টা করে পরিবারের সদস্যদের এবং চোখ দিয়ে যা দেখছে সেগুলোকে। অতঃপর চোখ, কান, নাক, জিহ্বা ও ত্বকের সহযোগিতায় হাত, পা, মুখ, পায়খানা ও প্রসাবের রাস্তা সমূহের দ্বারা বিভিন্ন কর্মের মধ্যে নিজেকে নিয়োজিত করে। যখনই কোন কর্ম করে তখনই সে সুখ, দুঃখ বা ঔদাসীন্যের সঙ্গে জড়িত হয়, কর্মফলের উপর নির্ভর করে। এভাবেই ধীরে ধীরে সে বড় হতে থাকে পরিবেশগত কর্মের মাধ্যমে। গবেষকদের মতে একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ ৫ (পাঁচ) হাজার হতে ৭ (সাত) হাজার কর্মের মধ্যে নিজেকে ব্যস্ত রাখে প্রতিদিন। প্রতিদিনের এই কর্মগুলোর মধ্য দিয়েই একই পরিবেশ অন্তর্ভূক্ত কর্মের বারবার বাস্তবায়নে তার গড়ে ওঠে অভ্যাস। এই অভ্যাসের প্রকাশ ভঙ্গিতেই আস্থা গড়ে ওঠে এবং পরবর্তীতে স্ব-ভাবে পরিণত হয়। ধর্মীয় আঙ্গিকে স্ব-ভাবের উপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। স্ব-ভাবকে দুই ভাগ করে সৎ স্ব-ভাব ও মন্দ স্ব-ভাব বলা হয়েছে এবং সৎ স্ব-ভাবের উপর বেশি প্রাধান্য দেয়া হয়েছে সর্বযুগে-সর্বকালে সকল ধর্মে।
ইসলাম ধর্মে সবচেয়ে সরাসরি সৎ স্ব-ভাবের উপর জোর দেয়া হয়েছে আত্মিক উন্নতির জন্য। নবী মুহাম্মদ (সঃ) বলেছেন:
- সৎ স্ব-ভাবই ধর্ম।
- সর্বাপেক্ষা উৎকৃষ্ট কার্য সৎ স্ব-ভাব।
- সর্বাপেক্ষা উৎকৃষ্ট গুণ সৎ স্ব-ভাব।
- সৎ স্ব-ভাবের বলে মানুষ ‘ছায়েমুদ্দাহার’ অর্থাৎ সারা বৎসর সিয়াম পালন করার এবং ‘ক্বায়েমুল্লাইল’ অর্থাৎ সারা রাত্রি দাঁড়িয়ে এবাদত করার ফযিলত ও ছওয়াব লাভ করতে পারে।
ধর্মীয় গবেষকগণ সৎ স্ব-ভাবের পরিচয় বা তত্ত্ব বিশ্লেষণে প্রবৃত্ত হয়ে নানা মত ও পথের জন্ম দিয়েছেন নিজেদের জানা ও উপলব্ধিবোধ হতে। যেমন - হাসি মুখ, কষ্ট সহ্য করা বা অত্যাচারে প্রতিশোধ না নেয়া সৎ স্ব-ভাব। বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় এগুলো এক একটি শাখা বা লক্ষণ কিন্তু সৎ স্ব-ভাবের পূর্ণাঙ্গ পরিচয় নয়।
মানুষ প্রাকৃতিক নিয়মেই জন্ম নেয়। পরবর্তীতে নিজের এক এক রূপ সৃষ্টি করে বিবর্তনের ধারায়। পরিবেশকে মোকাবিলা করার জন্যে কর্ম করে। কর্মের মধ্য দিয়েই তার দেহ শক্তিশালী হয়ে উঠে। সঙ্গে সঙ্গে মানুষের অভ্যন্তরীণ প্রকৃতি ও বৃত্তিগুলি সমভাবেই বিকশিত ও স্ফূর্ত হয়। এই বিকাশের ধারা থেকেই বিভিন্ন অঙ্গের শক্তি, বুদ্ধিমত্তা, নিয়ন্ত্রণ শক্তি এবং প্রবৃত্তি জেগে উঠে। এদের মাঝে সমতা এবং সামঞ্জস্য রক্ষা করার জন্য আবির্ভাব ঘটে বিচার শক্তির। এই চার শক্তির কোনটা কম বা বেশি থাকলে স্ব-ভাব গড়ে উঠে না অপূর্ণ থাকে। কম হলে দুর্বল বা অকর্মণ্য হয় আর বেশি হলে কুৎসিত আকার ধারণ করে এবং তা তার কর্মের মধ্যেই প্রতিফলিত হয়। একই তালে চারশক্তির প্রবৃদ্ধি যখন ঘটে একটা কর্মকে কেন্দ্র করে তখনই গড়ে ওঠে স্ব-ভাব। স্ব-ভাব দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে সমাজের উপর প্রভাব বিস্তার করে চলেছে এবং তা যথাক্রমে সৎ স্ব-ভাব ও অসৎ স্ব-ভাব। এই দুই স্ব-ভাবের মধ্যে ব্যবধান নির্ণয় করার জন্য কোন নির্দিষ্ট সীমারেখা নেই। ব্যক্তি যখন তার কর্ম অঙ্গগুলো সজাগ রাখে, তার বিচার শক্তি দিয়ে নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখে এবং প্রতিটি কর্ম বিশ্লেষণ করে তখনই তার মধ্যে চিন্তাজগতে দ্বন্দ্বের উৎপত্তি হয় আর এই দ্বন্দ্বই তাকে সৎ-অসৎ পথের সন্ধান দেয়।
যখনই দ্বন্দ্ব দেখা দেয় প্রতিটি কর্মকে ঘিরে তখনই সৎ সংসর্গে আসা একান্ত আবশ্যক যিনি সংশোধনের জন্য পথ দেখান। তিনি অসৎ পথগুলোর ব্যাখ্যা করেন এবং পারিপার্শ্বিকতা গড়ে তুলতে অসৎ হতে সৎ পথের যাত্রীকে সহযোগিতা করেন। এছাড়াও যখন কেহ কর্ম বিশ্লেষণ করে নিজেকে উপলব্ধির পর্যায়ে উন্নীত করেন তখন তার কর্মগুলো খারাপ হতে পারে না। সে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে এবং চিন্তাজগতকে সঠিক পথে চালাতে পারে। এইভাবে কোন কাজের অভ্যাস করতে থাকলে পরিশেষে ওই অভ্যাসই তার স্ব-ভাব হয়ে দাঁড়ায়। আর এই কারণেই বলা হয় অভ্যাস দ্বিতীয় স্ব-ভাব। এখানেই অনুসন্ধিৎসু মানুষ পথ প্রদর্শক খোঁজে এবং মুর্শিদের সন্ধান করে আত্মসমর্পণ করে আত্মিক উন্নতির জন্যে। মুর্শিদ তাকে পথ দেখায় - আল্লাহ্ প্রেমের সন্ধান দিয়ে।
