বৃহস্পতিবার, ২১ ডিসেম্বর, ২০১৭

মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্য পূরণে দরকার সার্বিক অঙ্গনে সচেতনতা

মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্য পূরণে দরকার সার্বিক অঙ্গনে সচেতনতা


শাহ্ ফুয়াদ ॥ জাতি গত শনিবার ১৬ ডিসেম্বর অর্জিত বিজয়ের ৪৬তম বার্ষিকী পালন করলো। নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ তথা স্বাধীনতা যুদ্ধ শেষে জন্ম নিয়েছিল একটি নতুন দেশ-স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের সন্তানদের সংগঠন প্রজন্ম একাত্তর’ এর প্রশ্ন - ‘তোমাদের যা বলার ছিল বলছে কি তা বাংলাদেশ?’ এর সঠিক জবাব এখনো কেউ দিতে পারছে না। এর কারণ অবশ্যই জাতিকে খুঁজে বের করতে হবে। ৪৬ বছর একটি জাতির জন্য নিশ্চয়ই কম সময় নয়। 
বিজয় দিবসের দিন সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে সোহরায়ার্দী উদ্যানে আয়োজিত বিজয় দিবসের অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও লাখো শহীদের ত্যাগের মহিমায় নিজেদের গড়ে তুলতে তরুণ প্রজন্মের প্রতি আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘এক মূহুর্তের জন্যও এটা ভোলা যাবে না, আমরা বিজয়ী জাতি, বীরের জাতি। আমরা মাথা নত করে চলি না। এটাই আমাদের প্রতিজ্ঞা’।
এদিকে দেশের বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী বাংলা একাডেমির সভাপতি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এমেরিটাস অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান সম্মিলিতভাবে স্বাধীনতাযুদ্ধের আদর্শিক লক্ষ্য পূরণ করতে সবার প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে বাংলা একাডেমির উদ্যোগে একাডেমির নজরুল মঞ্চে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তিনি বলেছেন, মুক্তিযুদ্ধের যে আদর্শিক লক্ষ্য ছিল, তা এখন পর্যন্ত পূরণ করা যায়নি। তিনি বলেছেন, ‘একাত্তরের ১৬ই ডিসেম্বর আমরা যে বিজয় লাভ করেছিলাম, তা শুধু মাটি ও পতাকার জন্য ছিল না। আমাদের যে আদর্শিক লক্ষ্য ছিল, তা শুধু মাটি ও পতাকার বিজয় ছিল না। আমাদের যে আদর্শিক লক্ষ্য ছিল, তা আমরা এখন পর্যন্ত পূরণ করতে পারিনি। আমাদের কর্তব্য হবে, আগামী দিনগুলোয় মুক্তিযুদ্ধের আদর্শিক লক্ষ্যগুলো পূরণ করা। এটা যদি আমরা করতে পারি, তাহলে আমরা সমৃদ্ধ বাংলাদেশের যে স্বপ্ন দেখি, তা সম্পূর্ণ হবে।  
এর আগে রাজধানীতে ‘৭ই মার্চ মুক্তি ও স্বাধীনতার ডাক বাংলার ঘরে ঘরে, ৭ই মার্চ সম্পদ আজ বিশ্বমানবের তরে’ শ্লোগানে আয়োজিত সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের অনুষ্ঠানে সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব সৈয়দ হাসান ইমাম বলেন, ‘আমরা স্বাধীন হয়েছি; কিন্তু পরাধীনতা ও সাম্প্রদায়িকতা থেকে মুক্ত হইনি। অর্থনৈতিক বৈষম্য থেকেও মুক্ত হইনি। অসম্পূর্ণ যে কাজগুলো আছে, তা আমাদের পূর্ণ করতে হবে। আমাদের নতুন প্রজন্ম মুক্তিযোদ্ধাদের স্বপ্ন পূরণ করবে। এটা তোমাদের দায়িত্ব। নতুন প্রজন্মকে দেশটাকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় গড়ে তোলার শপথ করতে হবে।’   

এবার দেশ ও জাতি আনন্দের সঙ্গে পালন করেছে মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জনের ৪৬ বছর। রাষ্ট্র, সরকার ও বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠনের উদ্যোগে আনুষ্ঠানিকভাবে দিবসটি পালনের ধুমধামের কোন ঘাটতি হচ্ছে না। কিন্তু বিবেকবান সকলের মুখে একটি কথা এখনো ঘুরে-ফিরে আসে তা হলো, মুক্তিযুদ্ধের আদর্শিক লক্ষ্য আজও পূরণ হয়নি। এই ব্যর্থতার দায়-দায়িত্ব এই জাতির সকলকেই নিতে হবে। শুধুমাত্র সরকার বা রাষ্ট্রকে দোষ দিলে হবে না, কারণ, এদেশের প্রতিটি নাগরিকই সরকার ও রাষ্ট্রের অংশ। প্রতিটি নাগরিক সচেতন হলে তাদের সরকারও সচেতন হতে বাধ্য। মুক্তিযুদ্ধের লাখো শহীদের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে পারবে কেবল আদর্শিক রাজনৈতিক নেতা-কর্মীরাই। যে অপার সম্ভাবনার দুয়ার আজ তৈরি হয়েছে স্বাধীনতার ৪৬ বছর পর, তারই প্রেক্ষাপটে বিবেকবান জাতি সেই আদর্শিক রাজনীতিই আশা করছে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সকল শ্রেণীর রাজনৈতিক সংগঠনসমূহের কাছ থেকে। 

দেশ ও দশের প্রতি দায়বদ্ধতা

সময়ের সাফকথা....
দেশ ও দশের প্রতি দায়বদ্ধতা

সংলাপ ॥ দেশ ও দশের প্রতি কতোটা দায়বদ্ধ থাকার কথা রাজনীতিকদের, নিজেদের বিশ্বাসযোগ্যতাকে কোন স্তরে উন্নীত করা রাজনীতিকদের কর্তব্য। সে প্রসঙ্গে বিস্তর আলোচনা, বিতর্ক এবং বিতন্ডা আছে। ইতিবাচক কোনও ফল টের পাওয়া যাচ্ছে না। বাংলাদেশে  ‘দায়বদ্ধতা’ বা ‘বিশ্বাসযোগ্যতা’র মতো শব্দ অধিকাংশ রাজনীতিকদের কাছেই এ যুগে এখন কেতাবি কথা। বাস্তবে ওই ‘কেতাবিআনা’র প্রয়োগকে অপ্রয়োজনীয় বা অসম্ভব বলেই হেসে উড়িয়ে দেন এখনকার সিংহভাগ রাজনীতিক।
দেশের আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের ব্যর্থতা এবং সে ব্যর্থতা ঢেকে রাখার নিরন্তর অপপ্রয়াস ইতোমধ্যেই শোরগোল আরম্ভ হয়েছে। সমালোচনার মুখে পড়ে প্রশাসন থমকে দাঁড়ালেও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী অদম্য।
মোকাবিলার পথ খোঁজা সর্বাগ্রে জরুরি। কিন্তু প্রশাসন খুঁজে চাপা দেয়ার উপায়। পরিস্থিতি স্বাভাবিক কারণেই জটিলতর হচ্ছে। এতে সরকারের ভাবমূর্তি যে একটুও উন্নীত হচ্ছে না, সে কথা শীর্ষ মহলের বোঝার সময় এসেছে। এখনও  ভুলগুলো বুঝতে না পারলে প্রশাসন, এখনও সংশোধনের কথা না ভাবলে  বিপদ আরও বাড়বে।
মানুষের বেঁচে থাকার প্রাথমিক এবং ন্যূনতম প্রয়োজনের মধ্যে স্বাস্থ্য হলো অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। মানুষের মৌলিক অধিকারের মধ্যে পড়ে খাদ্য, শিক্ষা, বাসস্থান ও স্বাস্থ্য। সমাজের সব স্তরের মানুষের কাছে এই পরিষেবাটুকু পৌঁছে দেয়া যে কোনও সরকারের প্রধান কাজ। সেজন্যই মানুষ ভোট দিয়ে সরকার নির্বাচন করেন। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় এক একটি ভোট সরকার গঠনে বিরাট ভূমিকা পালন করে। যে সরকার ক্ষমতায় আসে, তাদের উচিত মানুষের চাহিদাগুলোকে যথাসাধ্য মেটানো। ক্ষমতায় আসার পর সরকার প্রত্যেকটি মানুষের সুখ সুবিধার প্রতি নজর দেবে, এটাই কাম্য। শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার পর সাধারণ মানুষের কথা মাথায় রেখে যে এগিয়ে চলার চেষ্টা করছেন, তার কিছু কিছু প্রমাণ দেশবাসীর কাছেই অবশ্য মিলেছে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের সমস্যার সুরাহা করার ক্ষেত্রে তাঁর আন্তরিকতা অনেকটাই নজরে পড়েছে। সবক্ষেত্রেই যে তিনি পুরোপুরি সফল হতে পেরেছেন তা নয়, তবে তাঁর শুভ ইচ্ছাটুকু সাধারণ মানুষের নজরে পড়ছে।

