বৃহস্পতিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৮

আমরা সবাই জানি....৩০


সার্বিক একাত্মতা ও মিলন, একের সর্বোত্তম গুণ বহমান উপদেশের মাধ্যমে অন্য এক-কে দেয়ার মাধ্যমে ধারণ-লালন-পালন। একাত্মতা ও এক সত্য সমন্বয় সাধনের জন্যই পৃথিবী জুড়ে ‘চিন্তনপীঠ’ ছিল - আছে - থাকবে সব রকমের বিদ্যাভাসের জন্য। সত্যব্রত চিন্তনপীঠ যুগে যুগে নেতৃত্বে থাকে সেইসব চিন্তনপীঠগুলোর কেন্দ্র বিন্দু হিসেবে। সাধক-ভাষা শিক্ষাদানের মাধ্যম। সে ভাষা সমগ্র পৃথিবীর সত্যমানুষকুলের অর্থাৎ সাধককুলের সাংস্কৃতিক ভাষা। লক্ষ্য অর্জনের জন্য দৃঢ় প্রত্যয়ী চিন্তাবিদরাই সেই ভাষা শিখতে পেরেছেন এবং পারবেন। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে চিন্তনপীঠগুলোর ভাষার উপর গুরুত্ব আরোপ করা হলে চিন্তাজগতের স্বাভাবিক প্রবণতা হবে পুরানো সাহিত্য, সংস্কৃতি ও ধর্মকে উপলব্ধি করা। সত্যব্রত চিন্তনপীঠ বাঙালি জাতির অতীতের সব কিছুর মূল্য সম্যক হৃদয়ঙ্গম করে নতুন কিছু সৃষ্টি করছে, এমন কিছুর অবতরণ ঘটাতে চাচ্ছে যা হবে পৃথিবীর পক্ষে নতুন। এই প্রচেষ্টায় চিন্তাজগৎ যাতে অতীতের সব কিছুর দ্বারা শৃঙ্খলিত না হয়, তারজন্য নিজকে সার্বিক নিয়ন্ত্রণ করেই এগিয়ে যেতে হয়। অতীত সম্বন্ধে জ্ঞানলাভের প্রয়োজনীয়তা আছে বর্তমান এবং ভবিষ্যতের কাজের বিঘ্ন না ঘটাতে।
সর্বপ্রকারের বিদ্যাভাস অথবা যে কোন অবস্থাতেই বিদ্যাভাসের বেশীরভাগ অংশ অতীত সম্পর্কে জানবারই প্রচেষ্টা এই আশায় যে এই জ্ঞান বর্তমান সম্বন্ধে ভালভাবে বুঝতে সাহায্য করবে। অতীতকে আঁকড়ে নয় বা ভবিষ্যতের দিকে তাকানো নয় এই বিপদকে এড়াতে চাইলে নিজকে বোঝবার এবং জানবার জন্য বিশেষ যত্ন নিতে হবে। অতীতে যা কিছু ঘটেছিল, আজকে যা ঘটছে তারই প্রস্তুতির জন্য আর এখন যা কিছু ঘটছে তা ভবিষ্যতের পথ প্রস্তুত করার জন্য ছাড়া আর কিছু নয় এই হল সর্বাপেক্ষা প্রয়োজনীয় দৃঢ় প্রত্যয় যার জন্য নিজকে অবশ্যই তৈরী করতে হয়।
উপলব্ধি বোধের অনুশীলনের দ্বারাই বর্তমান ও ভাবীকালে লক্ষ্য অর্জনের জন্য নিজকে তৈরী করা যায়। মানব আধারের আর সব অংশের মত চিত্তেরও বিশ্রাম চাই, আর এ বিশ্রাম সে পাবে না যতক্ষণ না জানে কি রকমে তা দিতে হয়। চিত্তকে কি করে বিশ্রাম দিতে হয় তা অনুশীলনের জিনিস। এক উপায় হল, এক লক্ষ্য অর্জনের জন্য চিন্তাজগতের কাজ বদলান, কিন্তু সবচেয়ে ভাল বিশ্রাম হতে পারে এক লক্ষ্য ছাড়া সব ব্যাপারে নীরবতায়।
যখন ইচ্ছামত চিত্তকে নীরব করতে পারা যায়, গ্রহণোম্মুখ নীরবতার মধ্যে তাকে একাগ্র করে ধরে রাখা যায়, তখনি সমস্যার সমাধান হয়, সঙ্কট দূর করা যায়। শ্রীগুরু, আমি আমার উপলব্ধি ও বাস্তবতার সাহায্যে কাজ করতে চেষ্টা করব, আমার এই প্রয়াসে তুমি সাহায্য কর, প্রাণশক্তিকে শান্ত কর, চিন্তাজগতকে নীরব ও অচঞ্চল রাখ এমনভাবে যেন একাত্মতার ক্ষেত্র ঊর্দ্ধের দিকে উন্মুক্ত ও গতিসম্পন্ন হয় এই প্রার্থনাই উত্তম। আধুনিক পদ্ধতিতে শিক্ষাপ্রাপ্ত হচ্ছি কিন্তু নিজ-এর মধ্যে স্বজ্ঞার গুণ ও সমত্ববোধের সাহায্যে জ্ঞান লাভের ক্ষমতা বিকাশেরও চেষ্টাও করিনি, তাই এখুনিই শুরু করি। 
প্রত্যক্ষ দর্শন, উপলব্ধি ও জ্ঞান - তা অন্তরের গোপন দিনলিপিতে লিখে রাখতে হয়। আত্মসূর্যই শ্রীগুরুর রূপ। এই আত্মসূর্যের রূপ এবং আমি রূপ একই এবং অভিন্ন। জিহ্বার দ্বারা সকল স্বাদ বোঝা যায়। লালসাযুক্ত জিহ্বা দ্বারা লালসা উৎপন্ন হয়। এই লালসার জন্যই আমিত্ব আবদ্ধ হয়। লোভ চরিতার্থ না হলে ক্রোধ উৎপন্ন হয়। এগুলো সবই সত্যমানুষ হওয়ার অর্থাৎ সাধনার অন্তরায়। অতএব, লোভ ক্রোধ ইত্যাদি এগুলোকে সর্বাগ্রে নিয়ন্ত্রণ করা একান্ত প্রয়োজন। এগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে আত্মরাজ্যে প্রবেশ করা যায় । 
কোন বস্তু লাভের জন্য লোভ হয়। সেই লোভ বাইরের থেকে আমি-র মধ্যে প্রবেশ করে না। লোভ আমি-র ভেতরেই আছে। কোন বস্তু লাভের ইচ্ছা জাগ্রত হওয়াই দেহাভ্যন্তরস্থ লোভরূপী অবস্থার প্রকাশ। লোভ বর্তমান। এই লোভ কে নিয়ন্ত্রণ করতে হলে বাহ্যিক উপায়ে বা বাহ্যিক ত্যাগে সম্ভব নয়। যেমন যে বস্তুর প্রাপ্তির জন্য লোভ হল, সেই বস্তুকে যখন গ্রহণ না করা হয় তখন বাহ্যিক ত্যাগ হল বটে কিন্তু চিন্তাজগতের অন্তরে সেই বস্তু লাভের লোভ রয়ে গেল। অতএব এ ভাবে লালসা বা লোভ চরিতার্থতা হল না ঠিকই, কিন্তু এ উপায়ে সঠিক ত্যাগ সম্ভব নয়। ত্যাগ, শ্রীগুরুর আদেশ-উপদেশ-নিষেধের মধ্যের নির্যাস নিয়ে সংস্পর্শ-সান্নিধ্য-স্মরণে লক্ষ্য অর্জনে মগ্নতা। 
চরণ দেখা নাকি যার দ্বারা বিচরণ করা যায়। মানুষ দুই পায়ের দ্বারা বিচরণ করে। পা হাড় মাংস দ্বারা গঠিত। প্রকৃতপক্ষে পায়ের কি নিজস্ব ক্ষমতা আছে? যদি থাকত মৃত মানুষের পাও চলত। তা যখন চলে না, তখন এই দুই পায়ের নিজস্ব কোনো ক্ষমতা নেই। অতএব প্রকৃতপক্ষে এই দুই পা সহ সারা শরীরটাকে যিনি চালাচ্ছেন তিনি হলেন শ্বাস। এই শ্বাসের গতি থাকায় জীব জীবিত থাকে।
নিজ অন্তরকে সম্পূর্ণ রিক্ত কর, মুক্ত কর, উজাড় করে নিঃশেষে শ্রীগুরুর চরণে ঢেলে দাও, তাঁর সাথে নিরবচ্ছিন্নভাবে যুক্ত হও, অন্তরকে সর্ব্বদা পূর্ণরূপে তাঁর প্রতি উন্মুখ করে রাখ, তবেই নিমেষের মধ্যে তাঁর কৃপার বৈদ্যুতিক স্পর্শে হতাশা বিপর্য্যস্ত আমি-প্রাণ সরল সতেজ হয়ে থাকবে, তাঁর করুণাধারায় অভিসিঞ্চিত হয়ে জীবন চলার পথে সমগ্র জীবন-জনম ধন্য ও কৃতার্থ করে এবং কৃতজ্ঞ হয়ে আনন্দলোকে থাকা যায়।

আমরা সবাই জানি....২৯