শরীর অসুস্থ হলে ভাল খাবারও যেমন মুখে খারাপ লাগতে পারে অরুচির জন্যে, ঠিক তেমনি চিন্তা ও চেতনায় খারাপগুলো অনুপ্রবেশ ঘটালে আল্লাহ্ প্রেম হতে সে দূরে থাকবে। তার ভাল লাগবে না আজ্ঞাবহ হতে।
চিন্তাজগতকে একরৈখিকতায় কার্যকরী করে যে সমস্ত কাজ করা যায় তার একটা প্রভাব অভ্যন্তরীণ চেতনায় বিস্তার লাভ করে। ফলে ব্যক্তি এক অনির্বচনীয় জ্যোতিতে জ্যোতির্ময় হয়ে ওঠে। নবী মুহাম্মদ (সঃ) বলেছেন - আল্লাহ্র নির্দেশ আনন্দের সাথে পালন কর। যদি না পার তবে জবরদস্তি সহকারে পালন কর, কেননা এই জবরদস্তি করার মধ্যে প্রচুর পুণ্য রয়েছে।
সাধনা এবং পরিশ্রম দুটোর সাহায্যেই ফিরিশতার স্ব-ভাব ও গুণ অর্জন করা যায় এবং আধ্যাত্মিক জগতই মানবজাতির মূল উৎপত্তিস্থল। ধন-দৌলত এবং পার্থিব প্রতিপত্তির মোহে মত্ত থাকিলে নিকৃষ্ট স্ব-ভাব গড়ে উঠে। সেই নির্বোধ যে নিজের সম্বন্ধে ভাল ধারণা পোষণ করে, নিজকে  বহু গুণের অধিকারী বলে মনে করে ও নিজের মধ্যে কোন দোষ-ত্রুটি আছে বলে মনে করে না। বুদ্ধিমান সেই যে নিজের দোষ-ত্রুটি সম্বন্ধে সজাগ থাকে।
“একদা এক জিহাদ হতে আসার পর সাহাবাগণকে নবী মুহাম্মদ (সঃ) জিজ্ঞাসা করলেন - আমরা ছোট জিহাদ হতে আসলাম, না বড় জিহাদ হতে? সকলে আরয করলেন - ইয়া রাসুলাল্লাহ্ (সঃ), বড় জিহাদ কি? তিনি উত্তর দিলেন - নিজের নফস্ বা প্রবৃত্তির সাথে যুদ্ধ করাই বড় জিহাদ।” যত বড় দুর্দম্য এবং অবাধ্য প্রজাতি হোক না কেন নফস্ বা প্রবৃত্তি তদপেক্ষা অধিকতর অবাধ্য। তাই শক্তির লাগাম হতে অধিকতর শক্ত লাগাম দিয়ে নফস্কে সর্বদা বশে রাখা আবশ্যক। আর এর জন্য মুর্শিদের উপদেশ নামক অধিকতর শক্ত লাগামটি সর্বোৎকৃষ্ট।
এই আলোকে ব্যক্তি, পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে সৎ স্ব-ভাবের কি প্রয়োজন তা একটু চিন্তা করলে বেশ বুঝা যাবে। মা-বাবা সৎ স্ব-ভাবী হলে ছেলে-মেয়ে সৎ স্ব-ভাবী হতে বাধ্য। এভাবে প্রত্যেকটি পরিবার সচেতন হলে সমাজ সচেতন হবে এবং সামাজিক পরিবর্তনের পথ খুলে যাবে। অপরদিকে রাষ্ট্রীয় জীবনে যে দলই ক্ষমতায় আসুক না কেন কর্ণধারদের অবশ্যই সৎ স্ব-ভাবী হতে হবে। তাঁদের সৎ স্ব-ভাব থাকলে তারই স্পর্শে প্রশাসনিক ধারায় সৎ স্ব-ভাবের প্রভাব পড়তে থাকবে যা শুধু সামাজিক অবক্ষয় প্রতিরোধ করবে না বরং আত্ম-উন্নতির দিকে নিয়ে যাবে।
পৃথিবীর সকল চোখকে ফাঁকি দেয়া যায় কিন্তু নিজের বিবেককে ফাঁকি দেয়া যায় না। তাই মানুষ সংসার জীবনে শুধু লোভ আর মিথ্যা অহং ভাবের বশবর্তী হয়ে বিবেকের তাড়নাকে ঢাকা দেয়ার জন্য অভিনয় করে যাচ্ছে মাত্র। ব্যক্তি জীবনে প্রত্যেক মানুষই ধর্মপালন করে যাচ্ছে আর সেটা হচ্ছে তার মোহাচ্ছন্নতার ইচ্ছাধর্ম। পরিবর্তন হচ্ছে কিন্তু তাতে তার লোভ ও অহংকার দিন দিন বাড়ছে বই কমছে না। ‘নিয়ন্ত্রণ’ বলে শব্দটা বই পুস্তকে রয়ে যাচ্ছে কিন্তু ব্যক্তি জীবনে এর যথাযথ ব্যবহার হচ্ছে না। নিয়ন্ত্রণকে স্ব স্ব জীবনে বাস্তবায়িত করার জন্য প্রধান ভূমিকা পালন করে চোখ। এই চোখই যতো নষ্টের গোড়া আবার এই চোখই সাধারণ মানুষকে আত্মিক উন্নতিতে সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করে স্ব-ভাব গড়াতে। এই প্রক্রিয়ায় ব্যক্তির স্ব-ভাবের পরিবর্তন দলের উপর প্রভাব বিস্তার করতে করতে সমগ্র জাতির উপর প্রভাব বিস্তার করে জাতীয় জীবনে এক মৌলিক পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয়। তাই প্রয়োজন নেতৃত্বদানকারী নেতা-নেত্রীর সত্য ও দৃঢ় প্রত্যয়ী স্ব-ভাবী হওয়া। বিপদে পড়লে মানুষের চরিত্রের অনেক গোপন রহস্য উদ্ঘাটিত হয় আবার প্রকৃত বন্ধুও চেনা যায়।
আমাদের স্মরণে রাখতে হবে দেশবাসী না খেয়ে থাকতে পারে কিন্তু দৈনন্দিন জীবনে তারা একটু শান্তি চায়, একটা সুন্দর পরিবেশ চায় যেখানে সার্বিক আতঙ্কমুক্ত থাকতে পারা যায়। আসুন, আমরা সৎ স্ব-ভাবী হওয়ার প্রতিজ্ঞা নিয়ে দৈনন্দিন জীবনের পথে পা রাখি। 