শেখ হাসিনার প্রথম সরকারের আমলে সলতে পাকানোর কাজটুকু শুরু হয়েছিল। স্বপ্ন দেখানোর কাজ শুরু হয়েছিল। দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় এসে খোলনলচে বদলে দিয়ে আরও উন্নততর পরিষেবা দিতে উদ্যোগী হয়েছেন। চেষ্টা করছেন চিকিৎসা পরিষেবার উন্নতির পাশাপাশি সেখানকার পরিসর বৃদ্ধি, আধুনিক যন্ত্রপাতি এনে চিকিৎসা করানো, ভবন নির্মাণ, বেডের সংখ্যা বাড়ানো ইত্যাদির। আমাদের দেশে রোগীর সংখ্যা এত বেশি যে, সে তুলনায় হাসপাতালের সংখ্যা খুবই কম। যেটুকু আছে, সেখানেও সবাইকে চিকিৎসা দেয়ার সুযোগ থাকে না। হাসপাতালের বাইরে কত মানুষ যে যন্ত্রণায় কাতরায়, হয়তো বা তারা ক্রমে ক্রমে মৃত্যুর দিকে ঢলে পড়ে। আবার দেখা যায়, হাসপাতালগুলোর একই বেডে একাধিক রোগী শুয়ে থাকেন। এই অবস্থায় রোগীর পক্ষে সুস্থ হয়ে ওঠা কতটা অনুকূল তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে। উন্নত স্বাস্থ্য পরিষেবার জন্য সরকার কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। তবে এই উদ্যোগ সব হাসপাতালের ক্ষেত্রেই নেয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে থানার হাসপাতালগুলোর ক্ষেত্রে। রোগীর চাপ সামাল দিতে যে পরিকাঠামো দরকার, তা অবশ্য রাতারাতি গড়ে উঠবে না। কিন্তু এদিকে নজর দিলে দিনে দিনে হাল ফিরবেই। মানুষ বেঁচে থাকার লড়াই করছে। এতো আমাদের দীর্ঘদিনের লড়াই। মন্বন্তরে মরিনা আমরা, মারী নিয়ে ঘর করি। সুতরাং লড়াইটা আমাদের মজ্জাগত। তা বলে কেউ চিকিৎসা পাবে না তা তো হতে পারে না। সরকারকে দেখতে হবে বিনা চিকিৎসায় যাতে কেউ মারা না যায়। অনেক আর্থিক প্রতিবন্ধকতার মধ্যে বর্তমান সরকার যে পদক্ষেপটুকু নিয়েছে, তার প্রশংসা করেও আক্ষেপটুকু স্বীকার করতেই হয়। বলতেই হয়, প্রয়োজনের তুলনায় অতি অল্প হলো। এই আক্ষেপ দূর করতে পারে কেবলমাত্র সরকারই। উন্নত পরিষেবা একটি জাতিকে সুস্থ এবং পরিশ্রমী করে তুলতে পারে। 

’৭২-এর সংবিধান বিরোধী কারা?

’৭২-এর সংবিধান বিরোধীকারা?

সংলাপ ॥ বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভের এক বছর পার হওয়ার আগেই একটি সংবিধান জাতিকে উপহার দেয়া হয়েছিল। তৎকালীন জাতীয় সংসদে ১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর প্রথমবারের মতো সংবিধানের খসড়া প্রস্তাব উত্থাপিত হয়। সেজন্য দিনটি সংবিধান দিবস হিসেবে জাতীয় সংসদের অধিবেশনে গুরুত্ব সহকারে আলোচিত হয়েছে। সদ্য স্বাধীন দেশে ওই সংবিধানটিতে (যা ’৭২-এর সংবিধান হিসেবে পরিচিত) ছিল একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের চলার প্রয়োজনীয় দিক-নির্দেশনা। বিশেষ করে লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত দেশটির উঠে দাঁড়ানোর মতো নীতি ও আদর্শ যেমন - গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও বাঙালি জাতীয়তাবাদকে করা হয় রাষ্ট্রের চারটি মূলনীতি। স্বাধীনতাবিরোধী দেশী-বিদেশী অপশক্তি এবং তাদের দোসররা যেহেতু তখন গর্তের ভিতরে ঢুকে গিয়েছিল এবং দেশের রাজনীতি-অর্থনীতি নিয়ে কোনো কথা বলার শক্তি সামর্থ্য তাদের ছিল না সেহেতু ’৭২-এর সংবিধানের মূলনীতিগুলোর বিরুদ্ধে কোনো কথাও তখন শোনা যায়নি। দেশের মানুষ যে স্বপ্ন নিয়ে এদেশের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল অথবা মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্যে এগিয়ে এসেছিল সর্বাত্মকভাবে, যাবতীয় ত্যাগ-তিতিক্ষা নিয়ে দুঃখ-কষ্ট সহ্য করেছিল নয় মাস স্বপ্নের একটি দেশ গড়ে উঠার প্রত্যাশায় - ’৭২-এর সংবিধানের প্রতি তাদের সমর্থন ছিল অকুন্ঠ।
বাংলাদেশের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ১৯৭৪ সালে পাকিস্তানে ওআইসি শীর্ষ সম্মেলনে যোগদান এবং তারই ধারাবাহিকতায় কিছুদিন পর পাকিস্তানী প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টোর ঢাকা সফরকে কেন্দ্র করে স্বাধীনতা বিরোধীরা গর্ত থেকে বের হয়ে আসতে থাকে এবং এদেশের বিভিন্ন স্থানে নিজেদের অবস্থান শক্ত করে লিপ্ত হয় চক্রান্তে-ষড়যন্ত্রে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট তারা বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার মাধ্যমে এদেশকে আবারো পাকিস্তান বানাবার ষড়যন্ত্রে মেতে উঠে। ’৭২-এর সংবিধানের মূলনীতিগুলোকে ধুয়ে মুছে দেয়। মুক্তিযুদ্ধের সব অর্জন নিশ্চিহ্ন করতে এবং বাঙালি জাতিকে দারিদ্র্য, দুর্নীতিগ্রস্ত ও ধর্মান্ধ করে তুলতে ’৭২-এর সংবিধানকে মুছে দেয়ার চাইতে মোক্ষম কোন উপায় তাদের কাছে বুঝি আর একটিও ছিল না! এক্ষেত্রে এই ৭২’-এর সংবিধানের বিরোধীরা যথেষ্ট সফলই হয়েছে বলা যায়। সামরিক শাসন,স্বৈরাচারি শাসন ও দুর্নীতিগ্রস্ত আমলাতন্ত্রকে পাকাপোক্ত করে রাখতে ধর্মের নামে যাবতীয় অধর্মের কাজ  করেছে ’৭২-এর সংবিধান বিরোধীরা। ২০০৯ এর জাতীয় সংসদের অধিবেশনে সংসদ নেত্রী ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, ’৭২-এর সংবিধান আজ পর্যন্ত দেশে কায়েম থাকলে স্বাধীনতার ৩৮ বছর পরে এসে দেশের অবস্থা অন্যরকম হতো। দারিদ্র্যমুক্ত, শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা সম্ভব হতো।

কিন্তু সংসদে বিরোধী দলীয় নেত্রী খালেদা জিয়া, বিএনপি মহাসচিব খন্দকার দেলোয়ার হোসেনসহ স্বাধীনতা বিরোধী চক্র ’৭২-এর সংবিধানের বিরুদ্ধে উঠে পড়ে লেগেছেন। অবশ্য তাদের কাছ থেকে উল্টোটা আশা করাও বৃথা। কারণ, ’৭২-এর সংবিধান বলবৎ থাকলে রাজনৈতিক শক্তি হিসাবে এদের অস্তিত্ব ও বিকাশতো দূরের কথা, উদ্ভবই হতো না। যেমন থাকে না আলোর উপস্থিতিতে অন্ধকারের অস্তিত্ব। ’৭২-এর সংবিধান তাই ওদের কাছে আতংক। এর পুনঃপ্রতিষ্ঠা ওদের রাজনৈতিক অস্তিত্বের যবনিকা। কিন্তু ’৭২-এর সংবিধানের নাম যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। কেননা, ঐতিহাসিক ৬ দফা আর ১১ দফার মৌল চেতনার আলোয় ’৭০-এর ঐতিহাসিক নির্বাচনী ইশতেহারের ভিত্তিতে প্রণীত হয়েছিল ’৭২-এর সংবিধান যাতে প্রতিফলন ঘটেছিল মুক্তিযুদ্ধের লাখো শহীদদের স্বপ্ন, সাড়ে সাত কোটি মানুষের গণ আকাক্সক্ষার। তাই ’৭২-এর সংবিধানে ফিরে যাওয়ার এই দুর্লভ সুযোগে একথা দ্ব্যর্থহীন কন্ঠে বলার সময় এসেছে যে, ’৭২-এর সংবিধান মানে মুক্তিযুদ্ধ - মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। এর বিরোধিতা মানে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিরোধিতা করা, মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করা (যা ওরা করেও ছিল একাত্তরে প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে)। ’৭২-এর সংবিধানের বিরোধিতা প্রকারান্তরে রাষ্ট্রদ্রোহিতা। মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী আজকের ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ সরকারকে অবশ্যই এই কঠিন সত্যকে বিবেচনায় নিয়ে দৃঢ়তার সঙ্গে মোকাবেলা করতে হবে রাষ্ট্রদ্রোহীদের এবং যে কোন  মূল্যে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে  হবে ঐতিহাসিক গণতান্ত্রিক ’৭২-এর সংবিধানকে। 

মুক্তিযুদ্ধ ও যোদ্ধাদের নিয়ে বাণিজ্য - রাজনীতি কবে অবসান হবে!!