আনুষ্ঠানিকতা অধমাধম। তার মানে অধমেরও অধম, সবচেয়ে নীচু, সবচেয়ে স্থূল। ধ্যানভাব মধ্যম। অধম হলেও আনুষ্ঠানিকতা ত্যাজ্য নয়। আনুষ্ঠানিকতা একেবারে তলায়, তলায় হলেও সেটা একটা ধাপ; আরম্ভেতে সেটাও করতে হয়। সিঁড়ি দিয়ে ধাপে ধাপে ছাদে উঠতে হয়।
সাধনা নিজের মন্দকে দূর করা। শ্রীগুরু শুদ্ধ, অপাপবিদ্ধ, তাঁকে পাপ স্পর্শ করতে পারে না, তিনি পাপকে প্রকাশ করতে পারেন। লক্ষ্য অর্জনের জন্য লক্ষ্যকে চিন্তা করতে হয়। আরোপ করতে করতে লক্ষ্য স্বরূপ সম্বন্ধে ধারণা হয়; নিয়ন্ত্রণ আসে নিজের ওপর, কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা হয় নিজের ওপর। কৃচ্ছসাধন ইচ্ছে হয়, তাই কৃচ্ছসাধন করা। তীর্থভ্রমণে কাজের কাজ কিছু হয় না, কেবল অন্তর উচাটন আর অর্থহানি হয়ে থাকে। ঘরে বসে শান্তভাবে অন্তরে শ্রীগুরু চিন্তা করলেই কাজ হয়। মানুষ নিজের অন্তরে প্রবেশ করতে পারে না। দরকার সকলেরই আছে! যত জপ করতে পারা যায় ততই ভাল। গুরুউপদেশ! লালন আর পালনে খাটতে হয় খুব। শ্রীগুরুর সান্নিধ্য লাভ করতে হলে সাধনার পথের যাত্রীর চাই:-(১) ধৈর্য। (২) অধ্যবসায়। (৩) দেহ ও অন্তরের পবিত্রতা। (৪) তীব্র আকাক্সক্ষা বা ব্যাকুলতা। (৫) অন্তরের স্থিরতা, বিষয়ে আসক্তি-ত্যাগ, সকল প্রকার দুঃখে অবিচলিত থাকা, শ্রদ্ধাবনত শ্রীগুরুতে ও তাঁর উপদেশবাক্যে আস্থা ও চিত্তস্থাপন।
সাধন-ভজনের দ্বারা যেসব বিষয়ে উপলব্ধি বা দর্শনাদি হয় তা শ্রীগুরু ছাড়া আর কাকেও না বলা। আধ্যাত্মিক সম্পদ-অন্তরতম চিন্তাধারা-নিজের অন্তরে লুকিয়ে রাখতে হয়। তা অপরের কাছে প্রকাশ করতে হয় না। ওটা পবিত্র গুপ্তধন, একমাত্র শ্রীগুরুর সঙ্গে একান্তে উপভোগ্য বস্তু। আবার দোষ, ত্রুটি ও অনাচারের কথা অপরের কাছে বলে বেড়ানো সঠিক নয়। তাতে আত্মসম্ভ্রম খোয়া যায় ও অপরের কাছে হীন বলে প্রতিপন্ন হয়। নিজের দোষ, দুর্বলতা শ্রীগুরুকে জানাতে হয় ও তার কাছে প্রার্থনা করতে হয় যেন তিনি সেগুলো শোধরাবার শক্তি দেন।
ধ্যান করতে হলে প্রথমে খানিকক্ষণ স্থির হয়ে বসে চিন্তা যেখানে যেতে চায় যেতে দিতে হয়। ভাবতে হয়, নিজেই সাক্ষী, নিজেই দ্রষ্টা। বসে বসে লক্ষ্য-চিন্তায় ভাসা-ডোবা, চিন্তার দৌঁড়-ঝাঁপ দেখা এবং উপলব্ধি করা। ভাবতে হয়, আমি সম্পূর্ণ পৃথক। যখনই কোন অন্য চিন্তা আসে, তখনই সেটাকে জোর করে দাবিয়ে রাখার চেষ্টা করতে হয়। অভ্যাস বৈরাগ্য ছাড়া লক্ষ্যে একাগ্রতা আনবার অন্য কোনও সুগম বা সহজ উপায় নেই। যতক্ষণই জপ বা ধ্যান করা-ততটুকু নিমগ্ন হয়ে করা। শ্রীগুরু অন্তর্যামী, ভেতর দেখেন, তিনি তো আর কতটুকু সময় ধ্যান করা হলো বা কতবার জপ করা হলো তা দেখেন না। ৪/৫ বছর নিষ্ঠার সাথে নিয়মিত করলে তবে আনন্দ পাওয়া যায়। তখন একদিন না করলে ভারি কষ্ট হয়, কিছু ভাল লাগে না। আধ্যাত্মিক জীবন লাভ করতে দৃঢ় প্রত্যয়ী হওয়া দরকার। 
জীবনের অর্ঘ্য শ্রীগুরুর পায়ে অর্পণ করতে হয়। এটা জীবনের প্রথম এবং প্রধান কর্তব্য। তারপরে নির্ম্মাল্য হয়ে জগতের প্রতিজনের সংস্পর্শে আসা। অকপটে যে জীবন শ্রীগুরুতে উৎসর্গীকৃত হয়েছে, সে জীবনের সংস্পর্শে যে যখনি আসুক, নির্ম্মাল্যের পবিত্রতাকে সম্মান করে চলতে সে বাধ্য হয়। চর্মচক্ষে মানুষ শ্রীগুরুর বাহ্যিক রূপ দেখতে পায় আসল সত্য রূপ দেখতে পায় না, কিন্তু সত্যময় পবিত্রতা-রূপে যে প্রভা তিনি বিকিরণ করছেন, তা অনুভব করতে পারে এবং তার সৌরভ গ্রহণ করতে সমর্থ হয়। যে যতটুকু নিবেদনে পবিত্র, সে ততটুকু শ্রীগুরুর, সে ততটুকু উন্নত, সে ততটুকু আদরণীয়। শ্রীগুরুর হলে,-পবিত্রতার দিব্য সুগন্ধ সমস্ত অস্তিত্বকে ঘিরে ধরে থাকে।
শ্রীগুরুকে ভালবাসলে কামনা আপনি কমে যায়, ক্রোধ আপনি থেমে যায়, লোভ আপনি দমিত হয়,- এর জন্য আলাদা করে আর কোনও চেষ্টা করতে হয় না। পন্ডিতেরা মানবের সকল আচরণে, সকল দৃষ্টিভঙ্গীতে, সকল চিন্তা-ধারায় কামনার অপ্রতিহত মূর্তি আবিষ্কার করে শঙ্কিত হয়েছেন এবং অর্দ্ধোপভুক্ত ও অনুপভুক্ত কামনার কুফল যেমন করে সমাজের প্রতি অঙ্গে অকল্পনীয় অশান্তি এনেছে, তা দেখে কামনাকে অধিকতর নিশ্চয়তার সাথে উপভোগ করে অন্তরের বিকার প্রশমিত করে নিয়ে সকলকে শান্তি ও নিরুদ্বেগ জীবনের পথপ্রদর্শন করবার জন্য ব্যস্ত হয়েছেন। 
কামনার পৃথক অস্তিত্ব নেই। নিখিল ভুবন প্রেমময় প্রেমজগৎ, একের সাথে সম্পর্ক হতে প্রেম সৃষ্টি হয়েছে, তাই সব-কিছু প্রেমময়। সে প্রেম ক্ষুদ্র আধারে পড়ে কামনা নাম ধারণ করে। আবার অনন্ত অসীম শ্রীগুরুর চরণে পড়ে নিজ স্বরূপ প্রকাশ করে, প্রেম হয়। কামনা প্রেমজগতেরই একটা দিক মাত্র, সম্পর্ক নিত্যশুদ্ধ অবস্থা। আত্মসুখের লিপ্সার সাথে যখন মিশ্রিত হয়, সম্পর্ক তখন কামনা হয়ে যায়; শ্রীগুরুর বিশ্বসুখে, বিশ্বাত্মার সুখে, বিশ্বপ্রভু সুখের লিপ্সার সাথে যখন যুক্ত হয়, কামনা তখন প্রেমে পরিণত হয়ে যায় এবং বিভিন্ন রূপ ধরে সর্ব্বপ্রাণীর ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র হৃদয়ে বাস করে। যে মুহূর্তে কোনও প্রাণী জানে যে, কামনার পৃথক কোনও অস্তিত্ব নেই, শ্রীগুরুর প্রেমময় অস্তিত্বেই তার প্রকৃত অস্তিত্ব, তখন আর কামনা তার ক্ষুদ্র লক্ষ্য, ক্ষুদ্র দৃষ্টি, ক্ষুদ্র লীলা-বিলাস-লাস্য নিয়ে বসে থাকতে পারে না, তখন সে প্রেমের বিশ্বম্ভরী মূর্তি ধারণ করে এবং শ্রীগুরুর প্রতি অর্পিত ভালবাসাকে বিশ্বের প্রতিজনের প্রতি বিসর্পিত করে দিয়ে নিজেও হয় প্রতিক্রিয়া বর্জিত মধুময়, বিশ্বকেও করে বিপুল আনন্দে উল্লসিত। শ্রীগুরুকে ভালবেসে, অন্তরের কামনাকে শ্রীগুরুর চরণে রাখতে হয়, তাঁর অকৈতব প্রেমের মধুময় স্পর্শে কামনা তার কণ্টকমালা হতে রিক্ত হয়ে পারিজাত-মাল্য গলদেশে ধারণ করে বার হয়ে আসে, পূতিগন্ধময় তার অস্তিত্ব কলুষহীন নিষ্পাপ-সুন্দর দিব্যসুরভি নিয়ে বহির্গত হয়। যা ছিল গুপ্ত শত্রু, তা হোক নিখিল বিশ্বের প্রতিজনের পরম কুশলকারী নিত্যবন্ধু।