বৃহস্পতিবার, ১ নভেম্বর, ২০১৮

সময়ের দাবী - দেশ ও জনগণের স্বার্থে রাজনৈতিক সমঝোতা


সময়ের দাবী -
দেশ ও জনগণের স্বার্থে রাজনৈতিক সমঝোতা

সংলাপ ॥ দশম জাতীয় সংসদের শেষ অধিবেশন ছিল গত ২৯ অক্টোবর। একটি সংসদের নির্ধারিত মেয়াদকাল সমাপ্তির পথে। সারাদেশে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে সর্বমহলে চলছে জোর আলোচনা। ক্ষমতা আর আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে জোটের রাজনীতি বেশ ঝাঁকিয়ে বসেছে কিন্তু চাপা উত্তেজনায় সারা দেশের মানুষ। নির্বাচনের পূর্বে সংলাপ শুরু করার জোর আবেদন ছিল বিরোধী সব মহল থেকে বর্তমান সরকারের কাছে। সরকারি দলের নেতাদের বক্তব্যে সংলাপ বিষয়ে যখন হতাশার জন্ম নিচ্ছিল ঠিক তখনই বিরোধী ঐক্যফ্রন্টের নেতার চিঠি আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে। গণতন্ত্রকে সুসংহত করতে তিনিও দেরি না করে ইতিবাচক পদক্ষেপ নিয়ে ঐক্যফ্রন্টের নেতাকে সংলাপের দিনক্ষণ জানিয়ে পত্র পাঠালেন। হঠাৎ যেন বাংলার রাজনীতিতে সমঝোতার সুর!   
রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে সংলাপ শুরু করা জরুরী হয়ে পড়েছিল কারণ দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। রাজনীতির মাঠে যারা আছেন তারা তো অবশ্যই, বুদ্ধিজীবী, বিশ্লেষক, গবেষক সকলেরই এক কথা - সমাজে সর্বস্তরে দ্রুত সংলাপের ব্যবস্থা নেয়া দেশ ও দেশের জনগণের স্বার্থে। বিদেশী বন্ধুরাও সরব ছিল সংলাপের পক্ষে। তারাও যথারীতি পরামর্শ দিয়েছেন। বিভিন্ন গণমাধ্যমে তা বেশ জোরের সাথে প্রচারিত হচ্ছে, যাতে জনসমর্থন সংলাপের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান তৈরি হয়। সকলের একই কথা-সংলাপের মধ্য দিয়ে গ্রহণযোগ্য ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন দিয়ে গণতন্ত্রে ফিরতে হবে যদিও বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন আছে তা কোন গণতন্ত্র? সর্বদিক থেকে সংলাপ আয়োজনের বিষয়টি খুবই ইতিবাচক। রাজনৈতিক দল ছাড়া যেহেতু রাজনীতি চলবে না আর রাজনীতি না থাকলে যে কোন পদ্ধতির গণতন্ত্র থাকবে কোথায়? নিঃসন্দেহে এর চেয়ে যৌক্তিক বিবেচনা আর কী হতে পারে? এমন সরল সমীকরণ অস্বীকার করবে কে?
সংলাপ বা আলোচনা যেহেতু গণতন্ত্রের একটি ভীত, সুতরাং তাকে বাদ দিয়ে গণতন্ত্র মনষ্কতা নিশ্চয়ই সুচিন্তিত নয়। কাজেই সর্বস্তরে সংলাপ হোক। আমাদের গণতন্ত্র ছিলো, একসময় আমরা হারিয়েছি, এখন আমরা আবার হাঁটি হাঁটি করে সেখানে ফিরে যাচ্ছি। আর সে যাওয়ার পথে দেশ ও জাতির উপযোগী গণতান্ত্রিক পদ্ধতি বাস্তবায়নের দায় বর্তমান সরকারের। তারা হাত ধরে জাতিকে গণতন্ত্রের পথে নিয়ে যাবেন।
বর্তমান সরকার জনপ্রতিনিধিত্বশীল সরকার। দেশে যুগোপযোগী গণতন্ত্রে ফিরতে এই সরকার কর্তৃক বিভিন্ন আঙ্গিকে সংস্কার ও বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে যা বাংলার ও বাঙালি জাতির ঐতিহ্য রাখতে পারে। তাই আবার ফিরতে হবে শিকড়ের সন্ধানে এবং যাদের দ্বারা তা কার্যকর হবে তাদেরই কাছে অর্থাৎ নতুন প্রজন্মের হাতেই তুলে দিতে হবে দেশকে গণতান্ত্রিক শাসনে ফিরিয়ে আনতে। তাই সর্বস্তরে সংলাপ জরুরি।
কোনো সন্দেহ নেই গণতন্ত্রের জন্য নির্বাচন অবশ্যই অপরিহার্য আর সে নির্বাচনের জন্য রাজনৈতিক দল তো থাকতেই হবে। কিন্তু যে দলগুলো ৭৫’ পরবর্তী বছরগুলোতে রাষ্ট্রক্ষমতা পরিচালনা করে গণতন্ত্রের নামে যে বন্যতা, বর্বরতা উপহার দিয়েছিলো আমরা কি আবার তাদেরই কাছে ফিরে যাবো গণতন্ত্রের জন্য? গ্রহণযোগ্যতার দিক থেকে এই সরকার কর্তৃক নির্বাচন অনুষ্ঠানের আইনগত বৈধতা রয়েছে। সরকারের চিন্তাগত অবস্থান স্পষ্ট না হলেও কর্মকা-ে মোটামুটি প্রতীয়মান যে খুব বেশি হার্ডলাইনে তারাও আর অবস্থান নিতে চাচ্ছেন না।
 দেশে গণতন্ত্র আছে কিন্তু দেশ ও জাতির জন্য যুগপোযোগী গণতন্ত্র আজও প্রতিষ্ঠিত হয়নি। জনসমর্থন পেয়ে একটানা ১০বছর অতিক্রান্ত করে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত বর্তমান সরকার। কিন্তু সেই জনগণতান্ত্রিক গণতন্ত্র এবং জনগণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত করতে হলে রাজনীতির অঙ্গনের খোলনলচে পাল্টে দিতে হবে স্বদেশী ধারায়।কিন্তু যারা ছিলো যুদ্ধাপরাধী ও ধর্মের নামে উগ্র সন্ত্রাসী, দেশ ধ্বংসকারী, মানবাধিকার লংঘনকারী, দানবীয় রাজনীতির প্রবর্তনকারী, দুর্বৃত্তায়িত চিন্তা পরিবেষ্টিত হিংস্র শ্বাপদ তারা যেন আবার অপরিহার্য হয়ে উঠতে না পারে দেশ পরিচালনায় গণতন্ত্রের নামে। এক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে প্রতিটি সচেতন বাঙালিকে।
শুধুমাত্র নির্বাচন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে জনগণ তাদের প্রতিনিধিত্বশীল সরকার পরিচালনা করতে পারবে না। সূক্ষ্ম প্রক্রিয়ায় গণদাবি ও ন্যায়বিচারকে পাশ কাটিয়ে চলা সেই সব দুর্বৃত্ত রাজনীতিকদেরকে রাজনীতিতে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার হীনচক্রান্ত রুখতে হবে। গত ১০ বৎসরের অভিজ্ঞতা বলছে ন্যায়বিচারের দরজা এখনো যথারীতি রুদ্ধ হয়ে যায়নি। ইঁদুর-বিড়ালের খেলা আর মিডিয়ায় নানা নাটক, সংস্কারের মৌলিকত্বকে এখন যে-চোরা গলিপথের দিকেই ঠেলে দেয়ার অপচেষ্টা হচ্ছে, তা কি সচেতন রাজনীতিকরা অনুধাবন করতে পারছেন না? শুরুতে দৃঢ়তা না থাকলে লক্ষ্যের স্থিরতা থাকবে না, লক্ষ্যে পৌঁছানোও যাবে না।
গণতন্ত্র কোনো পণ্য নয়, যা মুদি দোকানে বিক্রি হতে পারে। রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতায় আসলেই অমনি তা জনগণ প্রয়োজন মতো মুদি দোকান থেকে কিনতে পারবে। এর কোনো অলৌকিকত্বও নেই যা আলাদিনের প্রদীপ হয়ে আমাদেরকে গণতান্ত্রিক বানিয়ে ফেলবে কিংবা আমাদের রাজনীতিকদেরকে সত্যি সত্যিই গণতান্ত্রিক চিন্তাধারায় বদলে দেবে। এমন নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারবেন না। স্বাধীনতার উত্তরকালে ক্ষমতায় থাকাকালীন সব দলের রাজনীতিকদের চরিত্রগুলো দেশবাসীর কাছে একেবারেই অপরিচিত নয়। এদের মধ্যে থেকে পাঁচ শতাংশ বের করা যাবে না যাদের ন্যূনতম দেশপ্রেম ছিলো বা আছে। তাই দেশ ও জাতির চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যগুলো বিবেচনায় এনে যুগোপযোগী গণতান্ত্রিক পদ্ধতি প্রণয়ন করে নতুন প্রজন্মকে সামনে এগিয়ে দিতে না পারলে বর্তমান সরকারকেও পিছু হঠতে হবে যা কোনভাবেই কাম্য  নয়। তাই সময়ের সাথে সাথে সমাজের সার্বিক অঙ্গনে সত্য প্রতিষ্ঠার কান্ডারি হওয়া বর্তমান সরকারের নৈতিক দায়িত্ব ও কর্তব্য।

বাংলাদেশে অতি-রাজনীতির সঙ্কট


বাংলাদেশে অতি-রাজনীতির সঙ্কট

* ভাল যদি সমর্থিত না হয়, খারাপ যদি ধিকৃত না হয়, তা কি সমাজ-রাষ্ট্রের জন্য কল্যাণকর হতে পারে?
* মানুষের অভ্যন্তরীণ ভাবনার কাঠামো পরিবর্তনের চেষ্টা না করে  বাহ্যিক কাঠামোর পরিবর্তন কি সম্ভব?
* সামাজিক-অর্থনৈতিক সমস্যা বিশ্লেষণ ও সমাধানের জন্য প্রয়োজন পক্ষপাতশূন্য, যুক্তিশীল, ও স্বচ্ছ  চিন্তা।