সংলাপ ॥ স্বাধীনতা অর্জনের ৪৬ বছরের চুলচেরা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় স্বপ্নের শোষণমুক্ত সমাজ বা দেশ প্রতিষ্ঠিত না হলেও মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে রাজনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্য কখনোই বন্ধ ছিল না। রাজধানী ঢাকার সর্বশেষ দৃশ্যপটঃ গুরুত্বপূর্ণ ছোট-বড় সকল সড়কের নামকরণ করা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধে যোগদান করে খেতাব অর্জনকারী বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধাদের নামে, রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলন সংগ্রামের বিভিন্ন নেতৃত্ব ও সংগঠকদের নামে। মহান স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দানকারী ব্যক্তিবর্গের নাম ও কীর্তিকে স্মরণীয় করে রাখা একটি জাতীয় দায়িত্ব স্বাধীনতা বিরোধী রাজাকার আলবদর ও তাদের আদর্শের ধারক-বাহকরা ছাড়া এ কথা অস্বীকার করতে পারে না কেউই। কিন্তু বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা ও স্বাধীনতা সংগ্রামী বিভিন্ন ব্যক্তিবর্গের অনেক নামফলকে যেভাবে ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের মেয়রের নাম প্রায় সমান আকারের টাইপে ফলাও করে লেখা হয়েছে তাতে স্পষ্টই বোঝা গেছে সংশ্লিষ্ট মেয়র তার নামকে জনসমক্ষে তুলে ধরার একটি মোক্ষম সুযোগ কাজে লাগানোর যথাসাধ্য চেষ্টা-তদ্বির করেছেন। অর্থাৎ মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের নামফলক তৈরি ও সড়কের নামকরণের মধ্য দিয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্য ও আদর্শ কতটুকু  বাস্তবায়ন হবে এ আশংকা রয়েই গেল। অবশ্য যেসব ফলকে কেবল বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা ও ব্যক্তিত্বের নামের পাশাপাশি তাদের কর্ম ও অবদানের কথা তুলে ধরা হয়েছে সেগুলোতে নতুন প্রজন্মের জন্য শিক্ষণীয় অনেক কিছুই রয়েছে।
সূফী সাধক আনোয়ারুল হক এর একটি স্মরণীয় বাণী হচ্ছে - ‘যে ব্যক্তি চিন্তা ও কর্মে এক নয় তার ইবাদত শুদ্ধ নয়।’ আর হাজার বছর আগেকার এক সাধক-ইমাম জাফর সাদিক ইবাদতের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেছিলেন, ‘সম্যক কর্ম সম্যক সময়ে সুসম্পন্ন করার নাম ইবাদত।’ ৪৬ বছর বয়সী বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্মকালের আশা-আকাংক্ষা ও লক্ষ্য বাস্তবায়ন না হওয়ার কারণ খুঁজতে গিয়েও আজ দেখা যাচ্ছে, যারা স্বাধীন দেশের সকল সুযোগ-সুবিধা ও ক্ষমতা ভোগ করেছে তাদের অনেকেই চিন্তা ও কর্মের মধ্যে কোন সমন্বয় ছিল না, পরিণতিতে মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন আজও স্বপ্নেই থেকে গেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বাঙালি বাংলার সামাজিক-সাংস্কৃতিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চিন্তা-চেতনার মান অনেক নিচে নেমে গেছে। মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের কর্ম ও অবদানের ফসল হিসেবে যে সাফল্য তার সুফল ভোগ করছে অতি নগণ্য সংখ্যক মানুষ। ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের যে মেয়রের সময় সড়কগুলোর নামকরণ মুক্তিযুদ্ধের নামে করা হলো তিনিও একজন বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন, পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে জানবাজ গেরিলা হিসেবে ঢাকায় অনেক দুঃসাহসী যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু স্বাধীনতা পরবর্তী বিভিন্ন সময়ে ব্যক্তিগতভাবে তিনি তার রাজনৈতিক দলের মাধ্যমে যে ভূমিকা পালন করেছেন তাতে মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী ব্যক্তিবর্গ ও দলই বেশি উপকৃত হয়েছে, ভূলুন্ঠিত হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও আদর্শ।
মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে রাজনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যের শুরু হয়েছে স্বাধীনতার পর থেকেই। রাজাকারদের তালিকা না করে মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা করতে গিয়েই সর্বপ্রথম মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়। কেননা, ’৭১-এর নয় মাসে কয়েক লক্ষ রাজাকার-আলবদর-মুসলিম লীগ-শান্তি কমিটির লোক ছাড়া সাড়ে সাত কোটি বাঙালির সবাই ছিল মুক্তিযোদ্ধা-মুক্তিবাহিনীর লোক ও সৈনিকদেরকে যুগিয়েছিল খাদ্য আশ্রয়সহ যাবতীয় সহযোগিতা। যে কারণে মুক্তিযুদ্ধকে বলা হয় একটি সর্বাত্মক জনযুদ্ধ-বিশ্বের সকল মুক্তিকামী জনতার কাছে যার আবেদন চিরভাস্বর হয়ে আছে। আর এ যুদ্ধের ‘জয় বাংলা’ শ্লোগানটিতে ছিল সমগ্র মুক্তিকামী বাঙালির সকল বিজয় ও আশা-ভরসার প্রাণস্পন্দন। মহান মুক্তিযুদ্ধ ও এর আবেদনকে সংকীর্ণ করে তোলার পেছনে ষড়যন্ত্র শুরু হয়ে আজও বিদ্যমান। মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকার আড়ালে তৎকালীন সরকারের মধ্যে ঘাপটি মেরে থাকা মোনাফেক ও ভন্ড রাজনীতিকদের যোগসাজশে বিলি করা হয়েছিল হাজার হাজার ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেট যার সুবিধা নিয়ে সুযোগ-সন্ধানী কথিত শিক্ষিত শ্রেণী এমনকি অনেক রাজাকারও সরকারি চাকরি বা ব্যবসা-বাণিজ্যের জগতে প্রভূত উন্নতি সাধন করেছে এবং এ শ্রেণীটিই পরবর্তী ৪৬ বছর ধরে দেশের সামগ্রিক ক্ষেত্রে নিয়ন্তা সাজতে গিয়ে আবহমান বাংলা বাঙালির পাঁচ হাজার বছরের ইতিহাস-ঐতিহ্য-শিক্ষা-সংস্কৃতি ও মূল্যবোধকে করেছে কলুষিত। ১৯৭৫-এর ১৫ই আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে হত্যার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ও বাঙালি জনগোষ্ঠীকে আবারো পাকিস্তানী ভাবধারার সাম্প্রদায়িক ও ধর্মান্ধ (যার সর্বশেষ পরিণতি জঙ্গিবাদ) বানানোর এক উর্বর ক্ষেত্রে পরিণত করার ষড়যন্ত্র বাস্তবায়িত হতে থাকে।
বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চার নেতাকে হত্যার পর ক্ষমতা ভোগকারী জেনারেল জিয়া ও জেনারেল এরশাদ কেউই মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে রাজনীতি ও বাণিজ্য করতে চেষ্টার কোনো ত্রুটি করেনি। জিয়া সারা দেশে ‘ইয়ুথ কমপ্লেক্স’ গঠন ও মুক্তিযোদ্ধা সংসদ-এর কার্যক্রমকে নিজেদের কায়েমী স্বার্থে ব্যবহার করে এদেশের ছাত্র, যুব সমাজ ও মুক্তিবাহিনীর বেকার সৈনিকদের পদস্খলন ঘটানোর পেছনে মারাত্মক ভূমিকা পালন করে গেছেন। জেনারেল এরশাদ, ‘মুক্তিযোদ্ধারা সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সন্তান’-এ ঘোষণা দিয়ে আরও বড় রাজনৈতিক ফায়দা নিয়েছিলেন এবং তার ক্ষমতা মেয়াদ নয় বছর পর্যন্ত বাড়াতে সমর্থ হয়েছিলেন।
তারপর ১৯৯১ সালে এদেশের জনগণ তথা মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে রাজনীতি ও ব্যবসা বাণিজ্যের অবসান ঘটেনি। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় আরোহনের পর মৃত্যুর পরে মুক্তিযোদ্ধাদেরকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফনের ব্যবস্থা করা হয়। যে দেশে ’৭১-এর বীর সেনানীদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশই জীবনযুদ্ধে পরাজিত হয়েছে, অন্যদিকে রাজাকার, আলবদর চক্র বিভিন্ন ছলচাতুরি ও দেশি-বিদেশী অশুভ শক্তির সহযোগিতায় ফুলে-ফেঁপে উঠেছে সেখানে শুধুমাত্র মৃত্যুর পর রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফনের ব্যবস্থায় তুষ্ট থাকার কোনো সুযোগ নেই। এ প্রসঙ্গে  ‘জীবনে যারে তুমি দাওনি মালা, মরণে কেন তুমি দিতে এলে ফুল’?-এই গানের কথাগুলোই মনে পড়ে যায়। মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে রাজনীতি হয়েছে বলেই স্বপ্নের সোনার বাংলা আজো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। শুধুমাত্র নগণ্য সংখ্যক লোকের হাতে দেশের সমস্ত সম্পদ কুক্ষিগত হয়ে গেছে। দারিদ্র্য অশিক্ষা-কুশিক্ষা, শোষণ-বঞ্চনা-নিপীড়ন-নির্যাতনের’ নির্মম শিকার হচ্ছে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ। তবু আশার কথা, বহু পরে হলেও দেশবাসী আজ যুদ্ধাপরাধীদের চিনতে পেরেছে, তাদের বিচারের দাবি জনগণের দাবিতে পরিণত হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ এবং এত বিজয়ের ঘটনা যে বাঙালি জাতির পাঁচ হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ ঘটনা তা সর্বজন স্বীকৃতি পেয়েছে। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের চেতনাভিত্তিক একটি অসাম্প্রদায়িক ও শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠিত করতে হলে এখন সবার আগে প্রয়োজন মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে রাজনীতিকদের রাজনীতি ও বাণিজ্যের অবসান ঘটানো। তবেই সুগম হতে পারে স্বপ্নের দেশ গড়ার, মুক্তি পাবে এদেশের সংখ্যা গরিষ্ঠ জনগণ। মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের দাবিদার সকল রাজনৈতিক দল ও নেতৃত্ব এ বিষয়টি যত শীঘ্রই উপলব্ধি করতে পারবে ততোই মঙ্গল। স্বাধীনতা বিরোধী চক্রকে আর সুযোগ দেয়ার অবকাশ নেই। তারা সত্য থেকে মুখ ফিরিয়ে আছে। এখন পর্যন্ত কপটতাই তাদের সংস্কৃতি, ধর্ম।