সত্য-প্রতিষ্ঠার চেষ্টা শ্রীগুরুচর্য্যের পরম-সহায়ক। পরম সত্যই স্রষ্টা শ্রীগুরু - এটা সাধককুলের তথা সত্যমানুষকুলের উপলব্ধি। সত্যে যে বিচরণ করে, শ্রীগুরুতে বিচরণ তার কঠিন হয় না। সত্যে দৃঢ় প্রতিষ্ঠা অর্জন করতে হয়। যে পরের প্রাপ্যের প্রতি অন্যায় ও লুব্ধ দৃষ্টি দেয় না, তার পক্ষে সত্যে সুদৃঢ় হওয়ার পথ সুগম। যে অন্যের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে না, তার পক্ষে সত্যে প্রতিষ্ঠিত হওয়া সহজ। যে অপরের অনুগ্রহ-লাভের প্রত্যাশী নয়, নিজের কার্য্য নিজের শক্তিতেই সাধন করতে চেষ্টিত, তার পক্ষেও সত্যে প্রতিষ্ঠালাভ সহজ। জগতের অধিকাংশ ভুলই বস্তু লাভের লোভ হতে সৃষ্ট হয়। যা লক্ষ্যপথে কিছু লাভ করতে পারে না। শ্রীগুরুর প্রতি লোভ মানুষকে ভুল পথে যেতে বাধ্য করে। যার প্রতি বিদ্বেষ আছে, ক্ষমার মহিমায় যদি তার প্রতি অন্তরের শত্রুতা-বোধ প্রশমিত করতে না পারা যায়, তা হলে তাকে অপদস্থ, হতমান ও পরাভূত করবার জন্য ভুল পথের আশ্রয় নিতে প্রলুব্ধ হয়।
ধর্মের শিক্ষা মানবকে বিনয়ী করে। ধর্মের জ্ঞান মানবকে মহান করে। মানবের এই জ্ঞানকে জীবনে লালন করতে হয়। একজানা জীবনে যুক্ত না হলে, সমস্তই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। এটা জীবনে অনুশীলন করতে হয়, তাহলেই এর সার্থকতা। যে কোন অনুভূতি অনুশীলন সাপেক্ষ অর্থাৎ সব কিছুই অনুশীলনের ভিতরে। এক-লক্ষ্য জানাকে জীবনে অনুশীলন করাই মানব জীবনের সাধনার একটা বৈশিষ্ট্য। সত্যাশ্রয়ী, নিষ্কন্টক, সহজ মানবই এক-লক্ষ্য জানাকে জীবনে অনুশীলন করেন। আর তাই তিনিই কেবল পরম উপলব্ধি লাভ করতে পারেন। অনুভূতিই ধর্মের প্রাণ-অনুভূতি বিহীন ধর্ম নিষ্ফল।

আমরা সবাই জানি....২৭-২৮


যার জীবনে শ্রীগুরু ধরা দেবে-অপরূপের দিব্য মহিমা-সে যে পথ দিয়ে চলবে সবাই সুখী হবে তার সেবায়। সবকিছু উজ্জ্বল হবে শ্রীগুরুর জ্যোতিতে - শ্রীগুরুর আদেশ-উপদেশ-নিষেধে উজ্জীবিত হয় সত্তা - সবাইকে দিতে পারে আনন্দ-সংবাদ।
লোভ, মোহ, আসুক নব নব ছলনা-সেদিকে লক্ষ্য না রেখে আপন চিন্তায় চিহ্নিত পথ ধরে এগিয়ে চললে, একদিন না একদিন গন্তব্য স্থানে গিয়ে পৌঁছানো যায়-এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। কল্যাণকর্মে জীবন কখনো ব্যর্থ, বিফল হয় না।
শ্রীগুরুকে ডাকলে জীবনের সকল অভাব, অপূর্ণতা দূর হয়। এটা শুধুমাত্র কথার কথা বা কল্পনা নয়। সাধককুল সত্যমানুষকুল তার উজ্জ্বল প্রমাণ।
সম্পর্ক করার জন্যই মানুষের সাধনা। যেদিন মানুষ শ্রীগুরুর সাথে সম্পর্ক করে নিষ্পাপ নিষ্কলঙ্ক হয়, সেদিন সে নিজের অন্তরের মুকুরে দেখে হৃদয়-দেবতা শ্রীগুরুর মুখ। সে লাভ করে এক অপূর্ব আনন্দঘন দিব্যজীবন।
শ্রীগুরু তাঁর কাঁধ বাড়িয়ে আছেন বোঝা নেবার জন্য। বিশ্বাস করে মানুষ তাঁর কাঁধে জীবন বোঝা দিতে পারেন না। তাই মানুষের দুরবস্থা-জীবন বোঝা তাঁর কাঁধে বোঝা দিতে পারলে জীবনের সব কাজই সুসম্পন্ন হয়।
মহাপুরুষরা ইচ্ছানুযায়ী বারবার জন্মগ্রহণ করেন-জীবের কল্যাণের জন্য। আমিত্বের আবরণগুলো হতে একেবারে মুক্ত হতে হলে নিয়ম নিষ্ঠা লালন-পালন করতে হয়। শ্রীগুরু কাউকে কিছু দেন না, তিনি সম্পূর্ণ নিস্পৃহ দ্রষ্টা-কিন্তু তাঁর উপদেশ, সান্নিধ্য আর নাম স্মরণ থেকে সব কিছু পাওয়া যায়।
শ্রীগুরুর আশীর্বাদ প্রসাদ ছাড়া মানুষ উর্দ্ধমুখী হন না। শ্রীগুরু সর্বত্র থাকলেও এক এক দেশে এক এক অবস্থানে শ্রীগুরুর এক এক বিশেষত্ব, দেখা যায় উপলব্ধির মাধ্যমে, বুঝতে হয় এবং চিনতে হয় তাঁর মধ্যের ভাব এবং বহমান বিশেষ করুণার ঝর্ণাধারা।
শ্বাসে প্রশ্বাসে নাম অভ্যস্ত হয়ে গেলে অপ্রাপ্য কিছুই থাকে না। শ্বাসে প্রশ্বাসে নাম স্মরণ সাধনার প্রথম দেশ এবং সিদ্ধি-সিঁড়ির প্রথম ধাপ। শ্রীগুরুর প্রিয় অপ্রিয় ভেদ নেই। ভক্তিতে ভজনা করলে শ্রীগুরুর সঙ্গে একাত্ম হওয়া যায়। অন্তরে শ্রীগুরুর স্থিতি উপলব্ধি হয়। শ্বাসে-প্রশ্বাসে নাম করার অর্থ তাঁর সঙ্গে যুক্ত থাকা। সমস্ত চিন্তা-জগৎ নামে এবং শ্রীগুরুর কর্মে মগ্ন থাকলে সুখ-দুঃখ তাকে স্পর্শ করতে পারে না। আঘাতে কোন যন্ত্রণাবোধ থাকেনা কারণ তার বর্তমান তখন নামে মগ্ন।
যে কোন একটা প্রজাতির সদস্যকে নিঃস্বার্থভাবে ভালবাসতে পারলে শ্রীগুরুদর্শন হয়। তিনি সর্বত্র। নিজকে নিয়ন্ত্রণ না করলে, ত্যাগ ও তপস্যার দ্বারা অন্তর শুদ্ধ ও পবিত্র না হলে শ্রীগুরুর আনন্দ-লোকে প্রবেশ করা যায় না।
সারাদিন আহার সুখ, নিদ্রা সুখ, বিষয় সুখ-এগুলো নিয়ে থাকলেও অগ্রাধিকার দিয়ে কিছু সময়ের জন্য শ্রীগুরু স্মরণে থাকা যায়। সুখ যত বাড়ে তত বাড়ে দুঃখের দহন-পরিত্রাণের উপায়-শরণাগতি। একান্ত চিত্তে শ্রীগুরুর উপর নির্ভর করে থাকা যায়। শ্রীগুরু প্রয়োজন মত সব ব্যবস্থা দিয়ে থাকেন। একটা অস্ফুট ব্যথাও তাঁর অগোচর নয়।
অন্তরে অন্তর্নিহিত আধ্যাত্মিক ভাবগুলো, যথা-শক্তি, জ্ঞান, প্রেমস্তর, পবিত্রতা, অন্তরের জ্যোতির্ময়তা এবং জীবন চলার পথে এমন কিছু কর্ম যার মধ্যে দিব্য জীবন-স্রোতে প্রবাহমান, তাতে একনিষ্ঠতা যোগে ধারণ করাই উত্তম। চৈতন্যসত্তা যখন শ্রীগুরুর ভাবগুলো দ্বারা পরিপূর্ণ হতে থাকে, তখন অপবিত্রতার কোন স্থানই সেখানে থাকে না। এ প্রকার সাধনা অব্যাহত থাকলে ধীরে ধীরে চিত্ত শুদ্ধ হয়। নিমগ্ন থাকলে সত্যমানুষে বিবর্তিত হয়, সত্য-শক্তি ও জ্যোতিতে পরিপূর্ণ হওয়ার পথ ধরে উর্দ্ধমুখী হওয়া যায়।