সংলাপ ॥ এক সময় বাঙালির গর্ব করার বিষয় ছিল তার রাজনৈতিক বোধ। আমরা রাজনীতি সচেতন, সাম্প্রদায়িক নই, জাত-পাতের পরোয়া করি না, ইত্যাদি। অর্থাৎ আদর্শ গণতান্ত্রিক পরিবেশের জন্য যা যা অপরিহার্য সেগুলো আমাদের ছিল। মনে প্রশ্ন জাগে, মানুষ রাজনীতি করে কেন? সময়ের পরিক্রমায় জানা যায়, জীবনের প্রতিটি পরতে জড়িয়ে  রয়েছে রাজনীতি। তা সে দেশ শাসন হোক বা অর্থনীতি। শিক্ষার জগৎ বা খেলার জগৎ। রাজনীতি ছাড়া জীবন অচল।  নিজেকে প্রশ্ন করে দেখি, আমি রাজনীতির কোন দিকে? উত্তর যেন একটা পুরনো গান , ‘আমি বাম দিকে রই না, আমি ডান দিকে রই না/ দুই দিকেতেই রই পরান জলাঞ্জলি দিয়া রে।’
এক সময় ট্রেনে-বাসে-হাটে-মাঠের আড্ডায় সাবলীল ভাবে ঢুকে পড়ত রাজনীতির প্রাণবন্ত আলোচনা। সব সময়ই সাবলীল থাকত না অবশ্য। কখনও কখনও কথা বলার সময় সাবধানী হতে হত। এ দিক ও দিক দেখে তবে বলতে হত।
প্রাণের কথাও বলতে গিয়ে ঢোক গিলে তৈরি কথা বলতে হত। অন্য দিকে যারা স্পষ্টত এক পক্ষের, তাদের এ সব টানাপড়ন ছিল না। যারা প্রকৃতিগতভাবে সুযোগসন্ধানী, তাদেরও কোনও সমস্যা হত না। সমস্যা হত আমাদের মতো মাঝের মানুষদের। সব দিক সামলে চলতে হত। রাজনৈতিক দলের কর্মপদ্ধতি নিয়ে গভীর সব প্রশ্ন ছিল। মানুষের অভ্যন্তরীণ ভাবনার কাঠামো বদলের চেষ্টা না করে শুধু ওপর ওপর বদল কি সম্ভব?
এখন সেই সব প্রশ্নের দিন আর নেই। কর্মপদ্ধতি, অভ্যন্তরীণ ভাবনা ইত্যাদি রাজনীতির অঙ্গন থেকে বেরিয়ে গিয়েছে। এখন স্পষ্ট, বাঙালি পাঠক বা শ্রোতা কেউই বস্তুমুখী সৎ খবর পছন্দ করেন না। মনমতো খবর তাদের কাছে পৌঁছলেই তারা খুশি। এমন খবর যা মনকে তৃপ্তি দেবে। আজকের পাঠক নিজের পছন্দের কাগজ থেকে নিজ মতাদর্শ সমর্থনের পাথেয় জোগাড় করে নেন। সংবাদপত্র গোষ্ঠীর ‘টার্গেট মার্কেটিং’ মডেলটা বেশ খাপ খায় এর সঙ্গে। এলাকার রাস্তা কেন খারাপ? উত্তর, হয় দেশ পরিচালনায় সরকারী দলের ব্যর্থতা কিংবা প্রশাসনের অপদার্থতা, যিনি যেটা শুনতে চান। শাসকবিরোধীরা সর্বদা শাসকদলের দোষ দেখেন, আর শাসকরা সর্বদা বিরোধীদের কিংবা আগের সরকারগুলোর ত্রুটি খুঁজে চলেন। অথচ রাস্তা খারাপ থাকার প্রকৃত কারণ হয়তো অন্য।
আশ্চর্যের বিষয়, আপাদমস্তক পক্ষপাতদুষ্ট সাধারণ মানুষের সমাজ এত বিশাল। এই বিশাল সংখ্যা নেহাত উপেক্ষার বস্তু নয়। এটা কি কাম্য? তাই কি দেশে যে কোনও বিশৃঙ্খলা, দুর্নীতি, ধর্ষণ বা খুনের তদন্তে শেষ অবধি ন্যায়বিচার জোটে না সাধারণের কপালে, কেবল পক্ষপাতদুষ্ট চাপানউতোর চলতে থাকে, এবং শেষ পর্যন্ত উপসংহার যে কী হবে, সেটা প্রায় পূর্বনির্ধারিতই বলা চলে।
কোনও রাজনৈতিক দলের তাই আজ আর বেশীরভাগক্ষেত্রে বিশ্বাসযোগ্যতা নেই। বাস্তব যেহেতু অস্পষ্ট, নীতি বস্তুটি প্রাগৈতিহাসিক প্রাণীর মতো, আদর্শ কাকে বলে তাও কেউ ঠিকমতো জানে না, তাই রাজনৈতিক দলগুলি নিজেদের মতো করে এ সবের ব্যাখ্যা দিয়ে যায়, আর মানুষ পক্ষপাতদুষ্ট মনে কোনও রকম অগ্রপশ্চাৎ বিচার না করেই সে সব গ্রহণ করে। অপছন্দের তথ্যকে সন্দেহ করে, তাকে গুরুত্ব দেয় না, গ্রহণ করে না। আর পছন্দের মিথ্যাকে বিশ্বাস করে, উপরে  তুলে ধরে। এই অতি-রাজনীতির জেরে সমাজের অবস্থা যা দাঁড়াচ্ছে, তাকে কি দেশের জন্য মঙ্গলজনক বলা চলে? ভাল যদি সমর্থিত না হয়, খারাপ যদি ধিক্কৃত না হয়, তবে তা কি সমাজের জন্য ভাল হতে পারে? একটি আলোচনা সভায় সংস্কৃতি প্রসঙ্গে বিবেকানন্দের উক্তি ব্যবহার করায় এক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বনামধন্য শিক্ষকের সেই বক্তব্য মনোমতো হয়নি বলে তিনি বললেন, ‘দেড়শো-দু’শো বছরের পুরনো রেফারেন্স আজ অচল।’ তাই কি? মূল্যবোধের নতুন-পুরনো কি এতটাই আলাদা? না কি, পক্ষপাতের উপর নির্ভর করেই আমরা নতুন পুরনো বেছে নিই?
আজ বাংলার রাজনীতির অভিধানে ‘মিথ্যা কথা’র পরিবর্তে প্রবেশ করতে পারে একটি নতুন শব্দ: ‘রাজনৈতিক কথা’। অর্থাৎ ডাহা মিথ্যা কথাও রাজনৈতিক হলে এখানে চলে যায়, চালানো যায়। রাজনীতিই যখন মুখ্য, সেখানে সত্য-মিথ্যার বাছবিচার দরকার কী। বরং সেই ফাঁকে স্বার্থ গুছিয়ে নেয়াই বুদ্ধির কাজ। সত্য বা সততা এখন বোকামির লক্ষণ। যে যত বুদ্ধিমান, সে তত মিথ্যা ও ভুলের প্রয়োজনমতো ব্যবহার করে স্বার্থের সিদ্ধি ও সুযোগের সদ্ব্যবহার করে নেয়। আমরা সবাই জানি এবং মানি যে, কাল দুই পা এগোনোর জন্য আজ এক পা পেছোনই ঠিক কাজ।
ত্রিপুরার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী নৃপেন চক্রবর্তী পাঁচ দশকের বেশি সময় বামপন্থী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ‘দলবিরোধী কাজের জন্য’ তাকে  সাসপেন্ড করা হয়। একমাত্র মৃত্যুর পরে জানা যায় কে প্রকৃত বামপন্থী। কোনটা সত্য, কোনটা মিথ্যে, কোনটা ঠিক, কোনটা ভুল, সে সবই প্রেক্ষিতনির্ভর। সুতরাং এ পাপ কারও একার নয়, এ পাপ আমাদের সকলের।
অথচ যে কোনও সমাজের মতো বাঙালি সমাজেও বেশ কিছু মানুষ কাজ করতে ভালবাসেন, কাজ করে তৃপ্তি পান। এদের অনেকেরই জীবনবোধ বা রাজনীতিবোধ হয়তো তত স্পষ্ট নয়, কিন্তু এরা সকলেই জানেন, কাজের জন্য, জীবিকার জন্য প্রয়োজনে কিছু ছাড়তে হয়। এই মানুষগুলোকে রাজনীতি তার নিজের প্রয়োজনে ব্যবহার করতে শিখে গিয়েছে। শাসনের প্রতি স্তরে, সরকারি পদের নিয়োগে স্বজনপোষণ চালু করে এই রাজনীতি কাজের মানুষদেরও রাজনীতির মানুষ বানিয়ে নিয়েছে। কাজের স্বার্থে ও ব্যক্তিগত স্বার্থে কাজের মানুষও ক্রমে ক্রমে শাসকের অনুগত হন। জীবনের স্বাভাবিক সুযোগ সুবিধেগুলো পাওয়ার জন্যও শাসক দলের রাজনীতির আনুগত্য প্রকাশ করতে তারা ক্রমে অভ্যস্ত হয়ে যান। এইভাবে যখন সাধারণ মানুষই রাজনৈতিক হয়ে পড়েন, তখন দেখা দেয় একটা নতুন সমস্যা। সরকার পরিবর্তন হয়ে নতুন সরকার এলে সেই সমস্যাটা স্পষ্ট হয়।
রাজনীতি এখন রোজ সঙ্কীর্ণ থেকে সঙ্কীর্ণতর, তাই নতুন শাসকরা অনেক সময়েই পুরনো কাজের লোকেদের গুরুত্ব দেন না। এর ফলে দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্র উপযুক্ত লোকের অভাবে ধুঁকতে থাকে। বর্তমানে দেশের শিক্ষাক্ষেত্র এই সমস্যার উজ্জ্বল উদাহরণ। স্কুল, কলেজ, উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন পদে উপযুক্ত ইচ্ছুক ব্যক্তির বিরাট অভাব চার দিকে। এই পরিস্থিতি যদি চলতে থাকে দিনের পর দিন, দেশ ও সমাজের জন্য তা মোটেও হিতকর হতে পারে না।
জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ভারসাম্য থাকা জরুরি। যে ওষুধে রোগ নিরাময় হয়, তারই অতিরিক্ত সেবনে আবার হিতে বিপরীত হয়। দিন কয়েক আগে হোয়াটসআপে চাণক্যের নামে একটা উক্তি পেলাম: ‘যা কিছু মাত্রাতিরিক্ত তা-ই বিষ।’ এই গুরুত্বপূর্ণ কথাটা রাজনীতি বিষয়েও প্রাসঙ্গিক। সমগ্র জাতি যদি চব্বিশ ঘণ্টা ধর্মাচরণে ব্যস্ত থাকেন, তা হলে কিছু মানুষ হয়তো তৃপ্তি পাবেন, কিন্তু সার্বিক ভাবে তা দেশের পক্ষে কোনও ভাবেই শুভ হতে পারে না। দেশের সব মানুষ হিমালয় বা সাগর-অভিযানে মেতে উঠে বেরিয়ে পড়লে সেটাও দেশের পক্ষে সুখকর হবে না। একই কথা প্রযোজ্য রাজনীতির প্রসঙ্গেও।