বৃহস্পতিবার, ২২ জুন, ২০১৭

প্রকৃতির প্রতিঘাত নাকি আমাদের কর্মফল?

পাহাড়ে মৃত্যুর মিছিল
প্রকৃতির প্রতিঘাত নাকি আমাদের কর্মফল?

·        ‘তিনিই জমিনের বুকে সুদৃঢ় পাহাড় সমূহ স্থাপন করেছেন, যাতে করে জমিন তোমাদের নিয়ে স্থির থাকতে পারে’। (সূরা আন-নাহল:আয়াত-১৫)।
·        ‘তিনিই নভোমন্ডলকে নির্মাণ করেছেন কোনো খুঁটি ছাড়া, যা তোমরা নিজ চোখেই দেখতে পাচ্ছ। তিনিই পৃথিবীতে পাহাড় সমূহ স্থাপন করেছেন ভারসাম্য বজায় রাখার জন্যে। তাতে সকল প্রকারের বিচরণশীল প্রাণীকুলের বিস্তারের ব্যবস্থা করেছেন’। (সূরা লুকমান: আয়াত-১০)।
·        ‘আমি জমিনকে বিছিয়ে দিয়েছি, আমি তার মধ্যে স্থাপন করেছি মজবুত পাহাড়সমূহ, আবার এ জমিনে আমি উদ্গত করেছি নানা ধরনের গাছপালা’। (সূরা ক্বাফ: আয়াত-৭)।
·        ‘তিনিই জমিনের ওপর থেকে পাহাড় সমুহ স্থাপন করেছেন ও তাতে বহুমূখী কল্যাণ রেখে দিয়েছেন এবং তাতে সকলের আহারের পরিমান নির্ধারণ করে দিয়েছেন’। (সূরা হামীম আস-সাজদাহ : আয়াত-১০)।