অশান্তির মূল হচ্ছে দ্বৈতভাব এবং দ্বিচারিতা। চতুর্দিকে সুন্দর পুষ্পরাশি থাকতে পারে; পবিত্র ভাবোদ্দীপক চিত্র -পটাদি থাকতে পারে, সুরভিত ধূপ থাকতে পারে, কিন্তু চিন্তায় অপবিত্রতা থাকলে; অর্থাৎ একাগ্রতা না থাকলে, লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের প্রতি স্থির না থাকলে-পবিত্রতা বস্তুটা অজ্ঞাতই থেকে যায়। অবিচলিত একাগ্রতার শক্তি দ্বারা যে কোন বাহ্য অবস্থা অতিক্রম করা যায়। সংযত চিন্তা শক্তিশালী হয় এবং যা কিছু দ্বারা বিক্ষিপ্ততা আসে, তা হতে নিজকে বিযুক্ত করার ক্ষমতা তার আয়ত্তে আসে। সাধনা, প্রেমজগতের পবিত্রতায় দৃঢ়ভাবে স্থিতিশীল হয়, কোন কিছুই আর তখন চিত্তকে উদ্বিগ্ন করতে পারে না। বিক্ষিপ্ত এক একটা চিন্তা এক একটা সুতোর মতো, তাকে সহজেই ছেঁড়া যায়। কিন্তু একাগ্রতা সুতোর এক গুচ্ছ, তাকে ছেঁড়া কঠিন। চিন্তারাশি সংযত করে লক্ষ্য-বিষয়ে দৃঢ়ভাবে সংযোগে থাকতে হয়। একাগ্র হলে কিছু শ্রুতিগোচর হয় না, কিছু দৃষ্টিগোচর হয় না-সব সমর্পিত হয়ে যায়। বাহ্য শব্দ, বাহ্য দৃষ্টি প্রভৃতি সকল বাহ্যিক ক্রিয়াসমূহ একাগ্রতা দ্বারা জয় করা যায়। সম্পর্কের সর্বোচ্চ রূপ একাগ্রতার তীব্রতায় নিকটে আসে। সংযোগে থাকা সহজ নয়। সংযোগে থাকার অর্থ অন্তরে শ্রীগুরুর অস্তিত্ব অনুভব করা। যোগ এবং সংযোগ শিল্প সৃষ্টির একমাত্র সত্য পথ বলে উপলব্ধ। তার অর্থ এই নয় যে, প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ ব্যাপারটা উপেক্ষা বা অবহেলা করা। শ্রীগুরুকে অন্য কোন কিছুর সঙ্গে তুলনা করা যায় না। শ্রীগুরু চিন্তায় ভাবের অভিব্যক্তি ঘটায়।
প্রেমজগতের ভালবাসায় শ্রীগুরুকে ভালবাসলে কামনা কমে যায়, ক্রোধ থেমে যায়, লোভ দমিত হয়, - এর জন্য আলাদা করে আর কোনও চেষ্টা করতে হয় না। পন্ডিতেরা মানুষের সব আচরণে, সব দৃষ্টিভঙ্গীতে, সব চিন্তা-ধারায় কামনার অপ্রতিহত মূর্ত্তি আবিষ্কার করে শঙ্কিত হয়েছেন। তাঁরা অর্দ্ধোপভুক্ত ও অনুপভুক্ত কামনার কুফল কেমন করে সমাজের প্রতি স্তরে অকল্পনীয় অশান্তি আনছে, তা দেখে কামনাকে অধিকতর নিশ্চয়তার সাথে উপভোগ করে স্ব-বিকার প্রশমিত করার জন্য সকলকে শান্তি ও নিরুদ্বেগ জীবনের পথপ্রদর্শন করবার জন্য ব্যস্ত হয়েছেন এবং আছেন।
সাধককুল তথা সত্যমানুষকুল কামনার পৃথক অস্তিত্ব স্বীকার করেন না। প্রাণ আর প্রেমজগৎ অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত। নিখিল ভুবন প্রাণ-প্রেমজগৎ-প্রেমময়-প্রেমসম্পর্ক হতে সৃষ্ট, তাই সব-কিছুই প্রেমময়। সেখানে মিথ্যা বলে কিছু নেই। প্রেমজগতে লক্ষ্যচ্যূত হলে বা লক্ষ্য না থাকলে বিক্ষিপ্ত চিন্তার মাঝে আত্মসুখ লিপ্সায় কামনার সৃষ্টি। আবার অনন্ত অসীম শ্রীগুরুর সাথে একাত্মতায়, স্বরূপে প্রকাশিত হয়ে হয় প্রেমময়। কামনা প্রেমজগতেরই একটা পরিবর্তনশীল অবস্থা। আত্মসুখ লিপ্সার সাথে মিশ্রিত হয়ে কামনা হয় বহমান; শ্রীগুরুর সাথে একাত্মতায়-পরমসত্যের সাথে একাত্মতায়-পরম চেতনার মাঝে নিমজ্জিত অবস্থায় প্রেমজগৎ শুধু প্রেমে ভরপুর থাকে। প্রাণ আর প্রেমজগৎ শ্রীগুরুতে লীন হয়ে যায়।

আমরা সবাই জানি…. ২৬


আধ্যাত্মিক সাধনার পথে যাত্রা আরম্ভ করার আগে নিজেকে নৈতিকতার ওপর প্রতিষ্ঠিত করা প্রয়োজন। শ্রীগুরুর উপদেশ অতি অবশ্য পালনীয়। উপদেশ যতদিন অন্তরে বদ্ধমূল না হয়-ভক্ত না হয়, ততদিন হাজার বাহ্যিক অনুষ্ঠান সত্ত্বেও কিছুই হবার নয়।
সম্পর্কের ভিত্তি সুদৃঢ় হওয়া প্রয়োজন এবং তা লক্ষ্যকে কেন্দ্র করে নীতিপরায়ণতার ওপর প্রতিষ্ঠিত করতে হয়। নিজের প্রশান্তির জন্যও এ সব প্রয়োজন, অন্তরে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিজেকে অনিন্দ্য না বোধ হলে শান্তি বা চিত্ত উপভোগ করা যায় না। আধ্যত্মিক নীতিসমূহের সঙ্গে স্বীয় জীবনচর্যার অনৈক্য থাকলে, হাজার মেরুদ- সরল করে বসা ও ধ্যানের চেষ্টা করা সত্ত্বেও তার আনন্দদায়ক ফল লাভ হবে না। বসাও একটা অভ্যাস। এমনভাবে বসা শিক্ষা করা প্রয়োজন, যাতে দেহবোধ যথাসম্ভব কম হয়; এরূপে চিন্তা শরীরের ভারে অবনত হবে না এবং ক্রমশই অতি সহজেই তা শান্ত হয়ে আসবে। শরীর নিজ বশে না থাকলে চিন্তাজগৎ এবং প্রেমজগৎ যথাযথ ব্যবহার করা সম্ভব নয়: একাগ্রতা লাভই হয় না, সংযোগ-সম্পর্ক তো দূরের কথা। চিন্তার ভারসাম্য বজায় না থাকলে, ক্ষণকালের জন্যও স্থিরভাবে সংযোগ সম্ভব নয়। চিন্তাজগৎ ও শরীরের দৃঢ়তা লাভ করতে হবে। দৈহিক অঙ্গপ্রত্যঙ্গের উপর আধিপত্য না থাকলে আধ্যাত্মিক চেতনা লাভ করা যায় না।
শরীরকে স্থির করতে শক্তি প্রয়োগের আবশ্যক হয়। সঙ্কল্প করতে হয়, নির্দিষ্ট ক্ষণে শরীরকে একটি নির্দিষ্ট মুদ্রায় স্থির ও দৃঢ় অবস্থায় ধরে রাখার। দিনের পর দিন এরূপ অভ্যাস করলে, আলস্য ও শারীরিক অস্থিরতা ক্রমশই কাটায়ে উঠতে পারা যায়।