স্বাধীনতার স্বাদ ভোগ করছে জনগণ পুনরুদ্ধার করার কিছু নেই


স্বাধীনতার স্বাদ ভোগ করছে জনগণ

পুনরুদ্ধার করার কিছু নেই

  • ·        দেশ কি পাক-বৃটিশ হায়েনাদের হাতে বন্দি যে তাকে পুনরুদ্ধার করতে হবে?
  • ·        দেশ বাঙালির হাতেই আছে, পাক হায়েনা ও তাদের দোসররা তাই শান্তি পাচ্ছে না।
  • ·        সর্বকালীন পাকি হায়েনারা ক্ষমতালোভী স্বার্থপ্রতিবন্ধী, তাই সচেতন বাঙালিকে মুক্তির যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হবে।

শেখ উল্লাস ॥ ‘রক্ত দিয়ে নাম লিখেছি, বাংলাদেশের নাম’। ১৯৭১ সালে এই দেশকে যারা রক্ত দিয়ে স্বাধীন করেছিল এবং অপরদিকে যারা বাঙালি জাতির এই স্বাধীনতা সংগ্রামের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল দেশি-বিদেশি অপশক্তি-এই দুই মেরুর অবস্থান কখনও এক হতে পারে না। স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী উদযাপনের আর যখন দুই বছরের মতো কম সময় বাকী, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যে মূহুর্তে বাঙালি জাতিকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে এদেশের রাজনীতিতে তখনই আবার এই দুই মেরুর অবস্থান আবারও স্পষ্ট হয়েছে। ৭১’এর ২৫ মার্চের পর মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ না করে স্বেচ্ছায় পাকিস্তানে চলে যাওয়া এবং স্বাধীনতার পর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উদারতা ও কৃপায় বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পদ গ্রহণকারী, সংবিধান প্রণেতার দাবিদার ড. কামাল হোসেন গত ২৫ অক্টোবর পূণ্যভূমি সিলেটের মাটিতে যখন বলেন, ‘জনগণকে মালিকানা থেকে বঞ্চিত করে রাখা হয়েছে। জনগণের মালিকানা পুনরুদ্ধার করতে হবে। এ জন্য ঐক্য গড়ে তুলতে হবে, দলীয় ঐক্য নয়, জাতীয় ঐক্য। জেলায় জেলায়, থানায় থানায়, ঐক্যকে সুসংহত করতে হবে। ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে দেশকে স্বৈরাচারমুক্ত করতে হবে। বিজয় আমাদের অনিবার্য’-তখন একটু মনোযোগ দিয়ে শুনলে ড. কামাল হোসেনের এই কথাগুলোকে পাকি দোসর রাজাকার দন্ডপ্রাপ্ত যুদ্ধাপরাধী জামাত নেতা গোলাম আযম, যুদ্ধাপরাধীদের নিয়ে ক্ষমতার মসনদে আরোহণ করা খালেদা জিয়া এবং জাতির জনকের কন্যাকে হত্যার নীলনকশায় জড়িত যাবৎজীবন দন্ডপ্রাপ্ত অপরাধী তারেক রহমানের কথা হিসেবেই ধরে নেওয়া যায়। ওদের সকলের চিন্তা ও ভাষার মধ্যে একটি গভীর সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায়। আর এ সাদৃশ্য না থাকার কোনো কারণও নেই। পাকিস্তানী মতাদর্শের লোকেরা তাদের ভাষায় কথা বলবে এটাই স্বাভাবিক।
তবে এ মূহুর্তের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে, জনগণের মালিকানা কে কার কাছ থেকে উদ্ধার করবে? কে কাকে ফিরিয়ে দেবে? গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের প্রস্তাবনার ৩য় অংশে বলা হয়েছে, ‘আমরা অঙ্গীকার করিতেছি যে, যে সকল মহান আদর্শ আমাদের বীর জনগণকে জাতীয় মুক্তি সংগ্রামে আত্মনিয়োগ ও বীর শহীদদিগকে প্রাণোৎসর্গ করিতে উদ্বুদ্ধ করিয়াছিল - জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার সেই সকল আদর্শ এই সংবিধানের মূলনীতি হইবে’। সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৭। (১)- সংবিধানের প্রাধান্য বিষয়ে এ বলা হয়েছে, ‘প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ; এবং জনগণের পক্ষে সেই ক্ষমতার প্রয়োগ কেবল এই সংবিধানের অধীন ও কর্র্তৃত্বে কার্যকর হইবে’। এই মহান সংবিধান সমুন্নত রাখতে গিয়ে গত ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে গঠিত সরকারের আমলে দেশে যে ব্যাপক উন্নয়ন কর্মকা- পরিচালিত হয়েছে তা বিশ্বব্যাপী স্বীকৃতি পেয়েছে। উন্নয়ন ও মানবতার পক্ষে কাজ করতে গিয়ে দেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘দেশরত্ন’ ‘মাদার অব হিউম্যানিটি’ ইত্যাদি খেতাবে ভূষিত য়েছেন। বাংলাদেশ আজ সারা বিশ্বে উন্নয়নের রোল মডেল। পদ্মা সেতু নির্মাণের মতো মেগা-প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ দেশীয় অর্থে সম্পন্ন হচ্ছে। বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীও পুলিশের সদস্যরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা বাহিনীর সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করে বিশ্ব সম্প্রদায়ের আস্থা ও সুনাম অর্জন করেছে, করছে। বাংলাদেশের বিশেষ করে শ্রমজীবী মানুষেরা তাদের কর্মনিষ্ঠা দিয়ে বিশ্ব শ্রমবাজারে বিরাট একটি স্থান করে নিয়েছেন এবং দেশের উন্নয়নে তারা বিশেষ ভূমিকা পালন করে চলেছেন। দেশের অভ্যন্তরে সরকারি-বেসরকারি খাতে কর্মজগৎ ও চাকরির বাজার ব্যাপকভাবে বিস্তার লাভ করছে। সর্বক্ষেত্রে নারীর ক্ষমতায়ন বিশ্বের যে-কোনো উন্নত দেশের উদাহরণকে আজ চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিচ্ছে। বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু আয় এখন ১ হাজার ৭৫১ মার্কিন ডলার। এক কথায় দেশের গ্রাম-শহর-মফস্বল-রাজধানী সর্বক্ষেত্রে নবজাগরণের জোয়ার বয়ে যাচ্ছে-যার সব কিছুর নিয়ন্তা ও ভোগকারী শুধুই