সংলাপ ॥ প্রকৃতি জগতের সবকিছুই সুমহান আল্লাহর নির্ধারিত বিধানে পরিচালিত হয়। প্রকৃতি জগতের স্বাভাবিক নিয়মে বাধা আসলে প্রকৃতির বিরূপ প্রভাব দেখা যায়। মানুষ প্রকৃতির উপর নিজেদের অস্বাভাবিক প্রভাব বিস্তার করতে গিয়ে প্রকৃতির যে ক্ষতি সাধন করে চলেছে তা পরিনামে নিজের দিকেই ফিরে আসছে। পবিত্র কুরআনে ঘোষিত হয়েছে - ‘প্রত্যেকেই তার কর্মফল ভোগ করবে’। এটাই স্রষ্টার বিধান। প্রকৃতির উপর আঘাত করার কারণে প্রকৃতি প্রতিঘাত করবে এটাই স্বাভাবিক। সারাবিশ্ব জুড়েই প্রকৃতির এই প্রতিঘাত লক্ষণীয়। বিশেষ করে বাংলাদেশে এই চিত্র যেন নিয়মে পরিণত হয়েছে। সম্প্রতি ঘটে যাওয়া পার্বত্য এলাকার মহা বিপর্যয় মানবসৃষ্ট অপকর্মের এক নিদারুন প্রতিঘাত। বাংলাদেশে পাহাড় ধ্বসের কারণে নানা সময়ে বহু মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। বিশেষ করে পার্বত্য জেলা চট্টগ্রাম, রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি, কক্সবাজার ও বান্দরবানে প্রতি বছরই বর্ষার শুরুতে পাহাড় ধ্বস ও মাটি চাপায় প্রাণহানির ঘটনা ঘটে এবং মূল্যবান সম্পদ বিনষ্ট হয়। সতর্কতামূলক প্রচার-প্রচারণা সত্ত্বেও পাহাড় ধ্বসে মৃত্যুর মিছিল থামানো যাচ্ছে না। সাগরে নিম্নচাপের প্রভাবে টানা দু’দিনের অবিরাম বৃষ্টির পর গত কয়েকদিনে তিন পার্বত্য জেলায় এখন পর্যন্ত অন্তত ১৫৪ জন মানুষের মৃত্যু হয়েছে। সবচেয়ে বেশি লোকের মৃত্যু হয়েছে রাঙামাটি জেলায়। এর আগেও ২০০৭ সালের ১১ জুন পাহাড় ধ্বসে ব্যাপক প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছিল বন্দর নগরী চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থানে। সে ঘটনায় সরকারী হিসেবে মারা গিয়েছিল ১২৭ মানব প্রাণ। ২০০৮ সালে ১৪ জন, ২০০৯ সালে ৩ জন, ২০১০ সালে ৩ জন, ২০১১ সালে ১৭ জন, ২০১২ সালে ৯৪ জন, ২০১৩ সালে ২ জন, ২০১৪ সালে ৩ জন, ২০১৫ সালে ১৯ জনের প্রাণহানি হয়। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে গত ১০ বছরে ৪০১ জনেরও বেশি মানুষ পাহাড় ধ্বসের ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে। আহত হয়েছে কয়েক হাজার মানুষ। পার্বত্য জেলাগুলোতে প্রতিবছরই এভাবে লাশের ভারে পাহাড় কাঁদে। থরে থরে সাজানো লাশ দেখে স্বজনের কান্না আর অবিরাম বৃষ্টি যেন মিলেমিশে বেদনার্ত পরিবেশ সৃষ্টি করেছে পাহাড়ি এলাকায়। এবারের দুর্ঘটনায় অনেকে হারিয়েছেন স্ত্রী-সন্তান, কেউ হারিয়েছেন মা, কেউ বাবা, কেউবা ভাই-বোন। তাদের মধ্যে রয়েছেন সেনাবাহিনীর দুই কর্মকর্তা ও দুই সৈনিক। কোনো কোনো পরিবারের এখন আর কেউই বেঁচে নেই। পাহাড় ধ্বসের পর উদ্ধার কাজের সময় মাটিচাপা পড়ে প্রাণ হারান তারা। কিন্তু কেন এখানে বার বার পাহাড় ধ্বসের ঘটনা ঘটে? প্রাণহানিও কেন এত বেশি? খোঁজা যাক তার উত্তর।
জানা গেছে, বান্দরবান জেলার ৭টি উপজেলায় প্রায় ৩০ হাজার পরিবার, রাঙামাটি জেলার ১০টি উপজেলায় প্রায় ৮০ হাজার পরিবার এবং খাগড়াছড়ি জেলার ৯টি উপজেলায় প্রায় ৬০ হাজার পরিবারের বসতি রয়েছে। এরা উঁচু-নিচু পাহাড়, পাহাড় ঘেঁষে কিংবা পাহাড়ের পাদদেশে থাকেন। এসব পরিবার যুগ যুগ ধরে এখানে বসবাস করে আসছে। কিন্তু জেলা ও উপজেলা প্রশাসন বর্ষায় মাইকিং করে নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার নির্দেশ প্রদান করা ছাড়া বাস্তবমুখী কোনো পদক্ষেপ নেয় না বলে অভিযোগ রয়েছে।
প্রায় ২৫ বছর ধরে তিন পার্বত্য জেলায় ভূমি বন্দোবস্ত প্রদান বন্ধ থাকায় ভূমিহারা বা ভূমিহীন হাজার হাজার পরিবার অসহায় অবস্থায় দিনযাপন করছে। এসব জেলায় একদিকে ভূমি বন্দোবস্ত বন্ধ রয়েছে, অপরদিকে পার্বত্য শান্তি চুক্তির বিশেষ বিধিমতে ‘যারা স্থায়ীভাবে বসবাস করেন এবং জায়গা-জমি আছে, কেবল তারাই পার্বত্য অঞ্চলের জায়গা-জমি কিনতে পারবেন বা স্থায়ী বাসিন্দার অধিকার রাখেন’ বলে উল্লেখ রয়েছে। এ কারণেই বাঙালি জনগোষ্ঠী ভূমিহীন হয়ে পড়ছে। এক খন্ড ভূমি কিনতে পারছে না বা ব্যবহারের সুযোগও নেই সাধারণ মানুষের, বিশেষ করে মধ্য ও নিম্নবিত্ত শ্রেণীর। ফলে বাধ্য হয়ে বৈধ-অবৈধ উপায়ে যে যার মতো পাহাড়ে কিংবা পাহাড়ের পাদদেশে বাড়ি-ঘর নির্মাণ করে বসবাস করছে। এসব পরিবার খুবই ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাস করে এলেও তাদেরকে স্থায়ীভাবে সরিয়ে দেয়ার কোনো উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে না। তাছাড়া ইউনিয়ন, উপজেলা বা পৌরসভাভিত্তিক পাহাড়ে ঝূঁকিপূর্ণভাবে বসবাসরত পরিবারগুলোকে নিরাপদ স্থানে পুনর্বাসন করার কোনো সরকারি পদক্ষেপও গ্রহণ করা হয়নি। গত কয়েক বছরে পার্বত্য জেলাগুলোয় পাহাড়ের নিচে দখল আর বসতি এত বেড়েছে, এ নিয়ে আর শঙ্কিত না হয়ে উপায় নেই। যৎসামান্য তৎপরতা ছাড়া সংশ্লিষ্ট বিভাগ এবারো উদাসীন। কানে তুলা দিয়ে চোখ বন্ধ করে ঘুমে বিভোর প্রশাসন। ফলে যা হওয়ার তাই হচ্ছে। দেশবাসীকে পাহাড় চাপাপড়া লাশের স্তুপ দেখতে হচ্ছে বারবার। নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও তা ঠেকানো যাচ্ছে না কেন? চাইলেই ঠেকানো যায়; কিন্তু ঠেকানো হচ্ছে না। আর মানুষও অতি লোভে তা চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু কেন?
পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য মতে- বান্দরবান, রাঙ্গামাটি এবং খাগড়াছড়ি জেলার পাহাড়ের মাটি অপেক্ষাকৃত নরম এবং মাটির ধরন হচ্ছে বেলে। তাই টানা বৃষ্টিতে পাহাড়ের মাটিতে ব্যাপক ধ্বস নামে। এবার বান্দরবান, রাঙ্গামাটি ও চট্টগ্রামে পাহাড়ের মাটি ধ্বসে যে পরিমাণ প্রাণহানি ঘটেছে, তা শুধু পাহাড়         কাটার কারণ নয়, অবাধে অপরিকল্পিতভাবে পাহাড়ে সৃজিত গাছপালা কর্তন এবং পাহাড় খোদাই করে নিষিদ্ধ বারুদ ব্যবহার করে বোল্ডার পাথর ভাঙন ও উত্তোলন করা। পাহাড়ের ওপর অত্যাচার হলে পাহাড় প্রতিঘাত করবেই।