জানা মিশ্রিত-স্বরূপ, সমুদয় বিষয়ানুভূতি পর্যবেক্ষণ ও  বিশ্লে­ষণ থেকেই এসে থাকে। শাস্ত্র বা বই পড়ে দার্শনিক জ্ঞান বা তত্ত্বজ্ঞান হয় না, বরং যত বই পড়া যাবে, ততই সব গুলিয়ে যাবে, পরমুখাপেক্ষী হবে। চেতনার অবস্থান ও স্তর সমূহের বিশ্লে­ষণ করে দেখা যায় যে, ইচ্ছা একটা মিশ্রবস্তু, আর যেহেতু প্রত্যেক মিশ্রবস্তু কোন-না-কোন বাহ্য শক্তিবলে বিধৃত থাকে, সেহেতু ইচ্ছার বহিঃস্থ শক্তিসমূহের সংযোগে বিধৃত রয়েছে। এমনকী, যতক্ষণ না মানুষের ক্ষুধা পাচ্ছে, ততক্ষণ সে খাবার ইচ্ছা করতেও পারে না। ইচ্ছা বাসনার অধীন। আমরা সকলেই বিভিন্ন জগৎ দেখছি ও তার অস্তিত্ব অনুভব করছি। ‘ইচ্ছা’-বদ্ধভাবাপন্ন হবার আগে যেরূপ ছিল, তাই মুক্ত স্ব-ভাব। স্বাধীন ইচ্ছার ধারণা – প্রতিমুহূর্তে দেখাচ্ছে যে, মানুষ বন্ধন কাটাবার চেষ্টা করছে। একমাত্র মুক্ত স্ব-ভাব – তা অনন্ত, অসীম, দেশ-কাল নিমিত্তের বাইরে। মানুষের ভিতর যে স্বাধীনতা রয়েছে, সেটা একটা পূর্বস্মৃতিমাত্র – স্বাধীনতা মুক্তিলাভের চেষ্টামাত্র। দেহজগতে সব শক্তিই ঘুরে ঘুরে একটা বৃত্ত সম্পূর্ণ করবার চেষ্টা করছে – তার উৎপত্তিস্থানে যাবার, তার একমাত্র যথার্থ উৎস নিজ-এর কাছে যাবার চেষ্টা করছে। মানুষ যে সুখের অন্বেষণ করছে, সেটা আর কিছু নয় – সে যে সাম্যভাব হারিয়েছে, সেটা ফিরে পাবার চেষ্টা। নীতিপালন, এও বদ্ধভাবাপন্ন ইচ্ছার মুক্ত হবার চেষ্টা, আর এ থেকেই প্রমাণিত, পূর্ণাবস্থা থেকে নেমে আসার।
ক্রিয়া হতে থাক্, কিন্তু প্রতিক্রিয়া যেন না আসে, ক্রিয়া থেকে সুখই হয়ে থাকে, সমুদয় দুঃখ হচ্ছে প্রতিক্রিয়ার ফল। প্রতিক্রিয়াটা বন্ধ করতে পারলে ভয়ের কারণ কিছু নেই। চিন্তা জগৎকে শ্রীগুরু স্মরণে নিজের বশে নিয়ে আসা, যাতে প্রতিক্রিয়াটা মাথাচাড়া না দিতে পারে। জীবনের সবচেয়ে সুখকর মুহূর্ত সেইগুলো, যখন নিজেকে একেবারে ভুলে থাকা যায়। স্বাধীন-ভাবে নিমগ্ন হয়ে কাজ করা, কর্তব্যের ভার থেকে কাজ করা নয়। দেহজগৎ একটা খেলার মাঠ-এখানে শুধু খেলা আর খেলা। জীবনের রহস্য হচ্ছে নির্ভীক হয়ে খেলা। কি হবে-এ ভয় কখনও করা নয়, কারও উপর নির্ভর করা নয়। যে  মুহূর্তে বাহ্যিক সাহায্য প্রত্যাখ্যান, সেই মুহূর্তেই মুক্তি।
যশের জন্য, বংশমর্যাদার জন্য, ব্যক্তিস্বার্থ সিদ্ধির জন্য কিংবা কারো অনুরোধ-উপরোধে দান করা সঠিক নয়। এরূপ দানে নিজের অকল্যাণ হয়। যথার্থ ভক্তি সহকারে যখন একটা পয়সাও দেয়া যায়, তা শতগুণ হয়ে ওঠে। এ-দানই ধর্মের শ্রেষ্ঠ বৈশিষ্ট। দারিদ্র্য ব্যক্তির সৃষ্ট। একমাত্র শ্রীগুরুর আশীর্বাদ-কৃপাপ্রসাদ পেলে দারিদ্র্য নাশ হয়। শ্রীগুরু নাম স্মরণের শক্তিতে সমস্যা খুব দ্রুত কাটে। তিনি সদানন্দময়, কাউকে নিরানন্দে রাখেন না। নিজের মধ্যে সর্বশক্তিগুলোকে জাগ্রত করা দরকার। নিয়ন্ত্রিত-নিজেকে প্রস্তুত করতে হয়, তারপর সেবা। প্রয়োজন অকারণে দিনে দিনে বাড়ানো নয়। বাড়লে সে বোঝার ভারে ক্লান্তি আসে, বিপন্ন হতে হয়। আহার, আমোদ, আহ্লাদ, কিছুই কেউ ভুলে না, শুধু ভুলে থাকে শ্রীগুরুকে। যেখানে ধর্ম সেখানে জয় – ধার্মিককে শ্রীগুরু নিজে রক্ষা করেন।
ভক্তির সাথে শ্রীগুরুকে ডাকলে, তিনি সব ব্যবস্থায় সাড়া দেন। তিনিই প্রকৃত বন্ধু। শিক্ষা পরিবারেই শুরু হয়। পরিবারের কারো সমর্থন না থাকলে ছেলে মেয়েরা বিলাসী, উদ্ধত হতে পারে না। আর এজন্য ঘরে ঘরে দুঃখ, দৈন্য, রোদন, হাহাকার। ভোগ বিলাস নিয়েই ব্যস্ততায় কি কেউ যথার্থ শান্তি, সুখ পেয়েছে? অন্তরের দয়া, প্রেম, ভালোবাসা, প্রীতি -এসব বৃদ্ধি পেয়েছে? শিক্ষা-সংস্কৃতিতে উন্নত অবস্থা লাভ করেছে? অধিকাংশই অন্তঃসারশূন্য। নিজের মাঝে সত্য প্রতিষ্ঠা ও শ্রীগুরু নামই মানুষের পরম আশ্রয়।
ভক্তের কাছে শ্রীগুরুই সর্বশক্তিমান। তিনি কৃপা করেন, কিন্তু সান্নিধ্য-প্রাপ্তরা মর্যাদা দেন না। শ্রীগুরু  সর্বকালের বন্ধু। শ্রীগুরু নিত্য যুক্ত না থাকলে ভক্তের শান্তি বা আনন্দ নেই। শ্রীগুরুর কাছে আত্মসমর্পণ করতে পারলে আর কিছুই দরকার হয় না। যার মান অপমান কলংক বোধ নেই – তিনিই প্রকৃত শ্রীগুরুতে আত্মসমর্পণ করতে পারেন। শ্রীগুরুর উপদেশ মোতাবেক সদাচার না মানলে নিজধর্ম রক্ষা হয় না। সদাচার পালন না করাতে নাম নিয়েও বিশেষ ফল পাওয়া যায় না। তাই ধর্ম বিরল। কেবল আচার অনুষ্ঠান করলে কি হবে, অন্তরে সত্য ও অহিংসা প্রতিষ্ঠিত না হলে, ধর্মলাভ হয়নি বুঝতে হবে। লোকের কোলাহলে থাকলেও উপলব্ধি করতে হবে ধর্মের চূড়ো কতো উত্তুঙ্গ। ধর্ম মুখের কথা নয়, জীবনের পরম সত্য-পরম চেতনা।

আমরা সবাই জানি.... - ২৫


মানুষ সংসার নিয়েই মত্ত। তারা ভাবেন যে, সংসারে বেশ সুখে ও নির্ভয়ে আছে। এটা বুঝতে পারেন না যে, লক্ষ্যহীন সাগরে ডুবে রয়েছে। মানুষ যখন মৃত্যুশয্যায় শুয়ে আছেন, তখনও এমনি মায়া যে, প্রদীপে বেশী সল্তে জ্বললে বলেন, ‘তেল পুড়ে যাবে, সল্তে কমিয়ে দাও।’ আবার তার পরিবার বলে, ‘তুমি তো চল্লে, আমার কি করে গেলে?’ মানুষ সর্ব্বদা বিষয়েই আসক্ত, ভুলেও কখনও স্রষ্টার চিন্তা করেন না। তারা অবসর পেলে, আবোল-তাবোল গল্প করেন, না হয় বৃথা কাজ করেন। সময় কাটে না দেখে পরচর্চা করেন, তবু স্রষ্টার চিন্তা করেন না। উট কাঁটা ঘাস খেতে ভালবাসে। যত খায়, মুখ দিয়ে রক্ত পড়ে, তবুও ছাড়ে না। মানুষও তেমনি, তাদের কিছুতেই হুঁস হয় না। এত শোক, তাপ, দুঃখ দাগা পায়, এত বিপদে পড়ে, তবুও চৈতন্য নাই যেমন তেমনি যারা জন্মাচ্ছে বা জন্মেছে, তাদেরই ভাল খাওয়াতে-পরাতে, কিংবা ভাল জায়গায় রাখতে পারেন না, তবুও নিবৃত্তি নাই, জন্ম দিচ্ছেন। মোকর্দ্দমা করে সর্ব্বস্ব যাচ্ছে, তবুও মোকর্দ্দমা করছেন। সংসারী লোকদের সংসার থেকে সরিয়ে এনে ভাল জায়গায় (সাধুসঙ্গে) রাখা যায়, তাহলে হেদিয়ে হেদিয়ে মরে যাবেন। বিষ্ঠার পোকার বিষ্ঠাতেই আনন্দ, তাতেই বেশ হৃষ্টপুষ্ট হয়, যদি তাকে এনে ভাতের হাঁড়িতে রাখা যায়, সে মরে যাবে। গোবরের পোকা গোববের ভিতর থাকতে ভালবাসে, তাকে এনে পদ্মের ভিতর বসিয়ে দিলে ছট্ফট্ করে মারা যাবে। বিষয়ীও সেইরূপ বিষয়ের কথায় আনন্দ পায়; ধর্মকথায়, ত্যাগের কথায় মারা যাবার মতো বোধ করেন। মানুষকে হাজার শিক্ষা দিলেও, কিছুই করতে পারেন না। পাথরের উপর পেরেক মারতে গেলে, ভেঙ্গে যাবে, পাথরের কিছুই হবে না। সাধু সঙ্গ করে আসেন, কিন্তু