এদেশের জনগণ। শুধুমাত্র দুর্নীতি, ধর্মান্ধতা ও বিভিন্ন রকমের সংকীর্ণতা একটি বৈষম্যহীন কাঙ্খিত সমাজ প্রতিষ্ঠার পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে রেখেছে এবং এর জন্য শুধুমাত্র সরকারকে দায়ী করলেই বিরোধী দলের সব কিছু হালাল হয়ে যায় না। সরকার বিরোধিতার নামে শুধু সরকারের দোষ না খুঁজে মানুষের মধ্যে মূল্যবোধ ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে ভূমিকা পালন করলে সরকারের বিভিন্ন স্তরে জবাবদিহিতা ও দায়বদ্ধতার জায়গাগুলো আরও শক্তিশালী হতো। শুধু সরকারে গেলে আর ক্ষমতায় থাকলেই দেশের কাজ করা যাবে-এ মানসিকতা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। ইংরেজ আমল ও পাকিস্তানী আমলে যখন এদেশের মানুষের ক্ষমতার স্বাদ গ্রহণের কোনো সুযোগ ছিল না, তখন অনেক রাজনৈতিক নেতা-কর্মী ছিলেন যারা দেশ ও মানুষের সেবায় অংশ নিয়ে উদাহরণ সৃষ্টি করে গেছেন।
আজকের দিনে অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, সমাজ ও সরকারের বিভিন্ন স্তরে এমন অসংখ্য চক্র বাসা বেঁধে আছে যারা সরকারের বিরোধী শক্তির সাথে আঁতাত করে সেখানে দুর্নীতি, অন্যায়-অবিচার জিইয়ে রাখতে চায়। বস্তুতপক্ষে, বাংলাদেশ আজ অনেক দূর এগিয়ে গেছে, সমস্যা শুধু শিক্ষিত সমাজের মধ্যে যার ফলে সর্বস্তরের প্রশাসন ও ব্যবস্থাপনার মধ্যে বিরাজ করছে আস্থাহীনতা ও সমন্বয়হীনতাজনিত সংকট। এ সমস্যা সমাজের উঁচু স্তরে অপেক্ষাকৃত বেশি বলে এর কুপ্রভাব নিচের দিকেও গড়িয়ে পড়ছে। কিন্তু ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনে সুষ্ঠু অবস্থা প্রতিষ্ঠা করা গেলে দেশ সমৃদ্ধির উচ্চস্তরে উপনীত হবে-এই আশা সচেতন মহলে এখন আস্থার সাথেই ব্যক্ত করা  হচ্ছে। এ অবস্থায় আধ্যাত্মিক স্থান হিসেবে বাংলাদেশের শান্তিপ্রিয় মানুষের কাছে সম্মানীত সিলেটের মতো জায়গায় জনসভা করে যখন জনগণের মালিকানা ‘পুনরুদ্ধার’ এবং দেশকে ‘স্বৈরাচারমুক্ত’ করার আহবান জানানো হয়  তখন সচেতন মহলে প্রশ্ন উঠছে এরা কারা? এরা সত্যিকার অর্থেই কি বাংলাদেশ এবং এর  জনগণের মঙ্গল চায়? এরা কখনো তা চাইতে পারে? এদের পূর্ব-পরিচয়ের দিকে একটু তাকালেই বোঝা যায়, এরা কখনও বাংলাদেশের মানুষের মঙ্গল চায়নি। এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ, ৭১’এ এদেরকে এদেশের জনগণ কাছে পায়নি। বাংলাদেশ স্বাধীন না হলে ড. কামাল হোসেন কখনো কি পাকিস্তান বা লন্ডন থেকে এদেশে ফিরতেন? বাংলাদেশের সংবিধানের প্রণেতা হিসেবে নিজেকে দেশ-বিদেশে তুলে ধরতে পারতেন? বঙ্গবন্ধু ছাড়া আর কেউ কি তাকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বানাতেন? অথচ আজ বঙ্গবন্ধুর কন্যা শত বাধা-বিপত্তি মোকাবেলা করে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন তখন বঙ্গবন্ধুকন্যা এবং তাঁর রাজনৈতিক দলকে বাদ দিয়ে তথাকথিত জাতীয় ঐক্যের নামে বিএনপি-জামাতের নেতৃত্ব দিতে মাঠে নেমেছেন! আর বিএনপি-জামাতকে নেতৃত্ব দিতে তিনি এমন এক সময় মাঠে নেমেছেন যখন আদালতে ২১শে আগষ্টের গ্রেনেড হামলা মামলার রায় ঘোষণার মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হয়েছে যে, তারেক-নিজামী-বাবরের সরাসরি মদদে এই হামলা চালানো হয়েছিল। খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে পরিচালিত ওই হামলার সাথে রাষ্ট্রীয় কয়েকটি সংস্থার প্রধানগণই জড়িত ছিল। যে হামলার একমাত্র লক্ষ্যই ছিল শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের সকল নেতৃবৃন্দকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়া। এমন জঘন্যতম ষড়যন্ত্র ও হামলা যারা চালাতে পারে তাদের ব্যাপারে চুপ থেকে এবং এমন কি তাদেরকে রাজনৈতিকভাবে পুনর্বাসন যারা করতে চায় তারা কখনো বাংলাদেশের মানুষের বন্ধু হতে পারে না, মুখে মুখে যত বড় কথাই তারা বলুক না কেন। স্বাধীনতার ৪৭ বছরের যাবতীয় অর্জনকে সমুন্নত রাখতে হলে তাদের ব্যাপারে জাতিকে অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে। যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতার সংগ্রামে অংশ নেয়নি, বরং বিরোধিতা করেছে এবং যারা ১৫ই আগষ্ট ও ২১শে আগষ্টের হামলাকারীদের পক্ষ অবলম্বন করে তাদের এদেশে রাজনীতি করারই কোনো অধিকার থাকতে পারে না। দুঃখজনক হলে ও সত্যি যে, ড. কামাল হোসেন আজ এই হামলাকারীদের পক্ষের শক্তির নেতৃত্ব ও স্বাধীনতাবিরোধী তথা পাকিস্তানপন্থীদের ক্রীড়ণকের ভূমিকায় আসীন হয়েছেন। তবে শেষ পর্যন্ত তিনি যে তার স্বভাবসুলভ পলায়নপর মনোবৃত্তি থেকে এই তথাকথিত নেতৃত্বের আসন থেকে কেটে পড়ে পাকিস্তান ও লন্ডনে পাড়ি জমাবেন তাও সময়ের ব্যাপার মাত্র।   
তবু আজকের বাস্তবতা হচ্ছে, এই ষড়যন্ত্রকারীদের ব্যাপারে দেশবাসীকে অতীতের চাইতে আরও বেশি সচেতন থাকার সময় এসেছে। দেশ ঠিকমতই চলছে। জনগণও ঠিক পথেই আছে, স্বাধীনতার সুফল এরা ভোগ করছে। প্রয়োজন শুধু দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রকারী এবং সরকার ও সরকারি দলের ভেতরে ঘাপটি মেরে থাকা স্বার্থান্ধ ও মতলববাজদের মুখোশ উন্মোচন করে সর্বক্ষেত্রে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠা করা।