পাহাড় ধ্বসের আরেকটি অন্যতম কারণ হলো আমাদের পাহাড়ি অঞ্চলের উপরের দিকের মাটিতে কঠিন শিলার উপস্থিতি নেই বললেই চলে। তাই বৃষ্টির কারণে এ ধরনের মাটি পানি শুষে ফুলতে থাকে। তাছাড়া কঠিন শিলা না থাকায় মাটিগুলো নরম ও পিচ্ছিল হয়ে যায়। ফলে ভারি বর্ষণের সাথে সাথে মাটি ভেঙ্গে পড়ে। তাছাড়া যারা পাহাড়ে থাকেন তারা ঘর নির্মাণের জন্য পাহাড়ের সবচেয়ে শক্ত মাটির স্তরও কেটে ফেলেন। এতে পাহাড় ধ্বসের শঙ্কা আরও তীব্র হয়।
জিও সায়েন্স অস্ট্রেলিয়ার এক গবেষণায় বলা হয়েছে, পাহাড় ধ্বসের পেছনে প্রাকৃতিক কারণ এবং মানুষের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড মূল প্রভাবক হিসেবে কাজ করে। প্রাকৃতিক কারণ হলো পাহাড়ের ঢাল যদি এমন হয় যে ঢালের কোনো অংশে বেশি গর্ত থাকে, তখন অতিবৃষ্টিতে ভূমি ধ্বস হতে পারে। এছাড়া ভূমিকম্প, আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাত এবং পাহাড়ের পাদদেশের নদী ও সাগরের ঢেউ থেকেও পাহাড় ধ্বস হতে পারে। আর মনুষ্য সৃষ্ট কারণ হিসেবে গবেষণায় বলা হয়েছে, পাহাড়ের গাছ পালা কেটে ফেলা, মাটি কেটে ফেলা, পাহাড়ে প্রাকৃতিক খাল বা ঝর্ণার গতি পরিবর্তন, পাহাড়ের ঢালুতে অতিরিক্ত ভার দেয়া এবং খনি খননের কারণে পাহাড় ধ্বস হতে পারে। তবে আমাদের ভূতাত্ত্বিকরা বলছেন, বাংলাদেশে মূলত পাহাড়ের উপরের দিকে কঠিন শিলার অভাব, পাহাড়ের মাটি কেটে ফেলা এবং বড় গাছপালা কেটে ফেলার কারণেই পাহাড় ধ্বস হয়ে থাকে।
পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, পাহাড় ধ্বসের মূল কারণ হলো পাহাড় থেকে মাটি কাটা। পাহাড়গুলো ৩০ ডিগ্রির বেশি ঢালু হলে সে পাহাড়ের পাদদেশে বিপজ্জনক অবস্থা তৈরি হয়। পার্বত্য জেলাগুলোয় রয়েছে ৯০ ডিগ্রি পর্যন্ত অসংখ্য ঢালু পাহাড়। মাটির জমাট বাঁধা পাহাড় যখন কাটার মহোৎসব চলে তখন প্রবল বর্ষণ হলে মাটির ওপরের আবরণ না থাকায় যে প্রবল জলধারা নিচে ধাবিত হয় তার সঙ্গে বিপুল পরিমাণ মাটি এসে পাহাড়ের পাদদেশে আছড়ে পড়ে। আর তখনই ঘটে মর্মান্তিক ঘটনা।
২০০৭ সালে যখন পাহাড় ধ্বসে ব্যাপক প্রাণহানি হয় তখন তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল। পাহাড়ি ভূমি ধ্বসের সুস্পষ্ট কারণ উল্লেখসহ সুনির্দিষ্ট সুপারিশমালা পেশও করেছিল কমিটি। কিন্তু দুর্ভাগ্য এর অধিকাংশই মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়িত হয়নি। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, একটি জরিপের মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলোকে জরুরি ভিত্তিতে চিহ্নিত করার সুপারিশ ছিল, যা আজ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি। তেমনিভাবে বাস্তবায়িত হয়নি পাহাড়ের পাদদেশে বিপদসঙ্কুল অবস্থায় বসবাসকারী বস্তিবাসীকে উপযুক্ত কর্মসংস্থানের ব্যবস্থাসহ নিরাপদ স্থানে পুনর্বাসনের কর্মসূচি। বাস্তবায়িত হয়নি পাহাড় কাটার আশঙ্কা কিংবা বন উজাড়ের ঘটনা। পাহাড় হন্তারকদের পাহাড় কাটা থেকে বিরত করা যায়নি। অন্যদিকে প্রশাসন, সিটি করপোরেশনের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর লোভাতুর হাত গুটিয়ে না নেয়ায় অশিক্ষিত এ জনগোষ্ঠী টুপাইস দিয়ে পাহাড়ের পাদদেশেই ঝুঁকিপূর্ণ বসবাস অব্যাহত রাখে। এক শ্রেণীর তথাকথিত রাজনৈতিক নেতারা জোরপূর্বক এসব পাহাড় দখল করে সেখানে টিনশেড ঘর তুলে তা ৫০০ থেকে ১০০০ টাকায় ভাড়া দিচ্ছে। চট্টগ্রামের খুলশী ও রেলওয়ে সংলগ্ন একাধিক এলাকার পাহাড়ে এখন রমরমা পাহাড় বাণিজ্য চলছে। যেভাবে বসতি গড়া হচ্ছে তাতে আর পাহাড় থাকবে না। আগের ঘটনা থেকে মানুষ শিক্ষা নেয়নি বলেই তাদের এ করুণ পরিণতি বরণ করতে হচ্ছে। পাহাড়ে এখন যারা বসবাস করছেন তারা দ্রুত অন্যত্র আশ্রয় না নিলে পাহাড়ের আক্রোশ থেকে রেহাই পাবে না।
একের পর এক পাহাড় চাপা পড়ে জানমালের ক্ষয়ক্ষতির ঘটনায় পাহাড় ব্যবস্থাপনায় আমাদের অক্ষমতাকেই প্রকাশ করছে। আপাতত এই দেড়শ’ প্রাণের চালানকে ‘নিয়তি’র পরিহাস বলে সবাই মেনে নিলেও মৃত্যুর এই অস্বাভাবিক মিছিলটির দীর্ঘায়ণের জন্য কেবলমাত্র ‘সৃষ্টিকর্তা’র উপর ছেড়ে দিয়ে পার পাওয়া যাবে না। এগুলো এক প্রকারের হত্যাকান্ড। প্রতিদিন পত্রিকায় পার্বত্য অঞ্চলে পাহাড় কাটার খবর আসে। স্থানীয় প্রভাবশালীর দোহাই দিয়ে পাহাড় কেটে শিল্প-কলকারখানা তৈরি হচ্ছে, ব্যাপকহারে বৃক্ষ নিধন হচ্ছে। অপরিকল্পিত গর্ভধারণের মতো পাহাড়ের বুকে রাতারাতি বাড়ি তুলছে। এতো অরাজকতা চলার পরও এই দেশের সরকার চুপ মেরে বসে আছে। কারণ একটাই, যারা পাহাড় কাটছে কিংবা অবৈধ কারখানা পাহাড়ে বুকে তুলছে, তারা কোনো না কোনোভাবে রাজনৈতিক মেরুদন্ড শক্তপোক্ত। শুধুমাত্র সদিচ্ছা থাকলেই পাহাড়ে ভূমিধ্বস রোধ করা সম্ভব। সরকারের উচিত পাহাড়ে পরিকল্পিত বসতি কিংবা বসতির জন্য আধুনিক প্রযুক্তি নির্ভর হওয়া। জাপানের মতো দেশে যেখানে বছরে সাড়ে চার হাজার ভূমিকম্প হয়েও প্রাকৃতিক দুর্যোগে মৃত্যুর হার এক শতাংশে নিয়ে এসেছে, সেখানে আমরা কেন পারি না? তারা তো প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে পাহাড়কে শাসন করছে, আমরা কেন পাহাড়িদের দুঃখ লাঘবে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ গ্রহণ  করছি না?