যেমন তেতো তেমনি তেতোই থাকেন। মানুষের সামনে স্রষ্টার-কথা হলে, তিনি সেখান থেকে সরে যান। বলেন এসব মরবার সময় হবে, এখন কেন? মানুষ তীর্থ করতে গেলেও সেখানে গিয়ে স্রষ্টার চিন্তা করেন না, কেবল পরিবারের পুঁটলি বয়ে বেড়ান; আর মসজিদ, গীর্জা, প্যাগোডা, মন্দিরে গিয়ে প্রার্থনা করেন ও গড়াগড়ি দেন। এতেই ব্যস্ত থাকেন। মানুষ নিজের ও পরিবার-স্বজনের পেটের জন্য দাসত্ব করেন। যারা স্রষ্টার চিন্তা করেন, ধ্যান করেন, মানুষ তাদের পাগল ব’লে উড়িয়ে দেন। সংসারী লোকগুলোর কোন লক্ষ্য নেই। তারা তিনটা জিনিসের দাস। টাকার দাস, অভ্যাসের দাস, আর যশের দাস। মানুষ স্রষ্টার নাম নিজেও শোনেন না, পরকেও শুনতে দেন না, ধর্ম্মসমাজ ও ধার্ম্মিকদের নিন্দা করেন এবং উপাসনা করলে ঠাট্টা করেন। কুমীরের গায়ে অস্ত্র মারলে ঠিকরে পড়ে, তার গায়ে কিছুমাত্র লাগে না। মানুষের কাছে ধর্ম্মকথা যতই বলা হোক না কেন, কিছুতেই তাদের অন্তরে প্রবেশ করে না।
স্প্রীংয়ের গদির উপর বসলেই নুয়ে যায়, উঠলেই আবার যেমন তেমনি। সংসারী লোকেরা যখন ধর্ম্মকথা শোনেন তখন একটু ধর্ম্মভাব হয়, কিন্তু সরে গেলেই সব ভুলে যেমন তেমনি হয়ে পড়েন।
কামারশালের লোহা, যতক্ষণ হাপড়ে থাকে ততক্ষণ লাল দেখায়; যেমনি বার করা হয়, অমনি কাল হয়ে যায়। সংসারী মানুষগুলোও তেমনি। ধার্ম্মিকের কাছে থাকলে একটু ধর্ম্মভাব দেখা যায়, কিন্তু সরে এলেই, সে ভাব আর থাকে না। গরম লোহায় জলের ছিটে যেমন শুকিয়ে যায়, মানুষের কাছে ধর্ম্মকথাও সেইমত উবে যায়। এক কান দিয়ে শোনেন, আর এক কান দিয়ে বেরিয়ে যায়। পায়রার ছানার গলায় হাত দিলে যেমন মটর দানা গজ্গজ্ করে, সেরকম মানুষের সঙ্গে কথা কইলে টের পাওয়া যায় তাদের ভিতর বিষয় বাসনা গজ গজ করছে। বিষয়-কথাই তাদের ভাল লাগে, ধর্ম্ম-কথা ভাল লাগে না। বড় বড় দোকানে চাল-ডালের বড় বড় ঠেক থাকে; পাছে সেগুলো ইন্দুরে খায়, তাই দোকানদার কুলোয় করে মুড়কী রেখে দেন। সোঁদা সোঁদা গন্ধ আর মিষ্টিও লাগে; তাই যত ইন্দুর সেই কুলোতে গিয়ে পড়ে, ঠেকের সন্ধানও পায় না। মানুষ সংসারে কামনার-মায়াজালে মুগ্ধ হয়ে যান, স্রষ্টার খবর পর্যন্তও পান না। সংসারের কোন্দল শুনে, বাগানে বেড়াতে বেড়াতে একটা ফুল হাতে করে তুলে সঙ্গীকে বলেন ‘স্রষ্টা কি সুন্দর ফুল করেছেন!’ বিষয়ীরও ধর্মভাব ঠিক এরূপ ক্ষণিক।
যখন অন্তরে সত্য প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন কর্মের ফললাভ আপনা আপনিই হয়। সাধনার পথের যাত্রীগণও বাকসিদ্ধ হন। তারা যা বলেন তাই হয়। কোন বস্তুকে যেমন দেখা হয়, তাকে কথার দ্বারা তেমনভাবেই প্রকাশ করা হলো সত্যাচার। যেমন অনুভূতি তেমন প্রকাশ। যেমন শিশু বস্তুকে যে রকম দেখে, সেই রকমই প্রকাশ করে। এইরকম শিশুভাবের দ্বারাই অন্তরে সত্যপ্রতিষ্ঠা হয়। কুটিলতার জন্ম সংকীর্ণতা হতে হয়। তাইতো মানুষ অসত্যবাদী হয়ে যায়। অসত্য কথন ভয় বা কোন উদ্দেশ্যপূর্তির জন্য করা হয়। এই কথন অহিংসার অনুগত হওয়া দরকার। কখনও কখনও হিংসা আর সত্যের মধ্যে সমঝোতা করবার প্রয়োজন হয়। সেই সময় প্রকাশ না করা, মৌনাবলম্বন করা শ্রেয়। যখন প্রকাশ করা হবে, তখন তাকে সত্যভাবেই প্রকাশ করা উচিত। নিজের প্রয়োজনের অতিরিক্ত সংগ্রহ না করা এই ভাবের প্রতিষ্ঠা করা। লোভবৃত্তি নির্মূল হলে এই ভাব প্রতিষ্ঠা সম্পূর্ণ হবে।
জীবন ধারণের জন্য ন্যূনতম আবশ্যক বস্তুর গ্রহণ করা আর বাকির পরিত্যাগ করা। কোনও বস্তুকে গ্রহণ করবার পূর্বে তাকে বিশ্লেষণ করে দেখা উচিত যে সেটা অত্যাবশ্যক কি না। গ্রহণ বাইরের বস্তুর সাথে যুক্ত, অপরিগ্রহ ভিতরের ভাবের সাথে যুক্ত। অপরিগ্রহের ভাবনা হলে একপ্রকার নিজেকে সর্বদা মৃত্যুর সম্মুখীন রাখা। সব কিছু বিনষ্ট হয়ে গেলে অন্তরে বিকারের উৎপত্তি হওয়া উচিত নয়। সত্যবক্তা হন বাকসিদ্ধ। তিনি যাই বলেন, তাই ফলে। যখন চিত্তে সত্য প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন তা বীতরাগ হয়ে যায়। সেই চিত্তে কোন প্রকারের উদ্দেশ্যপূর্তির আকাক্সক্ষা থাকে না। এই চিত্ত আকাশকল্প। তাতে যে ভাবের জাগরণ হয়, তা ফলীভূত হবেই।

আমরা সবাই জানি.... ২৪


বর্তমানের সমাজ ধর্মের দিক হতে একেবারে না অথবা নকলবাগীশ, নিজের আচারের দিক হতে ভোগবাদী কিন্তু নিজের বিচারের দিক থেকে ঘোর সংস্কারচ্ছন্ন। সমাজে প্রায় ষাট ভাগ মানুষ তাগা-তাবিজ, মাদুলি, ঝাড়ফুঁক, মন্ত্র-পড়া, তেল-পড়া, পানি-পড়া, নুন-পড়া ইত্যাদি নানা সংস্কারে আবদ্ধ। আধুনিক শিক্ষাতে শিক্ষিত হয়ে যারা নানান ভাবে গর্ববোধ করেন, তারাও কিন্তু নানা রকম সংস্কারের শিকড় তাদের মধ্যে গেড়ে রেখেছেন। সুতরাং শিক্ষিত সমাজও সংস্কার হতে মুক্ত নয়। এরা নিজেদের অজান্তে বা খেয়ালের আবেগে, ভয়ের তাড়নায় ও লোভের বশবর্তী হয়ে অনেক সংস্কার স্বীকার করছে এবং তা আচরণেও কার্যকর করবার প্রয়াস করছে। কী বিভ্রান্তি! কী মেকী শিক্ষার গর্ববোধ! ব্যক্তি পর্যায়ে যতদিন না অধ্যাত্ম চেতনার উন্মেষ হচ্ছে, ততদিন সমাজ সংস্কার ও ভ্রান্তি হতে মুক্ত হবে না। তাই যথার্থ নিজেকে নিজে বিচার করা এবং বিবেকী হওয়া।