অর্থনৈতিক দুর্নীতিবাজদের মতো বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থাগ্রহণ জরুরী!


অর্থনৈতিক দুর্নীতিবাজদের মতো বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থাগ্রহণ জরুরী!

সংলাপ ॥ দুর্নীতির বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা জাতি উপলব্ধি করলেও দেশের পরিস্থিতি কেমন ছিলো এবং বর্তমানে কেমন আছে তা নিশ্চিত করেই এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নিতে হবে  দেশপরিচালকদের।
অর্থনৈতিক দুর্নীতির চেয়ে বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্নীতি বাংলাদেশের এখন  বড় সমস্যা। এখানে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতি। এমন কোনো রাষ্ট্রীয় অঙ্গন পাওয়া যাবে না যেখানে দুর্নীতি নেই। মানুষের আত্মিক উৎকর্ষতার জন্য যে শিক্ষা ব্যবস্থা, সেখানেও প্রতিষ্ঠানগুলো আপাদমস্তক বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্নীতিতে নিমজ্জিত।
রাজনীতিকদের এক বিরাট অংশের দুর্নীতি এখন আর গোপন নেই। সাম্প্রতিক সময়ে দুর্নীতির বিরুদ্ধে আদালতের রায়ই প্রমাণ করে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ে কীভাবে দুর্নীতি ডাল পালা ছড়িয়েছে। রাষ্ট্রীয় টাকা খরচ করে দুর্নীতিবাজদের সাধুতে রূপান্তরিত করা যাবে কিনা সেটা নিয়ে চিন্তাবিদরা চিন্তায় মগ্ন থাকতে পারেন। বছরের পর বছর ধরে দুর্নীতিপরায়ণতার কলঙ্ক নিয়ে আজও বিশ্বের বুকে সাহসী জাতি হিসেবে টিকে আছে বাঙালি! তবু দুর্নীতিবাজদের বিচার হচ্ছে যা আশাব্যঞ্জক। দেশে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কাজ করার প্রভূত সুযোগ রয়েছে। প্রথমত মিথ্যা ও মিথ্যাচারের বিরুদ্ধে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত দুর্বার সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা জরুরি। যেখানেই মিথ্যা ও মিথ্যাচার সেখানেই এলাকার সাধারণ মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে প্রতিরোধ করার জন্য। রাজনীতিকদের দুর্নীতির মূলোৎপাটন সম্ভব না হলেও এর বিপক্ষে শক্তিশালী সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে জনগণকেই এগিয়ে আসতে হবে। প্রতিরোধটা কীভাবে গড়ে তোলা সম্ভব এবং  এ রোগের উৎপত্তি কোথায় ও কীভাবে এ তা নিয়ে তাত্ত্বিক আলোচনা-সমালোচনা অনেক করা যায়। কেউ কেউ বলেন, রাজনীতিই সমাজকে দুর্নীতিমগ্ন করেছে। আবার কারো কারো মতে, আমলাতন্ত্র, আবার অনেকে দায়ী করেন শিক্ষাব্যবস্থাকে। আদর্শহীন শিক্ষিত লোকেরা সমাজের যেখানেই যাচ্ছে, সেখানেই চলছে চরম অনৈতিকতা। বাংলাদেশের সামাজিক বর্তমান অবস্থায় দুর্নীতি বা নীতিহীনতার প্রসার নানা দিক থেকেই ঘটে যাচ্ছে। বাংলাদেশে আমলাগণ না-কি রাজনৈতিক সমাজ বেশি দুর্নীতিবাজ-এর হিসাব বের করাও কঠিন। বাস্তবে দুর্নীতিবাজ আমলা এবং একই মনোবৃত্তির রাজনীতিক-এরা পরস্পর ভাই-ভাই। সরকারি আমলাদের সাহায্য ছাড়া ক্ষমতাবান রাজনীতিক দুর্নীতি করতে পারেন না। আবার ক্ষমতাসীন রাজনীতিকদের প্রশ্রয় কিংবা দুর্বলতা ছাড়া কোনো আমলার পক্ষে দুর্নীতি করে পার পাওয়া সম্ভবপর হতে পারে না। অপরদিকে, আমাদের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা যে আদর্শ ও নীতিভ্রষ্ট এবং দক্ষ মানুষ তৈরির মোটেও উপযোগী হয়ে উঠেনি সে কথা বিদেশে গিয়ে বাঙালিদের অবস্থা স্বচক্ষে দেখলে উপলব্ধি করা যায়।
বাংলাদেশের বাজেটে শিক্ষাখাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ দরকার। নতুন প্রজন্মকে আদর্শিক শিক্ষায় ব্রতী করে গড়ে তোলার জন্য যারা শিক্ষার সঙ্গে জড়িত তাদের প্রতি সরকারের কঠোর নজরদারি রাখতে হবে। এক্ষেত্রে আদর্শিক শিক্ষক ও বুদ্ধিজীবীগণকে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। শিক্ষার মূল উদ্দেশ্যই হচ্ছে ব্যক্তির নৈতিক উৎকর্ষ সাধন। উপমহাদেশীয় পৌরাণিক শিক্ষাতত্ত্বে ন্যায়শাস্ত্রই শিক্ষার মূল বলে বিবেচনা করা হয়েছে। আর এই ন্যায়শাস্ত্র সমাজ, রাজনীতি এবং অর্থনীতির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় নৈতিকতার দিকটি এখন আর গুরুত্ব পাচ্ছে না যদিও নৈতিক শিক্ষার জন্য পাঠ্যপুস্তক সিলেবাসভূক্ত করা হয়েছে। এ অবস্থায় নৈতিক অবক্ষয়ের জন্য শিক্ষাব্যবস্থাকে মোটাদাগে দায়ী করা যায়। মূলে দোষ শিক্ষা ব্যবস্থারই হোক আর আমলাতন্ত্রেরই হোক, রাজনীতিকদের দায়িত্ব এড়িয়ে যাবার কোনো সুযোগ নেই। রাজনীতি এবং অর্থনীতির সাথে ন্যায়শাস্ত্রের নিগূঢ় সম্পর্ক রয়েছে। ইংরেজিতে পলিটিক্ শব্দটি ব্যবহৃত হয়ে থাকে বিচক্ষণ অর্থে। কাজেই যারা রাজনীতি করেন তাদের বিবেক ও প্রজ্ঞা-বিবর্জিত হওয়ার সুযোগ নেই। পৃথিবীর সব দেশেই রাজনীতি সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে। দেশের আমলাতন্ত্র কীভাবে চলবে, শিক্ষা ব্যবস্থা কী রকম হবে - রাজনৈতিক সমাজই তা নির্ধারণ করেন।
কাজেই রাজনীতি সংশোধিত হয়ে আদর্শিক না হলে, রাজনীতিকরা প্রজ্ঞাবান না হলে, কর্মে দূরদর্শিতার পরিচয় দিতে না পারলে-একটি দেশ, একটি সমাজ কোনোমতেই সুগঠিত এবং সুন্দর হয়ে উঠতে পারে না। প্রত্যেক ব্যক্তি এবং প্রতিটি সমাজের মধ্যে ভাল-মন্দ, সত্য-মিথ্যা দুটো প্রবণতাই বিদ্যমান। এটা প্রকৃতিরই নিয়ম। সমাজে কিছু মানুষ থাকে যারা সব সময়ই সত্য ও  নীতি-নৈতিকতায় দৃঢ়। পক্ষান্তরে কিছু লোক থাকে মিথ্যা ও অনৈতিক প্রবণতা যাদের প্রবল। এই বাস্তবতায় সমাজের আসল চেহারাটি কি রকম হবে, সেটা নির্ভর করে কারা সমাজের বা রাষ্ট্রের ব্যবস্থাপনার ভার নিয়ে দেশের জনগণের কল্যাণে কাজ করছে। নীতিহীনরা রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা না বুঝে শুধুমাত্র নীতিবানদের মুখোশ পরে শাসন করলে সমাজে অনৈতিকতার শক্তিই প্রবল হবে। পক্ষান্তরে নৈতিকশক্তিতে যারা বলীয়ান তারা সমাজ ব্যবস্থাপনায় দৃঢ় প্রত্যয়ী হলে দুর্নীতির শক্তি অবদমিত হবে, এটাই স্বাভাবিক। সমাজে কোন শক্তি প্রবল হবে-সেটা অবশ্যই নির্ভর করে রাজনৈতিক সমাজের আদর্শ, নৈতিকতা ও সৎ সাহসের সঙ্গে দেশের আপামর জনগণের সঙ্গে সম্পৃক্ততার ওপর। একই সঙ্গে প্রয়োজন আইনের কঠোর প্রয়োগ। আইনের শাসন কায়েম, জবাবদিহিতা এবং প্রতিটি ক্ষেত্রে সত্য প্রতিষ্ঠা নিশ্চিত করতে কাজ করে যাচ্ছে সমাজের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে কিছু রয়েছে সাংবিধানিক, কিছু প্রশাসনিক। বেসরকারি পর্যায়েও আছে অনেক প্রতিষ্ঠান। রাজনৈতিক দলগুলো একেকটি প্রতিষ্ঠান। রাষ্ট্র ও সমাজের প্রত্যেকটি প্রতিষ্ঠানের নিজ এখতিয়ারের মধ্যে নিয়মানুযায়ী দায়িত্ব পালনের পথে বাধা রয়েছে। ফলে সমাজে অনৈতিকতার স্রোত প্রবল ও নির্বিঘ্ন।
বিচার বিভাগ, প্রশাসনিক বিভাগ তথা প্রতিটি প্রতিষ্ঠান এবং সাংবিধানিক সব প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করে রাখার দায়িত্ব নিঃসন্দেহে রাজনীতিকদের, বিশেষ করে যারা ক্ষমতায় থাকেন তাদের। কিন্তু, পরিতাপের বিষয় আমাদের দেশে বিগত সাড়ে চার দশকে প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাজনীতিকরাই হীনবল করে দিয়েছেন। তারাই শিক্ষা ব্যবস্থার মূলে আঘাত করেছেন ছাত্র এবং শিক্ষকদের দলীয় নীতিহীন রাজনীতিতে টেনে এনে। তারাই পুলিশকে ক্ষমতাসীন দলের লাঠিয়ালে পরিণত করেছেন দলীয়করণের মাধ্যমে। তারা নির্বাচন কমিশন ও পাবলিক সার্ভিস কমিশনের মত সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেননি। প্রতিষ্ঠানগুলো হয়ে ওঠেছিল ক্ষমতাসীন দলেরই বাড়তি অংশ যদিও এসব প্রতিষ্ঠান হচ্ছে নীতি নির্ধারণী সর্বোচ্চ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। দুঃখের বিষয়, ক্ষমতাসীনরা বাংলাদেশে এসব নীতি ও নৈতিকতার ধার ধারেননি। আমলাদের তারা ব্যবহার করেছেন ব্যক্তিগত ও দলীয় স্বার্থে। তারাই সংসদকে পরিণত করেন নেতা বা নেত্রীর বন্দনা এবং প্রতিপক্ষের উদ্দেশ্যে অমার্জিত বাক্যবান নিক্ষেপের অবাধ কেন্দ্রে যেহেতু দেশাত্মবোধ ও দেশপ্রেম তাদের উপলব্ধিতে জায়গা পায়নি। তাই একটু একটু করে সমাজের সর্বত্র বাসা বেঁধেছে নিয়মের জায়গায় অনিয়ম। অনিয়মের প্রাবল্যে দুর্নীতি সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে পৌঁছে স্থায়ী রূপ নেয়ার পথে। রাজনীতিকদেরই বলিষ্ঠ কণ্ঠে বলার সময় এসেছে যে রাজনৈতিক সমাজই কেবল পারে সকল পর্যায়ে দুর্নীতির পথ ধীরে ধীরে বন্ধ করে দিতে। কাজেই রাজনীতির অঙ্গনকে মিথ্যা ও মিথ্যাচারের বিরুদ্ধে আদর্শিক সংস্কার-সংশোধন  ছাড়া দুর্নীতি বন্ধ বা কমানো যাবে এমন চিন্তা করা বা  বলা হলে তা হবে শুভংকরের ফাঁকি।