সময়ের দাবি সরকার শুধুমাত্র পাহাড়ের সুরক্ষায় বাস্তবমূখী পদক্ষেপ গ্রহন করুক। পাহাড়ে বসবাসরতদের উন্নয়নে বিশেষ বরাদ্দ দিয়ে টেকশই বাড়ি-রাস্তাঘাট করে দিক। পাহাড়ি ভূমি-খেকোদের শাস্তির বিধান করে প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা করুক। অন্যরা পারলে আমরাও পারবো। আমরা মনে প্রাণে চাই, আর যেন পাহাড় ধসে কারো নির্মম মৃত্যু না হয়। আল্লাহর বিধান মেনে আমরা সবাই যেন পাহাড় রক্ষায় সচেতন হই। নয়তো আমাদের কর্মফল আমাদেরকেই ভোগ করতে হবে। 

সময়ের সাফ কথা.... যাকাত-ছদকা-ফিতরা’র কথা


 অধ্যাপক মো. আক্তার হোসাইন ॥ মানবীয় আমিত্বের পরিপূর্ণ উৎসর্গের নাম যাকাত। মনের মধ্যে স্রষ্টার জন্য মহাশূন্য ভাব জেগে ওঠাই যাকাত। কোন দানকে কুরআনে যাকাত বলা হয়নি। ইসলাম এবং কুরআন নিয়ে যারা গবেষণা করছেন তারা বলছেন যে যাকাত মালের সাথে সম্পর্কিত। অথচ কুরআন মাজিদ ঘোষণা করেছে যে, হযরত লুত, হযরত আদম, হযরত ইব্রাহীম এবং প্রত্যেক নবীই যাকাত দিয়েছেন। বিনিময় প্রথা চালু হলো সেদিনের কথা। শতকরা আড়াই টাকা তখনকার দিনে (১৪৫০ বছর আগে) কিভাবে যে দেয়া হতো তা তো সমাজকে বুঝানো যাবেনা। শতকরা আড়াই টাকাকে কুরআনে এমনকি হাদিসেও কোথাও যাকাত না বলে ছদকা বলা হয়েছে। যেখানেই সম্পদের উপর কর দানের প্রশ্ন সেখানেই ‘সাদকা’ শব্দটি ব্যবহার হয়েছে। তাছাড়া প্রত্যেক নবীই যদি যাকাত দিয়ে থাকেন তবে হযরত আদম (আ.) কাকে যাকাত দিয়েছিলেন এ প্রশ্নটি এসে যায়? কুরআনে বলা হয়েছে ‘আল্লাজি নাহুম লিজ যাকাতে ফায়েলুন’ অর্থাৎ ‘তারা সদা সর্বদা যাকাতের জন্য কর্মতৎপর থাকেন।’ যাকাত যদি কর হতো তবে তার জন্য বিশ্বাসীরা এটা পরিশোধের জন্য সদা তৎপর না হয়ে বছরে একবার দিয়ে অন্য সময়টা এবাদতসহ নানাবিধ কর্মে নিয়োজিত থাকতেন। তাছাড়া সালাতের সাথে যাকাতের প্রসঙ্গ এসেছে। তাহলে সালাত আর যাকাত একসাথে। সমাজের কথামতো কি ধরে নিতে হবে যে সালাত সবার জন্য আর যাকাত বিত্তবানদের জন্য? অবশ্যই না। সালাতের সাথে যাকাতের কথা বারবার এসেছে এবং একটু তলিয়ে দেখতে গেলে মানুষ দেখতে পারবে যে স্রষ্টার সাথে সংযোগ সাধন ও আমিত্বের উৎসর্গের  বিষয় নানাভাবে নানা মহিমায় স্থান কাল পাত্রভেদে বিভিন্ন রকম দৃষ্টান্তে বলা হয়েছে। প্রশ্ন, তাহলে যাকাত কি? উত্তরটি হলো, মানুষ আল্লাহ্র নিকট থেকে যা কিছু যেমন ধন-সম্পদ, বিদ্যা-বুদ্ধি, চিন্তা-ভাবনা ইত্যাদি (চিত্তবৃত্তির সব ধরনের গুণাবলী সবই আল্লাহর দান), আল্লাহর এই দানকে নিজের নিকট না রেখে আল্লাহ্র নামে উৎসর্গ করার নামই হলো যাকাত। মানবীয় আমিত্বের আবরণ ক্ষতিকর। মানুষের আমিত্বের আবরণ উন্মোচিত না হলে স্রষ্টার সাথে সংযোগ হবে না। কুরআনে বলা হয়েছে, সালাত কায়েম (সালাত পড়তে বলেনি) কর এবং যাকাত দাও। সালাতের মূল কাজ হলো স্রষ্টার সাথে সংযোগ প্রচেষ্টা। মানবীয় আমিত্বের আবরণ থাকলে সংযোগ হবে না। এগুলো বিসর্জন দিতে হয়। এ কারণে সালাত এবং যাকাত একত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। মুসলমান অধ্যুষিত রাষ্ট্রের দরবারী আলেমগণ একে কর হিসাবে আদায়ে ফতোয়া দেয়াতেই বিষয়টি মূল বিষয় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। তারা বোঝাতে চাচ্ছেন যে সম্পদ থেকে আড়াই ভাগ দান করলে সম্পদ বৈধ হয়। কিন্তু যদি প্রশ্ন করি যে মৃত কিংবা জীবিত সকল লোকের সম্পদে গরীব, অভাবী, এতিম, ফকির, মৃত ব্যক্তির আত্মীয়দের হক রয়েছে তখন তা দেবেন কি করে? এরা তখন বলে গরীব মিছকিনকে আত্মীয়স্বজনসহ ডেকে কিছু খাইয়ে দিলেই সব সমস্যার সমাধান হবে। কোথায় মালের ব্যাপার-অর্থের ব্যাপার আর কোথায় রুহানী তথা আধ্যাত্মিক ব্যাপার। কুরআনে বলা আছে, যে ব্যক্তি সম্পদ জমা করে রাখে তাকে হুতামা তথা জ্বলন্ত আগুনে চিরদিনই জ্বলতে হবে। ধন সম্পদ জমা করে রাখাটাই যেখানে অপরাধ সেখানে ধনের জন্য যাকাতের বিধান আসে কি করে? তাছাড়া এখানে একটা বিষয় কুরআনের আয়াত দ্বারা বিশ্লেষণ করতে হচ্ছে। কুরআনে বলা আছে, ‘আমি কাউকে বেহিসেবী তথা অফুরন্ত রেজেক দেই এবং কাউকে তার রিজিক নির্দিষ্ট করে রেখে দেই।’ এই বেহিসাবী রিজিক পার্থিব মাল বা ধন সম্পদ নয়। আল্লাহ্ যেখানে প্রত্যেকের ধনের পাই পাই করে হিসাব নেবেন বলে জানিয়েছেন সেখানে বেহিসাবী ধন সম্পদ দিয়ে আবার তার হিসাব চাওয়ার প্রশ্ন কেন? যদি বেহিসাবী সম্পদই ধরে নেয়া হয় তবে কেন বলা হলো যে যারা মাল জমা করে এবং গুণে গুণে রাখে তাদেরকে ওয়াইল নামক নরকে জ্বলতে হবে?
সমাজ আসলে কুরআনের প্রাসঙ্গিক বিষয়গুলোকে একত্রে সমাবেশ করে দেখেনা এবং জ্ঞানের স্বল্পতার কারণে পূর্বে যারা যা বলে গেছেন তাই মেনে নিয়ে কেবল অন্ধকারেই ডুবে আছে। দুনিয়ার সকল ধনীরই সম্পদের নিশ্চয়ই একটা হিসাব আছে এবং থাকাটাই স্বাভাবিক। তাহলে বেহিসাব কথাটা কাদের বেলায়,  কার জন্য প্রযোজ্য? আল্লাহর রিজিকের অর্থ যদি দুনিয়ার ধন সম্পদই হবে তাহলে আল্লাহ্ তার প্রিয়জনকে এই রিজিক নিশ্চয়ই প্রচুর দান করবেন কিন্তু আসলে তা হয়নি বরং আল্লাহ্ তার খাস বান্দাদেরকে এসব সম্পদ হতে এক রকম প্রায় বঞ্চিত করেই রেখেছেন। কোন্ নবী ধনে ধনী ছিলেন? নবীর কোন্ সঙ্গী সাথী ধনী ছিলেন? যারাও ছিলেন তারা তাদের ধন সম্পদ নবীর কাছে নিয়ে এসে আল্লাহর নামে আল্লাহর পথে কি বিলিয়ে দেননি? সুরা মরিয়মের ১৩ নং আয়াতটিকে যদি আমরা বিশ্লেষণ করি তবে এটা স্পষ্ট হবে যে, যাকাত বলতে কি বোঝায়। এ আয়াতে দু’টো শব্দ আছে একটি হলো ‘হানানান’ এবং অন্যটি হলো ‘জাকাতান’। হযরত ইয়াহিয়া (আ:) এর এমন কি সম্পদ ছিল যে, তাঁর প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে যাকাতের প্রশ্ন উঠবে? ‘হানানান’ আসলে মনের গোলযোগ শুন্য একটি শান্ত ভাব। বিশ্ব প্রকৃতির মধ্যে কার্যকারণের কোন গোলযোগ নেই। সৃষ্টির প্রত্যেক স্থানে সবাই ঠিকভাবেই আছে। মনের এই গুণময় ভাবটির নাম হানানান। অতএব যার মাঝে এই হানানান চলে আসে তার মধ্যে কোমলতা প্রকাশ পায়। এই রূপে পরিপূর্ণ প্রশান্তির একটি মানসিক অবস্থার নাম হানানান।  হযরত ইয়াহিয়া (আ.) ছিলেন বৃদ্ধ এবং তাঁর স্ত্রীও ছিলেন বন্ধ্যা। এসময় তাঁকে আল্লাহর তরফ থেকে একটি পুত্র সন্তানের খবর দেয়া হয় বলে হযরত ইয়াহিয়ার মন একরাশ প্রশান্তিতে, কৃতজ্ঞতায় ভরে গিয়েছিলো।  হানানান অবস্থাপ্রাপ্ত হলে বিশ্ব প্রকৃতির স্বাভাবিক বিধানের সঙ্গে মনের পূর্ণ সমন্বয় সাধন ঘটে, আমিত্বের আবরণের পরিপূর্ণ একটি উৎসর্গ হয় অর্থাৎ যাকাত হয়ে যায়। সে ব্যক্তি তখন নিজেই তাকওয়ার মূর্ত প্রতীক। এস্থানে হযরত ইয়াহিয়া (আ.)-এঁর কেবল শোকরানার ভাব, কৃতজ্ঞতার ভাব আল্লাহর রহমতে সিক্ত হবার ভাব। তার মাঝে কোন গর্ব নেই, আমিত্ব নেই আছে কেবল সেজদা আর কৃতজ্ঞতা। তাই, কুরআনের যাকাতকে যারা আয়কর বলেন তারা কিসের ভিত্তিতে বলেন তা বোধগম্য নয়। মানসিকভাবে জীবনের সামগ্রিক উৎসর্গই হলো যাকাত। এটা সাধকের জন্য সালাতের মতোই অবশ্য পালনীয় দেহ ও মনের একটি সার্বিক উৎসর্গ। পরিপূর্ণভাবে যাকাত দেয়া ব্যক্তি জান্নাতবাসী। সূরা তওবার ৬০ নং আয়াতে যে আট জনকে ছদকা দেয়ার কথা বলা হয়েছে তা ভালো করে খেয়াল করলেই সব রহস্য বের হয়ে যাবে। এখানে হুবহু বাংলা অনুবাদ তুলে দেয়া হলো : ‘ছদকাসমূহ গরীব, মিসছিন, ছদকা আদায়ের কাজে নিযুক্ত কর্মচারী এবং অনুরাগী অন্তর বিশিষ্টদিগের জন্য এবং যারা গোলাম তাদেরকে মুক্ত করবে, ঋণগ্রস্ত ব্যক্তিদের দায়মুক্ত করা, আল্লাহর পথ ও পথিকের মধ্যে - এ হচ্ছে আল্লাহর বিধান। আল্লাহ্ বিজ্ঞানময় জ্ঞানী।’ বর্তমান মুসলমান সমাজের শতকরা আড়াই টাকা যদি যাকাত হিসেবে আদায় করা হয় তা খাবে কে?
যে আটজনের কথা বলা হলো তারা ছাড়া অন্য কেউ আছে কি যে অপরের সম্পদের হকদার? ছদকাকে আমরা কেন যাকাত বলে ধরে নিচ্ছি? যাকাত বলতে আমিত্বের আবরণ উন্মোচন, আত্মোৎসর্গ ব্যতীত অন্য আর কোন অর্থেই শব্দটি কুরআনে ব্যবহার হয় নাই। সুরা তওবায় ‘ছদকা’ শব্দটিই আছে যাকাত নেই। কুরআনের নির্দেশ অনুযায়ী ছদকা নির্দিষ্ট আটটি খাতে ব্যয় করতে হবে। খাতগুলো হলো ১। অভাবগ্রস্ত প্রার্থীদের জন্য যারা অভাবের কারণে প্রার্থনা করে থাকেন, ২। অভাবীদের জন্য যারা কোন অবস্থাতেই প্রার্থনা করলো, ৩। যারা ছদকা আদায় এবং তা উপযুক্ত স্থানে বন্টন বিষয়ে কর্মচারীরূপে নিয়োজিত থাকবে, ৪। যারা বন্টন বিষয়ে কর্মচারীরূপে নিয়োজিত থাকবে। যারা আল্লাহ্ ও রাসূলের প্রতি প্রেমের অতিশয্যে অস্বাভাবিক মানসিক অবস্থাপ্রাপ্ত হয়ে উপার্জনের কর্তব্য পালনে বিকল হয়ে পড়ে - তাদের জন্য, ৫। বন্দিকে মুক্ত করার জন্য, ৬। ঋণে আবদ্ধ সৎ কর্মশীল কোন ব্যক্তিকেও আর্থিক মুক্তি দেয়া যেতে পারে যদি তা কর্তৃপক্ষ দ্বারা ন্যায়সংগত হয়, ৭। ধর্মীয় শিক্ষা ও প্রচার কাজে, ৮। পথিকের মধ্যে অর্থাৎ বিপদগ্রস্ত পথিককে এ ছদকা দেয়া যাবে। এমতাবস্থায় যাকাত শব্দটিকে আমরা কখনো মালের মধ্যে বা অর্থের সাথে মিলাতে পারি না।