ধর্ম বলতে যা বুঝায়, তা হলো যা ব্যক্তি নিজে সমস্তকে ধারণ করে বা ধরে রাখে এবং যাকে অবলম্বন করে সমষ্টিগতভাবে বাঁচে। কারণ জীবনের কলা হলো বাঁচার তাগিদ ও পূর্ণতা লাভের প্রবণতা বা প্রচেষ্টা। ধর্মকে আশ্রয় করেই সমষ্টিগতভাবে বাঁচা যায় এবং পূর্ণতা লাভের পথ প্রশস্ত হয়। নতুবা বাঁচার উদ্দেশ্যই বৃথা হয়ে দাঁড়ায়। ব্যক্তি বাঁচতে চায় এবং তার জন্য প্রয়োজন হয় আহার, আচ্ছাদন ও আশ্রয়। জীবন ধারণ করতে গেলে এগুলোর একান্ত প্রয়োজন এবং সুন্দরভাবে বাঁচতে গেলে আরও তিনটি জিনিসের প্রয়োজন হয়, যথা স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সুরক্ষা। কিন্তু এই জীবন ধারণ কিসের জন্য বা এর উদ্দেশ্য কি? নিশ্চয় জীবন ধারণের উদ্দেশ্য আছে এবং এর প্রয়োজনও আছে। কি সেই উদ্দেশ্য এবং কি সেই প্রয়োজন? উদ্দেশ্য হলো পরমসত্য বা আত্মতত্ত্বের উপলব্ধি আর এর জন্যই জীবন ধারণের প্রয়োজন। আত্মোপলব্ধি ও আনন্দলাভই হলো জীবনের লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য। যখন জীবনধারা সমষ্টির অনুকূল হয়ে প্রভাবিত হয় তখনই ধার্মিকতা, কারণ জীবন সহজ সৃজনাত্মক পথেই অগ্রসর হচ্ছে। জীবনধারা যখন সমষ্টির প্রতিকূল হয়ে চালিত হয় তখন তা অধার্মিকতা বা অসহজতা। কারণ তা অধর্ম বা অসহজ ধ্বংসাত্মক পথে অগ্রসর হচ্ছে। সুতরাং সমষ্টির অনুকূল হয়ে বাঁচা এবং বাঁচার লক্ষ্যে বা জীবন-ধারণের উদ্দেশ্যে উপনীত হওয়া। ধর্মের উদ্দেশ্য বা লক্ষ্য হল মহান। কিন্তু অধিকাংশ ধর্মজীবীরা বা ধর্মের তথাকথিত শিক্ষকরা ধর্মের নাম নিয়ে কি করছেন! সাধারণ মানুষের অজ্ঞতা বা ভ্রান্তিকে আশ্রয় করে তারা করছেন ষড়যন্ত্র এবং ধর্মীয় অনুশাসনের নামে ধর্মীয় শোষণ। বিবেক বৃত্তি জাগ্রত হলে তাদের ষড়যন্ত্র ধরে ফেলে, তাই তারা প্রচার করছেন ‘বিশ্বাসে মিলায় বস্তু তর্কে বহুদূর।’ কারণ বিশ্বাস কি তারা তা জানেন না এবং যুক্তি বা তর্কে তাদের চালাকি ধরা পড়ার সম্ভাবনা আছে, এজন্য কৌশলে তারা সাধারণ মানুষের চিন্তা জগৎকে পঙ্গু করতে লেগেছেন। সাধারণ মানুষের বিশ্বাস আনার জন্য আধ্যাত্মিকতার নাম নিয়ে তারা নানা কুসংস্কার ও বিচার বিহীন আচার তৈরী করছেন এবং নানা ভেলকিও ধারণ করছেন। ব্যক্তি যখন বিপদগ্রস্ত হয় এবং অসহায় বোধ করে তখনই সে ওই ব্যক্তিগণের ফাঁদে পা দেন আর শোষণ ও অপকর্মের শিকারে পরিণত হন। আবার অত্যধিক লোভাতুর তথাকথিত শিক্ষিত অসহজরা তাদের খপ্পরে পড়ে নাজেহাল ও নাস্তানাবুদ হন। যতক্ষণ অসহজ অবস্থা থাকে ততক্ষণ ওদের খপ্পরে পড়ে থাকেন, কিন্তু সহজ বা অধ্যাত্মচেতনা সম্পন্নরা ওদের ফাঁদে পড়েন না। আর পড়লেও তা বেশীক্ষণ স্থায়ী হয় না। সহজ হতে হবে, অধ্যাত্মচেতনার বোধে উদ্বুদ্ধ হতে হবে, তবেই সমস্ত ভেল্কি বা অজ্ঞান কুসংস্কার দূর হবে, নতুবা ওগুলো দূর হওয়া বড়ই দুরূহ। অধ্যাত্ম চেতনার বোধ বিহীন সাধারণ মানুষ আজও প্রতারিত হচ্ছে স্বার্থান্বেষীদের ষড়যন্ত্রে। আধাত্মিক অজ্ঞতার শিকারগ্রস্ত সাধারণ মানুষ কামনা সফলতার ভুয়ো আশ্বাসে অবাধে শোষিত ও ভ্রষ্টাচারে সর্বস্বান্ত হচ্ছেন। অধ্যাত্মচেতনার উন্মেষ ব্যতিরেকে এই কুচক্রের ব্যুহ ভেদ করা সম্ভব নয়। 
জীবন কেহ একইভাবে চালাতে পারে না। জীবন স্তরে স্তরে সজ্জিত। সুতরাং কোন স্তরে কোন কর্ম করবে এরূপ অবস্থায় কর্তব্য সকল সময় লক্ষ্য ঠিক রাখা এবং শান্তভাবে জীবন চলার পথে পথ চলা। শ্রীগুরুর উপর সম্পূর্ণ নির্ভর করে তাঁর নাম স্মরণে জীবন কাটানো। চঞ্চলতার বশবর্ত্তী হয়ে নিত্যনূতন পদ্ধতির কল্পনা করা নিতান্ত ভ্রমাত্মক। যেরূপ অবস্থাই আসুক না কেন, তাতে জীবনের লক্ষ্য ও চলার পথ ঠিক রাখতেই হবে। লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য পরিবর্ত্তন করলে কোনও দিনই কেহ লক্ষ্যস্থানে পৌঁছতে পারেন না। দেহসংযম, বাক্সংযম ও চিত্তসংযম, এই তিন সংযমেই আছে ধর্ম। কোনও কারণে দেহ, চিন্তা ও চিত্তে চঞ্চলতা জন্মাতে না দেয়া। সত্য যার জীবনের লক্ষ্য, ভ্রমেও যেন তাকে অন্য পথ ব্যবহার করতে না হয়। সংসারে কর্ত্তব্য গুরুতর। বিপদে-সম্পদে অবিচলিত থেকে ধীর ও স্থিরভাবে কর্ত্তব্যপালন করতে হয়। উত্তেজিত বা অবসন্ন হলে চলে না। অনিত্য উপাদানে যে বাসা ব্যক্তি বেঁধেছে, প্রতিমুহূর্ত্তে তা ভেঙ্গে যাবার সম্ভাবনায় ভরপূর। 
স্বভাবমৃত্যু না হওয়া পর্য্যন্ত সুখ-দুঃখ রোগ-শোক সহ্য করে যাওয়াই ব্যক্তির কর্ত্তব্য। এখানের বোঝা এখানেই ফেলে যেতে হবে। প্রকৃতির বিধান লঙ্ঘন করে কেউ কোন দিন সুখী হন না।
জীবনভোর চিত্তবৃত্তির সঙ্গে লড়াই করতে হবে। কর্মানুসারে সঞ্চিত গুণে আত্মসমর্পণ করলে চলে না। সত্য দ্বারা অসত্যকে, ক্ষমা দ্বারা ক্রোধকে, প্রেম দ্বারা হিংসাকে জয় করতে হবে। সাধকের ধৈর্য্য, তিতিক্ষা, পরমতসহিষ্ণুতা, সমদর্শিতা অঙ্গের ভূষণ। সম্পদ বিপদ উভয় কালেই সুখ বা দুঃখে বিচলিত না হয়ে বীরের ন্যায় কর্মফল অতিক্রম করে লক্ষ্যপথে অগ্রসর হওয়াই সাধনা। 
ফলাফল না দেখে কর্ত্তব্যগুলো যথাযথ করাই আদর্শ। জন্ম-মৃত্যু যা সাধ্যায়ত্ত নয় তার জন্য অধীর হওয়া মায়া জ্ঞান অর্জনের পথে সহায়ক নয়। মর্ম্মান্তিক দুঃখের কারণ হলেও মঙ্গলময় শ্রীগুরুর দান মাথা পেতে গ্রহণ করতে হয়। কর্ম-জগতে থেকে কর্ত্তব্যে অবহেলা অপরাধ। কর্ত্তব্যে যার অবহেলা, তার দ্বারা জগতে কোন কর্ত্তব্য সাধিত হয় না। শ্রীগুরুর কৃপায় জ্ঞান হলে সুখ-দুঃখ, রোগ-শোক, বিপদ-সম্পদ সকল অবস্থাতেই শান্তি পাওয়া যায়। অজ্ঞান অশান্তি উদ্বেগ আনে। শত দুঃখ মাথায় নিয়ে ত্যাগী আনন্দময়। এখানের কর্মগুলোর বোঝা এখানেই নামিয়ে রেখে না যেতে পারলে শান্তি নেই। রোগ-শোক, বিপদ-আপদ, দুঃখ-কষ্ট দেখে ভয় পেলে হবে না। সবই শ্রীগুরুর মঙ্গল হস্তের দান বলে গ্রহণ করতে হয়। ফলাফল শ্রীগুরু নির্ভর করে অকপটে চেষ্টা, যত্ন এবং নিমগ্নতাই কর্ত্তব্য। 
শ্রীগুরু প্রাপ্তির একমাত্র উপায় ব্যাকুলতা। তাঁর জন্য পাগল না হলে বেঁচে মরা না হলে কেহ তাঁকে পরিপূর্ন পান না। প্রেম জগতেই প্রেমময়কে লাভ করতে হয়। ব্যাকুলতাই সে পথের পাথেয়।

আমরা সবাই জানি.... ২৩