বৃহস্পতিবার, ১৮ অক্টোবর, ২০১৮

আগে জন্ম তারপর ধর্ম




সংলাপ ॥ নির্বোধ আর মতলববাজ। চরিত্র বিপরীত! সময়ে অথবা প্রায়শই এ দু’য়ের ভূমিকা হয়ে পড়ে অভিন্ন।  দেশটার নাম বাংলাদেশ। আছে শুধু ভাষা নয়, অভিন্ন কৃষ্টি, অভিন্ন সংস্কৃতি ও অভিন্ন ঐতিহ্য। আছে পাঁচ হাজার বছরের অভিন্ন ভৌগোলিক সামাজিক আর রাজনৈতিক উত্তরাধিকারও। স্বাধীনতার পর আমরা বিশ্বখ্যাত একটি সংবিধান পেয়েছিলাম। ছিলো তার মধ্যে দেশ ও জাতির জন্য চারটি মূলনীতি ঃ গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও জাতীয়তাবাদ। কিন্তু দুঃখের বিষয় ধর্মনিরপেক্ষতা আর জাতীয়তাবাদের কোনো সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা সংবিধানে দেয়া হয়নি। যার ফলে আজও এই দুটো নীতি নিয়ে চলছে নোংরা রাজনীতি আর বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্নীতি।
তাই মতলববাজরা, জাতিদ্রোহী চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্রকারীরা, ১৯৭১ সালের পর ১০ বছরের মধ্যে মহান মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শত্রুরা পাঁচ হাজার বছরের বাঙালি জাতির মাথায় সাইনবোর্ড লটকে দিয়েছে বাংলাদেশী জাতি বলে। গায়ের জোরে সাংবিধানিক স্বীকৃতি করিয়ে নিয়েছে বাংলাদেশী জাতীয়তা। মূলত বিশ্ববাসী আশ্চর্য হয়ে তাকিয়ে দেখলো এ জাতির উভয় প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার এক নিকৃষ্ট হীন অপচেষ্টাকে। এ অপচেষ্টা হচ্ছে এই জাতির সত্ত্বাকে মুছে দেয়ার, তিন সহস্র বছরের কৃষ্টি, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে ঢেকে ফেলার। যেন ১৯৭১ এর আগে কিছুই ছিলোনা এ জাতির। ’৭১-এ জন্ম নেওয়া বাংলাদেশ থেকেই এর যেন প্রথম যাত্রা শুরু।
মতলববাজদের এই অপচেষ্টার আড়ালে ঢাকা রয়েছে ওদের ঘৃণিত প্রত্যাখ্যাত চেহারা। ধর্মের নামে তথাকথিত ধর্মকে পুঁজি করে ব্যক্তিগত, গোষ্ঠীগত, সম্প্রদায়গত, কিংবা রাষ্ট্রীয়গত শোষণ, লুটপাট ও ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা সর্বোপরি কর্তৃত্ব বজায় রাখা। এরাই মুসলমানিত্বের জিকির তুলে ১৯৪৭ সালে ভারতকে খন্ড বিখন্ড করেছিলো, বিভক্ত করেছিলো সমৃদ্ধ বাংলাকে। সৃষ্টি করেছিল বর্বর ধর্মীয় প্রতারণার রাষ্ট্র পাকিস্তান! যে বর্বরতা আজো তাড়া করে চলছে রাষ্ট্রটিকে। মতলববাজ ধর্মব্যবসায়ী ও তাদের প্রভু-গডফাদাররা বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের মতো আরোও এক উদ্ভট মতলবি তত্ত্ব তৈরী করে জাতিকে বিভ্রান্ত করছে আর বলে বেড়াচ্ছে, ‘আমরা আগে মুসলিম তারপর বাঙালি’। সত্য চিরন্তন পথের দিশারী। আল কুরআনে সুস্পষ্টভাবে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে একটি জাতির ভাষাকে যার উপর ভিত্তি করে, যাকে কেন্দ্র করেই ওই জাতির অস্তিত্ব এবং এর কৃষ্টি-সংস্কৃতি। ‘আমি প্রত্যেক রাসুলকেই তার স্বজাতির ভাষাভাষী করে পাঠিয়েছি, তাদের কাছে পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করার জন্য’ (১৪:৪), ‘আর তাঁর নির্দশনাবলীর মধ্যে অন্যতম নিদর্শন আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টি এবং তোমাদের ভাষা ও বর্ণের বৈচিত্র্য। এতে জ্ঞানীদের জন্য অবশ্যই নিদর্শন রয়েছে’ (৩০:২২)। জ্ঞানীদের জন্য এরূপ সুস্পষ্ট নিদর্শন থাকলেও তা চোখে পড়ে না রাজনৈতিক ইসলামপন্থী অজ্ঞ নির্বোধদের? আল্লাহ্ যা বলার তা রাখ ঢাক না করেই বলে দিয়েছেন। বলেছেন, ‘কুরআন আমি তো আরবি ভাষায় অবতীর্ণ করেছি যাতে তোমরা বুঝতে পারো’ (১২:২)। আরও খোলাখুলিভাবে এও জানিয়ে দিয়েছেন, ‘এইভাবে আমি তোমার উপর আরবি ভাষায় কুরআন অবতীর্ণ করেছি যাতে তুমি সতর্ক  করতে পারো নগর অধিবাসীদেরকে ও তার আশে পাশে যারা বাস করে তাদেরকে আর সতর্ক করতে পারো সমবেত হওয়ার দিন সম্পর্কে, যার ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই’ (৪২:৭)। এটাই সত্য, এটাই বাস্তবতা। এই বাস্তবতারই প্রতিফলন দেখা যায় আরবীয়দের মাঝে। তারা নিঃসংকোচে পরিচয় দেয় নিজেদের আরবীয় হিসাবে। আশির দশকের  কথা, আরব নিউজ পত্রিকার সাথে এক সাক্ষাৎকারে তৎকালীন সৌদী পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছিলেন, ‘আমরা আগে আরব, তারপর মুসলমান’। অথচ এই সৌদীদেরই ‘ফেৎরা-ভোগী’ এদেশীয় ধর্মবেত্তা মতলববাজরা ষাট দশক ধরে  চিৎকার করে বাঙালিকে বোঝাবার চেষ্টা করে বলে চলেছে, ‘আমরা আগে মুসলমান তারপর বাঙালি’!
এদেশের প্রায় ১৫ কোটি বাঙালি মুসলমান। ঠেকে-ঠকে জেনেছে উপলব্ধি করেছে মুসলমানিত্ত্ব তাদের প্রথম পরিচয় নয়- বাঙালিত্ত্বই তাদের প্রথম পরিচয়। অক্ষমতা নির্বুদ্ধিতার বলেই হোক আর বিভ্রান্তির কবলে পড়েই হোক - যারা বলতে চায় আমরা আগে মুসলমান তারা নিজের অজান্তেই নিজেকে জাতিকে কুলাঙ্গারে পরিণত করে তুলেছে -পরিণামে হয়ে উঠেছে জাতিদ্রোহী এমনকি ধর্মদ্রোহীও!
তাই এখনো সময় আছে। নিজেকে চিনুন। মা-মাতৃভাষা-মাতৃভূমিকে চিনুন। নিজের সংস্কৃতিকে চিনুন তাহলে যে ধর্মাবলম্বীই হোন না কেন তা সঠিকভাবে ধারণ-লালন-পালন করে সত্যকার ধার্মিক হতে পারবেন। নচেৎ শুধু অন্য ভাষায় লেখাপড়া করে তোতা পাখির মতো বুলি পড়ে ধর্ম পালন করলে নিজেকে নিজেই প্রতারণা করবেন। সুতরাং সত্যের পথে আসুন এবং শান্তির (ইসলাম) ঝান্ডা তুলে ধরুন যাতে ওই ঝান্ডা হেলে না পড়ে এবং দেশও বাঁচে।