আমাদের দেশে ঈদের আগে ফেতরা ধরা হয়। এটা যে কোথা হতে কে আমদানি করলো তা এক বিস্ময়। প্রতিটি মানুষকে পৌনে দুই সের গমের সমপরিমাণ দামে ফেৎরা দিতে হয়। যাকাতও মাল, ছদকাও মাল, ফেতরাও মাল আর সবই যদি মাল আর কর হয় তবে তা তিন নামে আসার যে কোন যৌক্তিকতা থাকে না সেটা সাধারণ পাঠকও বুঝে যাবেন। মাল-অর্থ কামানোর এটা একটা শুভঙ্করের ফাঁকি। তাছাড়া এমনও দেখেছি  যে অনেক লোক স্বর্ণের যাকাত দিতে দিতে মূল স্বর্ণের দামের তিনগুণ বেশিও যাকাত দিয়েছেন।  পবিত্র কুরআন না বুঝে পড়ার খেসারত কতো কাল দিয়ে যাবে এই মুসলিম সমাজ? কুরবানীর মাংস কেন তিনভাগে ভাগ করা হয়? একভাগ নিজের, একভাগ আত্মীয়দের এবং একভাগ প্রার্থীদের জন্য? সম্পদের বেলায় এমনটি হলে অর্থাৎ যা কামাই করবো তার এক ভাগ আমার, একভাগ আত্মীয়দের এবং একভাগ প্রার্থীদের? কারণ, কুরআনে তো বলাই আছে  যে, তোমাদের সম্পদে রয়েছে আত্মীয়, গরীব, ফকির, মিসকিন ও এতিমদের হক। যার যার হক আদায় করে দিলেই তো হয়। সূরা আহ্যাবের ৩৩ নং আয়াতে যাকাত আদায়ের মাধ্যমে মনের কালিমা দূর করতে বলা হয়েছে। এভাবে যদি মানুষ চলতো আর কুরআন নির্দেশিত পথে ব্যবস্থা করতো তবে দুনিয়ার কোন মানুষ অনাহারে থাকতো না। কেউ দশ তলায় আবার কেউ গাছ তলায় থাকতো না। সূরা মুমিনে যাকাতের মাধ্যমে পবিত্রতা অর্জন করার চেষ্টা করতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আমরা করছি কি তা? আমাদের ভেবে দেখা দরকার। 

অর্থপাচার বন্ধে সর্বাত্মক ব্যবস্থা নিতে হবে



*শপথ তাদের যারা ছুটে যায় হাঁপাতে হাঁপাতে-আগুনের ফুলকি ছিটিয়ে, সকালে হামলায়, ধূলো উড়িয়ে ঢুকে পড়ে একসাথে। মানুষ তো তার প্রতিপালকের প্রতি অকৃতজ্ঞ। আর সে তো নিজেই তার স্বাক্ষী। আর ধন-সম্পদের প্রতি তার কি কঠিন প্রেম! সে কি জানে না যা কবরে আছে তা উঠানো হবে, আর অন্তরে যা আছে তা প্রকাশ করা হবে। আর সেদিন তাদের খবর তাদের প্রতিপালকের ভাল করেই জানা থাকবে। (আল কুরআন, সূরা আদিয়াত-আয়াত ১-১১)

শেখ উল্লাস ॥ যখন এ দেশের মানুষের এত অর্থ-সম্পদ, টাকা-পয়সা ছিল না তখন সমাজ-সচেতন মানুষদের পক্ষ থেকে বলা হতো ধর্ম নিয়ে রাজনীতি সবচেয়ে বড় দুর্নীতি। এখন অনেক মানুষের হাতে, রাষ্ট্র ও সরকারের হাতে অর্থ-সম্পদ হয়েছে। দেশের অর্থ-সম্পদ আজকাল ব্যাপকহারে বিদেশে পাচার হচ্ছে নানা পন্থায়, যা দেশের সার্বিক আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের পথে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ, অন্য সকল দুর্নীতির টাকা দেশের ভেতরে খরচ হলে, বিনিয়োগ হলে এর কিছু না কিছু অংশ কোন না কোন ভাবে দেশের মানুষের কাজে আসার সুযোগ থাকে, কিন্তু যে অর্থ বিদেশে পাচার হয়ে যায়, তা দেশের আর কোন কাজে আসে না। বিগত দুই তিন দশক ধরে এই অর্থপাচারই দেশের জন্য ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি করে চলেছে। বর্তমান সময়ের দুঃখজনক ও বেদনাদায়ক পরিস্থিতি হচ্ছে, এদেশের বড় বড় ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী, পেশাজীবী ও রাজনীতিজীবীদের একটি বিরাট অংশই এদেশের সকল সুবিধা-সুবিধা ভোগ করে তাদের আখের গোছাচ্ছে বিদেশে, বাড়ি করছে মালয়েশিয়া, আমেরিকা, কানাডা, অষ্ট্রেলিয়ায়; ছেলেমেয়েদেরকেও প্রতিষ্ঠিত করছে বিদেশে, টাকা জমাচ্ছে বিদেশি ব্যাংকগুলোতে। নিজের জন্মভূমি, গ্রাম কিংবা মফস্বলের ছোট্ট শহরে তাদের আর ফিরে যাওয়া হচ্ছে না। দেশের প্রতি তাদের অনীহা, বিস্মৃতিপ্রবণতা ও অকৃতজ্ঞতা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, নিজের জন্মভূমিকে তাদের এবং তাদের ছেলেমেয়েদের নিরাপদ আবাসস্থল হিসেবে বেছে নিতে পারছে না। ফলে নানা কৌশলে তারা বিদেশে অর্থ পাচার করছে এবং সেখানে স্থায়ী নিবাস গড়ে তুলছে। পরিণামে জীবনের শেষ দিনগুলো বিদেশের মাটিতে তারা কাটিয়ে দিচ্ছে ওইসব দেশের দ্বিতীয় বা তৃতীয় শ্রেণীর নাগরিক হিসেবে। এই অবস্থায় একজন মানুষের নিজের প্রতি নিজের বিশ্বাসই হারিয়ে ফেলার অবস্থা তৈরি হয়েছে।
গত ১৩ জুন, ২০১৭, ৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৪, তারিখ মঙ্গলবার দৈনিক কালের কন্ঠ লিখেছে, বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে ৪৫১ কোটি টাকা পাচারকারী ৯ ব্যক্তিকে চিহ্নিত করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। অর্থ পাচারকারী এই ৯ জনের আটজনই ব্যবসায়ী, অন্যজন সাবেক আমলা। তারা দেশের ব্যাংকিং চ্যানেল এবং ব্যাংকিং চ্যানেলের বাইরে এই অর্থ পাচার করেছেন। পাচার করা অর্থ ফেরত আনার ক্ষেত্রে আইনী সহায়তা পেতে যুক্তরাষ্ট্রে তিনটি ’ল ফার্ম নিয়োগ করেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। যুক্তরাষ্ট্রে পাচার করা এই ৪৫১ কোটি টাকাসহ দেশ থেকে পাচার হওয়া যেকোন অর্থ ফেরত আনার ক্ষেত্রে আইনী সহায়তা পাওয়ার লক্ষ্যে এই তিনটি মার্কিন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করা হয়েছে। এই চুক্তি সম্পাদনে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে এশিয়া উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। এই চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ সরকারকে যুক্তরাষ্ট্রে পাচার হওয়া যেকোন অর্থ ফেরত পেতে সব ধরনের আইনী কার্যক্রম পরিচালনায় সহায়তা করবে এই তিন মার্কিন প্রতিষ্ঠান। এ বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করবে এনবিআর। প্রয়োজনে তারা বাংলাদেশ ব্যাংক, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতা নেবে।
পত্রিকাটি আরও লিখেছে, ব্যাংকিং চ্যানেলের বাইরে আমদানী-রপ্তানীতে মিথ্যা তথ্য দিয়ে যারা অর্থ পাচার করেছে, তাদের সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের বা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কোন কর্মকর্তা সহযোগিতা করেছেন কি-না তাও যাচাই করা হচ্ছে।

সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের এই পদক্ষেপ সময়োচিত। ব্রিটিশ ও পাকিস্তানী আমলে এদেশকে শোষণ করে ঔপনিবেশিক শাসকরা এদেশকে, এদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষকে দরিদ্র বানিয়ে এদেশেরই অর্থ লুন্ঠন ও পাচার করে নিজ দেশে নিয়ে গিয়েছিল। আজ আমাদেরই দেশের একশ্রেণীর প্রতারক, দুর্ণীতিবাজ ব্যবসায়ী-আমলা-রাজনীতিজীবি এদেশের অর্থ পাচার করে বিদেশে পাঠিয়ে দিচ্ছে। ব্রিটিশ-পাকিস্তানীদের লুটপাটের কারণে দরিদ্র হয়ে পড়া জনগণের আর্থিক স্বচ্ছলতা বর্তমানে বেড়েছে। দারিদ্র্যের হার কমে আসলেও বিদেশে অর্থপাচারের মতো দুর্নীতি দেশের সামগ্রিক অগ্রগতিকে মারাত্মকভাবে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিয়েছে। সুইস ব্যাংকসহ বিশ্বের বড় বড় ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশী নাগরিকদের পাচার ও জমা করা বিশাল অঙ্কের অর্থের খবর মাঝে মাঝেই প্রকাশিত হয় গণমাধ্যমে। তবে এর প্রতিকার কিংবা অর্থ পাচাররোধে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের গৃহীত পদক্ষেপের খবর খুব কমই সাধারণ জনগণ জানতে পারে, যদিও এ সম্পদ দেশের সকল মানুষের। এ অবস্থা আর চলতে দেয়া যায় না। নিজের জন্মভূমিকে বসবাসের অযোগ্য আখ্যায়িত করে যারা দেশের টাকা বিদেশে পাচার করে তারা দেশ ও জাতির সবচেয়ে বড় শত্রু। তাই তাদের সকলকে চিহ্নিত করে                   তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ ও সর্বাত্মক  ব্যবস্থা গ্রহণ আজ সময়ের দাবি।