অবিশ্বাস সন্দেহ মানুষের চিত্তলোককে আচ্ছন্ন করার চেষ্টা করে, অনেক ঘাত-প্রতিঘাতের দ্বন্দ্বে অন্তর হয়, ছিন্নভিন্ন, অবিচলিত থাকে সংকল্প ও সাধনা, অনেক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে একদিন আসে জীবনের পরম লগ্নজয়ের গৌরব, যা শ্রীগুরুর চরম দান। দিন যায় দিন আসে। সবাই ছুটছে স্বর্ণ-মরীচিকার পিছনে। কিন্তু চিন্তা করতে হবে জীবিকার অন্বেষণের চেয়ে জীবনের অন্বেষণ অনেক মহত্তর। সুখ ও সম্পদ জীবন ধারণের সামান্য উপকরণ। অতি সংকীর্ণ তার পরিধি, ক্ষণভঙ্গুর তার দান। আর জীবনের লক্ষ্য অন্বেষণ মানুষকে দেয় শাশ্বত পরমসত্যের সন্ধান, মৃত্যুতোরণ উত্তরণের উত্তরাধিকার সকল ক্ষয়ক্ষতির ঊর্ধ্বে এক দুর্লভ অমর জীবন। দেহ একদিন যাবে মাটির ভিতরে। একে কেন্দ্র করে স্বপ্ন-নীড় রচনা করা ভোগ-সহায়ক। এই দেহের মধ্যে আমি-র অস্তিত্ব কোথায়! আত্মাতেই আমি-র অস্তিত্ব, সেই অব্যক্ত আত্মাকে করে ব্যক্ত, অনুভব করে সেই সাধনায় নিয়ন্ত্রিত হোক আমি-র গতি ও প্রকৃতি। অকপট, অক্লান্ত যার সাধনা সেই হতে পারে দিব্যজীবনের অধিকারী। প্রকৃতির সকল ঐশ্বর্য প্রত্যেক মানুষের মধ্যে রয়েছে; কিন্তু তারা আত্মবিস্মৃত তাই এত দুঃখ, এত নৈরাশ্য। মোহ মানুষকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে অন্ধকারের কঠিন অবরোধে, তাই রুদ্ধ গতি-শক্তির মুক্তধারা। প্রত্যেক মানুষের মধ্যে যে মহাশক্তি ঘুমিয়ে আছে, তাকে জাগিয়ে তোলাইতো সাধনা। অসামান্য হয়ে উঠে জীবন। প্রয়োজন অশেষ দুঃখ বরণ, অসীম ত্যাগ ও অনন্ত ধৈর্যধারণ। অতীতের পানে ফিরে তাকানো, সামনে সত্যের আলোড়ন, নন্দনের আনন্দ সংবাদ। এই আমি-র আমিত্বগুলোকে শুধু নিয়ন্ত্রণ বা ভুলে যাওয়া, শুধু নিজকে সত্যের মাঝে বিলিয়ে দেয়া শ্রীগুরুর কৃপায়। 
সেবায় ধন্য ও পুণ্য হয় জীবন। রৌদ্রতাপে পুড়ে, বর্ষধারায় ভিজে, কঠোর পরিশ্রম করে চেতনার মাটিতে সোনার ফসল ফলানো, কোন দুঃখবরণ না করে, সে কি হয়? মহৎ কিছু পেতে হলে মূল্য দিতেই হবে, সইতে হবে অনেক দুঃখের তাপ, প্রতীক্ষার প্রহর কেটে যাবে, এরপর শুধু হাসি আর হাসি, আসবে উজ্জ্বল ফসলের কাল-পাবে অমূল্য রতন। শ্রীগুরুর উপদেশের ভিতর দিয়েই পাওয়া যায় দুর্লভের সন্ধান, লালন আর পালনের মাধ্যমে আবাদ করতে হয় সোনার ফসল-একাত্মতা। যে যতো দুঃখ সইতে পারে, সে ততো আনন্দ পাবার অধিকারী। এতো দুঃখ, এতো কান্না, যন্ত্রণার ভিতর দিয়ে কেন পেতে হয় পরম জীবনকে? এ না হলে পাওয়ার মধ্যে যে আনন্দ ও গৌরব থাকে না; এ ছাড়া সুলভ যা মানুষ সহজে তাকে হারায়। মানুষ তাকে ধরে রাখে না। সেজন্য মূল্য জানিয়ে শ্রীগুরু তার দুর্লভ ধন ভক্তের হাতে তুলে দেন। যারা সুখে থাকে তারা পায় কি? ওরা খাঁচার পাখির মতো। ওদের গায়ে রোদ, বৃষ্টি, ঝড়ের ঝাপটা লাগে না, কিন্তু ওরা কি অন্তহীন আকাশের নীলিমাকে এমন অবাধ করে পায়? এতো আলো, আলোর অমৃত, অক্লান্ত বনের সবুজ ডেকে ডেকে রাত্রিশেষে বনে ফোটায় আলোর ফুল! 
দুঃখ জীবনকে মহৎ কিছু দেয়, তবে সে দুঃখ বরণ করতে ভয় কেন? একটা লক্ষ্যভিত্তিক নিয়মের অধীন হয়ে না চললে জীবন গঠন হয় না। যেদিন ভাল লাগল, সেদিন তাঁকে অর্থাৎ শ্রীগুরুকে স্মরণ করবো আর যেদিন ভালো লাগল না, সেদিন মুখ ফিরিয়ে থাকবো, অলস সুখে ঝরে পড়বে মুহূর্তের অফোটা কুঁড়ি, বৃথা জল্পনায় কাটবে দিন এ সমীচীন নয় মোটেই। সামান্য সাড়ে তিনহাত শরীর, তার পুষ্টি ও পরিণতির জন্য কত খাবার, কত যত্ন ও সেবার প্রয়োজন হয়, আর যে অসীম, যার গতির শেষ নেই, অশেষ যার রহস্য, প্রচন্ড শক্তি তার পরিচয় পাবে, পূর্ণায়ত একটি পদ্মের মতো ঘটবে তার সুচারু প্রকাশ। এজন্য চাই তীব্র ত্যাগ এবং দীর্ঘ একরৈখিক সাধনা। বহু সংস্কার নিয়ে গঠিত যে জীবন একদিনে তার দিব্য রূপান্তর অসম্ভব। অস্থির জীবন, মৃত্যু যার অনিবার্য পরিণতি, অকারণে তাকে নষ্ট না করে, কোনো মহৎ উদ্দেশ্যে কোনো মহৎ আদর্শের বেদীতলে তা নিঃশেষে নিবেদন করাইতো বুদ্ধিমানের কাজ। এখানে জয় ও পরাজয় দুই-ই গৌরবময়। বিফলতার মধ্যেও থাকে সার্থকতা। একাত্মতা-সিদ্ধির চূড়ায় পৌঁছান না গেলেও অগ্রগতির পথে বহু সোপান অতিক্রম করা হয়। ধৈর্যই আমি-ধর্মের উপলব্ধি। তিল তিল করে আহরণ করতে হয় অমর জীবন। কোনো দুঃখে, কোনো লোভে, কোনো বেদনায় যে বিচলিত হয় না সে-ই পায় উত্তরাধিকার। পথিক হলেই দুঃখ, কণ্টকিত হবে পথ। এরই ভিতর দিয়ে অগ্রসর হতে হবে। ভয় নয়, সঙ্গে রয়েছে তাঁর অর্থাৎ একাত্মতায় শ্রীগুরুশক্তি জীবন বিকাশের বহ্নিমন্ত্র।
জীবনকে যা ধারণ করে থাকে সেখানেই আছে ধর্ম। চিন্তাজগতের সর্বাত্মক প্রকর্ষ ধর্মেরই নামান্তর। ধর্মের নিগূঢ় তত্ত্ব নিহিত রয়েছে চিন্তাজগতে। জীবনের গভীরে বিদ্যমান এর অস্তিত্ব। গুরুর যাত্রাপথই প্রকৃত ধর্মপথ যা অনুস্মরণীয়। সূফী সাধক আনোয়ারুল হক বাংলার এক অনন্য ধর্মাচার্য সত্যমানুষ শ্রীগুরু। সত্যান্দোলনের তিনি প্রবর্তক। ধর্মীয় ও সামাজিক ইতিহাসের একটি অধ্যায়ের তিনি যুগনায়ক। ইতিহাস তাঁকে সৃষ্টি করেনি, ইতিহাসের তিনি গ্রষ্টা। তাঁর প্রেম-সত্য-শান্তি ধর্ম থেকে বাঙালি পেয়েছে কর্ম-মানবতা-শান্তির পথে আত্মিক, আধ্যাত্মিক এবং সাংস্কৃতিক উন্নতির দিক্-নির্দেশনা। তিনি চেয়েছেন চেতনার জগতে আত্মউপলব্ধিতে উদ্ভাসিত হয়ে উঠুক প্রতিটি মানুষ। বাঙালির মধ্যে তিনি এনে দিয়েছেন পূর্ণাঙ্গ সত্যমানুষের প্রত্যয়, তাঁর বাণীগুলো পথ দেখায় কিভাবে পাখির মতো খোলস ভেঙে বেরিয়ে এসে বাঙালি মাটির থেকে অনেক দূরে অসীম দিগন্তে উড়তে শিখতে পারে। মানবিকতার বেদীমূলে প্রতিষ্ঠিত তাঁর ধর্ম মূলতঃ সত্যের সাথে একাত্মতা।